কলমের শক্তি
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৫:৪২
॥ সাকী মাহবুব ॥
লেখালেখি একটা সৃজনশীল কাজ। একটা চমৎকার আর্ট এবং নান্দনিক শিল্প। আদর্শ প্রচারের কার্যকর হাতিয়ার। লেখা অন্যদের কাছে আপনার বার্তা পৌঁছানোর মাধ্যম। লেখা অন্যদের কাছে আপনার উপদেশ, আপনার আহ্বান, আপনার মনের আকুতি অবিকল পৌঁছে দেয়। আপনার মৌখিক উপদেশ, পরামর্শ কজন মনে রাখে? কিন্তু লেখার ব্যাপারটাই ভিন্ন। যে কেউ যেকোনো সময় তা পড়ে নিতে পারে। আপনার লেখার কোনো তত্ত্ব, কোনো তথ্য, কোনো সুখপাঠ্য বাক্য যে কেউ যেকোনো সময় দেখে নিতে পারে।
আপনার যদি কোনো মিশন থাকে, আপনি যদি সমাজ সংস্কার করতে চান, সমাজ বদলাতে চান, আপনি যদি আপনার আদর্শের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে চান, তবে লেখালেখি করুন। আপনি যদি মানুষকে আপনার পক্ষে আনতে চান, কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে চান, যদি কোনো জালিমের বিরুদ্বে ঐক্যবদ্ধ করতে চান, তবে লেখালেখি করুন। আপনার মহৎ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য লেখার দারুণ কার্যকর শক্তি। লেখা দাওয়াত দানের মোক্ষম হাতিয়ার। লেখা সত্য ও উত্তম আদর্শের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার অসীম শক্তিধর মাধ্যম। লেখা অন্যায়, অবিচার, অশ্লীলতা, অনাচার, বেহায়াপনা, নোংরামি, পাপ পঙকিলতা, যাবতীয় মন্দ কাজের বিরুদ্ধে মানুষের মনে ঘৃণা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করার শানিত হাতিয়ার। জুলুম, দুঃশাসন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টির বলিষ্ঠ উপায়। লেখা আদর্শ জীবন গঠন ও সুন্দর সমাজ গড়ার বলিষ্ঠ হাতিয়ার। লেখা জাতি, সম্প্রদায়; এমনকি বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার কার্যকর শক্তি। লেখার মধ্যে অন্তর আসক্ত করার সম্মোহনী শক্তি বিদ্যমান। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ভাষাভাষী জনসাধারণকে প্রভাবিত করা যায়। ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লবে লেখনীর বিশাল ভূমিকার কথা সবারই জানা। কমিউনিজমকে বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে কমিউনিস্ট কবি-সাহিত্যিকদের লেখনীর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। আধুনিককালে ইউরোপীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে সিংহভাগ অবদান লেখনীর। তেমনি ইসলামের ইতিহাসে দীনের পয়গাম প্রচার-প্রসারে লেখনীর ভূমিকাকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশদের বিতাড়নে এবং তাদের ভিত নড়বড়ে করে দেওয়ার পেছনে লেখনীর বিশেষ ভূমিকা ছিল। বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ব্রিটিশদের অবস্থান দুর্বল করে দেওয়া লেখনীর অবদান। রাজনীতিবিদগণ সরাসরি ময়দানে অবস্থান নিয়েছিল আর বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে মূল ভূমিকা পালন করেছিল লেখনী। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ শুরু হওয়ার পূর্ব থেকেই লেখনীর প্রয়াস শুরু হয়েছিল। এর সূচনা করেন শাহ ওয়ালী উল্লাহ, সাইয়েদ আহমদ শহীদ ও ইসমাইল শহীদ (রহ.) প্রমুখ। তাদের অগ্নিঝরা বক্তব্য, সম্মোহনী লেখনী বিশেষ প্রভাব ফেলছিল এ উপমহাদেশের মুসলমানদের ওপর। জ্ঞান ও সাহিত্যের ময়দানে আজও সেই গুঞ্জন ভেসে আসে। তারা বিপর্যস্ত মুসলিম মিল্লাতকে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তি জুগিয়েছিলেন। এ আন্দোলনে শীর্ষস্থানীয় সহযোদ্ধা এবং তাদের রচিত লেখনী অসাধারণ শক্তির কথা আজও লোকদের অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে আছে। ইসলামী চিন্তা-চেতনার ধারক-বাহক আল্লামা ইকবাল, আত্মমর্যাদাবোধে বলীয়ান কবিদের মধ্যে যফর আলী খান, আলতাফ হোসেন হালী, আকবর ইলাহবাদী, আল্লামা শিবলী নোমানী প্রমুখের কবিতার ঝংকার ও ছন্দের জাদু ইসলামী চেতনাকে নতুন করে উজ্জীবিত করেছিল। ব্রিটিশবিরোধী যোদ্ধা কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর, হাসরত মোহানী, আবুল কালাম আজাদ বিশেষভাবে স্মরণীয়। লেখনীতে যাদের দক্ষতা আছে, তারা লেখনীর অস্ত্র প্রয়োগ করে সংবর্ধিত ব্যক্তিকে খুব সহজেই নিজের প্রতি আকৃষ্ট করতে পারেন। লেখনীর মধ্যে রয়েছে জাদুকরী শক্তি। আপনি দেখেননি ইমাম গাজ্জালী, ইবনে তাইমিয়া, ইবনুল কাইয়িম, ইবনে হাজম, শাহ ওয়ালীউল্লাহ, সাইয়েদ কুতুব, হাসান আল বান্না, আল্লামা ইকবাল, মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি, কাজী নজরুল ইসলামের লেখা মানুষকে, সমাজকে কী চমৎকার পরিবর্তন করে দিয়েছে। এরা মরেও চির অমর। জীবন্ত পথপ্রদর্শক। তাই আসুন, আমরাও এদের পথ ধরি। হাতে কলম তুলে নিই। লেখালেখি করি।
লেখক : সহকারী শিক্ষক, নাদির হোসেন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়।