অনৈতিক সাইবার হামলায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করুন
৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৪:৩৮
যুদ্ধের ধরণা বদলেছে, তাই বলে নীতি-নৈতিকতাও এ সভ্য দুনিয়ায় বর্জন কাম্য নয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যালটযুদ্ধ প্রভাবিত করতে অনৈতিক সাইবার হামলাকারীরা জাতির দুশমন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ৩৬ জুলাই-পরবর্তী সময়ে গোটা জাতি যখন নৈতিক-শক্তিতে বলীয়ান হয়ে মানবিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম করছে, ঠিক সেই সময় দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় বর্ষীয়ান জননেতা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের এক্স হ্যান্ডল (সাবেক টুইটার) আইডি হ্যাক করে নারীদের জন্য অবমাননাকর পোস্টের সাথে জড়িতদের ব্যাপারে প্রাথমিকভাবে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা জাতির জন্য লজ্জাকর।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে একদল আইটি বিশেষজ্ঞ ব্যাপক অনুসন্ধানের পর হ্যাক হওয়া আইডি উদ্ধার করেছে। তাদের অনুসন্ধানে হ্যাকিংয়ে জড়িত ব্যক্তি বঙ্গভবনের নামে ই-মেইল ব্যবহার করে এ অপকর্ম করেছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, ‘ডিভাইস হ্যাক করে দলীয় আমীরের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে কর্মজীবী নারীদের সম্পর্কে জঘন্য আপত্তিকর পোস্ট দেওয়া হয়। জামায়াত ও দলের আমীরকে হেয়প্রতিপন্ন করতে ঘটানো হ্যাকের ঘটনায় হাতিরঝিল থানায় গত ৩১ জানুয়ারি শনিবার রাতে জিডি করা হয়েছে। মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।’ জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম তথ্যচিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘শনিবার বিকেল ৪টা ৩৭ মিনিটে জামায়াত আমীরের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নারীদের সম্পর্কে আপত্তিকর পোস্ট দেয় হ্যাকাররা। ওই সময়ে জামায়াত আমীর কেরানীগঞ্জের কোনাখোলা মাঠে নির্বাচনী জনসভায় বক্তৃতা করছিলেন। এর লাইভ ভিডিও রয়েছে। ফলে জামায়াত আমীরের পক্ষে পোস্ট করা সম্ভব ছিল না ওই সময়ে। পোস্টের বিষয়টি ৪টা ৫৩ মিনিটে নজরে আসে জামায়াতের তধ্যপ্রযুক্তি টিমের। বিকেল ৫টা ৯ মিনিটে জামায়াত আমীরের এক্স অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড বদল করা হয়। ৫টা ২২ মিনিটে এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে হ্যাকের বিষয়টি জানানো হয়। তবে এর আগেই ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদের এক্স অ্যাকউন্ট থেকে আপত্তিকর ওই পোস্টটি শেয়ার করে এর বাংলা অনুবাদ দেওয়া হয়।’
হ্যাকাররা হয়তো ভেবেছিলো জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল হয়তো সাইবার যুদ্ধে দক্ষ নয়। কিন্তু তাদের ধারণার চেয়েও অল্প সময়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর আইটি টিম হ্যাকিং হওয়া ডিভাইসটির নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে সমর্থ হয়েছে।
ডিভাইস কীভাবে হ্যাক হলো- এমন প্রশ্নে মাহমুদুল আলম তথ্যচিত্র তুলে ধরে দেখান, গত ২৩ জানুয়ারি বঙ্গভবনের ব্যবহৃত সরকারি ই-মেইল ঠিকানা assistantprogrammer @bangabhaban. gov.bd থেকে জামায়াত আমীরের ই-মেইলে মেইল আসে। এতে লেখা ছিল, ‘নির্বাচন সংক্রান্ত জরুরি তথ্য’। সরকারি ই-মেইল হওয়ায় জামায়াত আমীরের একটি ডিভাইস থেকে মেইলের অ্যাটাচমেন্ট খোলা হয়। এই ‘ফিশিং অ্যাটাচমেন্টে’ ক্লিকের কারণে ওই ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ হ্যাকারদের কাছে চলে যায়। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ জামায়াতের কাছেও একই ই-মেইল ঠিকানা থেকে মেইল যায়। অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের কাছেও ফিশিং মেইল পাঠানো হয়। বঙ্গভবনের সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ার আলমের ই-মেইল ঠিকানাটি ব্যবহার করার কথা। ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপি মহাসচিবের প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী দেলোয়ার হোসেনের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট গত ১২ জানুয়ারি হ্যাক করার চেষ্টা করা হয়।’
আমরা জানি, বিখ্যাত ব্যক্তি; বিশেষ করে বিশ্বনেতাদের আইডি হ্যাক হওয়া কোনো নতুন ঘটনা নয়। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের আগে ইতোপূর্বে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বারাক ওবামা, জো বাইডেনের টুইটার একাউন্টও হ্যাক হয়েছিলো। এবারের অভিযুক্ত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। কারণ প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল বিএনপির দেশে ১১ দলীয় জোটের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেয়া নারীকর্মীদের লাঞ্ছিত করার একের পর এক ঘটনা বিভিন্ন মিডিয়ায় আসার পর আমীরে জামায়াতের ওপর এ সাইবার হামলার নেপথ্যে কারা, তা দেশবাসীর আর জানার বাকি নেই। তারপরও আমরা সরাসরি কাউকে অভিযুক্ত না করে তদন্ত দাবি করছি।
আমরা মরে করি, ডা. শফিকুর রহমান এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণে বিএনপি আতঙ্কিত। তাই সন্দেহের তীর তাদের দিকে যাবে- এটা অমূলক নয়। আমরা আশা করি, যারাই এমন অনৈতিক সাইবার যুদ্ধ শুরু করুক না কেন, সরকারের দায়িত্ব সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতা রক্ষা করে জাতিকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেয়া।