সরকারকে ‘তত্ত্বাবধায়কের’ ভূমিকায় চায় বিএনপি
২৩ অক্টোবর ২০২৫ ২০:২২
বিশেষ সংবাদদাতা : অর্থবহ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে এই মুহূর্ত থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকা পালনের পরামর্শ দিয়েছে বিএনপি। গত ২১ অক্টোবর মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ দাবি জানিয়েছে দলটি। সে-সঙ্গে সরকারে উপদেষ্টা পরিষদে থাকা ‘দল-ঘনিষ্ঠদের’ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে বলেছে দলটি।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে বিএনপির তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল গত ২১ অক্টোবর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ কথা বলেন।
সরকার ও বিএনপির সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, এই সাক্ষাতে ওই দুটি বিষয় ছাড়াও বিচার বিভাগ, সচিবালয় এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে রদবদলসহ আরও কিছু বিষয়ে বিএনপির নেতারা প্রধান উপদেষ্টাকে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানান।
পরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস বিএনপির নেতাদের বলেছেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা হিসেবে নির্বাচনের আগে প্রশাসনের যাবতীয় রদবদল সরাসরি তাঁর তত্ত্বাবধানে হবে। জেলা প্রশাসক পদে যোগ্যতার ভিত্তিতেই নিয়োগ দেওয়া হবে। দায়িত্বে নিরপেক্ষ থেকে যেখানে যিনি শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সক্ষম, সেই ব্যক্তিকেই তাঁরা বেছে নেবেন।
‘তত্ত্বাবধায়ক’ সরকারের ভূমিকায় যেতে হবে
গত ২১ অক্টোবর মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যমুনার সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা আজকে প্রধান উপদেষ্টা মহোদয়ের কাছে এসেছিলাম কতগুলো রাজনৈতিক কনসার্ন (উদ্বেগ) নিয়ে কথা বলার জন্য। বিশেষ করে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানকে অর্থবহ, নিরপেক্ষ, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য এই মুহূর্ত থেকে যেটা প্রয়োজন, সেটা হচ্ছে অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারকে এখন কেয়ারটেকার গভর্নমেন্টের (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) আদলে নিতে হবে।’
এর ব্যাখ্যা করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, প্রথমেই যে বিষয়টির প্রয়োজন হবে, তা হচ্ছে প্রশাসনকে জনগণের কাছে পুরোপুরিভাবে নিরপেক্ষ করে তৈরি করতে হবে। সচিবালয়ে যারা এখনো আছেন, যাঁদের চিহ্নিত ফ্যাসিস্টদের দোসর বলা হয়, তাঁদের সরিয়ে সেখানে নিরপেক্ষ কর্মকর্তা দেওয়ার জন্য বিএনপি বলেছে।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা বলেছি যে, জেলা প্রশাসন; বিশেষ করে সেখানেও একইভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আমরা কিছু কিছু কথা বলে এসেছি, যেগুলো আমরা মনে করি যে তারা এখনো সেই ফ্যাসিস্ট সরকারের স্বার্থ পূরণ করছে। সে জন্য তাদের অপসারণের কথা আমরা বলেছি। আমরা পুলিশের নিয়োগের ক্ষেত্রে; বিশেষ করে যেসব পদে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হবে বা যাদের পদোন্নতি দেওয়া হবে, সেই ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে এসেছি।’
বিচার বিভাগে; বিশেষ করে উচ্চ আদালতে এখনো ফ্যাসিস্টের যেসব দোসর আছে, তাদের সরিয়ে নিরপেক্ষ বিচারক নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করার কথা বলেছে বিএনপির প্রতিনিধিদল।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারকে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার কথাও আমরা বলেছি। সরকারের মধ্যে যদি কোনো দলীয় লোক থেকে থাকেন, তাঁকে অপসারণ করার জন্য আমরা দাবি জানিয়ে এসেছি, এটাই ছিল প্রধান মূল কথা।’
কোনো উপদেষ্টার বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলেছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম ‘না’ সূচক জবাব দেন।
তবে বৈঠকে উপস্থিত একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার একজন বিশেষ সহকারীর একটি দলের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে তাদের অপসারণ চেয়েছে বিএনপি।
‘আমাদের দায়িত্ব নিরপেক্ষ থাকা’
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে বিএনপির নেতারা আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনে সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। বৈঠকে তাঁরা পুলিশের নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়া নিয়েও কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
বিতর্কিত কোনো কর্মকর্তা; বিশেষ করে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের শাসনামলে নির্বাচনী দায়িত্বে ছিলেন এমন কর্মকর্তাদের আসন্ন নির্বাচনে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখার আহ্বান জানান বিএনপির নেতারা। নির্বাচনের আগে প্রশাসনে রদবদলের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্যও প্রধান উপদেষ্টার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
প্রধান উপদেষ্টা বিএনপি নেতাদের বলেছেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা হিসেবে নির্বাচনের আগে প্রশাসনের যাবতীয় রদবদল সরাসরি তার তত্ত্বাবধানে হবে। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার ভিত্তিতেই কর্মকর্তাদের বাছাই করে নির্বাচনের আগে যথোপযুক্ত স্থানে নিয়োগ দেওয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব নিরপেক্ষ থাকা। নির্বাচন একটি মহা আয়োজন। এখানে যিনি শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সক্ষম, সেই ব্যক্তিকেই আমরা বেছে নেব। এটি আমার তত্ত্বাবধানে থাকবে। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ করার জন্য যা কিছু প্রয়োজন, আমরা তা করব।’
এছাড়া জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে রাজনৈতিক নেতাদের সম্পৃক্ত করায় এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারায় সরকারকে অভিনন্দন জানায় বিএনপি। পাশাপাশি সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থাপনায় সংঘটিত একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিএনপির নেতারা। এসব ঘটনা অন্তর্ঘাতমূলক কি না, সে বিষয়ে অনুসন্ধানেরও আহ্বান জানান তারা।
এ বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সালাহউদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সরকারের পক্ষে পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল ও শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান অংশ নেন।