সিংহের পিঠে কাঠের বোঝা


৩১ জুলাই ২০২৫ ১৪:৫৬

॥ মনসুর আহমদ ॥
সে অনেক দিন আগের কথা। এক দেশে এক নেক্কার ব্যক্তি বাস করতেন। তার স্ত্রী ছিল কর্কশভাষিণী ও মুখরা প্রকৃতির। শুধু সে স্বামীর সাথেই ঝগড়া করত তাই নয়, পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথেও ঝগড়া-ফ্যাসাদ করত। একবার ঐ নেক্কার লোকটির বাড়িতে তার এক বন্ধু বেড়াতে আসেন। তিনি বন্ধুর বাড়িতে এসে দরজার কড়া নাড়া দিলেন। নেক্কার লোকের স্ত্রী বিরক্ত সহকারে দরজা খুলে দিলে ঝাঁঝালো সুরে জিজ্ঞেস করল, ‘কে আপনি?’
‘আমি আপনার স্বামীর দীনি ভাই, আমি তাকে দেখতে এসেছি’, জবাব দেন আগন্তুক। মুখরা স্ত্রীলোকটি অত্যন্ত কর্কশ ভাষায় বলল, ‘সে তো জঙ্গলে কাঠ কাটতে গেছে। খোদা যেন ওই ব্যাটারে নিরাপদে ফিরায়ে না আনে। খোদা যেন ওর অমুক করে ইত্যাদি। এভাবে সে তার স্বামীর বিরুদ্ধে নিন্দাবাদ করতে লাগল, বদ দোয়া করতে লাগল।’
ইতোমধ্যে তার স্বামী জঙ্গল থেকে ফিরে এলেন। এক সিংহের পিঠে বিরাট এক বোঝা, নিজেও বসে আছেন নিশ্চিন্তে সিংহের পিঠে। পাহাড়ের দিক থেকে খুব নীরবে কাঠ ও কাঠুরিয়াকে পিঠে নিয়ে ফিরে এলো সিংহটি। এ অবস্থা দেখে তো ভয়ে আগন্তুকের অবস্থা খারাপ। কিন্তু কাঠুরিয়া তার দীনি ভাইকে দেখে খুব খুশি। তিনি সালাম জানিয়ে আগন্তুককে মোবারকবাদ জানালেন। সিংহটি পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে। কাঠুরিয়া বন্ধুকে পাশে দাঁড় করিয়ে সিংহের পিঠ থেকে কাঠের বোঝা নামাতে লাগলেন। একসময় কাঠ নামানো শেষ হলে সিংহটিকে বললেন, ‘যাও, আল্লাহ তোমার ভালো করুন।’ সিংহটি নীরবে পাহাড়ের দিকে চলে গেল। কাঠুরিয়া তার বন্ধুকে ঘরের ভেতরে নিয়ে এলেন, খুব যত্ন সহকারে খাওয়া-দাওয়া করালেন। কিন্তু মুখরা বৌটি বকবক করে যাচ্ছিল, কাঠুরিয়া ধৈর্য সহকারে স্ত্রীর ঝগড়া শুনছিলেন, কিন্তু কোনোই উত্তর দিচ্ছিলেন না। আগন্তুক তার ধৈর্য দেখে অবাক হলেন এবং একসময় বিদায় নিয়ে ফিরে গেলেন।
বছর ঘুরে গেল। বন্ধু আবার ফিরে এলো কাঠুরিয়া বন্ধুর সাথে দেখা করতে। আগেরবারের মতো দরজায় কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে আওয়াজ এলো, ‘দরজায় কে?’ ‘আমি আপনার স্বামীর দীনি ভাই,’ জবাব দিলেন আগন্তুক। ‘আপনাকে মোবারকবাদ, আসুন ভেতরে আসুন’ বলে মহিলা দরজা খুলে দিলেন। বললেন, ‘আপনি বসুন’ বিশ্রাম করুন। আপনার বন্ধু শিগগিরই ফিরে আসবে। আল্লাহ্ তাকে ভালোভাবে ফিরিয়ে আনুন।’ আগন্তুক এবারে বন্ধুর স্ত্রীর ব্যবহারের খুব খুশি হলেন।
একটু পরেই কাঠুরিয়া বন্ধু কাঠের বোঝা নিয়ে ফিরে এলেন। এবার কাঠের বোঝা সিংহের পিঠে নয়। নিজের পিঠে। পিঠ থেকে কাঠের বোঝা নামিয়ে দুই বন্ধু পরস্পর কোলাকুলি করলেন। আগন্তুক বন্ধুকে অতি যত্ন সহকারে আহার করালেন। এবার বিদায়ের পালা। বিদায়কালে আগন্তুক কাঠুরিয়া বন্ধুকে প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা বন্ধু। গত বছর যখন এসেছিলাম, তখন দেখেছিলাম আপনার স্ত্রী আপনার সাথে দুর্ব্যবহার করছে, কর্কশ ভাষায় গালিগালাজ করছে। আর আপনি সিংহের পিঠে কাঠ বহন করে নিয়ে আসছেন। কিন্তু এ বছর দেখলাম তার উল্টো, আপনার স্ত্রী অত্যন্ত ভালো ব্যবহার করছে আপনার সাথে। তার মধুর ভাষা আমাকে মুগ্ধ করেছে। কিন্তু এবার কাঠের বোঝা বয়ে নিয়ে এলেন নিজের পিঠে করে। এ ব্যাপারটি আমার বুঝে আসছে না, বলুন তো রহস্যটি কী?”
কাঠুরিয়া বন্ধু হেসে দিলেন, ‘শুনুন ভাই। আমার কর্কশভাষিণী স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে। তার ব্যবহারে আমি ধৈর্যধারণ করতাম। এ ধৈর্যধারণের পুরস্কারস্বরূপ আল্লাহ ঐ সিংহটিকে আমার খেদমতের জন্য বশীভূত করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন আমার নতুন স্ত্রীর ব্যবহার অত্যন্ত মধুর। আমি তাকে নিয়ে খুব সুখে আছি। আগের মতো আর কোনো কর্কশ ভাষা শুনতে হয় না, ধৈর্য করার ব্যাপারও নেই। আল্লাহ তাই সিংহকে আমার খেদমত থেকে সরিয়ে দিলেন। আর তাই তো নিজের পিঠে করেই আমাকে কাঠ বহন করতে হচ্ছে। আমি মহান খোদার শোকরিয়া জানাই যে, তিনি আমাকে এমন এক সৎস্বভাবা নেক্কার স্ত্রী দিয়ে সুখী করেছেন।’
আল্লাহর খাতিরে বিপদে ধৈর্যধারণ করলে হিংস্র পশু সিংহও মানুষের খেদমতে এগিয়ে আসে। শুধু সিংহই নয়, পৃথিবীর সব কিছুই তার খদমতে এগিয়ে আসে। এসব কিছুই অসীম ধৈর্যের প্রতিফল।