বাস্তবজগতের সঙ্গে ভার্চুয়ালজগতের সম্পর্ক
১০ এপ্রিল ২০২৫ ১৩:৩৯
॥ সাইদুর রহমান ॥
বাস্তব জগতের সঙ্গে ভার্চুয়ালজগতের সম্পর্কটা এখন এতটাই ঘনিষ্ঠ যে, একটি অপরটির পরিপূরকে পরিণত হয়েছে।
শহুরে পরিবেশে ভার্চুয়াল বা সাইবারজগৎবিহীন জীবন এখন কল্পনাই করা যায় না। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই বাস্তবজগতের মতো ভার্চুয়ালজগৎও নিষ্কণ্টক নয়। এ জগতেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। ভার্চুয়াল বা সাইবার নিরাপত্তার অর্থ হচ্ছে, এ জগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবকিছুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে ভার্চুয়ালজগৎ এমন এক মহাসমুদ্রের মতো, যেখানে অমূল্য সম্পদের পাশাপাশি রয়েছে মহাবিপদের আশঙ্কা। এ মহাসমুদ্রে যারা প্রবেশ করবেন, তারাই আক্রান্ত হবেন বিষয়টি আবার এরকমও নয়। তবে সবার জন্যই এ আশঙ্কা থেকে যায়।
ভার্চুয়ালজগতে একটি মহাবিপদ হচ্ছে কম্পিউটার ভাইরাস। কম্পিউটারের পরিভাষায় ভাইটাল ইনফরমেশন রিসোর্সেস আন্ডার সিজ-এর সংক্ষিপ্ত রূপ হলো ভাইরাস। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ উৎসগুলো বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। প্রখ্যাত গবেষক ‘ফ্রেড কোহেন’ কম্পিউটার ভাইরাসের নামকরণ করেছেন। কম্পিউটারে ভাইরাস জীবন্ত কোনো কিছু নয়, কিন্তু এটি এমন একটি প্রোগ্রাম, যা কম্পিউটারে জীবন্ত ভাইরাসের মতোই আচরণ করে। চিকিৎসাবিদ্যায় ভাইরাসের কারণে যেমন মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে, ঠিক তেমনি একটি কম্পিউটার সিস্টেমও ভাইরাসের অত্যাচারে অকেজো হয়ে যেতে পারে। কম্পিউটার ভাইরাস মানুষের তৈরি একটি প্রোগ্রাম।
বিভিন্ন রকমের ভাইরাস আছে। একেকটা ভাইরাসের আক্রমণ-কৌশল একেক রকমের। কম্পিউটার ব্যবস্থা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে কিনা, তা বোঝার জন্য কয়েকটি লক্ষণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এগুলো হলো- কম্পিউটার স্লো হয়ে যাওয়া তথা কোনো প্রোগ্রাম লোড বা রান হতে অস্বাভাবিক সময় নেয়া; স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্টোরেজ ডিক্সের ভলিউমের নাম পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া; হার্ডডিক্সে ব্যাড সেক্টর দেখা দেওয়া; ডট ইএক্সই (বীব) ফাইলের আকার পরিবর্তন হওয়া; সিস্টেমের সময় ও তারিখ এর অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটে যেতে পারে; কোনো কারণ ছাড়াই মেমোরি থেকে ফাইল ডিলিট হয়ে যেতে পারে।
এছাড়া সিস্টেমের সেটিং স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তন হতে পারে; ডিসপ্লে রেজুলেশন তথা সেটিং পরিবর্তন হতে পারে; ফোল্ডার অপশন হাইড হয়ে যেতে পারে; ফ্রি মেমোরি স্পেস পরিমাণে কম দেখাতে পারে; হার্ডডিক্সের পার্টিশন নষ্ট হয়ে ডাটা হারিয়ে যেতে পারে; কম্পিউটারের বায়োস (ইওঙঝ)-এর ডেটা মুছে ফেলে কম্পিউটার অচল করে দিতে পারে; হঠাৎ বিভিন্ন অপ্রত্যাশিত ইরর মেসেজ দিতে পারে; প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সফটওয়্যার ইনস্টল হতে সময় নিতে পারে অথবা এ বার্তা দিতে পারে যে, এটি ইনস্টল হবে না; যে কোনো সময় কম্পিউটার হ্যাং হতে পারে অথবা হঠাৎ রিস্টার্ট হতে পারে; ফলে আনসেভ যে কোনো ডকুমেন্ট হারিয়ে যেতে পারে।
এছাড়া বিভিন্ন ধরনের অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ করা যেতে পারে। এসবের কোনো একটি অথবা একাধিক লক্ষণ প্রকাশ পেলে, তখন ধরে নেয়া যেতে পারে কম্পিউটারটি ভাইরাসে আক্রান্ত। কম্পিউটার ভাইরাস মোকাবিলার পথ রয়েছে। কারণ ভাইরাসকে প্রতিরোধ করা ও ধ্বংস করার জন্য প্রতিনিয়ত কাজ চলছে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এ লক্ষ্যে তৎপরতা চালাচ্ছে। তারা তৈরি করছে একের পর এক অ্যান্টি-ভাইরাস। নিজের কম্পিউটার ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখতে অ্যান্টি-ভাইরাস ইনস্টল করা জরুরি। এ ধরনের অ্যান্টি-ভাইরাস কম্পিউটারকে ক্ষতিকারক ভাইরাস থেকে রক্ষা করে। পাশাপাশি অ্যান্টি ভাইরাস প্রোগ্রামকে প্রতিনিয়ত আপডেট করতে হবে। কোনো সফটওয়্যার ইনস্টল করার আগে ভালো করে দেখে নিতে হবে। পাবলিশার কে তা ভালোভাবে দেখে নিতে হবে। যদি তা খারাপ হয় অথবা বিশ্বস্ত না হয়, তাহলে ইনস্টল থেকে বিরত থাকতে হবে। কম্পিউটারের ফায়ারওয়াল অন রাখতে হবে। কোন স্প্যাম ইমেইল অন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। স্প্যাম ইমেইল-এ যদি কোনো ফাইল থাকে কিংবা কিছু ডাউনলোড করতে বলে অথবা নাম-ঠিকানা দিতে বলে, তাহলে তা দেওয়া যাবে না।
আসলে যে কোনো ব্যক্তি চাইলেই কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারেন এবং ইন্টারনেট বা ভার্চুয়ালজগতে প্রবেশ করতে পারেন। কিন্তু এ জগতে নিরাপদ থাকতে প্রত্যেক ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর জন্য কিছু সাধারণ জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ জরুরি। কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, কীভাবে ব্যবহার করলে নিরাপদ থাকা যাবে, অন্যকে নিরাপদ থাকতে কীভাবে উৎসাহিত করা যাবে-সবারই এসব বিষয়ে কৌশল জানা থাকা দরকার। বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দেশগুলোয় যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন তাদের বড় একটা অংশই এখনো প্রযুক্তি সম্পর্কে ততটা জ্ঞান রাখেন না। ফলে বিভিন্ন সময় প্রযুক্তি ব্যবহার করতে গিয়ে ব্যক্তি বিশেষকে সমস্যায় পড়তে হয়। অনেক সময় বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টির কারণে শাস্তির মুখেও পড়তে হচ্ছে। এ অবস্থায় সার্বিক সতর্কতা ও যথোপযুক্ত জ্ঞান জরুরি।
ভার্চুয়ালজগতের একটি আকর্ষণীয় দিক হলো, এখানে বাস্তবিক অর্থে কোনো বিধিনিষেধের তোয়াক্কা করতে হয় না। প্রয়োজনে নিজের পরিচয় গোপন রেখেই সব কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। কোনো প্রতিষ্ঠান বা সরকার নির্দিষ্ট কোনো সীমাবদ্ধতা আরোপ করলেও বিকল্প প্রযুক্তির মাধ্যমে তা এড়িয়ে যাওয়াও সম্ভব হয় এ জগতে। তবে বাস্তবতা হলো, ভার্চুয়ালজগতে একজন ব্যবহারকারী যে স্বাধীনতা ভোগ করেন তা আসলে প্রকৃত কোনো স্বাধীনতা নয়। এর মধ্যদিয়ে একজন ইউজার কেবল মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে স্বস্তি লাভ করতে সক্ষম হন। ইন্টারনেটকেন্দ্রিক এ জগতে সময়ের সীমাবদ্ধতা নেই। রাত-দিনের বিভাজন নেই। সত্যিকার অর্থেই ভার্চুয়ালজগৎ স্থান ও সময়ের প্রচলিত ধারণাকে পাল্টে দিচ্ছে। এ জগতের কল্যাণে বিশ্বের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তের সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হচ্ছে নিমিষেই। এক সময় যা ছিল অকল্পনীয়।
ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরতার কারণে মানুষের আচার-আচরণেও পরিবর্তন আসছে। এ পরিবর্তন কখনো ইতিবাচক কখনো আবার নেতিবাচক। সাধারণ জ্ঞান অর্জন যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি সহজে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পথও খুলে গেছে। যোগাযোগ হয়ে পড়ছে যন্ত্রকেন্দ্রিক। বলা হয়ে থাকে, অনেকেই একসঙ্গে বসবাস করলেও তথ্য আদান-প্রদান করেন যন্ত্রের মাধ্যমে। এর ফলে মাধ্যমবিহীন যোগাযোগ ও সম্পর্ক ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেছনে মানুষ এখন অনেক বেশি সময় ব্যয় করছে। আমরা বলছি না, এসবের প্রয়োজন নেই। কিন্তু এর ব্যবহার হচ্ছে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি। পরিবারের সদস্যরা ইন্টারনেটের পেছনে অনেক বেশি সময় ব্যয় করায় বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে। দূরত্ব বাড়ছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও।
তরুণদের মাঝেই ভার্চুয়াল জগতের প্রতি ঝোঁক-প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। এ কারণে তরুণ সমাজের মধ্যে এক ধরনের আত্মকেন্দ্রিকতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি আসক্ত তরুণরা এখন আর আগের মতো একজায়গায় বসে গল্প-গুজব করতে খুব একটা আগ্রহী নয়। এর ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ও মনের টান কমে যাচ্ছে। অনেকেই ইন্টারনেটে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়ালজগতের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আকর্ষণের পেছনে প্রধানত পাঁচটি কারণ কাজ করে। এক. যৌন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি ঝোকপ্রবণতা; দুই. ইন্টারনেটের মাধ্যমে নতুন নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রবল আগ্রহ; তিন. জুয়াসহ এ ধরনের নেশা সৃষ্টিকারী বিভিন্ন খেলার প্রতি ঝোকপ্রবণতা; চার. নতুন নতুন তথ্য সংগ্রহের মাত্রাতিরিক্ত আগ্রহ এবং সর্বশেষ কম্পিউটার গেইমের নেশা। ইন্টারনেটের প্রতি আসক্ত ব্যক্তিরা সাধারণত সামাজিক তৎপরতা কমিয়ে দেয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজের প্রতি তাদের আগ্রহ হ্রাস পায়। পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইন্টারনেট ব্যবহারে বাধা পেলে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।
ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, ভাইবার, হোয়াটসআপ ও টেলিগ্রামের মতো মাধ্যমগুলোর জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। প্রতিদিনই সেখানে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন ব্যবহারকারী। আসলে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এখন মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের সব দেশেই একই চিত্র লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে পরিবার, সমাজ ও সংস্কৃতিতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব বেশি লক্ষণীয়। এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জাতি তাদের জাতীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচিতি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে। তারা এখন এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজছে।
ইন্টারনেটের ভালো ও মন্দ দুটি দিকই রয়েছে। তবে ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারের কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশু-কিশোররা। অনেক অভিভাবকই ইন্টারনেট সম্পর্কে অজ্ঞ হওয়ায় এ ধরনের নিয়ন্ত্রণহীনতা দিনে দিনে বাড়ছে। শিক্ষার পরিবর্তে কখনো কখনো কুশিক্ষা গ্রহণ করছে। শিশু-কিশোরদের একটি প্রবণতা হলো নিজেকে প্রকাশ করা এবং অন্যকে অনুসরণ করা। আত্মপ্রকাশ ও অনুসরণের প্রবণতা তাদেরকে কৌতূহলপ্রিয় করে তুলে। কৌতূহলের বশে তারা নতুন কিছু জানতে চায়, শিখতে চায়। এ স্বতঃস্ফূর্ত আকাক্সক্ষাকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে হবে। আর তাহলেই ছেলেমেয়েরা ভবিষ্যৎ জীবনে, কর্মক্ষেত্রে এবং সমাজে সফল মানুষ হতে পারবে। এর বিপরীতে শিশু-কিশোর বয়সে তাদের নিয়ন্ত্রণ না করলে এবং পুরোপুরি তার ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিলে তারা নানাবিধ অন্যায়-অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণে অভিভাবকদের সচেতনতা জরুরি। শিশু-কিশোরদের ইন্টারনেটে কী করছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলছে এ বিষয়ে মাতা-পিতা, অভিভাবক ও শিক্ষকদের পক্ষ থেকে খোঁজখবর রাখতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় মা-বাবা, অভিভাবক ও শিক্ষকদের আরও সচেতন হতে হবে। নিজেদের মধ্যে এ ধরনের আসক্তি থাকলে তা ত্যাগ করে সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। শিশুদের গল্প শোনাতে হবে, নানা ধরনের খেলা ও বেড়ানোর মতো নিরাপদ বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হয়- এমন খেলাধুলায় ব্যস্ত রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। সব মিলিয়ে বাবা-মা এবং আত্মীয়-স্বজনের পক্ষ থেকে পরিবারের শিশুদের আরও বেশি সময় দিতে হবে।
সর্বোপরি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিজেদের পরিবেশ-পরিস্থিতির আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে এ জগৎ মানুষের জন্য শান্তি, কল্যাণ ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে। গোটা মানবসমাজকে সুস্থ ও সমৃদ্ধ রাখতে এক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা, শলা-পরামর্শ ও সহযোগিতা জরুরি। যা কিছু কল্যাণকর, তা লালন করে অকল্যাণকর সব কিছু দূরে রাখতে সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে।