পাপের শাস্তি


১ নভেম্বর ২০২৪ ১৮:১৬

॥ গাজী আবদুস সালাম ॥
অনেক দিন আগের কথা। এক দেশে বাস করত এক ক্ষমতাধর জাতি। মহান আল্লাহ সেই জাতিকে অঢেল নেয়ামত দান করেছিলেন। সেখানে অনেক স্রোতস্বিনী নদী ছিল। নদীগুলো নানারকম সুস্বাদু মাছে ভরে থাকত। জেলেরা নৌকা নিয়ে দূর সাগরে চলে যেত মাছ ধরতে। তাদের জালে প্রচুর মাছ ধরা পড়ত। মাছ খেয়ে ও বিক্রি করে তারা খুব সুখে-শান্তিতে দিন কাটাত।
ঘন-সবুজ নয়নাভিরাম বন ছিল সেখানে। পাখিদের কলকাকলীতে মুখরিত থাকত বনগুলো। উঁচু উঁচু পাহাড় ছিল। কলকল শব্দে ঝর্ণাগুলো বয়ে যেত। ঝর্ণার শীতল পানি খেয়ে ক্লান্ত পথিক তার তেষ্টা মেটাত। নানারকম রঙিন ফসল ফলত মাঠে। প্রচুর গবাদিপশু ছিল, ছিল দুধেল গাই। আঙুরক্ষেতে থোকা থোকা আঙুর ফলত। তা দেখে জিভে পানি চলে আসত সবার।
মোটকথা, আল্লাহ তাদের প্রচুর নেয়ামত দান করেছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তাদের অধিকাংশই বেপরোয়া হয়ে উঠল। তারা বিলাসিতায় ডুবতে শুরু করল ধীরে ধীরে। অহংকার হয়ে গেল তাদের নিত্যসঙ্গী। তারা বলল, আমাদের কোনোকিছুরই অভাব নেই। আমরা সুঠাম দেহের অধিকারী। তাই আমরা যা ইচ্ছে তাই করতে পারি। ফলে তারা আল্লাহকে ভুলে গেল। ব্যাপকভাবে অনাচার বেড়ে গেল। বাড়ল ব্যভিচার, হত্যাকাণ্ড আরও নানা অপকর্ম।
এভাবে বেশ কিছুদিন কেটে গেল। হঠাৎ সেই দেশে নামল এক ভয়াবহ বিপর্যয়। আকাশ থেকে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেল। শুরু হলো খরা। মাঠ-ঘাট শুকিয়ে ফেটে চৌচির হলো। দাবদাহে পুড়ল বনাঞ্চল। নদীগুলো শুকিয়ে যেতে লাগল। মাঠের ফসল শুকনো খড়ে পরিণত হলো। গবাদিপশুরা খাদ্যের অভাবে না খেয়ে মরতে বসল। মানুষের নানারকম ব্যাধি শুরু হলো। এমন একটা কঠিন বিপদ থেকে বাঁচতে সেখানকার রাজা একটা সভা ডাকল। ডাকা হলো রাজ্যের সব জ্ঞানী ব্যক্তিকে। কিন্তু কারো মাথায় কোনো বুদ্ধি আসল না।
এমন পরিস্থিতিতে একদিন এক লোক কোথা থেকে এসে রাজার রাজপ্রাসাদের প্রধান ফটকে বসে পড়ল। তার পোশাক ছিল জীর্ণ। চেহারা ছিল ধুলামলিন। রাজার লোকজন লোকটিকে চিনতে পারল না। এর আগে কখনো তারা এরকম কাউকে এ রাজ্যে দেখেছে বলে তাদের মনে পড়ে না। তারা তাকে খেদিয়ে দিতে চেষ্টা করল। তারা বলল, ‘আমরা অনেক বিপদে আছি। আমাদের মন অনেক খারাপ। তুমি এখান থেকে চলে যাও।’
লোকটি বলল, ‘তোমাদের এ বিপদ থেকে বাঁচতে একটি উপায় আমি বলতে পারি, যদি রাজাকে আমার সাথে দেখা করিয়ে দাও।’ তারা বিষয়টি রাজাকে জানাল। রাজা লোকটির সাথে দেখা করলেন। বললেন, ‘এ রাজ্যের লোকজন অনেক বিপদে আছে। আমরা এখন অসহায় হয়ে পড়েছি। দয়া করে আমাদের কোনো উপায় বলতে পারেন?’
লোকটি রাজাকে রাজ্যের পূর্বের অবস্থা মনে করিয়ে দিল। বলল, ‘আপনার কি মনে আছে? মহান আল্লাহ এ রাজ্যে অঢেল নেয়ামত দান করেছিলেন। কিন্তু লোকজন সেই নেয়ামত পেয়ে বিলাসিতায় ডুবে গেল। ভুলে গেল আল্লাহকে। ফলে আল্লাহও তাঁর নেয়ামত তুলে নিলেন। কতই না ভালো হতো! যদি লোকজন আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করত, তাহলে আল্লাহ এরকম বিপদ অবতীর্ণ করতেন না। বরং আরও বেশি সুখ-শান্তি দিয়ে ঘিরে রাখতেন এখানকার অধিবাসীদের।’
লোকটি রাজাকে পবিত্র কুরআনের সূরা আরাফের ৯৬ নম্বর আয়াতটি পড়ে শোনাল। ‘অথচ যদি জনপদের মানুষগুলো ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তাহলে আমি তাদের ওপর আসমান-জমিনের যাবতীয় বরকতের দুয়ার খুলে দিতাম। কিন্তু তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করল। সুতরাং তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য আমি তাদের পাকড়াও করলাম।’
আয়াতটি শুনে রাজা ও তার লোকজন ভীষণ অনুতপ্ত হলো। তারা মহান আল্লাহর কাছে তওবা করল এবং সবাই দীনের পথে আসতে লাগল। মহান আল্লাহ তাদের ওপর দয়া করলেন। তিনি পুনরায় ওই রাজ্যের সুখ-শান্তি ফিরিয়ে দিলেন।