নারীর প্রকৃত অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অভাব বিত্তে নয়, চিত্তে
১৩ মার্চ ২০২৫ ১৬:৩৩
॥ এডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নী ॥
“তিনি তোমাদের একই সত্তা হতে সৃষ্টি করেছেন এবং তার জীবন সঙ্গিনীকে একই উপাদান হতে সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আন নিসা : ১)।
“তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক।” (আল্ বাকারা : ১৮৭)।
“উত্তম স্ত্রী সৌভাগ্যের পরিচায়ক।” (মুসলিম)।
বছরের পর বছর দিবসের বেড়াজালে
মুখরোচক নানান প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে,
আনুষ্ঠানিকতার স্লোগানে মাতিয়ে,
স্বাধীন সুখী জীবনের মিথ্যা আশ্বাসে
হে নারী-ছুটছো তুমি কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে!!
নিত্য-নতুন সহিংসতার ঊর্ধ্বমুখী খবরে
আর কতকাল থাকবে তুমি পণ্য হয়ে?
পত্রিকার নৃশংস হেডিং হয়ে,
চাতুর্যে ভরা কথার মারপ্যাঁচে,
কি দাম আছে এমন শাব্দিক ক্ষমতায়নে!!
অত্যাচারীর খোরাক হয়ে
পুরোনো সকল রেকর্ড ভেঙ্গে,
নির্যাতনের মোড়ক উন্মোচনে
গ্রিনিজ বুকে কি নিত্যনতুন নাম উঠাবে?
হে নারী!
তবুও কি তুমি আলোকিত পথের যাত্রী হবে না?
▪ ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস
এ দিবসটি উদযাপনের পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামী ইতিহাস। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মজুরিবৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকরা। সেই মিছিলে চলে সরকারের লেঠেল বাহিনীর দমন-পীড়ন। সেই ঘটনাকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক নারী দিবস (পূর্ব নাম আন্তর্জাতিক কর্মজীবী নারী দিবস) প্রতি বছর মার্চ মাসের ৮ তারিখে পালিত হয়ে আসছে।
বিশ্বব্যাপী নারীরা একটি প্রধান উপলক্ষ্য হিসেবে এ দিবস উদযাপন করে থাকেন। বিশ্বের একেক প্রান্তে নারী দিবস উদযাপনের প্রধান লক্ষ্য ও ধরন একেক প্রকার। কোথাও নারীর প্রতি সাধারণ সম্মান ও শ্রদ্ধা উদযাপনের মুখ্য বিষয় হয়, আবার কোথাও মহিলাদের আর্থিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রাতিষ্ঠানিক বেশি গুরুত্ব পায়।
এ দিবসকে কেন্দ্র করে সারা বিশ্বে নারীরা সমঅধিকার, নারী স্বাধীনতা, ন্যায্য অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার ইত্যাদি দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। নারী ক্ষমতায়নে যে কোনো বাধা, পক্ষপাতিত্ব ভেঙে ফেলো, গুঁড়িয়ে ফেলো- এমন স্লোগানে স্লোগানে এ দিবস পালন করছে।
ইসলাম নারীকে পুরুষের চেয়ে অধিক অধিকার ও মর্যাদায় ভূষিত করেছে
“যে ব্যক্তি মুমিন অবস্থায় সৎকর্ম করবে, সে পুরুষ হোক অথবা নারী হোক সে জান্নাতে প্রবেশ করবে”। (সূরা মুমিন : ৪০)।
ইতিহাস বিশ্লেষণে এ কথা একবাক্যে স্বীকার করতেই হবে, কেবল ইসলামই একমাত্র জীবন ব্যবস্থা, যা পুরুষের পাশাপাশি নারী জাতিকে তাদের ন্যায্য অধিকার, প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদাজনক আসন দিয়েছে। কখনো মা হিসেবে, কখনো স্ত্রী হিসেবে, কখনো মেয়ে হিসেবে, আবার কখনো বোন হিসেবে।
তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইসলাম নারীকে শুধু পুরুষের সমঅধিকার নয়, বরং কোন কোন ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীকে অধিকার ও মর্যাদা দিয়েছে। নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে সম্পত্তির উত্তরাধিকার আইনে ১২ জন ওয়ারিশের মধ্যে ৮ জনই নারী। এভাবে নারীদের জন্য সম্মানজনক দেনমোহর নির্ধারণ বিয়ের অন্যতম শর্ত হিসেবে পুরুষের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় রাসূল (সা.) : রাসূল (সা.) একমাত্র ব্যক্তি, যিনি নারীদের সকল ক্ষেত্রে অধিকার আদায় করে দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। রাসূল (সা.)-এর জীবন অ্যানালাইসিস করে ভিন্ন ধর্মের অনুসারী হয়েও জর্জ বার্নার্ডশ’ বলেছিলেন, একমাত্র হযরত মুহাম্মদই (সা.) নারীদের যথাযথ সম্মান করেছেন। এজন্যই তাকে নারী মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অগ্রদূত বলা হয়। শুধু মুখে বা আইন করে সমাজের বুকে নারীদের সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয় । তাই তিনি ব্যক্তি জীবনে আগে তা নিজে করে দেখিয়ে দিয়েছেন।
নারীদের প্রতি উত্তম আচরণের ব্যাপারে সদাসতর্ক দৃষ্টি ছিল তাঁর। তিনি মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত ঘোষণার সাথে সাথে নারী জাতিকে পুরুষের চেয়ে তিনগুণ বেশি শ্রদ্ধা ও মর্যাদা পাবার অধিকারী বলে ঘোষণা দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! মানুষের মধ্যে আমার সদ্ব্যবহারের সর্বাপেক্ষা অধিকারী ব্যক্তি কে? তিনি বলেন, তোমার মা। সে বলল, এরপর কে? তিনি বলেন, এরপরও তোমার মা। সে বলল, তারপর কে? তিনি বলেন, তার পরও তোমার মা। সে বলল, এরপর কে? তিনি বলেন, এরপর তোমার পিতা। (মুসলিম)।
সুবহানাল্লাহ! এতে করে স্পষ্ট হয়ে যায়, ইসলাম সর্বোচ্চ নারীকে সম্মান দেয় বলেই আল্লাহর রাসূল (সা.) তাদের সম্মানের ব্যাপারে এতটা গুরুত্বারোপ করেছেন। অর্থাৎ ১ম, ২য় এবং ৩য় পুরস্কারটিও মায়ের জন্য নির্ধারিত করেছেন, আর বাবার জন্য রেখেছেন সান্ত্বনা পুরস্কার।
ইসলাম মেয়ে এবং বোনের সাথেও সদাচরণ ও মর্যাদাজনক আচরণ করার তাগিদ দিয়েছে। আবু সাঈদ আল-খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যারই তিনটি মেয়ে অথবা তিনটি বোন আছে, সে তাদের সঙ্গে স্নেহপূর্ণ ব্যবহার করলে জান্নাতে যাবে।’ (তিরমিযী)।
রাসূল (সা.) ব্যক্তি জীবনে স্ত্রীকে বিচারকের আসনে বসিয়ে বিচারের মানদণ্ড তার হাতে দিয়ে মর্যাদাজনক ঘোষণা দিয়েছেন। বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম। আর নিশ্চয়ই আমি আমার স্ত্রীর কাছে সর্বাপেক্ষা বেশি উত্তম ।’ (তিরমিযী)।
নারী মর্যাদার এমন কালজয়ী ঘোষণা পৃথিবীর কোনো ব্যক্তি কখনো দিতে পারেনি, ভবিষ্যতেও দিতে পারবে না।
ইসলাম নারীকে যে উচ্চাসনে বসিয়েছে, তা দুনিয়ার আর কোনো ধর্ম ও সমাজে নেই:
পারিবারিক জীবনে সংসার পরিচালনার ক্ষেত্রে আর্থিক ক্ষেত্রে নারীর ওপর পুরুষের প্রাধান্য থাকলেও সার্বিক মূল্যায়নে ইসলাম নারী জাতিকে যে সম্মান-মর্যাদার উচ্চাসনে বসিয়েছে, তা দুনিয়ার আর কোনো ধর্ম ও সমাজে খুঁজে পাওয়া যাবে না। অন্যান্য ধর্মে তো পিতার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে কন্যা সন্তানের কোনো অধিকারই স্বীকৃত নয়। সম্প্রতি মৃত বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তির (স্থাবর-অস্থাবর) উত্তরাধিকার সম্পদ থেকে হিন্দুধর্মাবলম্বী নারী বা কন্যাকে বঞ্চিত করার বিধান কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল দিয়েছে হাইকোর্ট।
সমাজ জীবনে ইসলাম প্রদত্ত নারী অধিকার নীতি বাস্তবায়নে গড়িমসি : অত্যন্ত দুঃখ আর বেদনার সঙ্গে বলতে হয়, এখন অধিকাংশ মুসলিম পরিবার, সমাজ, দেশ, জাতি ও রাষ্ট্রে নারীর ব্যাপারে ইসলাম প্রদত্ত নারী অধিকার নীতির যথাযথ প্রতিফলন তেমন একটা দেখা যায় না। যার কারণে ইসলামের সুমহান সৌন্দর্য ও সুফল থেকে নারী বছরের পর বছর বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে। পরিবারে মা হিসেবে, স্ত্রী হিসেবে, বোন ও কন্যা হিসেবে মর্যাদাজনক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের পরিবারে ডিপেন্ডেন্ট করে রাখা হয়েছে। পরিবার পরিচালনায় তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে মূলযায়ন করা হয় না, তাদের নির্ভরশীল করে রেখে করুণার দৃষ্টিতে দেখা হয়।
বিশেষ করে নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্য ইসলাম যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার দিয়েছে সেটা থেকে আজ ম্যাক্সিমাম নারীদের বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। তাদের প্রাপ্য মর্যাদা ও প্রাপ্য অধিকার যথাযথভাবে বুঝিয়ে না দেয়া একটা ট্রেডিশনে পরিণত হয়েছে।
অথচ এ মূল সমস্যার দিকে না গিয়ে আমাদের সমাজের কিছু নারীবাদীরা অজ্ঞতা ও বিদ্বেষপ্রসূত কুরআন ও সুন্নাহ বিরোধিতায় মাঠে থাকেন। অবাস্তব আবদার নিয়ে মাঠ গরম করে রাখেন। আর কিছু অবিবেচক নারী-পুরষ জেনে না জেনে, বুঝে না বুঝে ‘কান নিয়েছে চিলে’ বলে তাদের পিছু ছুটছে। আসলে এদের সত্যিকার টার্গেট নারী অধীকার প্রতিষ্ঠা নয়, নারীদের পণ্য বানিয়ে সকল কাজের মূলে ইসলাম বিরোধিতাই মুখ্য।
আমাদের দায়িত্বহীনতাই এ অবস্থার জন্য দায়ী
এটা বলতে দ্বিধা নেই যে, আমাদের দায়িত্বহীনতা ও সংকীর্ণ মানসিকতাই তাদের এ ধরনের প্রচারণার আগুনে ঘি ঢালছে। আমরা যদি ইসলাম প্রদত্ত নারীর মৌলিক অধিকারগুলো সঠিকভাবে আদায় করতাম, (যেমন- পিতা-মাতার কাছে পরিবারে কন্যা হিসেবে প্রায়োরিটি, স্ত্রী হিসেবে স্বামী প্রদত্ত দেনমোহর, লিভিং স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী স্বামীর পক্ষ থেকে নিয়মিত হাত খরচ, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত নারীর অংশ এবং স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর প্রাপ্ত অংশ, সন্তানদের কাছ থেকে মায়ের হক ইত্যাদি) তাহলে ম্যাক্সিমাম নারীরা সম্পদশালী হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো। মুসলিম নারীরা অন্যদের কাছে রোলমডেল হতে পারতো। বাস্তবতার নিরিখে মনে হয়- এ বিষয়ে কোনো সার্ভে পরিচালিত হলে দেখা যাবে আমাদের মুসলিম কমিউনিটিতে ৯০% থেকে ৯৫% নারীরাই কোনো না কোনো ক্ষেত্রে এসব ন্যায্য অধিকার ও হক থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে।
অথচ এসব অধিকার আদায় করার জন্য নারী সংগঠনগুলোরও যেমন কোনো পদক্ষেপ, আন্দোলন বা সংগ্রাম চোখে পড়ে না, তেমনি আমাদের মুসলিম কমিউনিটির মাঝেও গঠনমূলক ও ইফেক্টিভ কর্মতৎপরতা চোখে পড়ে না। সামাজিক নেতৃত্বে যারা আছেন, তাদের সক্রিয় তৎপরতা ও মসজিদে, মসজিদে জুমার খুতবায় এ প্রসঙ্গটি বেশি বেশি উঠে আসা উচিত। ইসলাম প্রদত্ত নারী সকল অধিকার থাকার পরও যেন আমরা নারীকে অবলা/অসহায় বানিয়ে রাখতেই যেন বেশি পছন্দ করি। যদিও ইদানীং ইসলামী স্কলাররা এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণী
আরেকটি বিষয়Ñ আমরা যারা অতিমাত্রায় নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। তারা পরিবারে স্বামীর কর্তৃত্ব মেনে নিতে কষ্ট হলেও অফিস আদালতে অনায়াসে-অবলীলায় বসের কর্তৃত্ব ও আনুগত্য মেনে নিচ্ছি। সেখানে কোনো প্রশ্ন তুলছি না বা বিব্রত হচ্ছি না। অনেক ক্ষেত্রে, অনেক অন্যায়-অযৌক্তিক দাবি ও আবদারও মেনে নিচ্ছি।
এটা কী ধরনের সংকীর্ণতা। সেটা যদি নারীর ব্যক্তিত্বে আঘাত না লাগে, তাহলে পরিবার নামক সংগঠনের যিনি বস তার আনুগত্যে আমাদের এত অনীহা কেন?
নারীর অবমূল্যায়নে অনেকটা নারীরাও দায়ী
অনেক সময় নারীর প্রতি অসম্মানের কারণ বিশ্লেষণে মনে হয়, সত্যিকার অর্থে আমরা নারীরা যদি সঠিক ব্যক্তিত্ব নিয়ে কথাবার্তা, চাল-চলন, আচার-আচরণ, পোশাক-আশাকে শালীনতা বজায় রেখে যে যার অবস্থানে দক্ষতা-যোগ্যতা ও প্রতিভার স্ফুরণ ঘটাতে পারি, তাহলে ব্যক্তিত্বের এ দ্যুতি দেখে সবাই সম্মান করতে বাধ্য হবে। সেক্ষেত্রে নারীদের নিজেদের আত্মগঠনে ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব গঠনে এগিয়ে আসতে হবে। সেই সাথে নারীরা যেন নারী নির্যাতনের কারণ না হই, সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি দিতে হবে।
সমাজের এ চিত্র আমাদের নারী জাতিকেই লজ্জিত ও অপমানিত করছে যে, আমাদের কারণে পরিবারে শাশুড়ির হাতে পুত্রবধূ, পুত্রবধূর হাতে শাশুড়ি, ননদের হাতে ভাবী, ভাবীর দ্বারা ননদ বঞ্চিত ও নির্যাতিত হচ্ছে, আমাদের নারীদের দ্বারা বাড়ির গৃহকর্মী অথবা অফিসের কোনো নারী কর্মী নিপীড়িত হচ্ছে, যা গোটা নারী সমাজকে বিব্রত করে।
স্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিবার ও সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত : নারী পুরুষের সম্মিলিত ও সঠিক দায়িত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ ভারসাম্যমূলক সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘গোটা সমাজ দেহ পাখির ন্যায়, আর নারী ও পুরুষ হচ্ছে পাখির দুটি পাখাসম।’ ভারসাম্যমূলক সমাজ গঠনে এমন অপূর্ব উদাহরণ আর হতে পারে না।
মহান রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে প্রদত্ত বিধান- নারীর ওপর পুরুষের অভিভাবকত্ব ও কর্তৃত্বের দায়িত্ব একটি স্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিবার ও সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত। চার চাকার একটি গাড়িতে সামনে থাকে দুটি চাকা, পেছনে থাকে দুটি। গাড়ি সচল রাখতে হলে চারটি চাকারই সমান গুরুত্বই রয়েছে। শুধু গঠনগত কারণে কোনটিকে পেছনে এবং কোনটিকে সামনে থাকতে হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে সাধারণত নারী সৈনিকদের ডিফেন্সে এ রাখা হয় না, তেমনি পরিবার ও সমাজ নামের জীবনযুদ্ধে নারীদের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থেই পুরুষকে ডিফেন্সে রেখে অধিক দায়িত্ব, কর্তৃত্ব ও অভিভাবকত্ব প্রদান করা হয়েছে। দেয়া হয়েছে অনেক বেশি গুরু দায়িত্ব। আশা করি, এ সহজ বিষয়টি বুঝতে কারো সমস্যা হবার কথা নয়।
নারীর যথাযথ অধিকার প্রদানে বিত্তের চেয়ে চিত্তের অভাব
নারী যখন স্ত্রী, তখনো তাদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ নারীদের তাঁর বিশেষ নিদর্শন বলে আখ্যা দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে- ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে আছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলি রয়েছে সে সম্প্রদায়ের জন্য, যারা চিন্তা করে।’ (সূরা : রুম : ২১)।
নারীর ন্যায্য অধিকার প্রদানে প্রতিটি পুরুষকে আন্তরিকতা, সদিচ্ছা ও সচ্ছতার সাথে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে তাদের পরিবারে মা, স্ত্রী, কন্যা, বোন এদের সবার শরিয়ত নির্ধারিত হক আদায় করে সকলের কাছে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। এটা তাদেরই দায়িত্ব। এক্ষেত্রে পুরুষ সমাজের বিত্তের চেয়ে চিত্তের অভাব বড্ড বেশি অনুভব করছি। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) যৌথভাবে পরিচালিত এক জরিপ নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪-এ পরিবারে নারীর ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের এক করুণ চিত্র উঠে এসেছে।
‘দেশের ৭০ ভাগ নারী তাঁদের জীবদ্দশায় অন্তত একবার হলেও শারীরিক, যৌন, মানসিক ও অর্থনৈতিক সহিংসতার শিকার হন। গত বছর (২০২৪) ৪৯ শতাংশ নারীর ওপর এ ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পরিবারের অন্য সদস্যদের তুলনায় স্বামীর মাধ্যমে বেশি নির্যাতনের শিকার হন নারীরা।’ মুসলিম দেশ হিসেবে নারী সমাজের এমন একটি চিত্র সত্যিই দুঃখজনক।
নারী জাতির প্রতি সম্মানের এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস
ইসলামের ইতিহাসে একজন নারীর সম্ভ্রম রক্ষায় বনু কাইনুকা গোত্রের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল নারী অনাত্মীয় হলেও তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য। তার নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন থাকা সবার দায়িত্ব। ইসলামের ইতিহাসে নারীর সম্ভ্রম রক্ষায় বনু কাইনুকা গোত্রের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। এক সাহাবী তার মুসলিম বোনের সম্ভ্রম রক্ষায় জীবন দিয়ে দিয়েছেন।
আবু আওন থেকে ইবনে হিশাম বর্ণনা করেছেন, একদিন জনৈকা মুসলিম নারী বনু কাইনুকা গোত্রের বাজারে দুধ বিক্রি করে বিশেষ কোনো প্রয়োজনে এক ইহুদি স্বর্ণকারের কাছে গিয়ে বসে পড়েন। কয়েকজন দুর্বৃত্ত ইহুদি তাঁর মুখের নেকাব খোলানোর অপচেষ্টা করে, তাতে ওই নারী অস্বীকৃতি জানান। ওই স্বর্ণকার গোপনে মুসলিম নারীটির (অগোচরে) পরিহিত বস্ত্রের এক প্রান্ত তার পিঠের ওপরে গিঁট দিয়ে দেয়, তিনি তা বুঝতেই পারলেন না। ফলে তিনি উঠতে গিয়ে বিবস্ত্র হয়ে পড়েন। এ ভদ্র মহিলাকে বিবস্ত্র অবস্থায় প্রত্যক্ষ করে নরপিশাচের দল হো হো করে হাততালি দিতে থাকল। মহিলাটি ক্ষোভে ও লজ্জায় মৃতপ্রায় হয়ে আর্তনাদ করতে লাগলেন। তা শুনে জনৈক (প্রতিবাদী) মুসলিম ওই স্বর্ণকারকে আক্রমণ করে হত্যা করেন। প্রত্যুত্তরে ইহুদিরা মুসলিম লোকটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁকে হত্যা করে। এরপর নিহত মুসলিমটির পরিবারবর্গ চিৎকার করে ইহুদিদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের কাছে ফরিয়াদ করেন। এর ফলে মুসলিম ও বনু কাইনুকার ইহুদিদের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাত বাধে। প্রায় ১৫ দিন সে গোত্রের দুর্গ অবরোধ করে রাখার পর তাদের সবাইকে বন্দি করা হয়। (ইবনে হিশাম : ২/৪৭, আর রাহিকুল মাখতুম [বাংলা] : ২৪০/২৪২)।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে অনুধাবন করা যায় যে ইসলাম নারীদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার প্রতি কতটা গুরুত্ব দিয়েছে।
নারী দিবসে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে পারি-
‘নারী-পুরুষে আর নয় কোনো বিরোধ।
যথার্থ হক আদায় করে-
পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, ত্যাগ-সেক্রিফাইসেই ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ উন্নয়ন সম্ভব’।
লেখক : নির্বাহী পরিচালক, মাসুক (মানবাধিকার ও আইনি সুরক্ষা কেন্দ্র)।