চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রশাসনকে সফল হতেই হবে

ডাকসুসহ ছাত্র সংসদ নির্বাচন ঘিরে শঙ্কা


২৯ আগস্ট ২০২৫ ১২:৫৮

॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
৩৬ জুলাই অর্থাৎ ৫ আগস্টের পরিবর্তনের পর গণতন্ত্রে উত্তরণের মহাসড়ক ধরে চলছে দেশ। ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেরও তোড়জোড় চলছে। ৩৬ জুলাই বিপ্লবের কারিগর শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক চেতনার উন্মেষের সূতিকাগার ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের এসিড স্টেট হবে বলে মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
গত ২৬ আগস্ট মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের কাছে ছুটছেন প্রার্থীরা। তবে প্রচার চলাকালে সামাজিক, আর্থিক ও সেবামূলক সহযোগিতা বা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যাবে না। মূলত চারটি উপায়ে নিজেদের কথাগুলো ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে সচেষ্ট প্রার্থীরাÑ ১. অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ২. পোস্টার বা লিফলেট, ৩. ব্যানার এবং ৪. সশরীরে হল পর্যায়ে ও একাডেমিক ভবনের সামনে প্রচার চালাতে চান তারা। গত ২৬ আগস্ট মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় আনুষ্ঠানিক প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। তবে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন পদে ৪৭১ জন প্রার্থী লড়ছেন ডাকসু নির্বাচনে। ভোটগ্রহণ করা হবে আগামী ৯ সেপ্টেম্বর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভোটের জন্য অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে নির্বাচনী আচরণবিধি জারি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তফসিল ঘোষণার পর থেকে আচরণবিধি ভঙ্গ ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ঘটনা সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে প্রার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আচরণবিধি ভঙ্গের ঘটনায় কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। আইন অমান্যকারী প্রার্থী বা তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জরিমানা, প্রার্থিতা বাতিল; এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এক্ষেত্রে রিটার্নিং অফিসাররা লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে বা স্বতঃপ্রণোদিত হয়েও ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
আচরণবিধি মানতে যা অনুসরণ করা যাবে, তা হলো-
১. নির্বাচনী প্রচার : প্রচার চালানো যাবে প্রার্থীর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের দিন থেকে শুরু করে ভোটগ্রহণের ২৪ ঘণ্টা আগ পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১১টার মধ্যে প্রচার সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে রাত ১০টার পর মাইক ব্যবহার নিষিদ্ধ। সভা, সমাবেশ বা শোভাযাত্রা করতে হলে কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা আগে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের অনুমতি নিতে হবে। ক্যাম্পাস ও হলের নির্ধারিত স্থানে কেবল সভা বা সমাবেশ করা যাবে। সড়ক, শ্রেণিকক্ষ, লাইব্রেরি, পরীক্ষার হল কিংবা উপাসনালয়ে কোনো প্রচার চলবে না। প্রতিটি হলে একটি ও পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ তিনটি প্রজেকশন মিটিং আয়োজন করা যাবে। প্রচারে গোলযোগ সৃষ্টির চেষ্টা করলে রিটার্নিং অফিসার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
২. যানবাহন ব্যবহার ও শোডাউন করা যাবে না।
৩. পোস্টার, লিফলেট ও অনলাইন প্রচার : শুধু সাদাকালো পোস্টার, লিফলেট ও হ্যান্ডবিল ব্যবহার করা যাবে, যেখানে কেবল প্রার্থীর নিজের সাদাকালো ছবি থাকবে। অন্য কারো ছবি, প্রতীক, দেয়াল, যানবাহন, গাছ বা স্থাপনায় প্রচারসামগ্রী লাগানো যাবে না। প্রতিপক্ষের প্রচারসামগ্রী নষ্ট করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অনলাইনে প্রচার চালানো যাবে, তবে গুজব, মানহানি, চরিত্রহনন বা অসত্য তথ্য প্রচার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণ হলে কমিশন ক্ষতিকর ওয়েবসাইট বা গ্রুপ বন্ধের ব্যবস্থা নিতে পারবে।
৪. বিধিনিষেধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ : নির্বাচনী প্রচারে উসকানিমূলক, মানহানিকর বা সাম্প্রদায়িক বক্তব্য দেওয়া যাবে না। কোনো প্রার্থী বা সংগঠনকে লক্ষ করে আর্থিক লেনদেন, অনুদান বা চাঁদা দেওয়া-নেওয়া যাবে না। ভোটারদের খাদ্য, পানীয় বা উপহার দেওয়া যাবে না। প্রার্থীর ছবি বা বক্তব্যযুক্ত কোনো পোশাক (টি-শার্ট, জ্যাকেট ইত্যাদি) পরিধান করা নিষিদ্ধ। নির্বাচনী প্রচার বা ভোট চলাকালীন বিস্ফোরক দ্রব্য, লাঠি, রড, আগ্নেয়াস্ত্র বা যেকোনো অস্ত্র বহন নিষিদ্ধ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যতীত অন্য কেউ অস্ত্র বহন করতে পারবে না।
৫. ভোটকেন্দ্রের নিয়মাবলি: ভোটারদের বৈধ পরিচয়পত্র দেখিয়ে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে হবে। ভোট দেওয়ার পর কেন্দ্র ত্যাগ করতে হবে, কেন্দ্রের ভেতরে অকারণে ভিড় করা যাবে না। নির্বাচনী কর্মকর্তা, প্রার্থী ও অনুমোদিত ব্যক্তিদের বাইরে কেউ ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবে না। সাংবাদিকরা পরিচয়পত্র দেখিয়ে অনুমতি নিয়ে কেন্দ্রের ছবি তুলতে পারবেন, তবে গোপন কক্ষে ঢোকা যাবে না। ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন ও সব ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস বন্ধ রাখতে হবে।
৬. বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ : ভোটের দিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ভোটার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী ব্যতীত কোনো বহিরাগত প্রবেশ করতে পারবে না।
জাকসু ও রাকসু নির্বাচন আয়োজন এবং ষড়যন্ত্রের ঘ্রাণ
সাধারণ শিক্ষার্থী; বিশেষ করে ৩৬ জুলাই বিপ্লবীরা প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ সক্রিয় করার দাবি তুলেছে। ডাকসুর সাথে সাথে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাকসু) ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাকসু) বইতে শুরু করেছে নির্বাচনের হাওয়া। তবে একটি গোষ্ঠী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই সক্রিয়। তারা মনে করছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করবে। তারপর দলীয় প্রভাব খাটিয়ে অতীতের ফ্যাসিস্ট কায়দায় ছাত্র সংসদগুলোর দখল নেবে। এ মহল এখনো সক্রিয় বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।
সূত্রটি আরো জানিয়েছে, গত ২৫ আগস্ট সোমবার আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির সভায় ছাত্র সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ইউনিটপ্রধানদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সূত্রটি উল্লেখ্য করে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ তাদের মিত্র বামদের নিয়ে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা আঁকছে। ষড়যন্ত্রের মধ্যে তাদের প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে, আগামী ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় ডাকসু নির্বাচন ঘিরে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের এক নেতাকে দিয়ে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে রিট করা হতে পারে। এক্ষেত্রে তারা ডাকসুতে সফল হলে রাকসু ও জাকসুতে একই কায়দায় নির্বাচন পেছানো বা বন্ধ করার ষড়যন্ত্র করছে।
ইতোমধ্যে বাম সংগঠন ও তাদের গুরু বুদ্ধিজীবীরা নানা বয়ান দেয়া শুরু করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসলামী ছাত্রশিবির নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করা শুরু করেছে। গুরুদের তালিকায় অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বরত ব্যক্তিদের নামও আছে। তাদের নামে বিভিন্ন ফটো তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়াচ্ছে ফ্যাসিস্টের দোসররা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এখনই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এরা ছাত্র সংসদ নির্বাচন স্থগিত, বাতিল, ফলাফল পাল্টানো ইত্যাদি নেতিবাচক কাজে সফল হলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। বিশ্লেষকদের এ আশঙ্কার আভাস গোয়েন্দা সূত্রও নিশ্চিত করেছে। অতএব সাবধান।
অতএব সাবধান
ফ্যাসিবাদবিরোধী জুলাই আন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ব্যাঘাত ঘটাতে পারে নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে। গত ২৫ আগস্ট সোমবার এ বিষয় দুটি (ছাত্র সংসদ নির্বাচন ও লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র) নিয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির সভায় বিস্তারিত আলোচনা ও পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে বেশকিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে। কোর কমিটির সভা থেকে ছাত্র সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ইউনিটপ্রধানদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে শিগগিরই বড় অভিযানের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। সূত্রটি জানায়, ডাকসু, জাকসু এবং রাকসু নির্বাচনে নানা আশঙ্কার কথা তুলে ধরে একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে পৃথক প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক চলাকালীন সময় পর্যন্ত জাকসুতে ছাত্রদলের প্যানেল দিতে না পারার বিষয়টি প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, ছাত্রদলের পক্ষ থেকে নির্বাচন পেছানোর দাবি আসতে পারে। প্রতিবেদনে রাকসু নির্বাচন পেছানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে একটি সূত্রে জানা গেছে।
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ৩৬ জুলাই আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা সবাই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পক্ষে। তাই এ নিয়ে কোনো নীলনকশা বা ষড়যন্ত্র করলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জাতীয় রাজনীতিতে। যার ফলাফল কারো জন্য শুভ হবে না। তাই অন্তর্বর্তী সরকারকেই এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিজয়ী হতে হবে। যেকোনো মূল্যে ডাকসুসহ সব ছাত্র সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে।