প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত ইসি, তফসিলের আগে সংলাপ
২৯ আগস্ট ২০২৫ ১৪:০৯
স্টাফ রিপোর্টার : সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কর্তৃক আগামী বছর ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ভোট অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়া হয় গত ৫ আগস্ট। পরদিন ৬ আগস্ট নির্বাচন কমিশনকে ভোট অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিতে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেয় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়। আর এরপর থেকেই জোর প্রস্তুতি চালাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ইসির কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের ভোটের মাঠে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণের আওতায় আনছে ইসি। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রণয়ন, প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে ইসি। ভোটের আগে গত ৩০ জুলাই ৩০০ সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে খসড়া প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। যার ওপর শুনানি শেষে সবকিছু বিবেচনা করে এ বিষয়ে গ্রেজেট প্রকাশের কথাও জানিয়েছে ইসি। ইতোমধ্যে নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে হবে, সংখ্যানুপাতিক (পিআর) নাকি বিদ্যমান পদ্ধতিতে, তার এখনো কোনো সুরাহা হয়নি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ৭০ শতাংশ রাজনৈতিক দল পিআর পদ্ধতির পক্ষে রাজপথে থাকলেও বিএনপি ও তার কিছু মিত্র এ পদ্ধতির বিরোধিতা করছে। এদিকে মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ‘পিআর’ নিয়ে তারা বিরোধে জড়াবে না। এ বিষয়ে সরকার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
যেকোনো সময় চূড়ান্ত রোডম্যাপ
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ২৪টি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম নির্ধারণ করে নির্বাচনী রোডম্যাপের খসড়া চূড়ান্ত করেছে ইসি। অনুমোদন পেলেই তা প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ২০ আগস্ট নির্বাচন কমিশনের উপসচিব মো. মাহবুব আলম শাহ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয় আগামী ১০ সেপ্টেম্বর ভোটকেন্দ্রের খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে কমিশন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে তফসিল ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণের কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপ, তফসিল ঘোষণার আগে সম্পূরক ভোটার তালিকা প্রকাশ, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন, পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক নীতিমালা প্রণয়ন, বিভিন্ন প্রকার ম্যানুয়াল, নির্দেশিকা, পোস্টার, পরিচয়পত্র মুদ্রণ, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ও নির্বাচনী সরঞ্জামাদি ব্যবহার উপযোগীকরণে কমিটি গঠন করেছে ইসি। এছাড়া নির্বাচনী বাজেট বরাদ্দ সংক্রান্ত কার্যক্রম, নির্বাচনের জন্য জনবল ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ, ভোটে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক কার্যক্রম যথাসময়ে শেষ করতে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। রাজনৈতিক দল প্রচারণা কীভাবে চালাবে, তাও নির্ধারণ করেছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। গত সপ্তাহে (২১ আগস্টের মধ্যে) নির্বাচনী চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশের কথা ছিল। পরে এক নির্বাচন কমিশনার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আগামী ২৪ বা ২৫ আগস্ট লেগে যেতে পারে। কিন্তু ২৬ আগস্ট দুপুরে এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত তা প্রকাশ করতে পারেনি।
বিতর্কমুক্ত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায় সরকার, কঠোর সিইসি!
সরকার চাচ্ছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেন ইতিহাসের সেরা নির্বাচন হয়- এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অন্তর্বর্তী সরকার। নির্বাচন কমিশনও চায় বিতর্কমুক্ত ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন উপহার দিতে। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আন্তর্জাতিক মানের নির্বাচন দেখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। এজন্য তারা সব ধরনের সহযোগিতাও করতে ইচ্ছুক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জানিয়েছে, তারাও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন দেখতে চায়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সম্প্রতি সাংবাদিকদের জানান, ভোটের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। যারা বাক্স দখল করার স্বপ্নে বিভোর, তাদের স্বপ্নভঙ্গ হবে। যারা অস্ত্রবাজি করে ভোটে জিততে চাইবেন, তাদের জন্য দুঃসংবাদ। ভোটকেন্দ্র দখলের ইতিহাস ভুলে যান। আমরা কঠোর অবস্থানে থাকব। ভোটকেন্দ্র দখল করলে পুরো ভোট বাতিল করা হবে। ভোটের দিন যত এগিয়ে আসবে, ততই জনগণের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি এবং সরকারের নির্দেশনাও স্বাধীন এ প্রতিষ্ঠানের ওপর বাড়তে পারে। এদিকে ভোটের প্রস্তুতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা প্রত্যাশা করে ইসি যে সংলাপের আয়োজন করে থাকে, সেটিও নির্ভর করছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ওপর। জুলাই সনদে ঐকমত্য না হলে দলগুলো ভোটমুখী হবে কি না বা কোন দলের অবস্থান কী হবে, তা দেখে সংলাপ করতে চায় ইসি।
আগস্টেই ২২টি নতুন দলের প্রতিবেদন চায় ইসি
আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে ২২টি নতুন রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব যাচাই-বাছাই করে সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলেছে ইসি। গত সোমবার (২৫ আগস্ট) নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করেন। নির্দেশনায় জানানো হয়, নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের জন্য ২২টি দলকে মাঠপর্যায়ের তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। উক্ত ২২টি দলের জেলা ও উপজেলার দপ্তরের অস্তিত্ব ও কার্যকারিতা সরেজমিন তদন্তের প্রতিবেদন আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে পাঠানোর জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। নির্দেশনায় আরও জানানো হয়, সিনিয়র জেলা/জেলা নির্বাচন অফিসার/অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন অফিসার/তদন্তকারী কর্মকর্তা চেকলিস্ট পূরণ করে সব কাগজপত্রে পৃষ্ঠা নম্বর প্রদানপূর্বক সিলগালা করে বদ্ধ বিশেষ খামে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে পাঠাবেন। আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা সিনিয়র জেলা/জেলা নির্বাচন অফিস হতে প্রাপ্ত সিলগালাকৃত বদ্ধ বিশেষ খামগুলো রাজনৈতিক দলভিত্তিক একত্রিত করে অপর একটি বিশেষ খামে সিলগালা করে গোপনীয়ভাবে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে পাঠাবেন। এছাড়া উপজেলা দপ্তরের অস্তিত্ব ও কার্যকারিতার তদন্ত প্রতিবেদন তদন্তকারী সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ওপরের চেকলিস্ট পূরণ করে সব কাগজপত্রে পৃষ্ঠা নম্বর প্রদানপূর্বক সিলগালা করে বদ্ধ বিশেষ খামে সিনিয়র জেলা/জেলা নির্বাচন অফিসার নিকট পাঠাবেন। সিনিয়র জেলা-জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হতে প্রাপ্ত সিলগালাকৃত বদ্ধ বিশেষ খামগুলো রাজনৈতিক দলভিত্তিক একত্রিত করে অপর একটি বিশেষ খামে সিলগালা করে গোপনীয়ভাবে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে পাঠাবেন।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলছেন ইসি দলকানা-নির্লজ্জ
গত ২৪ আগস্ট রোববার জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণ অঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ বর্তমান নির্বাচন কমিশন কিছু দলের পার্টি অফিস হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন যেভাবে দলকানা একটি দলের প্রতি, একটি দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে যেভাবে নির্লজ্জের মতো কাজ করছে, সেটি আমাদের নির্বাচনমুখী হওয়ার অন্তরায় বলে আমরা মনে করছি।’ রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে ২৪ আগস্ট দুপুরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্য কমিশনারদের উপস্থিতিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ ও ৩ আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে শুনানিতে হট্টগোল ও হাতাহাতি হয়। পরে বিকেল ৪টার দিকে ইসি ভবনে যান এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমরা বারবার বলে এসেছি আমরা একটি গ্রহণযোগ্য-অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচনের দিকে যেতে চাই। বাংলাদেশের মানুষ গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ আবার গুণ্ডাতন্ত্রের দিকে যেতে চায় না।’ হাসনাত বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ আবার এক-এগারো মঞ্চস্থের জন্য অপেক্ষা করছে না। সুষ্ঠু-অবাধ-গ্রহণযোগ্য-অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন হতে গেলে এ নির্বাচন কমিশনকে বস্তুনিষ্ঠ পেশাদারিত্বের ভূমিকায় আমরা দেখতে চাই।’ অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘আজ নির্বাচন কমিশন যে ভূমিকা রেখেছে, আমরা সেই ভূমিকাকে সবসময় প্রশ্নবিদ্ধ করে এসেছি। আমরা পুলিশকে দেখেছি নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। আমরা দেখলাম পুলিশ আমাদের নেতাকর্মীদের নির্বাচন কমিশনে ঢুকতে বাধা দিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির নেতাকর্মীদের ফ্রি এক্সিট দিয়েছে।’ নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠনের অনতিবিলম্বে দাবি জানিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘এই নির্বাচনের বিষয়ে কমিশনের প্রতি আমাদের যে আস্থা ছিল, সে আস্থা ক্রমশ ক্ষীয়মাণ। একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য এই নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই দল-মত নির্বিশেষে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের রিমোট কন্ট্রোল কোথায় রয়েছে? এটা আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত অজ্ঞাত। নির্বাচন কমিশনাররা যদি মনে করেন তারা এই নির্বাচন কমিশন পরিচালনা করতে পারবেন না, তা মানুষের সামনে প্রকাশ করুন।’ ‘না হয় নিকট অতীতে আমরা নূরুল হুদা কমিশনকে দেখেছি। তার পরিণতি আমরা দেখেছি,’ বলেন তিনি। এনসিপির এই নেতা আরও বলেন, ‘বিএনপির আওয়ামী বিষয়ক সম্পাদক রয়েছেন অনেকেই, যারা আওয়ামী লীগ থেকে বেশি আওয়ামী লীগ। তাদের মধ্যে অন্যতম রুমিন ফারহানা আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী, ফ্ল্যাটভোগী এবং যারা গুণ্ডা দিয়ে নির্বাচন কমিশনকে ঠাণ্ডা করে দিতে চায়, যারা একটা প্রেসক্রিপটিভ ইলেকশনের দিকে আবার যেতে চায়।’
প্রধান উপদেষ্টা বলছেন সরকার নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত
গত ২৫ আগস্ট সোমবার কক্সবাজারে রোহিঙ্গা অংশীজন সংলাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, বর্তমানে দেশ যথেষ্ট স্থিতিশীল এবং নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। ড. ইউনূস বলেন, ‘বাংলাদেশ রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত। সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে এক বছর আগে ঘটে যাওয়া হত্যাযজ্ঞ এবং ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর, বর্তমানে দেশ যথেষ্ট স্থিতিশীল এবং নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত।’ তিনি জানান, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন ঘোষণা করা হয়েছে এবং এই নির্বাচনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার একটি নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা এখন আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আছি। এক বছর আগে আমরা এক ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে গিয়েছিলাম। এরপর ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে দেশকে মুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।’