খিচুড়ি রহস্য
২ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:১৮
॥ তাহমিদুল্লাহ সারাসিনী ॥
(গত সংখ্যার পর)
রাজ্যের আনাচে-কানাচে কয়েকশ ঘোষক এই ঘোষণা ছড়িয়ে দিতে লাগলো, ‘যে ব্যক্তি অতিসত্বর সোনা ভেজে মুখরোচক খাদ্যে পরিণত করার রন্ধন প্রণালী নিয়ে রাজদরবারে হাজির হতে পারবে, তার জন্য হাজারো সোনার মোহর পুরস্কার হিসেবে বরাদ্দ’। অল্প সময়ের মধ্যেই রাজদরবার লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল। নানা পেশার নানা জাতের মানুষের ভিড়। সকলের মনেই হাজারো সোনার মোহর পাওয়ার ক্ষীণ আশা জোনাকির আলোর মতো জ্বলছে আর নিভছে। সবার আগে একজন সোনারু এগিয়ে এলো স্বর্ণখচিত সিংহাসনে উপবিষ্ট মণিমুক্তা শোভিত মুকুট ও দামি সিল্কের পোশাক পরিধানকারী মহারাজের সামনে। সোনারুটি বলল, ‘জাঁহাপনা, সবার আগে আপনার কাছে মাফ চাইÑ যদি কোনো বেয়াদবি হয়ে যায়! অতি উষ্ণ তেলের মাঝে কয়েক খণ্ড সোনা দিলে তা পানির মতো তরল হওয়ার পর তাতে হিমশীতল কয়েক টুকরো বরফ দিলেই তৈরি হয়ে যাবে অতি সুস্বাদু খাদ্য’।
‘কী বললি! তার মানে তুই গরম সোনা খাইয়ে আমার পুত্রকে হত্যা করে নিজে হাজারো সোনার মোহর বাগিয়ে নিতে চাস?! তুই তো দেখছি খুবই লোভী বাতুল। কই রে সব?! তাড়াতাড়ি একে ধরে নিয়ে কারাগারে নিক্ষেপ কর’, মহারাজ বললে দুজন লস্কর সোনারুকে ধরে নিয়ে গেল।
দরবারের সকলে ভয়ে ভূমিকম্প হলে যেভাবে পৃথিবী কাঁপে, সেভাবে থরহরি কম্পমান যখন, তখন যুবরাজ সোনাভাজার রন্ধন প্রণালী বের করতে লাইব্রেরির বইসমূহের মাঝে চিরুনি অভিযান চালাচ্ছে। এমনকি একসময় সে বজ্রনিনাদ কণ্ঠে বলে উঠল, ‘পেয়েছি, পেয়েছি, আমি পেয়েছি। কে কোথায় আছো?! তাড়াতাড়ি এদিকে আসো।’
রাজা-রানী-দাস-দাসী সবাই ছুটলো লাইব্রেরি ঘরের দিকে। রাজপুত্র খুবই উত্তেজিত কণ্ঠে বিজ্ঞের মতো বর্ণনা দিতে লাগলো, ‘গরুর দুধ থেকে ঘি তৈরি করে সেই ঘিকে জ্বলন্ত আগুনের ওপর স্থাপিত কড়াইয়ে ঢালতে হবে। তখন সেখান থেকে যেই ঘিয়ের তেল বের হবে তার মাঝে দুটি চুড়ি ভাজতে দিতে হবে। ভাজতে ভাজতে একসময় তা সুখাদ্যে পরিণত হবেÑ কিতাবে এভাবেই উল্লেখ আছে’। এ কথা শুনে তৎক্ষণাৎ রাজা রাজকীয় পাচককে খবর দিলে রানী তার হাতের হীরাখচিত স্বর্ণের চুড়ি খুলে তা ভাজতে দিয়ে দিলো। পাচক পাকশালায় গিয়ে চুলায় আগুন ধরিয়ে তার ওপর বিশাল কড়াই বসিয়ে তাতে গরুর দুধের ঘি ঢেলে তারপর চুড়ি দুটি দিলো ভাজতে।
রাজপ্রাসাদের সকলের মাঝে টানটান উত্তেজনা চলছে, যেন সকলে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের সময় নৌকায় বসে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করছে। কেউ বলছে, এটা অতি সুখাদ্য হবে। কেউ বলছে, শুধুই সময় নষ্ট। কেউবা বলছে, এতে স্বর্ণের মানহানি হচ্ছে- প্রত্যেকেই নিজের মত প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে। (চলবে)
লেখক : শিক্ষার্থী