প্রতিপক্ষকে ঘায়েল না করার সংস্কৃতি গড়ে তুলুন
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৪২
সরদার আবদুর রহমান : প্রায় দুই দশকের দীর্ঘ সময়কাল অতিক্রম করে জাতি একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে পেল। কিছু ত্রুটি আর কিছু ‘প্রশ্ন’ সঙ্গে নিয়ে এর ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। অতঃপর জনগণ এ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে কেমন রাষ্ট্র ও সমাজ চায়, তা নির্দিষ্ট করতে এবং তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
২০২৬-এর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ’ হওয়া একটি দল ছাড়া নিবন্ধিত সকল দলের অংশগ্রহণ করার দরজা খোলা ছিল। এছাড়া নিকট অতীতের বেশ কয়েকটি নির্বাচনে ভোট প্রদানের হারকে ছাড়িয়ে যায় এবারের নির্বাচন। ফলে বাস্তবেই এটি একটি প্রকৃতই অন্তর্ভুক্তিমূলক তথা ইনক্লুসিভ নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। অতঃপর আশা করা যায় যে, দেশের রাজপথ থেকে জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষগুলো অবধি রাষ্ট্রের জন্য নীতি-কৌশল প্রণয়নের কেন্দ্র হয়ে উঠবে। পারস্পরিক হিংসামূলক ও হিংস্রতা বিস্তারকারী কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে গঠনমূলক চর্চার ক্ষেত্রে পরিণত হবে। অস্ত্রের ভাষা দিয়ে এবং গালাগালি করে প্রতিপক্ষকে আক্রমণের যুগ আর যেন ফিরে আসতে না পারে, সেই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এখন জাতির প্রত্যাশা হলো, এমন একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা এবং সংস্কৃতি গড়ে তোলাÑ যাতে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তনগুলো সাধিত হতে পারে। প্রয়োজন না পড়ে কোনো অস্বাভাবিক পথ ও পন্থা অবলম্বন করার। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সিঁড়ি বেয়ে যে সকল বিষয় দেশকে একটি ইতিবাচক ধারায় এগিয়ে নিতে পারে, সেগুলো তুলে ধরা হচ্ছে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি, যা মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করে।
বিগত দীর্ঘসময় ধরে আওয়ামী শাসনকালে একটি টেকসই শাসনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ‘আইনের শাসন’ একপ্রকার ধ্বংস হতে বসে। এটি হলো এমন একটি শাসনব্যবস্থা, যেখানে আইনের স্থান সবার ওপরে, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং রাষ্ট্রের শাসনকার্যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ইচ্ছার বদলে সুনির্দিষ্ট আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এর মূল কথা হলোÑ আইনের সামনে সবাই সমান, যেখানে সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপ্রধান পর্যন্ত একই আইনের অধীনে থাকবে। এর মূলনীতি ও বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে রয়েছে জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা পদমর্যাদা নির্বিশেষে সকলের জন্য আইন সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। ক্ষমতার দাপট বা পদমর্যাদা ব্যবহার করে কেউ আইনের দায়বদ্ধতা থেকে পার পাবে না। এতে সরকার বা কোনো কর্তৃপক্ষ নিজের ইচ্ছামতো কাজ করতে পারে না, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে। আইনের সঠিক প্রয়োগের জন্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা অপরিহার্য। সাধারণ আদালত কর্তৃক নির্ধারিত পদ্ধতির মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।
সুশাসন প্রতিষ্ঠা
আইনের শাসন অনেকটা সুশাসনেরই অংশ। তবে বিগত শাসনকালে ‘উন্নয়ন’ নামক গোলকধাঁধার চক্করে ফেলে এই শাসনব্যবস্থার প্রকৃত অর্থ হারিয়ে ফেলে। বিশ্লেষকদের মতে, ‘উন্নয়ন’ সাধারণত দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য। নতুন উড়ালসড়ক, আধুনিক ভবন কিংবা বড় প্রকল্প সহজেই চোখে পড়ে। কিন্তু সুশাসন সরাসরি দৃশ্যমান নয়। এটি মূলত নাগরিক অভিজ্ঞতার বিষয়। সুশাসন হলো এমন এক শাসনব্যবস্থা, যা শাসক ও শাসিতের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করে। একজন মানুষ থানায় গিয়ে কী ধরনের সেবা পান, সরকারি দপ্তরে কাজ করতে গিয়ে অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের প্রয়োজন হয় কি না, কিংবা আদালতে একটি মামলার নিষ্পত্তি পেতে কত সময় লাগে, এই অভিজ্ঞতাগুলোই রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে। এখানেই উন্নয়ন ও সুশাসনের মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যায়, উন্নয়নের বর্ণনা যত বেশি জোরালো হয়, নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ ততটাই সংকুচিত হয়ে পড়ে। উন্নয়নকেন্দ্রিক আলোচনার বাইরে গিয়ে সমালোচনামূলক প্রশ্ন উত্থাপনকে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় কিংবা নেতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ সুশাসনের ভিত্তি গড়ে ওঠে প্রশ্ন ও জবাবদিহির মধ্য দিয়েই। যেখানে প্রশ্নের সুযোগ সীমিত হয়, সেখানে জবাবদিহিও দুর্বল হয়ে পড়ে। এ দুর্বলতাই ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। যেসব দেশে আইনের শাসন, নাগরিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়েছে, সেখানে কেবল উন্নয়নকেন্দ্রিক পরিকল্পনা রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে পারেনি। রাষ্ট্র টিকে থাকে তখনই, যখন ন্যায্যতা, আস্থা ও প্রতিষ্ঠানগত ভারসাম্য বজায় থাকে।
দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দেয়া
একশ্রেণির মানুষ ক্ষমতার বলয়ের মধ্যে থেকে সবসময় ওত পেতে থাকে দুর্নীতির সুড়ঙ্গ দিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য। আলোচ্য সময়কালে সরকারি-বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় অর্থের হরিলুট চলতে দেখা যায়। নানা কৌশলে এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে এই অর্থ লুণ্ঠনের মহোৎসব চলে। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে কিছু তৎপরতা দেখা গেলেও সেগুলো বিশেষ ফলদায়ক হতে পারেনি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার কবলে পড়ে এসব বিষয় ধামাচাপা পড়ে যাওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দেয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে ঘটনার নায়করা একেবারে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাওয়ায় লুণ্ঠনকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনাও দুরূহ হয়ে পড়ে।
সেসময় বিদেশে টাকা পাচারের জন্য আমদানি ও রফতানির মতো একটি বৈধ পদ্ধতিকে ব্যবহার করে অবৈধ প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়। মহলটি এজন্য ব্যাংকের এলসি পদ্ধতিকে টার্গেট করে। এভাবে বাণিজ্যের আড়ালে টাকা পাচার করে থাকে মহলটি। এছাড়া আলোচ্য সময়কালে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেখিয়ে সরকারের দেয়া প্রণোদনার অর্থও হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ ওঠে। এ সময়কালে আর্থিক বিষয়ের অন্য খাতগুলোর মতোই ব্যাংক ঋণ ও শেয়ারবাজারে এক অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করে। শত শত কোটি টাকার ঋণ নিয়ে তা ব্যাংকে ফেরত দেয়ার পরিবর্তে এর গ্রহীতারা অদৃশ্য হয়ে যায়। শেয়ারবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটে নিয়েও বহাল তবিয়তে থাকেন দাগাবাজরা। এমনকি কেউ কেউ পুরস্কৃতও হন।
একই সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে; বিশেষত স্বাস্থ্য খাতে বিপুল মাত্রার দুর্নীতি ঘটে আলোচ্য সময়ে। সরকারি কেনাকাটায় বিশেষত ক্রয়কৃত পণ্যের মূল্য কয়েকগুণ বেশি দেখিয়ে বাড়তি টাকা আত্মসাৎ করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। সরকারের দুর্নীতি প্রতিরোধকারী সংস্থাগুলোর তৎপরতা দেখা গেলেও দুর্নীতির মাত্রার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেন কুলিয়ে উঠতে পারে না সংস্থাগুলো। প্রায়ই দেখা যায়, প্রভাবশালী মহলের সুতার টানে এসব পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদি চক্করের মধ্যে আবর্তিত হতে থাকে। এমতাবস্থায় রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণ আর্থিক ক্ষেত্রে সকল প্রকার নেতিবাচক অবস্থা থেকে উত্তরণ লাভ করতে পারবে- এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা
চব্বিশের পরিবর্তনের হাত ধরে দেশের স্থায়ী কল্যাণের জন্য রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। জাতি এমন এক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে যেটি হবে ফ্যাসিবাদমুক্ত, সার্বভৌম এবং ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সংসদ নির্বাচনের পর লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইতোমধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১১ দলীয় জোটের সাথে মিলে একটি সমৃদ্ধ, স্থিতিশীল ও আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সাংবিধানিক শাসনের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে। এই নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করার ফলে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এবং বিরোধীদলের কর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যেকোনো হামলা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা বলা হয়। জাতির প্রত্যাশা, কোনো নাগরিকই যেন ভয়ভীতি বা নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হয়। জামায়াত আরো বলছে, তারা জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে নির্বাচিত সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করবে। তবে একটি আদর্শিক বিরোধীদল হিসেবে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে তারা আপসহীন থাকবে। সরকারের জনকল্যাণমূলক কাজে তাদের সমর্থন থাকবে, কিন্তু যেখানেই জবাবদিহির প্রয়োজন হবে, সেখানে তারা সোচ্চার থাকবে। তারা ঘোষণা করেছে, ‘তাদের উদ্দেশ্য সংঘাত নয় বরং সংশোধন; বাধা দেয়া নয় বরং পর্যবেক্ষণ। দেশের মানুষ এমন একটি সংসদ প্রত্যাশা করে, যা ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করবে এবং স্থিতিশীলতার সাথে রাষ্ট্রকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’
শিক্ষাঙ্গনে স্থায়ী শান্তি
বিগত বছরগুলোয় দেশের উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস ও অশান্তি যেন এক স্থায়ী রূপ নিয়েছিল। কিন্তু এখন সময় এসেছে এই সন্ত্রাস ও অশান্তি দূরীকরণে সরকার ও বিরোধীদল একাট্টা হওয়ার। বিশ্লেষকরা বলেন, নব্বই-পরবর্তী বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির মূল প্রবণতা ছিল ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় তাদের ছাত্র সংগঠন শিক্ষার্থীদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে তাদের ওপর বিধিনিষেধ ও নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেয়া। ছাত্র রাজনীতির নামে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সুপিরিয়র হয়ে উঠেছিল। সরকারি দলের ভাড়াটে বা ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী হয়ে তারা শিক্ষার্থীদের দমন-পীড়ন চালাতো। জোর করে মিছিলে যেতে বাধ্য করা থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত গেস্টরুমে নিয়ে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন ছিল নিয়মিত ঘটনা। বিরোধী শিক্ষার্থীদের ‘ট্যাগ’ লাগিয়ে নির্যাতন করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হতো।
ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব, শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতিতে দলীয় লেজুড়বৃত্তি, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে একাডেমিক যোগ্যতা না দেখে দলীয় আনুগত্যকে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করার রেওয়াজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সবদিক থেকে ডুবিয়েছে। ছাত্র-শিক্ষকদের লাগামহীন অপরাজনীতি বিশ্ববিদ্যালয়কে একসময় সন্ত্রস্ত-রক্তাক্ত করে তোলে। দেশের প্রায় সবগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দলবাজ শিক্ষক ও ছাত্ররা সে পথ ধরে প্রতিটি পবিত্র ক্যাম্পাসকে সন্ত্রাস-রক্তপাতসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে কলঙ্কিত করে তোলে। এভাবে দেশের উচ্চশিক্ষার সৃষ্টিশীল উদ্ভাবনী শক্তি সন্ত্রাসী, ধর্ষক-দখলবাজদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যাশিত মান বজায় রাখতে না পারা এবং শিক্ষা ও গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ নস্যাৎ হওয়ার পেছনে দেশের সামগ্রিক সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে দায়ী করা যায়। মূলত শিক্ষাঙ্গণের বিশৃঙ্খলা, দলবাজি ও অনৈতিক দখলবাজির কারণেই সামাজিক অবক্ষয় বেড়ে যায়। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে নস্যাৎ করে পুরো সমাজব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে থাকে। শিক্ষার নিম্নস্তর থেকে শুরু হওয়া দলবাজি, দখলবাজি ও অনৈতিকতার চর্চা ক্রমে উচ্চশিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়; এমনকি মাদরাসা শিক্ষাকে পর্যন্ত গ্রাস করে ফেলে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দখলবাজি ও অনৈতিক চর্চার বহু চিত্র পাওয়া যায়। সরকারি দলের স্থানীয় নেতা থেকে শুরু করে পুলিশের স্থানীয় দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও এসব অপকর্মের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতির সহসা অবসান ঘটানো ছিল খুবই কঠিন। তবে চব্বিশের পরিবর্তনের পর কয়েকটি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় পরিস্থিতির উন্নতি হতে থাকে।
গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রভাব
অতীতে নির্বাচনগুলোয় অরাজকতা ও নৈরাজ্য একটি নিয়মে পরিণত হয়েছিল। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন রাজনৈতিক অঙ্গনে ইতিবাচক আবহ তৈরি করে। এরই ধারাবাহিকতায় সংসদ ও সরকার গঠিত হয়। এর প্রভাবে অর্থনৈতিক অঙ্গনের অনিশ্চয়তার মেঘও কাটতে থাকে। এখন প্রধান কাজ হবে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনীতিতে আস্থা ফেরানো। একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে স্থিতিশীলতার বার্তা গেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক যাত্রা নতুন করে শুরু হয়েছে। এটি ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। তারা বলছেন, বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে নির্বাচন ছিল একটি ‘প্রয়োজনীয় শর্ত’। কারণ দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি খাত নতুন বিনিয়োগ বা ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহ দেখায়নি। অনিশ্চিত পরিবেশে উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে চাননি। এখন প্রয়োজন কার্যকর নীতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং দৃশ্যমান সুশাসন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে অর্থনৈতিক সংস্কারের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই টেকসই বিনিয়োগ প্রবাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
জনগণ যা চায়-
এ বিস্তৃত প্রেক্ষাপট সামনে রেখে জনগণ যা চায়, তার মোদ্দাকথা হলো, সর্বপ্রকার দুর্নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিচার বিভাগকে স্বাধীন করে সুবিচারের পথ খুলে দিতে হবে। চাঁদাবাজি-দখলদারির প্রতি জিরো টলারেন্স থাকতে হবে, যা ক্রমিক আকারে সজ্জিত করলে নিম্নরূপ দাঁড়ায়-
১. নির্ভয়ে কথা বলার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রাখতে হবে,
২. আর্থিক খাতে দুর্নীতি ও টাকা পাচার বন্ধ করতে হবে,
৩. আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে,
৪. শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি, নিয়োগ বাণিজ্য, ছাত্রাবাসে রুম ও সিট দখল বন্ধ করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে,
৫. শিক্ষাঙ্গনকে মেধা ও প্রতিভা বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে,
৬. অফিস-আদালতকে ঘুষ ও দুর্নীতিমুক্ত করে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে,
৭. বেআইনি, দখলদারি ও অনধিকারের চর্চা বন্ধ করতে হবে,
৮. পারিবারিক ও সামাজিক অশান্তির কারণসমূহ চিহ্নিত করে সেগুলো দূরীকরণে উদ্যোগ নিতে হবে,
৯. গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখে অবৈধ ও বেআইনিভাবে ক্ষমতা ধরে রাখার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে,
১০. রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে এবং স্বাধীন প্রতিরক্ষা নীতি গ্রহণ করতে হবে।