পবিত্র চুম্বন


১৯ জুন ২০২৫ ১৪:০৭

॥ মীর লুৎফুল কবীর সা’দী ॥
পবিত্র কা’বাঘর তাওয়াফের স্থান মাতাফে প্রবেশ করেই আম্মা তাঁর আজন্ম লালিত স্বপ্নের কথাটি উচ্চারণ করলেন। আমি তাঁর আকাক্সক্ষার তীব্রতা ও আপাত বাস্তবতার মাঝে জাজ¦ল্যমান বিশাল ব্যবধান লক্ষ করে স্তব্ধ হয়ে রইলাম। কীভাবে সম্ভব? এ কথাই কেবল উঁকি দিল মনের মাঝে। কিন্তু তা প্রকাশ না করে আম্মাকে বললাম ‘আল্লাহকে ডাকুন, একমাত্র তাঁর কাছেই বলুন’।
আম্মাকে নিয়ে পবিত্র কা’বাঘর প্রথম তাওয়াফের শুরুতেই মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম (আ.) আমার মানসপটে ভেসে উঠলেন। পবিত্র কা’বাঘর, জমজম, মাকামে ইবরাহীম, সাফা-মারওয়া সাঈ করার স্থান সব মিলিয়ে হযরত ইবরাহীম (আ.) ও তাঁর পরিবারের একচ্ছত্র উপস্থিতিই আমার সামনে প্রবল হয়ে উঠলো। আমি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে রইলাম। তাওয়াফের মাঝে এ চিন্তাই কেবল ঘুরপাক খেতে থাকলোÑ এখানে শুধু হযরত ইবরাহীম (আ.) ও তাঁর পরিবারের উপস্থিতি রয়েছে কেন? কী বিশেষ বিশেষত্ব, মহত্ত্ব রয়েছে তাদের এ উপস্থিতির? প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে হজে এসে কিংবা সারা বছর ওমরাহ পালনের মধ্য দিয়ে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর পবিত্র স্মৃতি প্রত্যক্ষ ও স্পর্শ করার মাঝে অন্তর্নিহিত কোনো শিক্ষা কি মুসলিমদের জন্য এখানে রয়েছে? কী সেই শিক্ষা?
তাওয়াফের শুরুতেই হঠাৎ এমন একটি গভীর দ্ব্যর্থবোধক প্রশ্ন মনের মাঝে উদিত হওয়ায় এবং অন্য দিকে আম্মা তাঁর তীব্র আকাক্সক্ষার কথা প্রকাশ করায় সীমাহীন চিন্তার জালে নিমজ্জিত হয়ে গেলাম। এই প্রশ্ন এবং আম্মার আকাক্সক্ষা পূরণ সম্ভব কিনা, তার সঠিক কোনো উত্তর আমার জানা নেই। নিজের অজান্তে চৈতন্যর স্তরগুলো পেরিয়ে ক্রমেই যেন গভীর থেকে গভীরে যেতে থাকলাম। বিশ্বের সব প্রান্ত থেকে ছুটে আসা পুণ্যবান প্রেমিকদের জনসমুদ্রের সাথে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পতঙ্গের মতো মিশে গিয়ে রুকনে ইয়ামানিতে পৌঁছে হৃদয়ের সব আর্তি উজাড় করলাম- ‘রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়াকিনা আজাবান্নার’। ‘হে প্রভু! আমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করুন এবং জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন’। (সূরা বাকারা : ২০১)।
হাজরে আসওয়াদে পৌঁছে দূর থেকে হাত তুলে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে প্রথম প্রদক্ষিণ শেষ করে দ্বিতীয় প্রদক্ষিণ শুরু করলাম। মাকামে ইবরাহীমের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর পবিত্র পদচিহ্ন প্রত্যক্ষ করে আবেগে আপ্লুত ও অভিভূত হলাম। এই অলৌকিক পাথরের ওপর দাঁড়িয়েই হযরত ইবরাহীম (আ.) তাঁর সন্তানকে নিয়ে পবিত্র কা’বাঘর পুনর্ণির্মাণ করে মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করেছিলেনÑ ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এ কাজ গ্রহণ কর, নিশ্চয় তুমি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা।’ (সূরা আল-বাকারা : ১২৭)।
তাওয়াফরত অবস্থায় আমার সামনে আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পিত হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর জীবনের অসাধারণ অধ্যায়গুলো যেন একের পর এক ভেসে উঠতে লাগলো। হযরত ইবরাহীম (আ.) তাঁর পিতা আজরকে বলেছিলেন, ‘আপনি কি মূর্তিকে ইলাহরূপে গ্রহণ করেন? আমি তো আপনাকে ও আপনার সম্প্রদায়কে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে দেখছি।’ (সূরা আন’আম: ৭৪)।
যৌবনের প্রারম্ভেই ইবরাহীম (আ.) তাঁর প্রকৃত প্রতিপালকের সন্ধান লাভে ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। এ বিশ্বচরাচরে প্রকৃতির মাঝেই কি প্রতিপালক রয়েছেন? তাই রাতের আঁধারে আকাশে তারকা দেখে তিনি বলে উঠলেন- ‘এটাই আমার প্রতিপালক।’ কিন্তু যখন তা অস্তমিত হলো, তখন তিনি বললেন, ‘যা অস্তমিত হয়, তা আমি পছন্দ করি না।’ চাঁদকে সমুজ্জ্বলরূপে উদিত হতে দেখে তিনি সেটাকে প্রতিপালক মনে করলেন। এরপর সূর্যকে আরও দীপ্তিমানরূপে উদিত হতে দেখে তিনি বলে উঠলেন, ‘এটা আমার প্রতিপালক, এটা সর্ববৃহৎ।’ কিন্তু যখন তাও অস্তমিত হলো তখন তিনি বললেন, ‘তোমরা যাকে আল্লাহর সাথে শরিক কর তার সাথে আমার সংশ্রব নেই।’ তিনি ঘোষণা দিলেন- “ইন্নি অজ্জাহাতু অজহিয়া লিল্লাজি ফাতারাস সামাওয়াতি অলআরজা হানীফাও অমা আনা মিনাল মুশরিকিন”। “আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকে মুখ ফিরাচ্ছি যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।” (সূরা আন’আম: ৭৯)।
সত্যানুসন্ধানী হযরত ইবরাহীম (আ.) এভাবে তাঁর কাক্সিক্ষত প্রতিপালককে খুঁজে পেলেন এবং সম্মানিত বার্তা বাহক নবী হিসেবেও হলেন মনোনীত। সেই সাথে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্রমান্বয়ে একের পর এক পরীক্ষা আসতে লাগলো তাঁর ওপর। আল্লাহর মেহেরবানিতে তিনি সব পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হতে থাকলেন। অসীম সাহসিকতার সাথে আল্লাহর একত্ববাদ প্রচার করার ফলে তাঁকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হলো। আল্লাহ্ তায়ালার এ কঠিন পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হলে আল্লাহ্ ঘোষণা দিলেন, “ইয়া নারু কুনি বারদাও ওয়া সালামুন আ’লা ইবরাহীম”। “হে আগুন! তুমি ইবরাহীমের জন্য আরামদায়ক শীতল হয়ে যাও।” (সূরা আল-আম্বিয়া: ৬৯)।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যখন তিনি একটি সুসন্তান উপহার পেলেন, তখন আবার আল্লাহর কাছ থেকে হুকুম আসলো প্রাণাধিক প্রিয় এ সন্তানকে জবেহ করার জন্য। উহ, কি ভীষণ পরীক্ষা! আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুগ্রহে হযরত ইবরাহীম (আ.) এ ভয়ানক পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হলেন। আর সেই সাথে সূচিত হলো ঈদুল আজহা বা কুরবানির ঈদ!
আম্মার হাত ধরে পবিত্র কা’বাঘরের চারদিকে তাওয়াফ করছি আর একের পর এক হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো স্মরণ করে বিস্ময়ে বিমোহিত হচ্ছি। হযরত ইবরাহীম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে তাঁর স্ত্রী ও শিশুপুত্রকে বিরাণ মরুপ্রান্তরে কা’বাঘরের পাশে রেখে চলে গেলেন। মা হাজেরা (আ.) পানির সন্ধানে ছোটাছুটি করছেন সাফা ও মারওয়া দু’পাহাড়ের মাঝে। তিনি শিশুপুত্র ইসমাঈলের দিকে চেয়ে ছুটছেন একবার সাফা থেকে মারওয়া পাহাড়ে আবার মারওয়া থেকে সাফা পাহাড়ে। শিশুপুত্রের পানে চেয়ে তিনি দু’পাহাড় অতিক্রম করছেন। কিন্তু দু’পাহাড়ের সংযোগ স্থলটি অতিক্রম করতে হয় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে। সে সময় তাঁর শিশুপুত্রের দিকে তাকানোর আর উপায় নেই। তাই দ্রুত দৌড়ে এ স্থানটুকু অতিক্রম করছেন তিনি। আজও আল্লাহর নির্দেশে হাজীরা সাফা মারওয়ার মাঝে দৌড়ে এ মধ্যবর্তী পথটুকু অতিক্রম করেন। মা হাজেরা সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার অতিক্রম করেও যখন পানির চিহ্নটুকু দেখতে না পেয়ে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে এলেন শিশুপুত্র ইসমাইলের কাছে, তখন এক অলৌকিক দৃশ্য দেখে অতি আনন্দে পুলকিত ও উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। তাঁর শিশুপুত্রের পায়ের আঘাতে মাটির বুক চিরে উথলে আসছে বহু কাক্সিক্ষত, বহু প্রার্থিত পানির ঝর্ণাধারা! তিনি এ পানি আটকাতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, বললেনÑ ‘জমজম’। সুপেয় পানির ঝর্ণাধারা সেই জমজম থেকে আজও পানির অফুরন্ত ফল্গুধারা অব্যাহত আছে।
পবিত্র কা’বাকে ছয়বার প্রদক্ষিণ করা আমাদের শেষ হলো। আর মাত্র এক প্রদক্ষিণ বাকি রয়েছে। এরপরই আমাদের তাওয়াফ শেষ হবে এবং মাকামে ইবরাহীমের পিছনে গিয়ে দু’রাকাত সালাত আদায় করবো। আম্মা আবারও তাঁর আকাক্সক্ষার কথা আমাকে বললেন, ‘বাবা আমি হাজরে আসওয়াদ চুমো দিতে চাই’। এটা যে কতখানি অসম্ভব, অবাস্তব তা আমি খুব ভালো করেই জানি। হজ বা ওমরাহ করতে আসা নারী-পুরুষ মাত্রই তা উপলব্ধি করতে পারেন। তবে আল্লাহর অসীম মেহেরবানিতে আমি ইতোমধ্যেই হাজরে আসওয়াদ চুমো দেয়ার বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেছি। সেই সৌভাগ্যের হাত ধরেই কি আম্মার এই আকুতি? আমি আম্মাকে না বলতে পারলাম না। পারলাম না এ আপাত অসম্ভবের কথা বলে আম্মাকে হতাশায় নিমজ্জিত করতে। আর মাত্র একবার প্রদক্ষিণ করলেই আমাদের তাওয়াফ শেষ হবে। প্রতি মুহূর্তেই মনের মাঝে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে আম্মার আকুতির কথা, অসম্ভব এক আকাক্সক্ষার কথা। আমি আমার অসহায়ত্বের কথা আল্লাহকে বললাম। বললাম দূরদূরান্ত থেকে আসা তাঁর এক বান্দীর অসম্ভব তীব্র এক আকাক্সক্ষার কথা। আমি সম্পূর্ণ অসহায়, নিরুপায়!
গভীর সমুদ্রের মাঝে একটি কেন্দ্রে এসে পানি যেমন ঘুরপাক খেতে খেতে ঘূর্ণি তৈরি করে, তেমনি এ বিশাল জনসমুদ্র যেন কেন্দ্রীভূত হয়েছে হাজরে আসওয়াদকে ঘিরে। কার সাধ্য এ প্রচণ্ড ঘূর্ণির মাঝে মুহূর্তকাল টিকে থাকে? তাওয়াফের শেষ প্রান্তে এসে গেছি। একটু পরই রুকনে ইয়ামানিতে এসে পৌঁছব। এর পরই তো সেই বেহেশতি পাথর হাজরে আসওয়াদ। আদি পিতা হযরত আদম (আ.) বেহেশত থেকে এ পবিত্র পাথরটি নিয়ে এসেছিলেন যে বেহেশতী পাথরে পবিত্র স্পর্শের চিহ্ন রয়েছে হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে প্রিয়নবী শেষ রাসূল মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত। প্রিয়নবী (সা.)-এর প্রিয় সাহাবীবৃন্দ, তাবেঈ, তাবে তাবেঈ, ইমাম, ফকিহ, আউলিয়া কেরাম, বুজুর্গানেদীনসহ বিশ্বের সব প্রান্ত থেকে ছুটে আসা সৌভাগ্যবান, পুণ্যবানদের ওষ্ঠের স্পর্শ অঙ্কিত রয়েছে এ কৃষ্ণ পাথরে। কিন্তু এ কৃষ্ণ পাথরের কি কোনো নিজস্ব শক্তি বা নিজস্ব কোনো ক্ষমতা রয়েছে? না, নিশ্চিতভাবে কিছুই না। হযরত ওমর (রা.) তাই হাজরে আসওয়াদকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন- ‘তুমি একটা কৃষ্ণবর্ণ পাথর ছাড়া আর কিছুই নও। নবী মুহাম্মদকে (সা.) তোমাকে চুমো দিতে দেখেছি। তাই আমিও দিচ্ছি নইলে কিছুতেই চুমো দিতাম না’। নিশ্চিতভাবেই এ পাথরের নিজস্ব কোনো শক্তি নেই, কেবল আল্লাহর হুকুমে কৃষ্ণ পাথরের এ বিশেষ মর্যাদা!
হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়্যত লাভের পূর্বে এ পাথরকে ঘিরেই চরম বিভেদ দেখা গেল গোত্রে গোত্রে। পবিত্র কা’বাঘর মেরামতের পর কে এ পাথর নির্দিষ্ট স্থানে বসাবে তা নিয়ে চরম গোলযোগে দেখা দিলো। অবশেষে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি প্রস্তাব দিলেন, কাল প্রত্যুষে প্রথম যিনি কা’বাঘরে প্রবেশ করবেন তিনিই এর সমাধান দেবেন। সবাই এ সিদ্ধান্ত মেনে নিল। সেই সঙ্গে আপাতত গোলমালও মিটে গেল। এখন প্রতীক্ষার পালা! কে হবেন সেই ব্যক্তি যিনি এমন একটি জটিল সমস্যার সমাধান দিতে পারবেন যা আবার হবে সবার মনঃপূত! প্রত্যুষে প্রথম যিনি কাবা ঘরে এলেন, হ্যাঁ সবাই একবাক্যে বলে উঠলো এ কঠিন সমস্যার সমাধান কেবল তিনিই দিতে পারেন। তিনি সকলের প্রিয় আস্থাভাজন পরম বিশ্বাসী ‘আল-আমীন’ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ্ (সা.)। তিনি এসে একটি চাদর মাটিতে বিছিয়ে দিলেন। হাজরে আসওয়াদকে চাদরের ওপর রাখলেন। সব গোত্রপতিদের বললেন- চাদরের প্রান্ত ধরে নির্দিষ্টস্থানে পাথরটি নিয়ে যেতে। নির্দিষ্টস্থান এলে তিনি নিজ হাতে হাজরে আসওয়াদকে যথাস্থানে রাখলেন। এর মাঝেই নবুয়্যতের পূর্ণতার ইঙ্গিতটি যেন নবুয়্যত লাভের আগেই তিনি পেয়ে গেলেন। আর সব গোত্রই খুশি হলো এ মহান কাজে শরিক হতে পেরে।
তাওয়াফের শেষ প্রান্তে এসে রুকনে ইয়ামানিতে পৌঁছতেই অবিশ্বাস্য এক দৃশ্য দেখে আনন্দে আবেগে উচ্ছ্বসিত ও শিহরিত হয়ে উঠলাম। হাজরে আসওয়াদকে ঘিরে এখন তীব্র জনস্রোত তো দূরের কথা, এটি যেন জনমানব শূন্য কোনো এক বিরান প্রান্তরে একাকী পড়ে আছে। এরকম একটি দৃশ্য এক্ষণে অবিশ্বাস্যই বটে! কি এর কারণ? পবিত্র কা’বাঘরের কোন না কোন প্রান্তে কিছুক্ষণ পরপরই ধোয়া-মোছার কাজ চলতে থাকে। ফিতা দিয়ে একটি এলাকা ঘিরে নিয়ে দ্রুত তা ধুয়ে-মুছে আবার ইবাদতের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। আমাদের শেষ তাওয়াফের সময় এ ধোয়া-মোছার কাজ চলছে হাজরে আসওয়াদকে ঘিরে। যতক্ষণ এ কাজ চলতে থাকে ততক্ষণ এর ভেতর কারও প্রবেশ নিষেধ। ফলে হাজরে আসওয়াদকে ঘিরে যেখানে মৌমাছির চাকের চেয়েও ঘন হয়ে মাথাগুলো গুঞ্জরিত হতে থাকে, তা এখন সাময়িকভাবে পুরোপুরি মুক্ত।
আমি আম্মাকে ফিতার মধ্যে ঠেলে দিয়ে বললাম, আপনি হাজরে আসওয়াদে গিয়ে চুমো দিন। আম্মা কিছুটা দ্বিধান্বিত ও কম্পিতভাবে ফিতা দিয়ে ঘেরা এলাকায় প্রবেশ করে হাজরে আসওয়াদের কাছে পৌঁছালেন। ধোয়া-মোছার কাজে নিয়োজিত খাদেমরা আম্মাকে এখানে যেতে কোনো আপত্তি করলেন না। আম্মা হাজরে আসওয়াদের কাছে গিয়েই থমকে দাঁড়ালেন। যেন এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না, এই সেই হাজরে আসওয়াদ! যা এত কাক্সিক্ষত, এত প্রার্থিত! তীব্র জনস্রোতের প্রচণ্ড চাপে যেখানে সবলদেহী পুরুষও অনেক চেষ্টা সাধনা করে নিষ্ফল হয়ে ঘুরে আসে। সেই ঘূর্ণাবর্তের কাছে কোনো নারীর যাওয়াও দুঃস্বপ্ন বৈকি। সেই হাজরে আসওয়াদের সামনে শুধুমাত্র আম্মা একাকী দাঁড়িয়ে! আমি বললাম, ‘আম্মা আপনি হাজরে আসওয়াদের ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে চুমো দিন’। আম্মা হাত দিয়ে হাজরে আসওয়াদ ওপর থেকে স্পর্শ করে হাতে চুমো দিলেন। আমি বললাম, ‘আপনি মাথা ঢুকিয়ে হাজরে আসওয়াদে চুমো দিন’। এবার আম্মা তাই করলেন, হাজরে আসওয়াদের ভেতর মুখ রেখে বহু কাক্সিক্ষত, বহু প্রার্থিত চুম্বন এঁকে দিলেন এক, দুই, তিন…।
আমি আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করলাম। আমার কৈশরে দেখা একটি স্বপ্ন বাস্তবে এখানে প্রত্যক্ষ করে অভিভূত হলাম। ক্লাস নাইন, টেনে পড়াকালীন সময় জীবন ও জগৎ সম্পর্কে অন্তর্লীন অন্বেষা আমাকে প্রায়শই আলোড়িত করে তুলতো। আমি অতি গভীরে, একান্তে তলিয়ে দেখার চেষ্টা করতাম। আর অন্তরের গভীর থেকে একান্তভাবে কায়মনোবাক্যে শুধুমাত্র আল্লাহকে ডাকতাম। এ সময়েই স্বপ্নে যে দৃশ্যটি দেখেছিলাম আজ তা বাস্তবে প্রত্যক্ষ করে আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতা জানালাম। স্বপ্নে দেখছি কোনো এক সুন্দর সকালে পবিত্র কা’বাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আম্মা হাজরে আসওয়াদে চুমো দিতে ইতস্তত করছেন, আর আমি বলছি ‘আপনি মাথা ভেতরে ঢুকিয়ে চুমো দিন’। আল্লাহ্ তা’আলার কি অপার মহিমা! কি অসাধারণ মেহেরবাণি! হুবহু ঠিক সেই স্বপ্নের দৃশ্য আজ বাস্তবে নিজ চোখে দেখলাম। আমি বিস্মিত, মুগ্ধ, অভিভূত! কীভাবে আল্লাহর শোকর গুজারি করবো? হে আল্লাহ! পরম দয়াময়! রব্বুল আলামিন! তুমি আমাকে শোকর গুজার বান্দা হওয়ার তাওফিক দান কর (আমীন)।
পবিত্র হাজরে আসওয়াদ চুমু দেয়ার মাধ্যমে তাওয়াফ শেষ করে সরাসরি মাকামে ইবরাহীমের ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে আম্মা আর আমি দু’রাকাত সালাত আদায় করলাম। আম্মার প্রার্থিত চুম্বনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আর তওয়াফের শুরুতেই আমার মনের মাঝে হযরত ইবরাহীম (আ.) ও তাঁর পরিবারকে ঘিরে যে দ্ব্যর্থবোধক প্রশ্নের উদয় হয়েছিল সে প্রশ্নের জওয়াব যেন পেয়ে গেছি মাকামে ইবরাহীমের পিছনে সালাতে দাঁড়িয়ে। “মিল্লাতা আবীকুম ইবরাহীম, হুয়া ছাম্মাকুমুল মুসলিমিন”। ‘এটা তোমাদের পিতা ইবরাহীমের মিল্লাত। তিনি তোমাদের নামকরণ করেছেন মুসলিম’। (সূরা আল-হজ : ৭৮)।
মুসলিম মিল্লাতের পিতা হলেন হযরত ইবরাহীম (আ.)। ইবরাহীম (আ.) ও তাঁর পরিবারকে ঘিরেই পবিত্র কা’বা, মাকামে ইবরাহীম, জমজম ও সাফা মারওয়ার সাঈ। এর মাঝেই সব শিক্ষণীয় নিদর্শন রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে। হযরত ইবরাহীম (আ.) ও তাঁর পরিবার আল্লাহর পক্ষ থেকে বার বার চরম পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। আর সে সব পরীক্ষায় অত্যন্ত সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন কেবলমাত্র আল্লাহর ওপর অবিচল দৃঢ় আস্থা রেখে। হযরত ইবরাহীম (আ.), হযরত ইসমাইল (আ.) ও মা হাজেরা ঈমান-ইয়াকিন এবং তাওয়াক্কুলের যে পরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন তার সুস্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে এখানে। তবে কেবল সাদামাটা চোখ দিয়ে এ নিদর্শন দেখা যায় না। এই নিদর্শন প্রত্যক্ষ করতে হবে অন্তরের গভীর থেকে গভীরে, হৃদয়ের চোখ দিয়ে আল্লাহ তায়ালার ঐকান্তিক সাহায্য নিয়ে।
এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা হচ্ছে যখনই একজন মুসলিম আল্লাহর কোনো নির্দেশ জানতে পারবে তখন কোনো ভয়ভীতি, প্রতিবন্ধকতা সে নির্দেশ পালনের পথে কোনোভাবেই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। যে আল্লাহ্ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাঁর হুকুম পালনের নির্দেশ দিয়েছেন, সে আল্লাহ্ই অবশ্যই সদা-সর্বদা সহায় হবেন। যে কোনো বিপদ থেকে, ধ্বংসের হাত থেকে তিনি রক্ষা করবেন- এ দৃঢ় বিশ্বাস প্রতিটি মুহূর্তে মুসলিম মাত্রই থাকতে হবে। এ হুকুম পালনের মাঝেই রয়েছে একজন মুসলিমের ইহকালীন ও পরকালীন সার্বিক কল্যাণ ও হৃদয়ের পরিতৃপ্তি। আর মানবজীবনের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত রয়েছে এখানেই।
লেখক: সাংবাদিক, গবেষক।