ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার স্বপ্নদ্রষ্টা

ড. সৈয়দ আলী আশরাফ


২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৫:৫৩

॥ মুহাম্মদ ইসমাঈল ॥
কিছু কিছু মানুষ আছে, যারা দুনিয়ায় আসার কারণে দুনিয়া আলোকিত হয়।
তাদের আচার-আচরণ, কর্মজীবন, ব্যক্তি জীবন সবই আমাদের অনুকরণীয়। এ ধরনের মানুষের দুনিয়ার প্রতি কোনো লোভ নেই। চাওয়া-পাওয়া নেই। তাদের একটাই চিন্তা, আমার দেশের মানুষ কীভাবে ভালো থাকবে।
শুধু দুনিয়ার পেছনে ঘুরলেই চলবে না। পরকাল বলে আরেকটি জগৎ আছে। সে জগতের দিকে নিয়ে যাওয়াই ছিল ড. সৈয়দ আলী আশরাফের একান্ত চিন্তা। সারা জীবন দেশে-বিদেশে ইসলামকে প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন।
এবার আনা যাক তার কিছু কথা-
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাবিদ, কবি, সমালোচক, সুফি, সংগঠক, মানবসেবী ও ইংরেজি সাহিত্যের খ্যাতিমান অধ্যাপক ড. সৈয়দ আলী আশরাফ ১৯২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলাধীন আগলা গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম সৈয়দ আবু নছর আলী আশরাফ। তবে আলী আশরাফ নামেই পরিচিতি লাভ করেন। তার পিতার নাম সৈয়দ আলী হামেদ ও মাতার নাম সৈয়দা কামরুন্নিগার খাতুন। তার পৈতৃক নিবাস মাগুরা জেলার সদর উপজেলাধীন আলোকদিয়া গ্রামে। ঢাকা মিরপুরের মাজারে শায়িত বিখ্যাত সুফি সাধক ও ইসলাম প্রচারক হযরত সৈয়দ শাহ আলী বাগদাদী (র.) তার পূর্বপুরুষ। তার পূর্বপুরুষ সৈয়দ শাহ আলী বাগদাদী বংশানুক্রমে রাসূল (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.)-এর ১৯তম পুরুষ। তিনি সুদূর বাগদাদ থেকে সুফি সাধনা প্রসার ও ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে ৪০ জন সঙ্গী নিয়ে ১৪৪৩ সালে ভারতের দিল্লিতে আসেন। সৈয়দ শাহ আলী বাগদাদী (র.) স্ত্রী ও পুত্র সৈয়দ শাহ ওসমানকে নিয়ে ১৪৫১ সালে ফরিদপুরের গারেদায় চলে আসেন। এখানে আসার পর তিনি দ্বিতীয় বিবাহ করেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরেও সন্তানাদি লাভ করেন। সৈয়দ শাহ ওসমানের পুত্র ছিলেন সৈয়দ শাহ আঃ কাদির, তাঁর পুত্র সৈয়দ শাহ আ. রশিদ, তার পুত্র সৈয়দ শাহ মুহাম্মদ যাকের, তার পুত্র সৈয়দ শাহ মুহাম্মদ হাফিজ। এই সৈয়দ শাহ মুহাম্মদ হাফিজ গারেদা থেকে মাগুরা জেলার সদর উপজেলাধীন আলোকদিয়া গ্রামে এসে বসবাস করেন। কবি সৈয়দ আলী আহসান, প্রখ্যাত হোমিওপ্যাথিক অধ্যাপক সৈয়দ আলী রেজা, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি ও আলশেফা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আলী নকী ও এক সময়ের বাংলা শিক্ষক সৈয়দ আলী তকী, সৈয়দ আলী আশরাফের ভাই। ইমাম হোসাইন (রা.)-এর বংশ তালিকায় সৈয়দ আলী আশরাফ ৩১তম পুরুষ।
সৈয়দ আলী আশরাফ ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। ১৯৪০ সালে আরমানিটোলা সরকারি ইংরেজি হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকে পঞ্চম স্থান লাভ করেন। ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে ১৯৪২ সালে আই.এ পরীক্ষায় ৬ষ্ঠ স্থান লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৫ সালে ইংরেজিতে বি.এ অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৬ সালে উক্ত বিষয়ে এম.এ পাস করেন। পরবর্তীতে ব্রিটেনের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগ লাভ করেন। ওখান থেকে ১৯৫২ সালে ইংরেজিতে বি.এ অনার্স পাস করে দেশে ফিরে আসেন। পুনরায় ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযাগে পান এবং ১৯৫৬ সালে ইংরেজিতে এম.এ ও ১৯৬৪ সালে ঊহমষরংয ঢ়ড়বঃৎু ধহফ রঃং ধঁফরবহপব বিষয়ে পি.এইচ.ডি ডিগ্রি লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান ছাত্রী ও পরবর্তীতে রোকেয়া হলের প্রথম মহিলা প্রভোস্ট মরহুমা বেগম আছিয়া আশরাফ তার সহধর্মিনী ছিলেন। সৈয়দ আলী আশরাফ ও বেগম আছিয়া আশরাফ দাম্পত্য জীবনে কোনো সন্তানাদি লাভ করেননি।
১৯৪৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে লেকচারার হিসেবে তার শিক্ষকতা জীবন শুরু। ১৯৪৭-১৯৫৫ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজির লেকচারার এবং রিডার ছিলেন। ১৯৫৫-১৯৬৫ সাল পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের রিডার এবং বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। ১৯৫৬-১৯৭৩ সাল পর্যন্ত করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজির প্রফেসর এবং বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। ১৯৭৩-১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লেয়ার হলের ফেলো ছিলেন। ১৯৭৪-১৯৮৪ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবের জেদ্দাস্থ কিং আব্দুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও মক্কাস্থ উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। ১৯৮২-১৯৯২ সাল পর্যন্ত ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। অবশেষে মৃত্যু পর্যন্ত দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিয়োজিত ছিলেন। তাছাড়া তিনি ১৯৭১ সালে আমেরিকার হার্ভার্ড ও ১৯৭৪ সালে কানাডার নিউ ব্রান্সউইক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। অন্যদিকে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাইসহ বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ কোর্সে লেকচার দিয়েছেন।
সৈয়দ আলী আশরাফ ছিলেন একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা সংস্কারক। তিনি ‘শিক্ষার ইসলামীকরণ’ একক শিক্ষাদর্শন নিয়ে সারা বিশ্বে অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন এবং শিক্ষা সংস্কারে পথিকৃত হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। তার দৃষ্টিতে জ্ঞান-বিজ্ঞানে পাশ্চাত্য সেক্যুলারিস্ট ধ্যান-ধারণার প্রভাবে যে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় চলছে তা থেকে রক্ষা পেতে হলে শিক্ষার ইসলামীকরণ করে ধর্মভিত্তিক শিক্ষার বিকল্প নেই। বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলন, সেমিনার, ওয়ার্কসপ ইত্যাদির মাধ্যমে শিক্ষার ইসলামীকরণ আন্দোলনের পথিকৃত হিসেবে শিক্ষা সংস্কারে অতুলনীয় ভূমিকা রেখে গেছেন তিনি। অবশেষে ১৯৮৯ সালে নিজ দেশে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে তার শিক্ষাদর্শনকে বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষা সংস্কারের কাজ চালু রেখে গেছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে তার অবদান হিসেবে উল্লেখযোগ্যেসংখ্যক বই লিখে গেছেন, যা বাংলা, ইংরেজি ও আরবি ভাষায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষভাবে সমাদৃত।
ড. সৈয়দ আলী আশরাফ একজন খ্যাতিমান ধর্ম প্রচারক ছিলেন। ধর্ম প্রচারে তার মাধ্যম ছিল দুটি। প্রথমত, শিক্ষার ইসলামীকরণ। দ্বিতীয়, সুফি সাধনা। শিক্ষার ইসলামীকরণে তিনি বিভিন্ন মত ও ধর্মাবলম্বীদের নিকট ইসলামী মূল্যবোধ ও আকিদায় বিশ্বাসের দাওয়াত দিয়েছেন। তার এ দাওয়াতি কাজ অত্যন্ত সূক্ষ্ম ৩ প্রজ্ঞার সাথে চালু রেখেছিলেন। অন্যদিকে তিনি একজন সুফিসাধক হিসেবে দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান অলি-বুজুর্গদের খেলাফত লাভ করেন। তিনি সুফি সাধনায় আধ্যাত্মিকতার এক বিরাট পর্যায়ে উন্নতি লাভ করেছিলেন। এসব দিক থেকে তিনি ছিলেন একজন কামেল অলি। অন্যদিকে তিনি ছিলেন একজন নিঃস্বার্থ নীরব সমাজকর্মী। গ্রামগঞ্জে মাদরাসা-মসজিদসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও অন্যান্য কল্যাণ ও সেবাক্ষেত্রের মাধ্যমে সমাজের নির্ভীক কর্মী হিসেবে সামাজিক উন্নতি করে গেছেন।
ইংরেজি এবং বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে তার পরিচিতি চল্লিশের দশক থেকে। ১৯৪৩-৪৪ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের সহ-সম্পাদক ছিলেন, ১৯৪৪-৪৫ সাল পর্যন্ত সম্পাদক ও ১৯৪৫-৪৭ সাল পর্যন্ত সহ-সভাপতি ছিলেন। কবি-সাহিত্যিক হিসেবে তিনি ব্যাপকসংখ্যক বই রচনা করে গেছেন। তার প্রতিষ্ঠিত আশরাফ চেরিটেবল ট্রাস্ট ও যাকাত ফান্ড মানবসেবা ও দানকাজে এক অনন্য ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। নিঃসন্তান সৈয়দ আলী আশরাফ মৃত্যুর পূর্বে তার স্থাবর-অস্থাবর সকল সম্পত্তি আশরাফ চেরিটেবল ট্রাস্ট ও দারুল ইহসান ট্রাস্টে দান করে গেছেন। ৭ আগস্ট ১৯৯৮ সালে ব্রিটেনের ক্যামব্রিজস্থ নিজবাড়িতে ঘুমন্ত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
তার প্রকাশিত বাংলা গ্রন্থ- কবিতা: চৈত্র যখন (১৯৫৭), বিসংগতি (১৯৭৪), হিজরত (১৯৮৪), রূপবাইয়াতে জহীনি (১৯৯১), প্রশ্নোত্তর (১৯৯৬)। অনুবাদ: ইভানকে ক্লেয়ার গল (অনুবাদ : ১৯৬০), প্রেমের কবিতা (সৈয়দ আলী আহসানের সাথে যৌথ)।
গদ্যগ্রন্থ: কাব্যপরিচয় (১৯৫৭), নজরুলজীবনে প্রেমের এক অধ্যায়, রূপ বাংলা (১৯৯৫), বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ঐতিহ্য (১৯৬২), সংসদ যুগ : পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের ইতিকথা, অন্বেষা (আধ্যাত্মিক জীবনের বর্ণনা), সাহিত্য বিচার, কাব্য সংকলন (১৯৬৭), সৈয়দ আলী আশরাফের কবিতা (১৯৯১)।
বাংলাদেশ নামক ছোট্ট ভূখণ্ডটিতে নিকট অতীতে যে’কটি হীরকরত্ন জন্মেছিল আর আলোর বিভায় আলোকিত করেছে বিশ্ব মঞ্চ, তাদেরই একজন সৈয়দ আলী আশরাফ। একাধারে তিনি ছিলেন বহু ভাষাবিদ, বৈশ্বিক শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, কবি, সাহিত্যিক, সাহিত্য সমালোচক, সৌম্যকান্তিময় সর্বগ্রহনীয় বুজুর্গ, একাধারে আরব-আযমের পাঁচ পীরের খেলাফত প্রাপ্ত।
মেধার একঝলক
প্রখ্যাত ভাষাসৈনিক, সাংবাদিক, অধ্যাপক আব্দুল গফুর তার আত্মজীবনী “আমার কালের কথায়” স্মৃতিচারণ করেন, …এমনই এক অনুষ্ঠানে ১৯৪৫ কি ৪৬ সালে এসেছিলাম মুসলিম হলে। ডায়াস থেকে এক্সট্রা কারিকুলাম কার্যক্রমের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেসব ছাত্র ১ম, ২য়, ৩য় স্থান অধিকার করেন তাদের নাম ঘোষণা করা হচ্ছিল। এ পুরস্কার বিতরণকালে একটা বিষয়ে অবাক হয়ে যাই। অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার বটে! বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্র প্রতিটি বিষয়েই প্রথম স্থান অধিকার করেন।
বাংলা রচনা, বাংলা ডিবেট, বাংলা বক্তৃতা, উপস্থিত বক্তৃতা, ইংরেজি রচনা, ইংরেজি ডিবেট বক্তৃতা, ইংরেজি উপস্থিত বক্তৃতা, সব প্রতিযোগিতায় যদি একজন প্রতিযোগী প্রথম স্থান অধিকার করেন তা চমকে দেয়ার ব্যাপরই বটে। শুধু তাই নয়, সর্বাধিক বিষয়ে প্রথম স্থান অধিকারের জন্য একটি বিশেষ পুরস্কারও লাভ করেন তিনি। এই মেধাবী কৃতী ছাত্র আর কেউ নন তিনি ছিলেন সৈয়দ আলী আশরাফ।
তিনি বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফার্সি, সংস্কৃত; এমনকি আরবী ভাষায়ও পারদর্শী ছিলেন। ১৯৪৫ সালে তিনি ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান দখল করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি একই বিষয়ে কৃতিত্বের সাথে পাশ করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
তিনি কর্মজিবনের একটি দীর্ঘসময়ে ঢাকা, রাজশাহী, ক্যামব্রিজ, হার্ভার্ড নিউ ব্রাঞ্চ উইক (কানাডা) কিং আব্দুল আজিজের মতো বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের স্বনামধন্য অধ্যাপক ছিলেন।
তার এই প্রখর মেধা কখনো নিষ্প্রভ হয়নি। তা কাজে লাগিয়েছেন সত্য ও সুন্দরের প্রতি। শিক্ষকতার মহান পেশায়। তিনি ১৯৪৭ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত মাঝে কিছু সময় বাদ দিয়ে মোট একান্ন বছর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ভার্সিটিতে অধ্যাপনা করেন। টিচিংয়ের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সাবলীল স্বপ্রতিভ, ছাত্রদের প্রিয়ভাজন।
একবার কোনো কারণে মক্কা উম্মুল কুরা ভার্সিটিতে গেলে জানতে পারলেন ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান তার ছাত্র। তখন সেখানে যেতে চাইলে চেয়ারম্যান সাথে সাথে চেয়ার ছেড়ে ছুটে আসেন। এই বলে স্বাগত জানান আসসালামু আলাইকুম হাউ আর ইউ স্যার প্লিজ হ্যাব ইউর সিট স্যার দিসিস চেয়ার ফর ইউ।
কতভাবেই না বসার জন্য অনুরোধ করলেন কিন্তু কি অমায়িকতা, তিনি তাতে বসতে রাজি হলেন না। ছাত্ররা তার ক্লাসের জন্য থাকতো অধীর, উন্মুখ।
শেষ লগ্নের মুজাদ্দিদ। চেয়েছিলেন শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার।
ধর্মবিহীন শিক্ষাব্যবস্থার কুপ্রভাব আজ সর্বস্বীকৃত। তিনি সারা জীবন চেষ্টা করেছেন জেনারেল শিক্ষাকে ইসলামাইজেশন করতে। এজন্য তিনি ইউরোপ-এশিয়া চষে বেড়িয়েছেন। বিশ্ব মঞ্চে দাঁড়িয়ে এর প্রয়োজনীয়তা বার বার ব্যাখ্যা করেছেন। এ চিন্তাকে বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালে তৎকালীন সৌদি বাদশাহ আব্দুল আজিজকে চিঠি দেন। পরবর্তীতে তিনিই প্রথম মুসলিম বিশ্বের শিক্ষাবিদদের নিয়ে ১৯৭৭ সালে বিশ্ব মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনের আয়োজন করেন। ১৯৮০ সাল থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত এ ধরনের পাঁচটি সম্মেলন বাস্তবায়ন করেন। তিনি ছিলেন এর প্রধান উদোক্তা ও সচিব।
এ লক্ষ্যে জীবনের শেষ লগ্নে প্রতিষ্ঠা করেন দেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘দারুল ইহসান’, যা ছিল তার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ ।
সকলের নিকট সমাদৃত সফল সংগঠক
তার ব্যক্তিত্ব ছিল প্রবল আকর্ষণীয়, ব্যাপক মান্যতা। ১৯৪৩ সালে তৎকালীন স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রভাবশালী সংগঠন পূর্ব-পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। এক অধীনে তিনি বিভিন্ন কর্মতৎপরতা চালান। পরবর্তীতে শিক্ষকতার পেশায় এসে ইত্যাকার বিষয় থেকে গুটিয়ে নিলেও ক্যামব্রিজ ইসলামিক একাডেমি, ওআইসি ওয়ার্ল্ড সেন্টার ফর ইসলামিক এডুকেশন, রাবেতা আলম আল ইসলামীর শিক্ষা বিষয়ক প্রজেক্ট (ইংরেজি অধ্যাপকদের সংগঠন), (লেখকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন), (আন্তর্জাতিক আধুনিক ভাষা ও সাহিত্য সংগঠন) এর সাথে যুক্ত থাকার কারণে বিভিন্ন সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছেন ও প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন। এছাড়া বাংলা একাডেমি, লিবার্টি ফোরাম ইত্যাকার দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সাথেও যুক্ত ছিলেন।
তিনি ছিলেন সকলের নিকট সমাদৃত। একবার এক অনুষ্ঠানে রাবেতার মহাসচিব বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. আব্দুল্লাহ উমর নাসিফ বলেন, প্রফেসর সৈয়দ আলী আশরাফ বিশ বছর যাবত আমাদের মাঝে পরিচিত ব্যক্তিত্ব। শিক্ষাক্ষেত্রে তার বিশেষ অভিজ্ঞতা ও দর্শন রয়েছে। আজ আমরা তা কাজে লাগিয়ে উপকৃত হতে চাই।
একজন মননশীল কবি পরিচ্ছন্ন সাহিত্যিক
সৈয়দ আশরাফ ছিলেন সংস্কৃতিবান কবি এবং প্রবন্ধকার। তার অধিকাংশ কবিতাই ছিল আত্মকেন্দ্রিক। সময়ের মান-অভিমান আচার-আচরণে মনের প্রেরণা থেকে কবিতা লিখতেন। তিনি নিজেই বলেন, কাব্য রচনা করছি নিজেকে জানার জন্য। ভাষার মারপ্যাঁচ দেখাবার জন্য নয়। তার কবিতায় ফুটে উঠতো ঐশীপ্রেম, সারাংশে মদিনার প্রতি ভালোবাসা।
তার কাব্য সম্পর্কে কলম ধরেছেন কবি আল-মাহমুদ, আল-মুজাহেদী, জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান প্রভৃতি শক্তিমান কবিগণ।
প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সহজ-সাবলীল প্রাকৃতিক সহজাত। বিষয়টিকেই প্রমাণ করতে চাইতেন। সাহিত্যাঙ্গনে তার পরিচিতি সেই ৪০-এর দশকে ছাত্র জীবনে। প্রথম বই প্রকাশ হয় ১৯৫৭ সালে। কাব্যগ্রন্থ “চৈত্র যখন”। কবিতা, গদ্য, প্রবন্ধ, অনুবাদ, সম্পাদনা বাংলা ও ইংরেজিতে প্রকাশিত সর্বমোট রচনার সংখ্যা ৩৫টিরও বেশি।
তার একটি কবিতার অংশবিশেষ…
তাই আজ সময়ের বাঁধ
ভেঙ্গে চুরে চুরমার হল
তাই আজ স্মৃতির গোলাপ
স্বপ্নের কমলে মিশে গেল,
তাই তার গাঢ় নীল চোখে
কিয়ামৎ প্রতিভাব হল;
এক হল-শান্তি-দীপ্ত সৃজন আলোক
আর সুপ্ত-অন্ধকার বিধ্বস্ত দ্যুলোক।
আধ্যাত্মিকতা তরঙ্গায়িত দরিয়ার দক্ষ নাবিক।
সৈয়দ আলী আশরাফ পার্থিব শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন, কিন্তু পার্থিব শিক্ষার চেয়েও বহুগুণে এগিয়ে ছিলেন আধ্যাত্মিক দীক্ষায়। এটা ছিল তার স্বভাবজাত কেননা তিনি ছিলেন ঐতিহ্যবাহী এক পীর বংশের সন্তান। সর্বপ্রথম ১৯৪৬ সালে তার নানা খলিফা হযরত গোলাম মুক্তাদির রহ.-এর কাছে বাইয়াত হন। তিনি ছিলেন তার একমাত্র মুরিদ প্রথম মুরাকাবায় যার সব মাকাম জারি হয়ে যায়।
১৯৫৯ সালে তার থেকে খেলাফত লাভ করেন। হযরত গোলাম মুক্তাদির (রহ.)-এর মৃত্যুর পর করাচির জাহীন শাহ তাজীর হাতে বায়াত গ্রহণ করেন এবং তারপর তিনি তাআল্লুক করেন ফুরফুরা ও জৈনপুর দরবারের খলিফা নোয়াখালীর ড. বদিউজ্জামান রহ.-এর সাথে। তার থেকেও বাইয়াতের ইজাজত লাভ করেন। তার ইন্তেকালের পর আধ্যাত্মিক সম্পর্ক গড়েন হাফেজ বজলুর রহমান রহ.-এর সাথে এবং খেলাফত লাভে ধন্য হন। লেখক : কবি।