যত দণ্ড হাসিনার
৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৭:৪০
স্টাফ রিপোর্টার : জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তিনটি পৃথক অপরাধে তাকে এ দণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া আরও দুটি অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে দুর্নীতির দায়ে পৃথক তিন মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদকে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। অন্যদিকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাজধানীর পূর্বাচলে ১০ কাঠা প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এছাড়া তার বোন শেখ রেহানার সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, তার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানার আদেশ দিয়েছে আদালত। প্রথম দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে গত ১৭ নভেম্বর এবং পরের দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে ১ ডিসেম্বর।
গত ১৭ ডিসেম্বর বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশের ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। এছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। আর সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ওইদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রায় ঘোষণা শুরু হয়। বিকেল ৩টার দিকে আদালত সাজা ঘোষণা করেন। এটাই জুলাই অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট কোনো মামলার প্রথম রায়।
আদালত বলেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ৫টি অভিযোগের মধ্যে তিনটিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্য দুটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগের মধ্যে দুটির জন্য মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য একটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ডের সাজা ঘোষণা করা হয়। সাবেক আইজিপির ব্যাপারে আদালত বলেন, তার অপরাধও মৃত্যুদণ্ডযোগ্য। তবে তিনি বিচার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করায় এবং রাজসাক্ষী হওয়ায় সব অভিযোগে তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হত্যা, ষড়যন্ত্র, উসকানি ও ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়ের অভিযোগে বিচার হয়েছে। সুনির্দিষ্টভাবে পাঁচটি অভিযোগগুলো হলো- গণভবনের সংবাদ সম্মেলনে উসকানিমূলক বক্তব্য, হেলিকপ্টার ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ, রংপুরে ছাত্র আবু সাঈদ হত্যা, চাঁনখারপুলে হত্যা এবং আশুলিয়ায় হত্যা ও লাশ পোড়ানো। এগুলোর মধ্যে শেষ তিনটি অভিযোগে আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। আর প্রথম দুই অভিযোগে তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
প্লট দুর্নীতি, হাসিনার ২১ বছর কারাদণ্ড
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে দুর্নীতির দায়ে পৃথক তিন মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদকে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা পৃথক ওই তিন মামলার প্রতিটিতে শেখ হাসিনা আসামি। প্রতিটি মামলায় তাকে ৭ বছর করে মোট ২১ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে প্রতিটি মামলায় তাকে এক লাখ টাকা করে মোট তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদকে পৃথক মামলায় পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এর পাশাপাশি দুজনকেই এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন ২৭ নভেম্বর এ রায় (পৃথক তিন মামলার) ঘোষণা করেন। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করা প্লট দুর্নীতির মামলার রায় পড়ার সময় বিচারক বলেন, ‘শেখ হাসিনা নিজে প্লট নেওয়ার পর তার ছেলে ও মেয়ের নামেও বরাদ্দ নেন। এরপর তার বোন শেখ রেহানা, বোনের মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক ও ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের নামেও বরাদ্দ নিয়েছেন। জনগণের সম্পত্তির প্রতি ওনার (শেখ হাসিনার) লোভাতুর দৃষ্টি পড়েছে। উনি চারবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এরপরও জনগণের সম্পদ থেকে লোভ সামলাতে পারেননি।’ রায়ে শাস্তি ঘোষণার আগে বিচারক মামলার পটভূমি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘প্লট দুর্নীতির বিষয়টি সাংবাদিকদের মাধ্যমেই উঠে আসে। মিডিয়া যে চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে, আমরা এ মামলার মাধ্যমে দেখলাম। আপনাদের (সাংবাদিকদের) রিপোর্ট না থাকলে দুদক কখনোই এ মামলা করত না। পত্রিকার রিপোর্টের আলোকেই দুদক পদক্ষেপ নিয়েছে।’ এ মামলায় শেখ হাসিনাসহ আসামি ১২ জন। আসামিদের মধ্যে শুধু একজনকে (গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম সরকার) খালাস দিয়েছেন আদালত। অন্য আসামিদের এক বছর থেকে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সাজা পাওয়া আসামিরা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা। সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রীও রয়েছেন। সাজাপ্রাপ্তরা হলেন পূরবী গোলদার (১ বছরের কারাদণ্ড), আনিছুর রহমান মিঞা (৫ বছর), মোহাম্মদ খুরশীদ আলম (১ বছর), শফিউল হক (৩ বছর), মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন (৩ বছর), সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরী (৩ বছর), নায়েব আলী শরিফ (১ বছর), কাজী ওয়াছি উদ্দিন (৬ বছর), মো. শহীদ উল্লা খন্দকার (৬ বছর) ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ (৬ বছর)। গত ১৪ জানুয়ারি মামলাটি করে দুদক। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে পূর্বাচলের নতুন শহরে ১০ কাঠার প্লট বরাদ্দ নেন। তার ঢাকা শহরে বাড়ি থাকার পরও হলফনামায় তথ্য গোপন করেন। এ কারণে আইনের লঙ্ঘন হয়েছে। এ মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয় গত ১১ আগস্ট। সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয় ১৭ নভেম্বর। এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন ২৯ জন।
পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দ, হাসিনার সঙ্গে টিউলিপও দণ্ডিত
অন্যদিকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাজধানীর পূর্বাচলে ১০ কাঠা প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। এছাড়া তার বোন শেখ রেহানার সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, তার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানার আদেশ দিয়েছে আদালত। পলাতক দেখিয়ে এ মামলায় তাদের বিচার হয়েছে। ফলে বিচার প্রক্রিয়ায় তাদের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। ১ ডিসেম্বর ঢাকার বিশেষ জজ আদালত পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ১০ কাঠা সরকারি প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগে দুদকের করা মামলায় শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, তার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিকসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। মামলায় শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা ও তার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক ছাড়া সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, রাজউক ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ১৪ জন কর্মকর্তা আসামি ছিলেন। এ মামলায় টিউলিপের ভাই রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও বোন আজমিনা সিদ্দিক রুপন্তীকে আসামি করা হয়নি। তাদের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা রয়েছে। রায়ে রাজউক ও গণপূর্ত কর্মকর্তাদের পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। তাদের এক লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো ছয় মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছে আদালত।
মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত বছর ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর গত ডিসেম্বরে তাদের বিরুদ্ধে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ১০ কাঠা করে ছয়টি প্লট বরাদ্দে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। এরপর চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগে শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা করে দুদক। পরদিন শেখ রেহানা ও তার ছেলেমেয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে সংস্থাটি। শেখ রেহানার পরিবারের বিরুদ্ধে করা তিন মামলায় শেখ হাসিনা ছাড়াও তার বোন শেখ রেহানা, তার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক, ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক এবং আরেক মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তীকে আসামি করেছে দুদক। পরে ১৪ জানুয়ারি শেখ হাসিনা ও সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। এসব মামলায় শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্য ছাড়াও আরো ১৬ জনকে এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে। এরই মধ্যে গত সপ্তাহে এ মামলায় শেখ হাসিনাকে ২১ বছরের কারাদণ্ড, সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। প্লট দুর্নীতির ছয় মামলাতেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আসামি করা হয়েছে। প্রতিটি মামলার বিবরণই প্রায় একরকম।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ ছিল, সেগুলো নেহাত হত্যা কিংবা নির্যাতন না, এগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধ। শুধু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ই না, তার শাসনামলের পুরোটা সময় গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে নিয়মিতভাবেই। এর বাইরেও বিএনপি নেতা-কর্মীদের ওপর এবং একটা সময় পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের ওপরেও পরিকল্পিতভাবে হেফাজতে নির্যাতন, গায়েবি মামলাসহ নানারকম নিপীড়নও মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়বে। অন্যদিকে জনগণের সম্পদে লোভ করেছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রমাণ হয়েছে এবং দণ্ডিতও হয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে তার রাজনৈতিক মৃত্যুও হয়েছে।