একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালী
১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:০৫
॥ আব্দুস সাত্তার সুমন ॥
ভ্রমণ হলো অজানার দিকে এগিয়ে যাওয়া, নিজের ভেতরের ক্লান্তিকে পেছনে ফেলে নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া। সেই অনুভূতি নিয়েই আমরা চারজনÑ আমি আব্দুস সাত্তার সুমন, আমার সহধর্মিণী সাহারা নাসরিন, আমাদের ছেলে সাঈদুল ইসলাম আর মেয়ে সুবাহ মনি রওনা দিলাম বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালীর উদ্দেশে।
কক্সবাজার থেকে অজানার পথে
সকালটা ছিল ভীষণ রকমের ব্যস্ত অথচ মনটা ছিল ছুটির আনন্দে হালকা। কক্সবাজার শহরের চেনা কোলাহল পেছনে ফেলে আমরা সিএনজিতে উঠলাম। গাড়ির জানালা দিয়ে ছুটে চলা রাস্তা, দোকানপাট, মানুষ সবকিছু ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, শহর আমাদের ছেড়ে দিচ্ছে প্রকৃতির হাতে।
সিএনজি থামল নোনারছড়ি ঘাটে। এখান থেকেই শুরু হলো আসল রোমাঞ্চ। সামনে অপেক্ষা করছিল সী-ট্রাক (জাহাজ) লোহার শরীর, কিন্তু বুকে ধারণ করে অজস্র গল্প। জাহাজে পা রাখতেই হালকা দুলুনি, আর সেই সঙ্গে বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শিহরণ।
নদী-সাগরের মিলন
জাহাজ ছাড়তেই প্রথমে পেরোলাম বাকখালী খাল। দুই পাশে সবুজ, মাঝখানে ধীর জল নদীর বুকে জাহাজের শব্দ যেন এক ধরনের সংগীত তৈরি করছিল। একটু পরেই এল কোহেলিয়া নদী। নদী এখানে প্রশস্ত, জল গাঢ় রঙের, আর বাতাসে লবণের গন্ধ।
হঠাৎ একপাশে খুলে গেল বিশাল বঙ্গোপসাগর। ঢেউ আছড়ে পড়ছে, দূরে জেলেদের নৌকা দুলছে আর পাশে ছুটে চলছে স্পিডবোট। সুবাহ অবাক চোখে তাকিয়ে, সাঈদ উত্তেজনায় জিজ্ঞেস করে
আব্বু, ওটাই কি সমুদ্র?
আমি বলি, হ্যাঁ বাবা, আজ আমরা সমুদ্রের খুব কাছের গল্প দেখছি।
পথে পার হলাম জেটিঘাট। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল আমরা যেন ধীরে ধীরে এক অন্য জগতে ঢুকে পড়ছি, যেখানে সময়ের গতি একটু কম।
মহেশখালীতে প্রথম স্পর্শ
জাহাজ থেকে নেমেই মহেশখালীর বিখ্যাত মিষ্টি পান খেলাম খুব মজাদার এবং মিষ্টি স্বাদের পান। তারপর সিএনজিতে যাত্রা। নামলাম পানিরছড়া শান্তি বাজারে। বাজারের নামের মতোই পরিবেশ শান্ত-নিরিবিলি। এখান থেকে নোনীরছড়া হয়ে প্রায় ২৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছালাম রাহেলা আপার বাড়িতে।
অচেনা জায়গায় এমন আপন আতিথেয়তা সত্যিই মন ছুঁয়ে যায়। মনে হলো, আমরা কোনো অতিথি নই আমরা যেন আপনজন।
সন্ধ্যার রোমাঞ্চ : পাহাড় আর আধ্যাত্মিকতা
বিকেলে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আমরা সবাই আমরা চারজন, রাহেলা আপা ও তার ছেলে রিফাত রওনা দিলাম দর্শনে। প্রথম গন্তব্য বৌদ্ধ বিহার স্বর্ণমন্দির। সোনালি রঙে মোড়া বিহার, চারপাশে নীরবতা মনে হলো, কোলাহলহীন এক শান্ত জগতে ঢুকে পড়েছি।
এরপর শুরু হলো দিনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অংশ আদিনাথ মন্দির। পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে ওপরের দিকে তাকাতেই বুকের ভেতর হালকা কাঁপুনি। উঁচু উঁচু সিঁড়ি, চারপাশে পাহাড়, বাতাসে রহস্য।
সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে পা ভারী হয়ে আসে, কিন্তু চোখের সামনে লক্ষ্য চূড়া। অবশেষে যখন ওপরে পৌঁছালাম, তখন মনে হলো পরিশ্রমের সব মূল্য পাওয়া গেছে।
চূড়া থেকে দেখা যায়
দূরে সমুদ্রের উপকূল,
নিচে নোনা বনাঞ্চল,
আর সবুজে মোড়া মহেশখালীর মিষ্টি পানের বরাগ।
সাহারা নাসরিন নিঃশব্দে তাকিয়ে, আর আমি ভাবছিলাম এ দৃশ্য কোনো বইয়ে পড়ে বোঝা যায় না, এটা দেখতে হয়।
অমাবস্যার রাত ও নীরব জেটিঘাট
সন্ধ্যার পর গেলাম নতুন জেটিঘাটে। সেদিন অমাবস্যা আকাশে চাঁদ নেই। চারপাশে অন্ধকার, শুধু দূরের আলো। আমরা সবাই কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম সাথে বাদাম ভাজা খেতে খেতে নোনা বনাঞ্চল দেখতে লাগলাম। অন্ধকারের মধ্যেও সমুদ্রের শব্দ, বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজ এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ।
সেই মুহূর্তে বুঝলাম, আলো না থাকলেও প্রকৃতি কখনো অন্ধকার হয় না।
দ্বিতীয় দিনের বিস্ময়
পরদিন সকালে নতুন রোমাঞ্চ অপেক্ষা করছিল। আমরা গেলাম দেখতে লবণ কীভাবে তৈরি হয়। বিস্তীর্ণ মাঠে নোনা পানি, রোদে শুকিয়ে ধীরে ধীরে সাদা লবণে রূপ নিচ্ছে। মানুষের শ্রম, সূর্যের তাপ আর সময় সব মিলিয়ে এক জীবন্ত প্রক্রিয়া।
পথে চোখে পড়ল বিশাল পদ্মফুলের বিল, সারি সারি শাপলা ফুল। শীতের দিনে অতিথি পাখির আনাগোনায় কখনো উড়ছে, কখনো জলে বসছে। সুবাহ আনন্দে হাত নাড়ে, সাঈদ মনোরম আনন্দ নিতে ব্যস্ত।
স্বাদের রোমাঞ্চ
দুপুরে ফিরে এলাম রাহেলা আপার বাড়িতে। খাবারের আয়োজন যেন আরেকটা ভ্রমণ। নোনা পানির কাঁকড়া, তাজা চিংড়ি, সামুদ্রিক মাছ, দেশি মুরগি, গরুর গোশত, সাদা ভাত, পোলাও দেশি মুরগির ডিম ভুনা আর নানা রকম সবজি। এ খাবারে শুধু স্বাদ নয়, ছিল মহেশখালীর আত্মা।
বিদায়ের মুহূর্ত
এক রাত কাটিয়ে আমরা বিদায় নিলাম। ফিরে আসার পথে মনে হচ্ছিল আমরা শুধু একটা দ্বীপ ঘুরে এলাম না, আমরা নিয়ে এলাম পাহাড়ের দৃঢ়তা, সমুদ্রের উদারতা আর মানুষের আন্তরিকতা।
মহেশখালী সত্যিই আলাদা
এটা বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ,
এটা রোমাঞ্চ আর শান্তির মিলন,
এটা এমন এক জায়গা যেখানে গেলে মন চায় বার বার ফিরে যেতে।