বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শেখায় আশুরা
৩ জুলাই ২০২৫ ১২:১৩
এম মুহাম্মদ আব্দুল গাফফার : আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাঁর সৃষ্টিজগৎকে সৃষ্টিজীবদের জন্য এক বিস্ময়কর শিক্ষালয় হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এ মর্মে আল্লাহ তায়ালা এভাবে উদাহরণ দান করছেন, ‘এরা কী এ দৃশ্য কখনো দেখে নাই যে, আমি এক তৃণ-পানিবিহীন জমিনের দিকে পানি প্রবাহিত করি এবং পরে সে জমিনেই এমন ফসল ফলাই, যা হতে তাদের জন্তু-জানোয়ারেরাও খাদ্য লাভ করে, আর এরা নিজেরাও খাবার পেয়ে থাকে। তাহলে কী তারা ভেবে দেখবে না?’ (সূরা সাজদা: ২৭)।
মহান রাব্বুল আলামিনের এ উদাহরণ উপস্থাপনের উদ্দেশ্যটাই হলো মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি রহস্য অনুধাবন করে একমাত্র তাঁরই কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমত্বের নিকট মাথা নত করবে এবং যেটা চিরন্তন সত্য ও ন্যায় তাই এ জমিনে প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সম্পৃক্ত হবে।
আল্লাহর সৃষ্টি থেকে মানুষ শিক্ষা লাভ করে তাঁর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করবেÑ এটাই হলো আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার বিধান। এ মর্মে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেন, ‘তিনি সূর্যকে উজ্জ্বল ভাস্বর বানিয়েছেন, চন্দ্রকে দিয়েছেন আলো এবং চন্দ্রের হ্রাস-বৃদ্ধি লাভে এমন সব মনজিল বিষয় ঠিকভাবে নির্ধারিত করে দিয়েছেন, যার ফলে তোমরা উহার সাহায্যে বছর ও তারিখসমূহের হিসাব জেনে নাও, আল্লাহ তায়ালা এসব কিছু স্পষ্ট উদ্দেশ্যসম্পন্ন করে সৃষ্টি করেছেন, তিনি তাঁর নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে সুস্পষ্টরূপে পেশ করছেন তাদের জন্য যারা জ্ঞানবান।’ (সূরা ইউনুস: ৫)। এভাবেই আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা চিন্তাশীলদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেন, ‘যারা উঠতে বসতে ও শুতে সকল অবস্থায়ই রবের জিকির করে এবং আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি ও সংগঠন সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করে, তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে ওঠে- হে রব! এসবকিছু অর্থহীন ও উদ্দেশ্যহীন সৃষ্টি করোনি, তুমি উদ্দেশ্যহীন কাজের বাতুলতা হতে পবিত্র।’(সূরা আলে ইমরান: ১৯১)।
এখন যে কথাটা সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণার দাবি রাখে, তা হলো মহান রাব্বুল আলামিনের বিধান তাঁর জমিনে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আল্লাহর বান্দা হিসেবে দায়িত্ব এড়িয়ে যাবার কোনো সুযোগ নেই। এ মর্মে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঘোষণা করেন, ‘আর যারা আমার জন্য চেষ্টা-সাধনা করবে তাদেরকে আমি আমার পথ দেখাবো, আর আল্লাহ নিশ্চিতই সৎকর্মশীল লোকদের সঙ্গে রয়েছেন।’ (সূরা আনকাবুত: ৬৯)। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার এসব ঘোষণায় পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে যে, হক ও বাতিলের চিরন্তন দ্বন্দ্বে হকপন্থিগণ সবসময় বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করবে। এক্ষেত্রে ১০ মহররম অর্থাৎ আশুরার দিবসটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মহান রাব্বুল আলামিন আশুরার দিনটিকে মানবজাতির জন্য স্মরণীয় করে রেখেছেন।
বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাঁর সৃষ্টির সূচনা করেছেন ১০ মহররম তারিখ হতে। আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-কে জান্নাত থেকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন এ ১০ মহররম তারিখেই। মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহীম (আ.)-কে আল্লাহদ্রোহী জালিম নমরূদের অগ্নিকুণ্ডু থেকে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা মুক্তি দিয়েছিলেন এ ১০ মহররম আশুরার তারিখেই। আমাদের একটি বিষয় স্মরণ রাখতে হবে যে মক্কার মুশরিক কুরাইশরা নিজেদের দীনে ইব্রাহীমির অনুসারী বলে মিথ্যা দাবি করতো- অবশ্য তাদের মধ্যে দু-একজন মুর্তিপূজা থেকে দূরে থেকে দীনে ইব্রাহীমির দাবির পক্ষে সোচ্চার ছিল। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীস অত্যন্ত তাৎপর্যময়। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, জাহেলি যুগে কুরাইশরা আশুরার সাওম পালন করতো, পরে আল্লাহর রাসূল (সা.) আশুরার সাওম পালনের আদেশ দান করেন। ইতোমধ্যে রমজানের সাওম ফরজ করা হলে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, কেউ ইচ্ছা করলে এ সাওম পালন করবে আর ইচ্ছা করলে নাও পালন করতে পারে।’ (সহীহ আল বুখারী, কিতাবুস সাওম)।
এ আশুরার দিবসটিতে হজরত মূসা (আ.)-কে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বনি ইসরাঈলসহ জালিম ফেরাউনের কবল থেকে লোহিত সাগর পার করিয়ে ফিলিস্তিনের দিকে নিয়ে এসেছিলেন, অপরদিকে জালিম শাসক ফেরাউন ও তার দলবলকে সাগরে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। ১০ মহররম বা আশুরার এ ঘটনা সম্পর্কে একটি হাদীস এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, ‘ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, নবী (সা.) (হিজরত করে) মদীনা আগমন করলেন; দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিন সাওম পালন করছে। আল্লাহর রাসূল (সা.) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এটি কী ধরনের সাওম? তারা জবাব দিল, এটি একটি পবিত্র দিন! এদিন আল্লাহ দুশমন থেকে বনি ইসরাঈলকে নাজাত দিয়েছেন, তাই এদিন মূসা (আ.) সাওম পালন করেছেন। তখন নবী (সা.) বললেন, তোমাদের তুলনায় মূসা (আ.)-এর বেশি হকদার হলাম আমি। অতঃপর তিনিও সাওম পালন করলেন এবং এদিন (সবাইকে ) সাওম পালনের নির্দেশ দিলেন।’ (সহীহ আল বুখারী)।
১০ মহররম অর্থাৎ আশুরার দিবসে সর্বশেষ যে বেদনাদায়ক ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল, তা হলো ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে কারবালার অত্যন্ত নির্মম হত্যাকাণ্ড। মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর ইসলামী গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যথাক্রমে হজরত আবু বকর সিদ্দিক, হজরত ওমর ফারুক, হজরত ওসমান ও হজরত আলী (রা.) নিবার্চিত হয়ে মুসলিম জাহানের খেলাফতের দায়িত্ব পালন করেন। হজরত আলী (রা.) জীবিত থাকাকালীন সময়েই সিরিয়ার গভর্নর হজরত মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.) নিজেকে মুসলিম জাহানের খলিফা হিসেবে ঘোষণা করেন এবং ইন্তেকালের পূর্বে তৎপুত্র ইয়াযিদকে পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করে যান। হজরত মুআবিয়া (রা.)-এর এ সিদ্ধান্ত মুসলিম বিশ্বের নিষ্ঠাবান মুসলিমগণ মেনে নিতে পারেনি।
মক্কা, মদীনা, কুফা, বসরাসহ মুসলিম জাহানের গুরুত্বপূর্ণ এলাকার স্বচ্ছ শরিয়াহপন্থি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ মহানবী (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত হুসাইন ইবনে আলী (রা.)-কে খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের আহ্বান জানান। চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.)-এর স্থাপিত রাজধানী কুফা হতে অসংখ্য চিঠি হজরত হুসাইন (রা.)-এর নিকট পৌঁছতে লাগলো। এসব পত্রে একটাই আবেদন ছিল যে, তিনি যেন অবিলম্বে কুফায় উপস্থিত হয়ে সকল মুসলমানের বাইয়াত গ্রহণ পূর্বক খেলাফতের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন।
হজরত হুসাইন (রা.) পরিস্থিতি যাচাইয়ের জন্য স্বীয় চাচাতো ভাই মুসলিম বিন আকীল (রা.)-কে তথায় প্রেরণ করেন। মুসলিম (রা.)-এর ইতিবাচক পত্র পাবার পর পরিবার-পরিজনসহ তিনি মক্কা হয়ে কুফার উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে যান। ইতোমধ্যে ইয়াযিদ নিষ্ঠুর শাসক উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদকে বসরা থেকে কুফায় বদলি করে। উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ কুফায় পৌঁছেই কঠোরভাবে জনসাধারণকে হুসাইন (রা.)-এর আনুগত্য থেকে বিচ্যুত করে ইয়াযিদের পক্ষাবলম্বনে বাধ্য করে। উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ হজরত হুসাইন (রা.)-কে কুফায় প্রবেশের সব পথ বন্ধ করে দিয়ে তাঁকে কারবালার মরুপ্রান্তরে ইয়াযিদ বাহিনীর মুখোমুুখি করে ফেলে। হজরত হুসাইন (রা.) সমঝোতার জন্য তিনটি প্রস্তাব উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের নিকট প্রেরণ করেন-
প্রথমত, তাঁকে সপরিবারে মদীনায় চলে যেতে দেয়া হোক।
দ্বিতীয়ত, সরাসরি ইয়াযিদের সাথে তাঁকে কথা বলার সুযোগ করে দেয়া হোক।
তৃতীয়ত, তাঁকে দেশের সীমান্তবর্তী কোনো জায়গায় পাঠিয়ে দেয়া হোক।
উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ বিনাশর্তে ইয়াযিদের বাইয়াত তথা আনুগত্য ভিন্ন কোনো প্রস্তাবই মেনে নিলো না। ওমর বিন সাদ ও শিমারের পরিচালনাধীন ইয়াযিদ বাহিনী কারবালার অদূরে ফোরাত নদীর পানি বন্ধ করে দিয়ে ইমাম পরিবারের নারী, পুরুষ, শিশুসহ সকলকে অমানুষিক কষ্টে আবদ্ধ করলো। হজরত হুসাইন (রা.) অবর্ণনীয় জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েও অন্যায়ের নিকট মাথানত না করে বিশাল ইয়াযিদ বাহিনীর বিরুদ্ধে মুষ্ঠিমেয় সমর্থক ও আত্মীয়-স্বজন নিয়ে সম্মুখ সমরে বীরবিক্রমে লড়াই করে আল্লাহর দীন ও ইসলামী গণতন্ত্রের স্বার্থে জীবনদান করেন। নিষ্ঠুর উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ বাহিনী হজরত হুসাইন (রা.)-এর দেহের ওপর দিয়ে অশ্ব চালিয়ে ইতিহাসের জঘন্যতম অধ্যায় সৃষ্টি করে।
লেখক : সদস্য, দারুল ইসলাম ট্রাস্ট, দরগাহ রোড, সিরাজগঞ্জ।