ঘুম রাজ্যে
৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:০৯
শেখ মিজানূূর রহমান মিনু
জীম আর মীম- ওরা দুই ভাই-বোন। সেদিন ওর আম্মু সন্ধ্যাবেলায় বকুনি দিয়ে একটু পড়তে বসিয়েছে, তাও আবার ঘুম। ওকে নিয়ে আর পারা যায় না। সারা দিন দুষ্টুমি করবে, পড়ার নামে ঢো ঢো, কোনো নাম-গন্ধ নেই। সামনে পরীক্ষা, সেদিকে খেয়াল আছে একবিন্দু? অবশ্য মীমকে বলতে হয় না। যত ঝামেলা ঐ জীমকে নিয়ে। ওর নাকি সব মুখস্থ। হাসে মকর মকর। জীম বড়, ক্লাস ফোরে পড়ে। আর মীম পড়ে ক্লাস টুতে। কিন্তু ওদের দুজনে ভীষণ আড়ি। জীম যেন মীমকে একটুও সহ্য করতে পারে না। গণ্ডগোল লেগেই থাকে সব সময়। পড়াটা বলে নিতে গেলেও দোষ। অমনি তেড়ে দেয় চোখ রাঙিয়ে। শুধু কী তাই? মাঝে মাঝে চিমটি কাটতেও ভুল করে না। মীম যখন কান্না করে, তখন বলে- কেন স্যার আসলে বলে নিতে পারিস নে? ‘সব দোষ তো আমার’। অগত্যা মীম মন ভার করে ফিরে আসে ওর পড়ার টেবিলে। সবসময় হিংসুটে ভাব। খাওয়ার সময়ও তাই, মীমের চেয়ে ওর বেশি দিতে হবে। যদি একটু কম হয়েছে তো মহা হুলস্থুল বাধিয়ে বসবে। অবশ্য ওর আম্মু তখন রাগ সহ্য করতে না পেরে বসিয়ে দেন দুটি ‘ঘা’। সারা দিন রৌদ্রে টো টো করে ঘুরে বেড়াবে খেলনা পিস্তলটা নিয়ে। কারো বা গাছ থেকে পেয়ারা চুরি, কারো বা কামরাঙা, আর পাখি শিকার তো আছেই। কতক্ষণ সহ্য করা যায়। সমবয়সীদের সাথেও দুষ্টুমি করতে ভুল করে না। মীমকে মাঝে মাঝে খেলনা পিস্তল দিয়ে গুলি করতে যায়। মীম কেঁদে ওঠে- আম্মু দেখো না ভাইয়া…। অবশ্য সে গুলিতে মানুষ মরে না। তবে একেবারে কম দামিও নয়। সেবার ওর মামা সিঙ্গাপুর থেকে নিয়ে এসেছিলো ওর জন্য ঐ পিস্তলটা। জীম যদিও মীমকে দেখতে পারে না দু’চোখে, মীম কিন্তু ভাইয়া ছাড়া এক মুহূর্তের জন্য থাকতে পারে না। মমতা ভরা ওর অন্তরটা। ওর আম্মু বার বার বলে দিয়েছে, স্কুলে যেয়ে কারো দেওয়া কিছু খাবে না, পথে-ঘাটে অপরিচিত লোকের দেওয়া কোনো কিছু যেন না খায়; এমনকি টাকা দিয়েও যেন কিছু কিনে না খায়। ‘এখন সময় ভালো না’। কাগজ খুললেই দেখা যাচ্ছে, ‘হারানো বিজ্ঞপ্তি’। কোমলমতি ছোট্ট ছেলে মেয়েদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে, একদল কুচক্রী গোষ্ঠী। তারপর বিক্রি করে দিচ্ছে লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে। কারো বা উটের ‘জকি’ হিসেবে ব্যবহার করছে মরুভূমির তপ্ত বালুর ওপর।
তোমরা খুব সাবধানে স্কুলে যাবে আর আসবে, কোনো গণ্ডগোল করবে না, পথে-ঘাটে কেউ কিছু দিলেও খাবে না; এমনকি টাকা দিয়ে কিনেও যেন কিছু না খায়’। জীম ঘাড় কাৎ করে বলে, আচ্ছা!
স্কুলব্যাগ ঘাড়ে নিতেই মীম সাথী হলো। জীম চোখ রাঙিয়ে বললো- এই আমি যে বললাম, তুই আমার সাথে যাবি না। কিন্তু কে শোনে কার কথা? মীম স্কুলব্যাগ ঘাড়ে নিয়ে চললো, ভাইয়ার পেছনে একটু দূরত্ব বজায় রেখে। বলা তো যায় না, আবার যদি…..। স্কুল ছুটির পর সবার মতো ওরাও হৈহুল্লোড় করে বেরিয়ে এলো। হঠাৎ রাস্তার পাশে ঝালমুড়ির গন্ধে জীম ভুলে যায় ওর আম্মুর কথা। দু’টাকার ঝালমুড়ি কিনে খেতে লাগলো, মীমকে না দিয়েই বেশ মজা করে। আর মকর মকর হাসি ফুটে উঠছিল ওর ঠোঁটের কোনে। মীমের তো লোভ লাগছিলো। বললো সে, ভাইয়া আমায় দুটো দাও! মুখ ভেঙচিয়ে বললো জীম- ‘আমায় দু’টো দাও’। না, দেবো না। আমার সাথে আসলি কেন? মীম কাঁদতে লাগলো, ইঁ…ইঁ…ইঁ…, ইঁ…ইঁ…ইঁ…তারপর চোখ মুছতে মুছতে বললো- দাও না ভাইয়া, আমি তোমার ছোট বোন। ‘ছোট বোন তাই কি হয়েছে? আমি তোকে মুড়ি দেবো না, আমি একা একা মজা করে খাবো। মীম আবার কান্না করতে লাগলো। বললো সে ঠিক আছে খাও, আমি আম্মুর কাছে বলে দিয়ে, তোমার ঠিকই বকা খাইয়ে নেবো। জীম দেখলো, সেটাও তো একটা বিপদ, তার চেয়ে দু’টো দেয়াই ভালো। ‘তাহলে আম্মুর কাছে কিছু বলবি না তো? মীম বললো, না।
তবে এই নে, খা।
খবরদার! আম্মুর সাথে বললে কিন্তু খবর আছে। মীম খেতে খেতে ঘাড় নাড়া দিয়ে ‘না’ সূচক জবাব দেয়। এবার ওরা দু’জন একসাথে খেতে লাগলো। কিন্তু গা ঝিম ঝিম করছে কেন? মীম বললো- ভাইয়া, আমারও। হঠাৎ ওদের চোখ জড়িয়ে এলো ঘুমে। পাশে একটা দোকানের বারান্দায় ঘুমিয়ে পড়লো ওরা দু’জন, আত্মভোলার মতো। যখন ঘুম ভাঙলো, তখন দেখলো একটা স্যাঁতসেতে ঘরে ওরা দুই ভাই-বোন আবদ্ধ। মীম তো কান্না শুরু করে দিয়েছে। বললো সে, ভাইয়া, আমরা এখন কোথায়? আমি বাড়ি যাবো। জীম বললো, এই কান্দিসনে থাম! বাড়ি যাওয়া হবে পরে, মনে হচ্ছে আমরা বিপদে পড়েছি। এখন কোনো কথা বলবি না, চুপ! বললাম যে, আমার সাথে কোথাও যাবি না। আমরা যে এখন কোথায় আছি তাও জানি না। মীম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো, তুমি আমায় বকা দিচ্ছো, আমি আম্মুর সাথে সব বলে দেবো।
‘সেটা পরে হবে, এখন একটু চুপ করো বোনটি, না হলে আমরা বিপদে পড়ে যাবো, গায় মাথায় হাত দিয়ে আদরের ভঙ্গিতে বললো জীম। মীম তবুও চোখের পানি মুছতে মুছতে বললো, আম্মু বাইরে কিছু খেতে নিষেধ করেছিলো, তুমি আম্মুর কথা না শুনে ঝালমুড়ি খেতে গেলে কেন, যদি ছেলে ধরার কবলে পড়ে যাও? আমি মেয়ে মানুষ, আমাকে তো ওরা ধরবে না। হাজার চিন্তার মাঝেও জীমের ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠলো। বললো, ‘বোকা মেয়ে’ বুঝিস কিছু? ছেলে ধরা মানে শুধু ছেলে ধরা নয়, ছেলে মেয়ে উভয়েই। যাকে বলে শিশু পাচার। মীম কান্না থামিয়ে বলে, তাহলে কী হবে ভাইয়া?
সেটা তো আমিও ভাবছি, শোন- কানটা একটু এগিয়ে দে।
মীম কানটা এগিয়ে দিতেই, জীম ফিসফিস করে কী যেন বললো। মীম বললো, কী হবে ওটা দিয়ে? চুপ কর, দেখবি মজা।
ভাইয়া, আমার যে খুব খিদে পেয়েছে।
খিদে তো আমারও পেয়েছে কিন্তু…আচ্ছা দেখ তো, আম্মু টিফিন বক্সে যে রুটি ও কেক দিয়েছিলো, আছে কিনা। মীম স্কুলব্যাগ খুলে দেখলো, হ্যা আছে ব্যাগের মধ্যে। জীম বললো- ভাগ্যিস ব্যাগ দু’টো নেয়নি ঐ পাজি বদমায়েশটা। ওরা দুই ভাই-বোন ওগুলো খেয়ে নিলো। এবার বুদ্ধি আটার পালা। কীভাবে এই জালিমদের কবল থেকে পালাবে সেই চিন্তা। হঠাৎ তার মাথায় এলো দুষ্টুমি বুদ্ধি। মীমের কাছে আগেই জেনে নিয়েছে, ব্যাগে সেই মামার দেওয়া পিস্তলটা আছে কিনা। উপস্থিত ওটাই কাজে লাগাবে সে। দাদুর কাছে শুনেছে, ‘বান্দার যখন চেষ্টার শেষ, আল্লাহ তখন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন’। বিসমিল্লাহ বলে খুব সাবধানে পিস্তলটা লুকিয়ে রাখলো প্যান্টের পকেটে। কিছুক্ষণ পরে এলো সেই বদমায়েশ ছেলে ধরা লোকটা। কোমরে তার পিস্তল ও ডান হাতে বেতের লাঠি। দিন গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা। ষাট পাওয়ারের কমলা রঙের ‘ডুম’ জ্বলছিলো টিম টিম করে। রেশমা ভয়ে চুপসে গেছে ঐ ভয়ঙ্কর লোকটাকে দেখে। কী সাংঘাতিক তার চেহারা। মাথার চুলগুলো ঝাঁকড়া, কোঁকড়ানো দাঁত কি বিশ্রী খয়েরি ময়লা, আজম্মা না মাজা। ভ্রুজোড়া চওড়া কালো কুঁচকুঁচে। মুখ ভরা গোঁফ দাড়ি আগোছালো। চোখ দুটো যেন আগুনের গোলা। হাতের মাংসপেশিগুলো ফোলা ফোলা, যেন সাক্ষাৎ যমদূত। মীম ভয়ে মুখ লুকালো ভাইয়ার বুকের মধ্যে। কথা বললো ভয়ঙ্কর লোকটি বেশ গম্ভীর কণ্ঠে- তোমাদের এখানে কেন নিয়ে এসেছি জানো? এক্ষুণি দু’লক্ষ টাকা দিতে হবে। কথা বলার সাথে সাথে উৎকট গন্ধ বের হলো লোকটির মুখ থেকে। জীম নাকটা সিঁটিয়ে একটু পিছিয়ে এলো। তারপর বেশ সাহসী কণ্ঠে বললো- আমরা ছোট মানুষ, কোথায় পাবো টাকা? তুমি কি সেই ঝালমুড়িওয়ালা? ভয়ঙ্কর লোকটি হেসে উঠলো হে…হে…।
হে…হে… তুমি ঠিকই চিনতে পেরেছো। তবে আমি নই, আমার এরকম অনেক লোক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সারা দেশে। হাতের লাঠিটা ঘুরাতে ঘুরাতে বললো।
আমার আম্মু নিষেধ করেছিলো, পথেঘাটে যেন কিছু কিনে না খাই বা কারো দেওয়া কিছু না খেতে, কিন্তু…।
লোকটা অদ্ভুতভাবে হেসে উঠলো আবার। তারপর হাসি থামিয়ে বললো- কিন্তু বড্ড লোভ লেগেছিলো বোধ হয়, তাই না? জীম রাগে ফুঁসতে লাগলো। ধৈর্য ধরার বান্দা সে নয়। কিন্তু এখন তাকে কৌশলী হওয়া ছাড়া উপায় নেই। বললো সে- তোমরা কি ‘ছেলে ধরা’?
শুধু ছেলে নয়, শিশু হলেই হলো। তাই ছেলে হোক বা মেয়ে। মীম ভাবলো, তাহলে ভাইয়ার কথাই তো সত্য। সে ভয়েতে আরও কুঁকড়ে গেল, ভাইয়ার বুকের মধ্যে।
আচ্ছা, আমাদের ধরে নিয়ে তোমরা কী করো? জিমের কথার মধ্যে ছিল দৃঢ়তা ও বুদ্ধিদীপ্ত সাহস। ও এরকম অনেক গল্প শুনেছে, দাদু ও আম্মুর কাছে। অবশ্য আব্বু সময় পান না অফিসে সময় দেওয়ার জন্য। শুধু তাই নয়, ওর দাদুর খবরের কাগজের ছোটদের পাতা, ‘ডাংগুলি’, ‘গোল্লাছুট’ ‘নীল সবুজের হাট’, ‘পাতা বাহার’, ‘হৈহুল্লোড়’ ‘ইচিং বিচিং’, ‘আগডুম বাগডুম’ ওর খুব প্রিয়। যেমন দুষ্টুমি তেমন লেখাপড়ায়ও ভালো। বললো লোকটা- দেখো ছেলে, তোমাকে আমি খুব সরল সোজা ভেবে সব বলতেছি, যেন চালাকি করার চেষ্টা করবে না, তাহলে কিন্তু এ-ই…কোমরের ডান ধারের পিস্তলটা দেখিয়ে বললো। জীম মৃদু দুষ্টুমি হেসে বললো- ঠিক আছে।
এবার শোন তবে। প্রথমে মোবাইলের মাধ্যমে তোমাদের আব্বু-আম্মুকে টাকা দিতে বাধ্য করি। যদি অস্বীকার করে তখন এই বেত দিয়ে তোমাদের মতো শিশুদের পিটিয়ে পিটিয়ে তক্তা বানিয়ে ফেলি। যেটা দেখানো হবে ভিডিওর মাধ্যমে, আর্তচিৎকারের ছবি, তোমাদের আব্বু-আম্মুকে। তারপর যদি কাজ না হয়, তখন বাহরাইন কিংবা ভারতে বিক্রি করে দিই মোটা টাকার বিনিময়ে। তারপরও যদি কথা না শোনে, তখন এই অস্ত্র, বুঝলে? কোমরে পিস্তলটা দেখিয়ে বললো লোকটা। শেষের কথাগুলো যখন বলছিলো, তখন তার চেহারাটা যেন আরও ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছিলো। কিন্তু জীম ভয় পাবার পাত্র নয়। বললো সে- তুমি আমাদেরও মারবে বুঝি?
যদি কথা না শোন তখন। আচ্ছা, এবার শোন তাহলে- তোমরা লক্ষী ছেলের মতো এই মোবাইলে, তোমার আব্বুর কাছে বলবে, আমরা দুই ভাই-বোন আটকা পড়েছি। এক্ষুণি দু’লক্ষ টাকা দিয়ে আমাদের ছাড়িয়ে নিয়ে যাও। ‘না হলে ওরা আমাদের মেরে ফেলবে’। মীম ভয়েতে একদম চুপসে গেছে নেংটি ইঁদুরের মতো। গলা শুকিয়ে গেছে ওর। কোন কথা বলছে না সে। জীম বললো- আচ্ছা বলছি, তার আগে বলো তোমার কোমরে ওটা কী? লোকটা বুঝলো, পিচ্চিটা যথেষ্ট সরল সোজা। তার মাধ্যমে দু’লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া যাবে সহজে। বিধায় তার সাথে তাল মিলিয়ে যাওয়া মন্দ নয়। বললো লোকটা- এটা? এটা হলো মানুষ মারা জন্তর।
কই দেখাও তো কীভাবে মানুষ মারতে হয়। লোকটা যখন কোমর থেকে পিস্তল ছাড়িয়েছে, ঠিক তখনই জীম তার পকেট থেকে খুব দ্রুত বের করে আনে তার পিস্তলটা এবং তক্ষুণি শক্ত হাতে মাথা বরাবর ঠিক করে চেপে ধরে পিস্তলটা। তারপর বেশ কঠিন কণ্ঠে বললো- এক্ষুণি তোমার হাতের ঐ জন্তরটা ফেলে দাও, দাও বলছি। নইলে এক্ষুণি তোমার মাথাটা ছিদ্র হয়ে যাবে এবং সকালে তোমার লোকজন এসে দেখবে একটা রক্তাক্ত মৃত্যু দেহ। বেশ দৃঢ়তার সাথে বলে থামলো জীম। ওর চোখে মুখে ফুটে উঠেছে একটা জিঘাংসার প্রতিচ্ছবি। ট্রিগারে গোঁজা রয়েছে শাহাদাত আঙুল। যে কোনো মুহূর্তে গুলি ছুড়বে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। লোকটার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। তাকে যথেষ্ট সরল-সোজা ও হাবা-গোবা ভেবেছিলো, তার আচরণ দেখে। কিন্তু তার কাছে যে এমন একটা জ¦লজ্যান্ত অস্ত্র আছে, কে জানতো? হকচকিয়ে গেল সে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্য। ভাবলো, ছেলে মানুষ হঠাৎ যদি ট্রিগারটা চেপেই দেয়, তাহলে? কেন যে ওদের কাছ থেকে বই খাতার ব্যাগ দুটি কেড়ে নিইনি। নিজের ভুল বুঝতে পারলো। অসহায় হয়ে পড়লো ছোট্ট দুটি পিচ্চির কাছে। এ যেন জীবনের চরম পরাজয়। এবার গর্জন করে উঠলো জীম- কী হলো, কথা শুনছো না কেন? মরতে চাও? ছাড়ো, ছাড়ো বলছি। লোকটা তার হাতের পিস্তল ছাড়তে বাধ্য হলো।
এবার পিছনে ফিরে এগিয়ে যাও, যে পথ দিয়ে এসেছিলে। লোকটি তাই-ই করলো যাদুমন্ত্রের মতো। জীমের হাতের পিস্তলটা হালকা আলোতে একদম আসল পিস্তলই মনে হচ্ছিলো। এদিকে মীম তার ভাইয়ার কাণ্ড দেখে তো অবাক হয়ে গেছে। ভাগ্যিস, পিস্তলটা সেই’ই ভাইয়ার ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিলো, নইলে…।
জীম এবার ঐ লোকের ফেলে দেওয়া আসল পিস্তলটা হাতে উঠিয়ে নিয়ে বললো- ঐ ঘরে ঢোকো। কি আশ্চর্য, লোকটা এই খুদে পিচ্চির কাছে এতো অসহায় হয়ে পড়লো যে, যন্ত্রচালিতো রোবটের ন্যায় নির্দেশ পালন করে ঢুকে পড়লো, সেই ‘আয়নাঘরের’ মধ্যে। দারোয়ানকে বললো, তালা মারো। দারোয়ান বললো, কী হবে তালা মেরে?
কথা বাড়িয়ো না। যা বলছি শোন, নইলে গুলি ছুড়বো। দারোয়ান ভেবে পেলো না, এই খুদে পিচ্চিটা কীভাবে দূরন্ত সাহসী হয়ে উঠলো। দারোয়ান তাই করলো। জীম বললো, চাবিটা দাও।
না বাবু, চাবিটা নিও না। আমার চাকরি থাকবে না।
কথা কমাও, মরতে চাও?
না বাবু, এই নাও চাবি। জীম চাবি নিয়ে বললো- তোমরা এদিকে কেউ তাকাবে না। নির্ঘাত গুলি ছুড়বো।
চল মীম আমরা পালাই। মীমের হাত ধরে দে ছুট। ঠিক তখনই ভয়ঙ্কর লোকটা চেঁচিয়ে উঠলো- ওই দুই পিচ্চিকে ধরো, ওরা আমাকে বন্দী করে পালাচ্ছে। ওদের প্রয়োজনে হত্যা করো…. গুলি করো… দারোয়ান বললো- আপনি তো এতক্ষণ কিছু বলেননি।
বলিনি, এখন বলছি। ধরো ওদের, এক্ষুণি ধরো, দাঁতে দাঁত পিষে বললো। ততক্ষণে ওরা অনেক দূরে চলে গেছে। পিঠে ব্যাগ থাকায় দৌড়াতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। মীমতো দৌড়াতে পারছে না। হাঁফিয়ে গেছে, ক্ষুধায় কাতর সে। জীম ওর হাত ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগলো। উপায় নেই, পিছনে ধাওয়া করে আসছে শত্রুদল।
ভাইয়া, আমি আর পারছিনে, তুমি পালাও, আমি জিরিয়ে নেই।
বোকা মেয়ে, ওরা এক্ষুণি ধরে ফেলবে এবং আমাদের ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে। আর একটু দৌড়াও বোনটি, ঐ পাঁচিলটার পাশে যেতে পারলেই…আর কথা বের হলো না, হাঁফিয়ে গেছে সে। কণ্ঠনালি শুকিয়ে হয়ে গেছে কাঠ। কিছুক্ষণ পরে আবার বললো- আর একটু, আর একটু, এইতো এসে গেছি প্রায়, ব্যাগটা না হয় ফেলে দাও। মীম তাই করলো।
এদিকে ওরা পিছন দিক থেকে ধেয়ে আসছে যমদূতের মতো। হাতে ওদের আগ্নেয়াস্ত্র, আর ঘাড় ভাঙা জাপানি ইলেকট্রিক লাইট। লাইটের আলোতে ওরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে দুই পিচ্চি দৌড়াচ্ছে প্রাণ পনে, পাঁচিলটার পাশে যাওয়ার চেষ্টা করছে। জীম খুব দ্রুত মীমকে পার করে দিয়ে নিজে বুক ঘষা দিয়ে ওপারে লাফিয়ে পড়লো এবং চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠলো আম্মু…। ঠিক তখনই ওর ঘুম ভেঙে গেল এবং দেখলো, খাটের নিচে পড়ে আছে সে।