দুর্নীতি, চাঁদাবাজ-দখলবাজদের না, গণভোটে হ্যাঁ বলুন
২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:২৪
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
২০২৪-এর জুলাই ৩৬-এর পর জনগণ মনে করেছিল ফ্যাসিবাদ চলে গেছে। ছাত্র-জনতা স্বাধীনতার ফল ভোগ করবে। কিন্তু দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির শুধু হাতবদল হয়েছে। কোথাও আবার পরিমাণ বেড়েছে। কারণ আওয়ামী ফ্যাসিবাদীরা ১৬-১৭ বছর যা খাইছে, আরেক দল ১৬-১৭ মাসেই খাওয়ার পরিমাণ কভার করেছে। আপনি গ্রাম-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে চায়ের দোকানদার, পানের দোকানদার থেকে ছোট-বড় বাজারঘাট, বাস, রিকশাস্ট্যান্ড কোথাও চাঁদাবাজদের আনাগোনা থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
বর্তমান ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার আগামী মাসের ১২ তারিখে জুলাই সনদের ওপর গণভোটে হ্যাঁ ভোট এবং জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে। ইতোমধ্যেই নির্বাচন কমিশন নির্বাচন ও গণভোটের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। জনগণও জুলাই সনদের ব্যাপারে হ্যাঁ ভোট দেয়ার জন্য প্রচার করছে। সরকারের পক্ষ থেকেও হ্যাঁ ভোটের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যা গণভোটের জন্য ইতিবাচক। অন্যদিকে জাতীয় নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করা হয়েছে। মনোনয়নপত্র জমা হয়েছে। বাছাই পর্ব শেষ। প্রতীক বরাদ্দ শেষ হয়েছে। গত ২২ জানুয়ারি থেকে দল, জোট ও ব্যক্তিপর্যায়ে ভোটের বাজারে উত্তপ্ত প্রচার চলছে। মূলত জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি মাঠে তৎপর। জামায়াতের সাথে যোগ হয়েছে আরো ১০ দল এনসিপিসহ। ইতোমধ্যেই ৩০০ আসনে জামায়াত জোট তাদের সহযোগীদের নিয়ে মাঠে কাজ শুরু করেছে। আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান দেশের উত্তরাঞ্চল পঞ্চগড় থেকে শুরু করে পাবনা পর্যন্ত ২ দিনে সফল সফর করে গেছেন। প্রত্যেক জনসভায়ই জনতার ঢল নেমেছিল। আগেরকার রাজনীতি ভুলে গিয়ে ছাত্র-জনতা দুর্নীতিমুক্ত চাঁদাবাজ, দখলদারমুক্ত সমাজ গঠনের জন্য সৎ, যোগ্য, জনদরদি লোকদের তাদের মনোনীত সংসদ সদস্য নির্বাচন করে সংসদে পাঠানোর দৃপ্ত শপথ নিয়ে কাজ করছে। প্রত্যেক এলাকায়ই যারা প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছে, তারা জামায়াত জোটের প্রার্থীর তুলনায় কম যোগ্য বলেই মনে হচ্ছে। আমীরে জামায়াত ঢাকাসহ দক্ষিণবঙ্গে সফর শুরু করেছেন। জোটের প্রার্থীদের তিনি পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। জনতা হাত তুলে সমর্থনের আওয়াজ তুলছেন। অন্যদিকে দাঁড়িপাল্লাসহ জোটের প্রতীকে ভোট দেয়ার আহ্বান করছেন। সাথে সাথে জুলাই ২৪-এর সনদের প্রতি হ্যাঁ ভোট দেয়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান করছেন। আমাদের আশা একই। হ্যাঁ ভোট জয়যুক্ত হবে। অন্যদিকে দাঁড়িপাল্লাসহ জোটের অন্য প্রতীকের প্রার্থীকেও বিপুল ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবেন।
দীর্ঘ ৫৫ বছর বাংলাদেশের মানুষ তাদের প্রাপ্তি বুঝে পায়নি। যারাই ক্ষমতায় গেছে, তারা তাদের দল ও আত্মীয়দের টাকা বানানোর ব্যবস্থা করেছে। তারা অবৈধভাবে টাকা কামিয়ে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেশকে ফতুর করে ফেলেছিল। ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে জুলাই ৩৬-এর আন্দোলনে ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে স্বৈরাচারী হাসিনা পালাতে বাধ্য হয়। আগে-পরে তার দোসররাও দেশের মানুষের আক্রোশের ভয়ে দেশ থেকে পালিয়েছে। কেউবা ধরা পড়ে জেলে আছে। বিচারের অপেক্ষায় দিন গুনছে। জনগণ টেরই পায়নি যে, তারা কীভাবে দেশটাকে প্রতিবেশীর কাছে বিভিন্নভাবে বিক্রি করে দেয়ার ব্যবস্থা করেছিল। এক আদানির কাছেই বিদ্যুৎ খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার অসম চুক্তি করেছিল। এছাড়া সড়ক, নদীপথ তাদের সেভেন সিস্টারকে যুক্ত করার জন্য আমাদের ভূমি ব্যবহার করে ট্রানজিট ব্যবস্থা করে। বর্তমান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার সব চুক্তি খতিয়ে দেখছে। দুর্নীতির পথ বন্ধ করার ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমরা সব দেশের সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই। কিন্তু কারো সাথে গোলামির চুক্তি করতে চাই না। দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল দুর্নীতির রানি শেখ হাসিনা। এ সরকার চুরির পথ কিছুটা হলেও বন্ধ করেছে। চুরি করা টাকা ফেরত আনার চেষ্টা চলছে।
সামনে নির্বাচন ও হ্যাঁ ভোটের পরপরই দেশদরদি জামায়াত জোট ভোটে নির্বাচিত হয়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে পারবে বলে আমি মনে করি। নির্বাচনের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। এ সময়ে জোটের প্রার্থীরা গ্রাম-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে জনগণকে দেশের কল্যাণে কাজ করার জামায়াত জোটের প্রার্থীদের দাওয়াত পৌঁছে দিচ্ছে। তাদের দায়িত্ব বুঝে দেয়ার চেষ্টা করছে। বিপুল সাড়া পাওয়া যাচ্ছে সাধারণ মানুষের থেকে। মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের গুম-খুন, জেল-হাজত, আয়নাঘরের করুণ কাহিনীতে। মানুষ আর ফ্যাসিবাদ চায় না। তারা নৌকা, ধানের শীষ আর লাঙলের প্রার্থী না, দাঁড়িপাল্লার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। তারা জামায়াত জোটকে ভোট দিয়ে সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত প্রার্থীকে সংসদে পাঠাতে চায়।
ইতোমধ্যে বিএনপি চেয়ারম্যানও ভোটের হাটে বক্তব্য দেয়া শুরু করেছেন।
জুলাই বিপ্লবের ফলে পরিস্থিতি অনুকূলে হওয়ায় এবং ভিনদেশের অনুমতি নিয়ে দেশে ফিরে মায়ের কবর দিতে পারলেন। আবার অবৈধ সুযোগ-সুবিধা নিয়ে প্রটোকলের আওতায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অন্যদিকে জামায়াত জোট নেতা জনগণের কাছে যাচ্ছে, সময়ে রিকশায় চড়ে আবার হেঁটে, গাড়িতে, প্লেনে। যখন যেটা, তখন সেটা ব্যবহার করেই দেশের জনগণের কাছে জামায়াত জোটের নেতা ডা. শফিকুর রহমান আগামী দিনের দেশ কীভাবে তারা চালাবেন, তার ফিরিস্তি তুলে ধরছেন। দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, ব্যবসা-পাতি, বিদেশনীতি, যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি, জনগণের চাওয়া-পাওয়ার দিকনির্দেশনা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। সস্তা বুলি না আওড়িয়ে বাস্তবভিত্তিক দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার উত্তম পরিবেশ; বিশেষ করে গরিব পিতা-মাতার ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষার আলোকবর্তিকা তুলে ধরছেন। মেয়েদের উচ্চশিক্ষার দ্বার খুলে দিচ্ছেন। তারা পয়সা ছাড়াই উচ্চশিক্ষা লাভ করতে পারবে। চাকরিতেও মেয়েদের বিশেষ ক্ষেত্রের ব্যবস্থা হবে। তারা নিরাপদে তাদের কাজকর্ম করতে পারবে।
ছাত্র-ছাত্রীদের বেকার না করে তাদের বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। গ্রামভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য কলকারখানা তৈরি করে ছেলেমেয়েদের কাজের ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। আমাদের দেশের কম শিক্ষিত যুবকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও ভাষাজ্ঞান দিয়ে তাদের বিদেশে চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। যে দেশে যাবে, সেই দেশের ভাষা ও কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠালে কয়েকগুণ বেশি বেতন-ভাতা তারা পাবে। বিদেশি মুদ্রার ঘাটতি তারা রেমিট্যান্সে পাঠিয়ে দেশের উপকার করতে পারবে। অন্যদিকে অপ্রচলিত জিনিসপত্র যেমন মাছের আঁশ, পাটজাত দ্রব্য, হস্তশিল্পের কাজ; এমনকি আমাদের দেশের টোস্ট বিস্কিট টনকে টন বিদেশে রফতানি হয় এবং রফতানি বাড়ানোর সুযোগ আছে। জামায়াত জোট সরকার গঠন করতে পারলে বিদেশে কর্মরত দূতাবাসগুলোকে স্ব স্ব দেশের আমদানি ও রফতানিযোগ্য পণ্যের সন্ধানে ব্যবস্থা করা হবে। আমাদের দেশের সব বিভাগের লোকদের এবং আমলাদের কাজের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। ভালো কাজের জন্য পুরস্কার, মন্দ কাজের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। মূলকথা হলো, দেশের গ্রামের মেম্বার থেকে শুরু করে এমপি, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট সবার কাজের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। কোনো অপচয় করার সুযোগ থাকবে না। ফলে অল্প বাজেটেই ভালো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যাবে।
আবার বলতে চাই, জামায়াত জোটের পরিধি যেমন বাড়ছে; অন্যদিকে জোটের প্রার্থীরাও জনগণের কাছে পৌঁছাতে পারবেন। ফলে বিএনপির প্রার্থীরা হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণখেলাপির তালিকায় পড়েছে। দ্বৈত নাগরিকের ঘটনাও কম নয়। কারণ তারা দেশকে ভালোবাসার চেয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যেই ঘোষণা করেছেন, যারা ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিক তাদের তালিকা আসলে নির্বাচনের পরও প্রার্থিতা বাতিল করা যাবে এবং আইনের আওতায় আনা হবে।
চাঁদাবাজির টাকা দিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করে নমিনেশন নিয়ে নির্বাচনী মাঠে জনগণকে ব্যবহার না করে ভোট কারচুপির টার্গেট করছে। এবার ভোট কারচুপি বা ডাকাতির চিন্তা করলে ভোটকেন্দ্র থেকে সুস্থ অবস্থায় বাড়ি ফেরা যাবে না। ছাত্র-যুবকরা ৫ আগস্টের শিক্ষা কাজে লাগিয়ে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ভোট করার কাজে সময় দেবে। আবার কোনো কর্মচারী, যারা ভোট নিতে আসবে, তাদেরও সজাগ থাকতে হবে কোনো কারচুপি করে রেহাই পাওয়া যাবে না বা ঘরে ফেরা যাবে না। ভোটকেন্দ্র পাহারায় আর্মি, বিজিবি, পুলিশ, র্যাব সবাই নিরপেক্ষ ভোট করার ব্যাপারে সচেতন থাকবে। ছাত্র-জনতাও এবার ভোটকেন্দ্রে ভোট দিয়ে ভোটকেন্দ্র পাহারায় থাকবে। তাই আমরা জামায়াত জোটকে বলব আপনাদের ভোটাররা সকাল সকাল ভোট দিয়ে যেন ছাত্র-যুবকরা ভোটের ফলাফল নিয়ে বাড়ি ফেরে।
জামায়াত জোটের নেতা ও কর্মীদের ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। যেহেতু প্রতিপক্ষ ভোটের আগেই জেনে যাবে- তাদের পক্ষে জনগণ নেই, তাই তারা যেকোনো ঘটনা ঘটিয়ে ভোট বানচাল করার চেষ্টা করতে পারে। আমাদের জুলাই বিপ্লবের ফসল সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ সদস্য বানানো এবং হ্যাঁ ভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যেতে হবে। প্রতিপক্ষরা না ভোটের কথা বলতে গেলে তাদের জানান দিতে হবে, এই ভোটের সুযোগ পেয়ে, আগস্ট বিপ্লবের কারণে। তাই হ্যাঁ ভোটই জয়যুক্ত করতে হবে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির কর্মী-সমর্থকদের স্পষ্ট বলতে হবে, হয় দেশের জন্য কাজ কর, না হলে ফ্যাসিস্ট হাসিনার যে দশা হয়েছে, তোমাদের একই অবস্থা হবে। আমরা দেশের ভালো চাই, জনগণের কল্যাণ চাই। আগামী দিনে আমাদের নতুন প্রজন্মকে একটি সোনার বাংলা উপহার দিতে চাই। গোটা দুনিয়ার মিডিয়া ও দেশের প্রতিনিধিরা যারা বাংলাদেশে আছে, তারা বুঝে গেছে জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসবে তাদের প্রতিটি কাজের কারণে। জনগণ অনেক গুম-খুন, আয়নাঘর দেখেছে, তারা আর পেছনে তাকাতে চায় না। আমরাও সচেতন নাগরিক সমাজ দল-মত ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে জামায়াত জোটকে ক্ষমতায় এনে পরীক্ষা করতে চাই। তারা সততা-যোগ্যতার সাথে দেশ চালাতে পারে কিনা? যদিও দেশে ব্যাংক ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় জামায়াতের লোকেরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা প্রমাণ করেছেন যে, তারা দক্ষতার সাথে কাজ করতে পারবেন।
সচেতন ছাত্র-ছাত্রীরা ইতোমধ্যেই ডাকসু, জাকসু, রাকসু চাকসু, জকসুতে প্রমাণ করেছে যে, তারা সততার সাথে কাজ করতে পারে। দেশের শিক্ষিত সমাজও ছাত্রশিবিরের ভূমিকার প্রশংসা করছে। কয়েকদিন পূর্বে একটি প্রোগ্রামে আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমানের পাশেই দেখা গেল দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বসে আছেন এবং ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম কানে কানে কী যেন বলছেন আমীরে জামায়াতকে। অতএব জনতা বুঝে গেছে, আর চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজদের ভোট দেবে না। জামায়াত জোটের সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত লোকদেরই ভোট দেবে এবং হ্যাঁ ভোট দিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে, ইনশাআল্লাহ।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল : rnabi1954@gmail.com