মতিউর রহমান মল্লিকের কাব্যপ্রেম
১৪ আগস্ট ২০২৫ ১৫:১১
॥ ওবায়েদ ইবনে গনি ॥
কবি মতিউর রহমান মল্লিক ছিলেন কাব্যপ্রেমিক। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সংগীতশিল্পী, সুরকার ও গীতিকার। কবি মতিউর রহমান মল্লিক ইসলামী ধারায় অসংখ্য গান ও কবিতা রচনা করেছেন। তার সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতার মধ্যে একটি সময় অন্যতম। তাকে অনেকেই সবুজ জমিনের কবি। আবার অনেকে মানবতার কবি ও মরমী কবি বলে থাকেন।
কবি মতিউর রহমান মল্লিক ১৯৫৪ সালের ১ মার্চ বাগেরহাট জেলার সদর উপজেলার বারুইপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মুন্সী কায়েম উদ্দিন মল্লিক স্থানীয় জারীগানের দলের জন্য গান লিখতেন। তৎকালীন রেডিওতে কবি ফররুখ আহমদ যে সাহিত্য আসর পরিচালনা করতেন, সেই আসরে মল্লিকের বড় ভাই কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। মা-বাবার সান্নিধ্যে থেকে তিনি গানের প্রাথমিক জীবন শুরু করেন। প্রাথমিক জীবনে রেডিওতে গান শুনে শুনে গান লেখা শুরু করেন। তখনকার তার প্রায় সব গানই ছিল প্রেমের গান। পরবর্তীতে তিনি ইসলামী আদর্শে প্রভাবিত হয়ে ইসলামী ধারায় গান লেখা শুরু করেন।
কবি মতিউর রহমান মল্লিক বারুইপাড়া সিদ্দীকিয়া সিনিয়র মাদরাসায় প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। এরপর বাগেরহাট পিসি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ছাত্রজীবনে তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কর্মজীবনে কবি মতিউর রহমান মল্লিক সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন। ‘বিপরীত উচ্চারণ’ সাহিত্য সংকলন ও সম্পাদনা করেছেন, মাসিক কলম পত্রিকার সম্পাদক এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ সংস্কৃতি কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ছিলেন।
ভারতীয় উপমহাদেশে বাংলা সাহিত্যের ক্রমবিকাশমান ধারায় বিংশ শতাব্দীর আশির দশক ভিন্নমাত্রায় উজ্জ্বল এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় সাহিত্যে যে নৈরাশ্যবাদ ছড়িয়ে পড়ে, ক্রমেই তা আমাদের বাংলা সাহিত্যকেও ধীরে ধীরে স্পর্শ করে। বিশেষ করে কবিতার ক্ষেত্রে তা প্রকট হয়ে দেখা দেয়। ইউরোপের এ অস্থির নেতিবাচক মূল্যবোধের প্রভাব বাংলা কবিতাকে গ্রাস করে নেয়। আধুনিকতার নামে বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, অসীম চক্রবর্তী ও জীবনানন্দ দাশÑ এ পঞ্চপাণ্ডবের হাতে বাংলা সাহিত্যে বিশ্বাসী চেতনার বা আস্তিক্যবাদের স্খলন ঘটে। এসব কবি আধুনিকতার আবরণে নাস্তিক্যবাদকেই বাংলা কবিতায় উপস্থাপন করেন। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত লেখেন, ‘হয়তো ঈশ্বর নেই জীব সৃষ্টি আজন্ম অনাথ।’ এ নাস্তিক্যবাদই তখন আধুনিক বাংলা কবিতার ধর্ম হিসেবে প্রচলিত হয়ে যায়। আর নাস্তিক্যবাদের সঙ্গে সুকৌশলে পরে যুক্ত হতে থাকে মার্কসীয় বস্তুবাদের তত্ত্ব।
১৯৩০-এর দশকের কবিদের এ নেতিবাচক প্রভাবের বিরুদ্ধে এমন বাঙালি মুসলমানের বিশ্বাসী চেতনাকে তুলে ধরেছেন বাংলা সাহিত্যের ত্রিরত্ন কবি। এ তিনজন হলেনÑ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কবি জসীমউদ্দীন এবং কবি ফররুখ আহমদ। এ তিন কবির মনন ও মানসিকতায় শাশ্বত বিশ্বাসের একটা স্থিতি ছিল। তাদের এ মনন ও মানসিক বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটেছে তাদের কবিতায়। কাব্যভঙ্গির জনপ্রিয়তার কারণে তারা সহজেই নাস্তিক্যবাদকে আড়াল এবং পরাজিত করতে পেরেছিলেন। কবি ফররুখ আহমদ একটু ভিন্নভাবে রোমান্টিক আবহের মধ্য দিয়ে ইসলামের মূলভাবকে তার কবিতায় প্রস্ফুটিত করেছেন। ইসলামের আদর্শ, বিশ্বাস এবং চৈতন্যকে তিনি একটি নিগূঢ় আনন্দের মধ্য দিয়ে উপস্থাপন করেছেন। যার জন্য তার কবিতা বিশ্বাসী সুরে গাঁথা হয়েও সর্বজনগ্রাহ্য হয়েছে। তবে ১৯৩০ দশকের পঞ্চপাণ্ডবের দাপটে ফররুখের এ ধারাটা ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ।
এভাবেই ১৯৪০ দশকের পর পঞ্চাশ, ষাট এবং সত্তরের দশকে নানা ঘটনা ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে এগিয়েছে বাংলা সাহিত্য এবং বাংলা কবিতা। একটা অস্থিরতা একসময় বাংলা সাহিত্য তথা কবিতাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। যার ফলে ১৯৩০-এর দশকের এ হতাশাবাদ থেকে বাংলা সাহিত্য এবং বাংলা কবিতা বিশ্বাসের স্থির ও শীতল ভূমিকে স্পর্শ করতে পারেনি। তখনো কবি শামসুর রাহমান, কবি দাউদ হায়দার, কবি নির্মলেন্দু গুণ, কবি মহাদেব সাহা প্রমুখ নাস্তিক্যবাদী গোষ্ঠীর কবিদের দুর্দান্ত দাপটে কবি আশরাফ সিদ্দিকী, কবি ফজল শাহাবুদ্দীন, কবি আল মাহমুদ প্রমুখ বিশ্বাসী গোষ্ঠীর কবিরা ছিলেন অনুজ্জ্বল। তখনো বাংলা কবিতা নিমজ্জিত ছিল নাস্তিক্যবাদ এবং মার্কসীয় অসার বস্তুবাদের মধ্যে।
আশির দশকের শুরু থেকেই বাংলা কবিতায় একটি ভিন্নধারার সূচনা ঘটে। বিশ্বাসী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বাংলা সাহিত্যের কাব্যভুবনকে ভিন্ন সাধ এবং সুরে বিকশিত করে তুলে একদল সংগ্রামী তরুণ কবি। যারা মেধা, মনন ও মানসিকতায় ধর্মীয় বিশ্বাসে অটল। ওই বিশ্বাসী তরুণদের দলনায়ক ছিলেন কবি মতিউর রহমান মল্লিক (জন্ম ১৯৫৫, মৃত্যু ২০১০)। কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কবি জসীমউদ্দীন, কবি ফররুখ আহমদ ও কবি আল মাহমুদের উত্তরসূরি মূলত আশির দশকের এ বিশ্বাসী কবিরাই। বাংলা কবিতাকে নাস্তিক্যবাদ ও মার্কসীয় বস্তুবাদ থেকে মুক্ত করার সংগ্রাম আশির ওই তরুণ কবিরাই শুরু করেছিলেন।
বিশ্বাসী চেতনায় ওইসব সংগ্রামী কবি হলেন- কবি মতিউর রহমান মল্লিক, কবি হাসান আলীম, কবি সোলায়মান আহসান, কবি মোশাররফ হোসেন খান, কবি আসাদ বিন হাফিজ, কবি মুকুল চৌধুরী, কবি গোলাম মোহাম্মদ, কবি তমিজ উদ্দীন লোদী, কবি বুলবুল সরওয়ার প্রমুখ। আশির দশকের বিশ্বাসী চেতনায় ওই সংগ্রামী কবিরাই মূলত নব্বই দশকের অনেক তরুণ কবিকে বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সন্ধানমুখী করেছেন। আশির দশকের কবিদের রোপণ করা বিশ্বাস ও ঐতিহ্য চেতনা আজও বাংলা কবিতাকে উজ্জ্বল ও বেগবান করে চলেছে। কবি মতিউর রহমান মল্লিক আশির দশকের ওই বিশ্বাসী কবিদের সিপাহসালার। মুত্যুর আগ পর্যন্ত কবি মতিউর রহমান মল্লিকের মোট পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এ গ্রন্থগুলো হচ্ছে- আবর্তিত তৃণলতা, অনবরত বৃক্ষের গান, তোমার ভাষায় তীক্ষè ছোরা, চিত্রল প্রজাপতি এবং নীষণ্ন পাখির নীড়ে।
কবি মতিউর রহমান মল্লিক তার কবিতায় আধ্যাত্মিকতাকে রোমান্টিকতার আবরণে অত্যন্ত শৈল্পিক এবং নিপুণভাবে উপস্থাপন করেছেন। তার কবিতায় যেমন বিশ্বাসী চেতনায় পরিস্ফুটন ঘটেছে, তেমনি মানুষের হৃদয়বৃত্তি এবং প্রকৃতির নিপুণ সৌন্দর্যকেও তিনি তার কবিতায় রূপায়িত করেছেন। কবি মতিউর রহমান মল্লিক যেমন সারা দেশে কবি হিসেবে পরিচিত, তেমনি তার আপন বড় ভাই এলাকায় কবি সাহেব হিসেবে পরিচিত এবং তার চাচা এলাকায় সাংস্কৃতিক ব্যক্তি ছিলেন। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের এই বেড়ে ওঠা কবি মতিউর রহমান মল্লিক মক্তব, মাদরাসায় সাংস্কৃতিক পরিপমণ্ডল তৈরি করেন।
এলাকায় ফুটবল টিম তৈরি করে ছেলেদের মাঝে সাংগঠনিক পরিচয় তুলে ধরেন। আর ফাইনাল খেলার দিন ফুটবল খেলার সঙ্গে সঙ্গে গান-গজলেও মাতিয়ে দিতেন তিনি। এ সময় তিনি নজরুলের মতো ইসলামী গান লেখা, সুর করা, গাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখতেন। ইসলামিক আঞ্চলিক গানের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক ইসলামী গান লেখা, সুর করা ও গান পরিবেশন করে সাংস্কৃতিক ময়দানে নতুন জোয়ার আনেন। এককথায় বলা যায়, কবি মতিউর রহমান মল্লিক তার কবিতায় মানুষের হৃদয়বৃত্তি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ধারণ করে আধ্যাত্মিক চেতনাকে প্রস্ফুটিত করেছেন। তার প্রতিটি কাব্যগ্রন্থের কবিতা পাঠ করলেই এ সত্যটি উপলব্ধি করা যায়। যেমন-
জীবনের মতো
মৃত্যু কামনা করি।
বেঁচে রবো আমি ইতিহাস ভালবেসে
………….
আমি তো পালাব উধাও ধূসর রাতে
বাঁচার দলিল বেঁচে রবে প্রাণে প্রাণে।
(মিনার-আবর্তিত তৃণলতা)
কিংবা
আর কত দূরে, কত দূরে আর
মনজিল আমার, সেই ইপ্সিত মনজিল আমার;
………….
আল-কোরআনের দীপ্ত দীপ্ত মনজিল পাওয়া চাই
যত দূরে যাক তবু যে আমার মনজিলে যাওয়া চাই।
(মনজিল কত দূরে-অনবরত বৃক্ষের গান)
এভাবেই কবি মতিউর রহমান মল্লিক তার কবিতায় মানবিক প্রেম এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভেতর দিয়ে হেঁটে হেঁটে তার ইপ্সিত মনজিলে পৌঁছাতে চেয়েছেন। আর তার সেই ইপ্সিত মনজিল আল-কুরআনের আলোয় উজ্জীবিত। সারল্যই আধুনিক কবিতার চরিত্র। কবি মিল্টন যেমন চেয়েছিলেন, কবিতা হবে সরল, ইন্দ্রীয় সংবেদী ও আবেগদৃপ্ত। মতিউর রহমান মল্লিক তার কাব্যভূমিকে সারল্য, আবেগময়তা দিয়ে ইন্দ্রীয়সংবেদী করে তুলেছেন। তার কাব্যভুবন ঝর্ণার গীতলতায় হৃদয়কে স্পর্শ করে। যেমন-
অনেক বিজয় এসেছে আবার
অনেক বিজয় আসেনি যে
অনেক বিহান হেসেছে আবার
অনেক বিহান আসেনি যে!
(অনেক বিজয়-নীষণ্ন পাখির নীড়ে)
কবি মতিউর রহমান মল্লিক তার কবিতার বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে এনেছেন ব্যাপক বৈচিত্র্যময়তা। এসব কবিতার বিষয়বস্তু হিসেবে মানবিকপ্রেম যেমন এসেছে, প্রকৃতিপ্রেম, দেশপ্রেম, ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রত্নতাত্ত্বিক বিষয়বস্তু, আন্তর্জাতিকতা প্রভৃতি বিষয়ও এসেছে অত্যন্ত সাবলীলভাবে। তবে সবকিছু ছাড়িয়ে আধ্যাত্মপ্রেমই তার কবিতাকে করেছে উজ্জ্বল এবং মহিমান্বিত। মানবপ্রেম এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্য দিয়ে মতিউর রহমান মল্লিক তার কবিতায় বিশ্বাসী চেতনাকে অত্যন্ত নান্দনিকতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন।
লেখক : সাংবাদিক।