রমাদান : কুরআন জানার মহাসুযোগ


৬ মার্চ ২০২৫ ১৩:১৪

॥ মাহবুবুল হক ॥
দেখতে দেখতে রমাদান তো এসেই গেল। খাদ্যদ্রব্য ও জিনিসপত্রের দাম এখন এত বেশি যে, রমাদানের কথা মনে হতেই আগে ঈদের কথা এসে যায়। রমাদান থেকে ঈদের ভাবনাই যেন আমাদের বেশি। দাম বাড়ুক, কমুক, সেটা তো বাবা-মাদের বিষয়। তোমার-আমার বিষয় হলো রমাদানকে ভালো করে জানা। রমাদানের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য খুব ভালো করে খেয়াল করা এবং সে অনুযায়ী এ পবিত্র মাসকে উপভোগ করা।
রমাদান তো আসে রমজান মাসের ২ মাস পূর্বে। রজব ও শাবান তারপর রমাদান। রজব ও শাবান মাসের কথা আমরা তো আগেই আলাপ-আলোচনা করেছি। অর্থাৎ প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি কাজ আমাদের শেষ হয়ে গেছে। এখন আমরা একেবারে মূল কাজে প্রবেশ করেছি। আমরা আকাশে নতুন চাঁদ দেখে রমাদান মাসে প্রবেশ করি। আবার আকাশে নতুন চাঁদ দেখে ঈদে প্রবেশ করি। ঈদের দিন কিন্তু রমাদানের দিন নয়। ওটা শাওয়াল মাসের প্রথম দিন। মূল আনন্দটা হয় আসলে শাওয়াল মাসে। তার মানে এ নয়, রমাদান মাসে আনন্দ নেই। খুশি নেই। রোমাঞ্চ নেই। রমাদান মাসে নেই বলে কিছু নেই। একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবে এ মাসে সবকিছু আছে। তোমাকেই যদি জিজ্ঞেস করি বল তো, এ মাসের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে কল্যাণকর এবং সবচেয়ে মঙ্গলময় কোন জিনিসটি আমরা পেয়েছি। আমরা জানি, প্রশ্ন শেষ হবার আগেই তুমি আনন্দের সাথে বলে উঠবে- ‘কুরআন’। এর আবার অনেক নাম আছে। আল কুরআন, কুরআন মাজিদ, কিতাবুল্লাহ আরো অনেক। বড় হলে সেসব আমরা জানতে পারব। সাধারণভাবে আমরা জানি, এটা মহান আল্লাহর উপহার দেয়া ‘বই’, যেখানে আমাদের জন্য সব কথা আছে। সব জ্ঞানের কথা আছে। সব শিক্ষার কথা আছে। জানার সব কথা আছে। এ বই থেকে আগে সবকিছু জানতে হবে। তারপর অন্য কিছু জানার আছে। মানুষের জন্য মূল ‘বই’ এটা। এটা না পড়লে, না জানলে, না বুঝলে দুনিয়ার কোনো কিছু সঠিকভাবে বোঝা হয় না। যারা এ ‘বই’ না পড়ে, দুনিয়ার সব ‘বই’ পড়ে, তাদের কথা মনে হলে সত্যি খুব কষ্ট হয়। দুঃখ লাগে। আহা! ওরা না বোকার হদ্দ! মূল বিষয়টি না পড়ে অর্থাৎ আসল জিনিসটা না শিখে সব নকল জিনিস শিখে ফেলে। সে কারণে তারা নকলের মধ্যেই জীবনযাপন করে। আর ঠিক এ কারণেই ওরা জীবনকে হারায়, জীবনের আনন্দকে হারায়। জীবনের সুখ-শান্তিকে হারায়। হারায় জীবনের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা। কলুর বলদের মতো তাদের চোখের ওপর পট্টি বাঁধা থাকে। আসল সত্য তারা দেখতে পায় না। সত্যের সৌন্দর্য তারা অনুভব করতে পারে না। সত্যের আলো তারা অনুমান করতে পারে না। তারা শুধু ঘুরতে থাকে। ঘানির গরু বা বলদ যেমন- কেন ঘোরে, তা বোঝে না। কী কারণে ঘোরে, তা-ও বুঝতে পারে না। কুরআন না পড়া মানুষের অবস্থাও তাই। হোক না সে আমার বাবা-মা অথবা আমার দাদা-দাদি, নানা-নানি। যারা নিজেরা ঠকে, তাদের প্রজন্মকেও ঠকায়- এই দেখ কত কথা বলে ফেললাম। বিরক্ত হওনি তো?
এটাও তোমরা ভালো করে জান যে, কুরআন শুধু মুখস্থ করলে হয় না। আরবি ভাষায় শুধু পড়ে গেলে হয় না। নানা সুরে, নানা ভঙ্গিমায় পড়ে গেলেও হয় না। একে ভালোভাবে জানতে হয়, বুঝতে হয়, উপলব্ধি করতে হয় এবং সে অনুযায়ী নিজের পরিবার, সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্রকে তথা নিজের পৃথিবীকে সুন্দর করে সাজাতে হয়।
অথচ দেখ তোমরা এসব জানলেও অন্যরা কিন্তু তোমাদের মতো এত ভালো করে জানে না। তারা শুধু জানে, রমাদান মাসে কুরআন খতম দিতে হয়। এর অর্থ তো তোমরা জানই। কারণ ছোটকাল থেকে দেখেছ তোমাদের দাদা-দাদি, নানা-নানি, মা-বাবা, চাচা-চাচি, মামা-মামি, খালা-খালু, ফুপা-ফুপু রমাদান মাসে কেউ সকালে, কেউ দুপুরে, কেউ বিকেলে, কেউ রাতে দুলে দুলে আরবি ভাষায় কুরআন পড়ে। পড়ে পড়ে কেউ কেউ কাঁদে, কেউ কেউ চোখ মোছে, কেউ কেউ সেজদা দেয়। কেন কুরআন- ‘পড়’ এ কথা জিজ্ঞেস করলে বলে, রমাদান মাসে যতবার পারা যায় ততবার কুরআন খতম দিতে হয়। এর মাঝে কী কথা আছে, কী বাণী আছে, তারা তা বলতে পারে না।
আগে না এসব নিয়ে তেমন কৌতূহল ছিল না। সব ধর্মের লোকেরাই না বুঝে কিছু পড়ে। এসব দেখে মুসলিমরাও ওতেই কিছু পুণ্য হয় বলে মনে করে আসছে। এটা তারা বিশ্বাস করে এসেছে। আমাদের পূর্বপুরুষরা একইভাবে বিশ্বাস করত, রমাদানে শুধু কুরআন খতম করলে অনেক সওয়াব হয়। এসব মনে করা বা বিশ্বাস করা মিথ্যা নয়, একেবারে ভুল নয়। এ সওয়াবের অর্থ হলো পুণ্য। পুণ্য অর্থ পুরস্কার। আরো সহজ করে বলা যায়, ভালো কিছু পাওয়া। কার কাছ থেকে পাওয়া? অবশ্যই সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর কাছ থেকে। একমাত্র রবের কাছ থেকে পাওয়া? অবশ্যই সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর কাছ থেকে। মালিক কে? তোমরা তো জানই একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালা। যার কাছ থেকে আমরা এ পৃথিবীতে এসেছি। আমরা মালিকের ভৃত্য বা দাস। এ কুরআনেই তিনি আমাদের ইহ ও পরকালের জন্য সব আদেশ ও নির্দেশ দিয়েছেন। বিস্তৃতভাবে বলেছেন, কী কী কাজ আমাদের করতে হবে এবং কী কী কাজ আমাদের করতে হবে না। তিনি যেমন আদেশ দিয়েছেন, তেমনি আবার নিষেধের তালিকাও দিয়েছেন। সেসব যদি আমরা জানার চেষ্টা না করি তাহলে তো কুরআন জানা হলো না। সুতরাং সওয়াবের জন্য পড়লে হবে না। জানতে হবে।
রমাদান মাসে আমাদের প্রথম ও প্রধান কাজ হলো কুরআনকে খুঁটে খুঁটে পড়া, জেনে-বুঝে পড়া, শুধু পড়ার জন্য পড়া নয়। পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য আমরা যেভাবে অধ্যয়ন করি, সেভাবে পড়া। রাত জেগে পড়া, ভোরে উঠে পড়া, দুপুরের শান্ত পরিবেশে পড়া; পরীক্ষার জন্য কতভাবেই না আমরা পড়াশোনা করি। সেভাবেই রমাদান মাসে কুরআনকে আমাদের পড়তে হবে। জানতে হবে। বুঝতে হবে এবং বোঝাতে হবে। বোঝানোর শুরুটা করতে হবে পরিবার থেকে সমাজে, সমাজ থেকে রাষ্ট্রে, রাষ্ট্র থেকে দুনিয়াকে। মানবজাতির জন্য এটাই একমাত্র বড় কাজ।
এর বাইরে রমাদানে আরো কিছু পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক কাজ আছে, সেটা তোমাদের সাথে আরেক দিন বসে আলাপ করব। আল্লাহ হাফেজ।