স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রত্যাশা পূরণের সোনালি প্রভাত
৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:৪২
সোনার বাংলা রিপোর্ট: স্বাধীন বিচার বিভাগ গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছরে এ কথা শুধু কাগজে-কলমেই আছে বলে মনে করেন আইন-আদালত বিশ্লেষকরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক এবং বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘মানুষের শেষ ভরসার স্থল হচ্ছে বিচার বিভাগ। কিন্তু সেটাও নিয়ন্ত্রণে রাখতে নানাভাবে চেষ্টা করে সরকার। যে সরকার যত বেশি দিন ক্ষমতায় থাকে, তার পক্ষে তা তত বেশি করা সম্ভব হয়। এমন পরিস্থিতিতে আমরা দেখি, সরকারের বিষোদ্গারের শিকার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা চলাকালে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে ‘আইন তার নিজের গতিতে চলবে’, ‘বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন’- এ ধরনের আপ্তবাক্য উচ্চারণ করা হয়। কিন্তু বিচার বিভাগ বা ব্যবস্থাকে সরকারের প্রভাবমুক্ত করার জন্য গবেষণালব্ধ যেসব সংস্কারের প্রস্তাব বিভিন্ন সময়ে করা হয়েছে, তার একটিও বাস্তবায়ন করা হয় না। এরপরও রাজনৈতিক মামলায় বিচারকরা প্রতিকার দেওয়ার চেষ্টা করেন কখনো কখনো। এর জন্য অতীতে তাঁরা নানা হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন।
সরকারের অপছন্দের রায় প্রদানের জন্য উচ্চ আদালতের বিরুদ্ধে ঝাড়ুমিছিল হয়েছে, একজন প্রধান বিচারপতিকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে, হাইকোর্টে বিচারকদের চাকরি স্থায়ী না করে বিদায় দেওয়া হয়েছে। উচ্চ আদালতেই এসব ঘটলে, কম ক্ষমতাসম্পন্ন নিম্ন আদালতে কী ঘটে, তা সহজেই অনুমেয়। শ্রম আদালত বা বিশেষ আইনে প্রতিষ্ঠিত ট্রাইব্যুনালগুলো এর বাইরের কিছু নয়। এসব বাস্তবতা এড়িয়ে বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন, এটি সরকার পক্ষের লোকজন বলেই চলেছেন। কিন্তু সরকারের বাণীতে মানুষের আস্থা তৈরি হয় না। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রয়েছে, এ আস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হলে তদন্ত, প্রসিকিউশন ও আদালত ব্যবস্থার জরুরি সংস্কারগুলো আগে সম্পাদন করা প্রয়োজন।
গত ২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের কিছু অংশ অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। এছাড়া তিন মাসের মধ্যে পৃথক সচিবালয় গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। গত ২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। এর ফলে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি ও পদোন্নতির ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে ফিরল বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। এছাড়া এ রায়ের ফলে সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় স্থাপনে কোনো বাধা থাকল না বলেও জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। অ্যামিকাস কিউরি (আদালত বন্ধু) হিসেবে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী শরীফ ভূইয়া। আর ইন্টারভেনর হিসেবে শুনানি করেন আইনজীবী আহসানুল করিম।
সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ, ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এবং বিচার বিভাগীয় পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা চেয়ে গত বছরের ২৫ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের সাত আইনজীবী রিটটি করেন। রিট আবেদনকারী সাত আইনজীবী হলেনÑ মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন, মো. জহিরুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান, আবদুল্লাহ সাদিক, মো. মিজানুল হক, আমিনুল ইসলাম শাকিল ও যায়েদ বিন আমজাদ।
এ রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত বছরের ২৭ অক্টোবর হাইকোর্ট বিচারপতি ফারাহ মাহবুব (বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচারপতি) ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল জারি করেন। রুলে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং এ সংক্রান্ত ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা কেন সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়।
একই সাথে বিচার বিভাগীয় পৃথক সচিবালয় কেন প্রতিষ্ঠা করা হবে না, রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়। আইন মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব এবং সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। একই সাথে বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অগ্রগতি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে ৬০ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।
উল্লেখ্য, গত ২৫ মার্চ বিচারপতি ফারাহ মাহবুব আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। পরে প্রধান বিচারপতি বিষয়টি শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চে পাঠান। সে অনুযায়ী এ বেঞ্চে উভয়পক্ষে কয়েকদিন রুল শুনানির পর গত ২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার রায়ের দিন ধার্য করেছিলেন হাইকোর্ট।
এর আগে প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ গত ৩১ আগস্ট রোববার সন্ধ্যায় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান : বিচার বিভাগের সংস্কার’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্যকালে জানিয়েছিলেন, বিচার বিভাগে ঘোষিত সংস্কার কর্মসূচির প্রায় ৮০ শতাংশ ইতোমধ্যেই বাস্তবায়ন হয়েছে।
সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, ‘প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। বিচার বিভাগের কার্যক্রমে আরও স্বচ্ছতা আনতে হবে। বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের আচরণে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে এবং দেশের প্রতিটি আদালতে সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রসার ঘটাতে হবে।’ দেশের বিচার বিভাগ পূর্ণ স্বাধীনতা, শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘বিচার বিভাগকে ন্যায্যতা, সাহস ও সততার সাথে জনগণকে সেবা দিতে হবে।’
সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে আশাবাদী প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘সরকারের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুরোর মধ্যে একটি হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের জন্য একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা। এটি হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ক্ষমতার পৃথকীকরণ সাংবিধানিকভাবে আরও সুদৃঢ় হবে।’
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘বিচার বিভাগের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে বিচারক নিয়োগের ন্যায্যতার ওপর। এক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হচ্ছেÑ সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল কার্যকর করা। এর মাধ্যমে কলেজিয়ামভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এ পদ্ধতি বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ল্যাটিমার হাউস (গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকার নিয়ে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর ঐকমত্য ঘোষণা) নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’
প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিলের মাধ্যমে ইতোমধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার মানদণ্ড অনুসরণ করে বিচারক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এা নিয়োগ প্রক্রিয়া বিচার বিভাগের ওপর জনআস্থা পুনরুদ্ধার করেছে। আর তরুণ প্রজন্মকে আশ্বস্ত করেছে, যোগ্যতা ও সততাই এখন বিচারক নির্বাচনের মূল ভিত্তি।’
দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত বাণিজ্যিক আদালত গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে জানিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘ন্যায়বিচার যেমন স্বাধীনতার ভিত্তি, তেমনি বিশ্ব অর্থনীতিতে টিকে থাকার জন্য বাণিজ্যিক ন্যায়বিচার গুরুত্বপূর্ণ। বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণে ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা কাজ করে। সেই দীর্ঘসূত্রতা নিরসনে প্রশিক্ষিত বিচারক, ডিজিটাল ফাইলিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন আদালত গঠনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনাও শুরু হয়েছে।’
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘এ বিশেষায়িত আদালত চালু হলে বাংলাদেশের প্রতি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। চুক্তি বাস্তবায়নে দ্রুততা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত হলে দেশ বিনিয়োগ আকর্ষণে সক্ষম হবে এবং প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাবে। আইন বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, উদ্যোগটির বাস্তবায়ন হলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।’
জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও কেন স্বাধীন বিচার বিভাগ এ দেশ পায়নি। এ প্রসঙ্গে বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেছেন, ‘নিম্ন আদালতের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতে সরকারের নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রয়েছে আরও বেশি। হাইকোর্টে বিচারক পদে (বিশেষ করে উচ্চ আদালতের আইনজীবীদের মধ্য থেকে) নিয়োগ হয় সম্পূর্ণভাবে সরকারের মর্জিমতো। ১৯৭২ সালে গণপরিষদ বিতর্ককালে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আইনজীবীদের নিয়োগে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ‘নিশ্চিতভাবে শেষ হয়ে যাবে’ বলে সতর্ক করেছিলেন। বাস্তবতা হচ্ছে, এরশাদের পতনের পর বিভিন্ন সরকারের আমলে নিম্ন আদালতের বিচারকদের তুলনায় আইনজীবীদের মধ্য থেকে হাইকোর্টে বিচারক পদে নিয়োগ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। অতীতে একজন প্রধান বিচারপতি হাইকোর্টে নিয়োগে ‘প্রলয়’ ঘটে যাওয়া নিয়ে আক্ষেপ করেছিলেন।
সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে বিচারকদের শুধু নিয়োগ নয়, দুই বছর মেয়াদান্তে তাঁদের চাকরি স্থায়ীকরণ, আরও সম্মানজনক আপিল বিভাগে তাঁদের নিয়োগ, প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ; এমনকি অবসর শেষে বিভিন্ন আধা বিচারিক প্রতিষ্ঠানে তাঁদের নিয়োগ সম্পূর্ণভাবে সরকারের পছন্দের ওপর নির্ভরশীল। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথে প্রতিবন্ধক হিসেবে বিভিন্ন আমলে এসব নিয়ে প্রকাশ্য সমালোচনা, বিতর্ক, এমনকি মামলার ঘটনা ঘটেছে।
উচ্চ আদালতের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের জন্য বিভিন্ন বিষয়ে সংস্কারের প্রস্তাব সরকারকে দেওয়া হয়েছিল (ইউএনডিপির পক্ষে এ বিষয়ে একটি বিস্তারিত গবেষণা আমি নিজেই করেছিলাম)। উচ্চ আদালত নিজেও বিভিন্ন রায়ে বিচারক নিয়োগে কিছু নির্দেশিকা দিয়েছেন। কিন্তু সে অনুযায়ী বাস্তবে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
আইনজীবীদের নিয়োগে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ‘নিশ্চিতভাবে শেষ হয়ে যাবে’ এমন বক্তব্যের কারণ ব্যাখ্যা না করলেও সচেতন নাগরিকদের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কারণ এতে থাকে রাজনৈতিক প্রভাব এবং সততা যোগ্যতার প্রশ্ন? তাই মনে প্রশ্ন, স্বাধীন বিচার বিভাগের প্রত্যাশা পূরণের সোনালি প্রভাত আর কত দূরে?
পর্যক্ষেকমহল মনে করেন, ৩৬ জুলাই চেতনার আলোকে প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ জাতিকে স্বাধীন বিচার বিভাগ উপহার দিতে পারবেন। যেহেতু এ প্রশ্নে ৩৬ জুলাই চেতনার পক্ষের সকল জনগণ ঐক্যবদ্ধ আছে।