ভারতকে ‘সব দিয়েও’ কী পেয়েছে বাংলাদেশ!


৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৪:৩৬

॥ সরদার আবদুর রহমান ॥
পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ভারতের সঙ্গে ‘অতি ঘনিষ্ঠ’ সম্পর্ক রেখেছিল এবং তাদের ‘সব’ দিয়ে দিয়েছিল। এর প্রতিদানে কী পেয়েছে বাংলাদেশ! এই প্রশ্ন উঠলে শেখ হাসিনা বলতেন, ‘আমরা শুধু দিতে জানি, প্রতিদান নেয়া আমার পছন্দ নয়।’ এর মধ্য দিয়ে যে আসলে এই দুই দেশের মধ্যে প্রভু আর দাসের সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়েছিল, সেটি কারো বুঝতে বাকি ছিল না।
উল্লেখ করা যেতে পারে, ২০১৮ সালের ৩০ মে গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘আমরা ভারতকে যেটা দিয়েছি, তা তারা সারা জীবন মনে রাখবে।’ এর ফলাফল কী? এর জবাব হলো, ভারত শেখ হাসিনাকে কেবল এই নিশ্চয়তাই দিয়েছিল যে, তাকে তারা আজীবন ক্ষমতায় থাকার গ্যারান্টি আর ওয়ারেন্টি দিয়ে যাবে। তার বিনিময়ে ভারতের প্রতিটি চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ বাধ্য থাকবে। এতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন থাকার কোনো প্রশ্ন ছিল না, আর না ছিল স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার কোনো সুযোগ। গত দেড় দশকে বাংলাদেশকে নিয়ে তারা কী কী অপকর্ম করেছে, তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ এরূপ-
# ভারত রাজনীতিতে নগ্ন হস্তক্ষেপ করে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করেছিল।
# প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিজেদের অনুকূলে রাখার সবরকম পদক্ষেপ নিয়েছিল।
# বাংলাদেশের বুক ভেদ করে সম্পূর্ণ বিনা পয়সায় রেল, সড়ক, আকাশ ও নদীপথ দিয়ে করিডোর বাগিয়ে নিয়েছিল।
# বাংলাদেশকে ব্যবহার করে ভারত তার সেভেন সিস্টার্সে চলমান স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের লড়াইয়ে যুক্ত হাজার হাজার মানুষকে দমন করেছে।
# বাংলাদেশ পেয়েছে পানিশূন্য গঙ্গা-পদ্মা-তিস্তার হাহাকার।
# পেয়েছে সীমান্তে বিএসএফের হাতে খুন হওয়া বাংলাদেশের অগণতি লাশ।
# শিকার হয়েছে আমদানি-রফতানি খাতের ব্যবসা-বাণিজ্যে বিপুল ঘাটতির।
# রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার পক্ষ নিয়েছে। এখন নতুন করে বাংলাদেশের ভিতরে ভারতীয় নাগরিকদের পুশইন করছে।
# এভাবে তারা মূলত বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, ব্যবসা, প্রতিরক্ষা, নাগরিক অধিকার ইত্যাদি ধ্বংস করার কাজকে তাদের নীতি ও পলিসির অংশ করে নিয়েছিল।
বাংলাদেশে লুণ্ঠন : বাংলাদেশে ভারতের আধিপত্য বজায় রাখার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এর সম্পদ লুণ্ঠন করে নিজেদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা। এর প্রথম দৃশ্য মঞ্চায়ন করা হয় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরপরই। সে সময় বাংলাদেশে ভারতীয় সেনাদের বিরুদ্ধে লুটপাটের অভিযোগ ওঠে, যেখানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী ভারতীয় বাহিনী কর্তৃক লুণ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ সাংবাদিক মার্টিন উলকট দি গার্ডিয়ান পত্রিকায় এক প্রতিবেদনে এ লুটপাটের বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে বিভিন্ন সময়ে ‘লুটের সম্পদ ফিরিয়ে দাও দিল্লি’ শীর্ষক স্লোগান ওঠে, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতের ভূমিকা ও বৈদেশিক নীতি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে। বলা হয়, ৯৩ হাজার পাকিস্তানির রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ- যার তৎকালীন বাজার মূল্য ছিল প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা, তা ভারতীয় সেনারা নিয়ে যায়। ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ‘অনিক’ নামক ভারতীয় মাসিক পত্রিকা এক রিপোর্টে দাবি করে যে, ভারতীয় সৈন্যদের লুণ্ঠিত মালামালের মূল্য ছিল প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার। এ ঘটনায় বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। এমনকি এরকমও প্রচার ছিল যে, ভারতীয় বাহিনীর এ লুটপাটের প্রতিবাদ করায় তৎকালীন একজন সেক্টর কমান্ডার মেজর এমএ জলিলকে আটক করে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়।
হাসিনা রেজিমের সুবিধা : পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতন ও পালাবদলের জেরে ভারতের একচ্ছত্র সুবিধা আদায়ের ধারা বিঘ্নিত হয়। অতঃপর ভারতের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সমর প্রেসক্রিপশনের বদৌলতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা লাভ করে এবং এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ভারতের জন্য সুবিধা হাসিলের সিংহ দরজা খুলে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ভারতকে ট্রানজিট, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার, বিদ্যুৎ আমদানির সুযোগ, জলপথ, সড়ক ও রেলপথ ব্যবহারের সুবিধা দিয়েছে। বাংলাদেশ দিয়েছে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগের সুবিধা। ডিজেল পাইপলাইন, উপকূলীয় জাহাজ চলাচল, বিদ্যুৎ রপ্তানি, লাইন অব ক্রেডিট, সীমান্তহাট, বাণিজ্যচুক্তি সবকিছুতেই ভারত পেয়েছে বিস্তর সুবিধা। বাংলাদেশের স্থল ও জলপথ ব্যবহার করে নৌপথ, সড়কপথ ও রেলপথে ভারতের এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে পণ্য পরিবহনের বিনিময়ে কী পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ সরকার পেয়েছে, তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
ট্রানজিট না করিডোর : ভারত ট্রানজিটের নাম করে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে করিডোর আদায় করে নিয়েছিল। ‘ট্রানজিট’ হলো কোনো একটি দেশ অন্য একটি দেশে যাতায়াতের জন্য মধ্যবর্তী দেশের রাস্তা ব্যবহার করার সুবিধা। আর করিডোর হলো একই দেশ তার অপর অংশে চলাচলের জন্য মধ্যবর্তী দেশের রাস্তা ব্যবহার। বিদ্যমান অবস্থায় ভারত বাংলাদেশের ওপর দিয়ে করিডোর বাগিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু এর নাম দিয়েছিল ট্রানজিট। দুটির মধ্যে চলাচলের ক্ষেত্রে শর্ত ও সুবিধার পার্থক্য থাকে। ট্রানজিটের ক্ষেত্রে অধিক কর্তৃত্ব থাকে প্রথম দেশের আর করিডোরে কর্তৃত্ব থাকে মধ্যবর্তী দেশের। বাংলাদেশ যাতে ভারতের পণ্য বা অন্য কোনো প্রকারের পরিবহনে কর্তৃত্ব ফলাতে না পারে, সেজন্য একে ‘ট্রানজিট’ নামের আড়ালে প্রকৃতপক্ষে ‘করিডোর’ বাগিয়ে নেয়।
এ ফর্মুলায় বাংলাদেশ নাকি ‘সিঙ্গাপুর’ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এতে বাংলাদেশ কোনো সুবিধা তো পায়নি, বরং ভারত একতরফা সুবিধা হাসিল করে নিয়েছে। আসলে ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্টের বিনিময়ে বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে কী পরিমাণ অর্থ পেয়েছে, তার হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। এভাবে ১৬টি ট্রানজিট রুট খোলা হয় ভারতকে সুবিধা দেয়ার জন্য। এগুলো হলোÑ চট্টগ্রাম-আখাউড়া-আগরতলা, মোংলা-আখাউড়া-আগরতলা, তামাবিল-ডাউকি, শেওলা-সুতারকান্দি এবং বিবিরবাজার-শ্রীমন্তপুর রুট।
ভারতের উন্মুক্ত বাজার : হাসিনা রেজিমে বাংলাদেশ কার্যত ভারতের একটি উন্মুক্ত বাজারে পরিণত হয়েছিল গত ১৫ বছরে। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৭ হাজার ১৬০ দশমিক ৮১ মিলিয়ন ডলার। এমন বাণিজ্য ঘাটতি বিশ্বে বিরল ঘটনা বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। দেশের চাহিদা অনুযায়ী অনেক পণ্যই আমদানি করতে হয়। কিন্তু বিকল্প বাজার না খুঁজে সবকিছুই ভারত থেকে কিংবা ভারতের মাধ্যমে আমদানি করা শেখ হাসিনার একটি প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
রেমিট্যান্স ও বিদ্যুৎ বিক্রি : বাংলাদেশে কর্মরত ভারতীয়দের রেমিট্যান্স প্রেরণ করার হিসাবও ভারতের জন্য একটা উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে কর্মরত বিদেশিরা ৯ কোটি ৪০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ নিজ দেশে পাঠিয়েছেন। ২০২১-২২ অর্থবছরে যা দাঁড়ায় ১১ কোটি ৫০ লাখ ডলারে। আর এ টাকা পাঠানোর দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ভারতীয়রা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত (২০২২-২৩) অর্থবছরে ৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স গেছে ভারতে, যা দেশের বাইরে যাওয়া রেমিট্যান্সের মধ্যে সর্বোচ্চ। অর্থাৎ এ খাতে ভারত হলো সবচেয়ে সুবিধাভোগী দেশ।
দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ ১৭ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৬ হাজার ৮৪৪ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ক্ষমতা বেশি হওয়ার পরও ভারত থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি করে শেখ হাসিনার সরকার। শেখ হাসিনা ২০১৭ সালে তার নয়াদিল্লি সফরের সময় ভারতের আদানি পাওয়ারের সাথে চূড়ান্ত বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত গৌতম আদানি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ব্যক্তিদের একজন। তিনি আদানি পাওয়ারের মালিক। ২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রথম ঢাকা সফরের সময় ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে প্রথম চুক্তি হয়। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ভারতের বৈদ্যুতিক ফাঁদে আটকা পড়ে।
অভিন্ন নদীর পানি ছিনতাই : ভারতের দিক থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বয়ে চলা অভিন্ন নদীগুলোর পানি ছিনতাই করার মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর দ্বিধাহীনভাবে আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়টি কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হয়ে থাকেনি, এটি আন্তর্জাতিক মহলেও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফারাক্কা ব্যারাজ ছাড়াও আলোচনায় এসেছে ব্রহ্মপুত্র তথা যমুনা, তিস্তা, মহানন্দা ও বরাক নদীসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পরিস্থিতি। বাংলাদেশের জনসাধারণের জন্য ভয়ঙ্কর সংবাদ হলো, এ অভিন্ন নদীসমূহের প্রায় প্রতিটিতে এবং এর উপনদীগুলোয়ও ভারত অসংখ্য প্রকল্প নির্মাণ করেছে এবং আরো প্রকল্পের জন্য মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করে চলেছে। এর মধ্যে যেমন আছে বৃহদাকার ব্যারেজ, ড্যাম, সেচ ক্যানেল, আছে বিদ্যুৎ প্রকল্পও। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে যেমন অভিন্ন নদীসমূহের পানি উজানে একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে নেয়া হচ্ছে, তেমনি পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর অনিবার্য প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের নদী তথা পানিসম্পদের মালিকানা ও অধিকার থেকে এদেশের জনসাধারণ বঞ্চিত হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের বরখেলাপ এবং মানবাধিকারেরও চরম লঙ্ঘন। ভারত তার বহুসংখ্যক সেচ ও পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মূল গঙ্গা এবং এর উপনদীগুলোর ৯০ ভাগ পানি সরিয়ে নিচ্ছে। শুধু ফারাক্কা নয়, গঙ্গা-পদ্মাকেন্দ্রিক বাঁধ, জলাধার, ক্রসড্যাম, রেগুলেটরসহ অন্তত ৩৩টি মূল অবকাঠামো নির্মাণ করেছে ও করছে। ভারত অনেক আগে থেকেই গঙ্গায় বৃহদাকার তিনটি খাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘আপারগঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’, ‘মধ্যগঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’ এবং ‘নিম্নগঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট।’ এ ধরনের প্রকল্পের হাজার হাজার কিলোমিটার খালের মাধ্যমে তারা গঙ্গার পানি সরিয়ে নিয়ে সেচ দেয়ার ব্যাপক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ‘ওপর গঙ্গা খাল প্রকল্পের’ মাধ্যমে উত্তর প্রদেশের ২৫ লাখ একর জমিতে সেচ দেয়ার লক্ষ্যে ৬ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে। ‘মধ্যগঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’ নামের প্রকল্পে মূল ও শাখাসহ খননকৃত খালের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার এবং ‘নিম্নগঙ্গা সেচ প্রকল্পের’ জন্য ৬ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে। এছাড়া ভারত গঙ্গার ‘বাড়তি’ পানি কাজে লাগিয়ে ৩ লাখ ১ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেয়ার জন্য ‘পূর্ব গঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’ তৈরি করেছে। এর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪০০ কিলোমিটার। এসব ক্যানেল প্রকল্প চাঙা রাখতে নিয়মিতভাবে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। অপরদিকে আন্তর্জাতিক অভিন্ন নদী তিস্তার উজানে গজলডোবাসহ কয়েকটি স্থানে বাঁধ নির্মাণ করে ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে চলেছে। এতে শুকনো মৌসুমে তিস্তা নদীতে পানির প্রবাহ থাকে একেবারেই তলানিতে। ফলে বাংলাদেশের গোটা উত্তরাঞ্চলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়। বাংলাদেশ ১৯৮৩ সাল থেকে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের চেষ্টা করে আসছে। ভারতও একের পর এক প্রতিশ্রুতি দিয়েও পানিবণ্টন চুক্তি করা থেকে বিরত রয়েছে। উল্টো আন্তর্জাতিক নদী শাসন আইন লঙ্ঘন করে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।
সীমান্তে হত্যা : বাংলাদেশের সীমান্তে ভারত যেভাবে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা করে চলেছে, ভারতের অন্য কোনো সীমান্তে তার নজির নেই। জানা যায়, ২০০৯ সাল থেকে ১৫ বছরে প্রায় পাঁচশ বাংলাদেশি নাগরিককে সীমান্তে গুলি করে হত্যা করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। বাংলাদেশ কদাচিত এসব হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করেছে। এ বিষয়ে বরাবরই শেখ হাসিনার সরকার নতজানু নীতি অনুসরণ করে এসেছে। ভারতের কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে থাকা বাংলাদেশের কিশোরী ফেলানীর লাশ বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে।
এছাড়া বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডের ভেতরে ঢুকে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর একজন সদস্যকে হত্যা করে লাশ নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় দেশের মানুষের মনে ক্ষোভ জন্মালেও চুপ ছিলেন শেখ হাসিনা। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আওয়ামী লীগের মন্ত্রীরা বলেছিলেন, ‘এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এমন ঘটনায় আমাদের বন্ধুপ্রতিম দুই দেশের মধ্যে বিরাজমান সম্পর্কে কোনো সমস্যা হবে না।’ এভাবে সীমান্তে একের পর এক হত্যাকাণ্ড চলতে থাকলেও ভারতপ্রেমীরা ছিল নির্বিকার।
এ কথা সত্য যে, একটি দেশের সবচেয়ে নিকট ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হওয়ার কথা তার প্রতিবেশী। সে হিসেবে ভারত সেই স্থানটি পাওয়ার কথা। কিন্তু এক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টোটা। ভারত সবকিছুই একতরফা করে ফেলেছিল। বরাবরই ভারত বড় দেশ হয়ে ছোট দেশের সার্বভৌমত্ব লুট করার প্রবণতায় আচ্ছন্ন। এ দাপট অন্য প্রতিবেশীদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে না পারলেও বাংলাদেশকে কব্জা করতে সক্ষম হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সেই কলকব্জা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। এর ফলে ভারত এখন হারানো দিন ফিরে পাওয়ার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করে এগোতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে বলে অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হয়।