ভারত বিমুখ বাংলাদেশ
৩ জুলাই ২০২৫ ১২:০৯
বাংলাদেশসহ বৃহৎ প্রতিবেশী চীন ও পাকিস্তানসহ কোনো প্রতিবেশীর সাথেই সুসম্পর্ক নেই ভারতের। ভারত হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, যদিও তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তার সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী অপর হিন্দু রাষ্ট্র নেপালের সাথেও ভারতের সম্পর্ক মধুর নয়, বরং তিক্ততর। আর চীন ও পাকিস্তানের সাথেও বিগত আট দশকে বেশ কয়েকবার যুদ্ধে জড়িয়েছে ভারত। বাংলাদেশের সাথেও ভারতের সম্পর্ক উঞ্চ নয়, বরং শীতল ও তিক্ততর। বিগত পাঁচ দশক ধরে ভারত বাংলাদেশের ওপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিকসহ বিভিন্নভাবে বিরোধ লাগিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বদলে তিক্ততা ও সংকটই তৈরি করেছে। এতে করে বাংলাদেশের ক্ষতি করার পাশাপাশি ভারতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভারত প্রতিনিয়ত অপচেষ্টা চালিয়ে গেছে কীভাবে বাংলাদেশকে পিছিয়ে রাখা যায়। ভারত প্রকাশ্যে যেমন বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা চালিয়েছে, তেমনি গোপনে তার গোয়েন্দা সংস্থা দিয়েও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ব্ল্যাকমেইল করেছে। বাংলাদেশকে রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার ব্যাপারে ভারত হেন অপকর্ম নেই, যা করেনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিথ্যা অপবাদ ও প্রোপাগান্ডা চালিয়ে সীমান্তে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশিদের হত্যা করে যাচ্ছে।
সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় বিগত সপ্তাহে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানা গেছে যে, ভারত বিগত পাঁচ দশকে সীমান্তে তার বিএসএফ দিয়ে পাঁচ হাজারের অধিক বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে। প্রতি বছর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকবার সম্মেলন হয়ে থাকে। সেখানে ভারতের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় সীমান্তে বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা দেয়া হবে এবং কোনো মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হবে না। তারপরও সীমান্তে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বাংলাদেশি হত্যাকাণ্ড থামছে না।
বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা
রাজনৈতিক অপকর্মের পাশাপাশি ভারত বিগত বছরগুলোয় বিভিন্ন শুল্ক বাধা সৃষ্টি করে ভারতে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি ব্যাহত করছে। যার কারণে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ভারসাম্য নেই। দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বরাবরই বাংলাদেশ পিছিয়ে। ভারত থেকে বাংলাদেশ যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করে, তার তুলনায় রপ্তানি খুবই নগণ্য। সর্বশেষ গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশ ৯০০ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। তার বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পণ্য রপ্তানি হয়েছে মাত্র ১৫৭ কোটি ডলারের। যদি সহজভাবে বলা হয়, তা হচ্ছে ভারত বাংলাদেশে প্রতি বছর রপ্তানি করে ৯০০ কোটি ডলার, সেখানে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি মাত্র ১৫৭ কোটি ডলার। অথচ বাংলাদেশের তুলনায় ভারত হচ্ছে বড় বাজার। বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস রপ্তানিতে দিল্লি বাধা সৃষ্টি না করলে রপ্তানি বৃদ্ধি পেলে বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা কিছুটা কমত।
বাংলাদেশ যাতে রাজনৈতিক দিক থেকে স্থিতিশীল হতে না পারে, তার জন্য ভারত বিগত কয়েক দশক ধরে ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারদেরই লালন-পালন করেছে। বিগত ৫৪ বছরে বেশ কয়েকটি ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক দলকে তৈরি করেছে ভারত। তন্মধ্যে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি অন্যতম। শুধু তাই নয়, এ দুটি দলকে বেশ কয়েকবার ক্ষমতায় বসতে দিল্লি সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে। দিল্লি এ দুটি ফ্যাসিস্ট দলকে ক্ষমতায় বসিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে ধ্বংস করার পাশাপাশি গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকেও ধ্বংস করে দিয়েছে। কারণ বাংলাদেশ যদি রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল হয়, তাহলে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাবে। তাই ভারতের এক নম্বর এজেন্ডা ছিল বাংলাদেশকে সবসময় অস্থিতিশীল করে রাখা।
গঙ্গা ও তিস্তাসহ অসংখ্য নদী থেকে পানি প্রত্যাহার
ভারত সবসময়ই দাবি করে, বাংলাদেশ তার বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী। কিন্তু ভারত তার কার্যকলাপ দিয়ে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করছে যে, বাংলাদেশকে বিভিন্ন কায়দায় সংকটে ফেলে পিছিয়ে রাখতে হবে। তার প্রমাণ হচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রবাহিত আন্তর্জাতিক নদনদীগুলোর পানি প্রত্যাহার করে বাংলাদেশকে মরুভূমিতে রূপান্তর করা। আন্তর্জাতিক নদী থেকে উজানের দেশ কোনো চুক্তি ছাড়া পানি প্রত্যাহার করতে পারে না। কিন্তু ভারত গঙ্গা নদী ছাড়া অন্যসব নদী থেকে প্রতিনিয়ত পানি আটকিয়ে বাংলাদেশের কৃষিসহ প্রতিবেশগত সংকট সৃষ্টি করছে। অপরদিকে বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশকে না জানিয়ে পানি ছেড়ে বন্যা সৃষ্টি করছে।
করিডোর, ট্রানজিট ও কলকাতা বন্দর
আধুনিক বিশ্বে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনেক প্রসার ঘটেছে। বাণিজ্য করতে এক দেশকে অপর দেশের সাথে বিভিন্ন রকম চুক্তির পাশাপাশি যোগাযোগের সুযোগ-সুবিধাও ডেভেলপ করতে হয় এবং হচ্ছে। ভারতের যেমন তার নিজের দেশের সেভেন সিস্টারের জন্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে করিডোর দরকার হয়, তেমনি বাংলাদেশেরও কিন্তু বাণিজ্য করতে ভারতের ভেতর দিয়ে ট্রানজিট দরকার। ভারত তার নিজের স্বার্থে বাংলাদেশ থেকে ট্রানজিটের চেয়ে বড় সুযোগ করিডোর নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ কি ভারতের কাছ থেকে কোনো ধরনের ট্রানজিট পেয়েছে। বাংলাদেশের বুমিং টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস শিল্পের জন্য নেপাল, ভুটান ও পাকিস্তানে ট্রানজিট খুবই জরুরিভাবে দরকার। বাংলাদেশ পাকিস্তানের সাথে ট্রানজিট থাক দূরের কথা, নেপালের সাথে মাত্র ৬০ কি.মি. ট্রানজিটই ভারত বাংলাদেশকে দিচ্ছে না। ভারত চিকেন নেক নামে অভিহিত ৬০ কি.মি. ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশ ও নেপাল উভয় দেশই বাণিজ্য সুবিধা পাবে। কিন্তু ভারত তার প্রতিবেশীদের কাছ থেকে শুধু সুবিধা নেবে, কিন্তু সুবিধা দেবে না- এ নীতি দিয়ে তো সুসম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে না।
বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতকে তার বাণিজ্য থেকে শুরু করে মালামাল পরিবহনের জন্য করিডোর ও ট্রানজিট দিয়েছে। অথচ ভারত সরকার ১৯৪৭ সালে আমাদের দেশের জন্য কলকাতা বন্দর একদিনের জন্যও ব্যবহার করার সুযোগ দেয়নি। তৎকালীন সরকার ভারতের কাছে কলকাতা বন্দর ছয় মাস ব্যবহার করার জন্য অনুরোধ করেছিল। তখন ভারতের নেতৃবৃন্দ বলেছিল, ছয়-মাস নয়, ছয় ঘণ্টার জন্যও ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। এভাবে বিগত ৭৮ বছর ভারত কোনো সময়ই বাংলাদেশকে কোনো আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তা দেয়নি।
কূটনৈতিকভাবেও ভারত বিভিন্ন কৌশলে বাংলাদেশকে ইউরোপ আমেরিকা ও দূরপ্রাচ্যসহ মুসলিম বিশ্বকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। চাণক্যনীতি প্রয়োগ করে ফ্যাসিস্ট সরকারের মাধ্যমে বিগত দশকে বাংলাদেশকে এক ঘরে করে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। ফ্যাসিস্ট নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সবার সাথে বন্ধুত্ব এমন নীতিমালা প্রয়োগ করতে পারেনি।
বাংলাদেশের জনগণের বড় অংশ ভারতের বাংলাদেশ ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র দেরিতে হলেও বুঝতে পেরেছে। দিল্লির চাণক্যনীতির কবলে পড়ে বাংলাদেশ যে পিছিয়ে যাচ্ছে, তা দেশপ্রেমিক রাজনীতিক, কূটনীতিক, আমলা, সাংবাদিক ও শিল্পপতি ব্যবসায়ীরাসহ সাধারণ জনগণ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। তাই তারা ভারতপন্থি রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রত্যাখ্যান করছে। এককথায় বলা যায়, বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণও ভারত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
তাই এখন ব্রাহ্মণ্যবাদি দিল্লির টনক নড়েছে। দিল্লি নড়েচড়ে বসেছে, দিল্লি এখন বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করতে চাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দিল্লি তার পররাষ্ট্র বিষয়ক সংসদীয় কমিটিকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি ভারত ও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সম্পাদকদের দিয়ে প্রতিবেদন ও কলাম লিখিয়ে প্রকাশ করছে। ইতোমধ্যে কলকাতা ও ঢাকার কয়েকটি পত্রিকায় এ বিষয়ে কয়েকটি লেখা প্রকাশ করেছে। ইন্ডিয়াহুড.ইন (রহফরধযড়ড়ফ.রহ) নামের একটি অনলাইন বাংলা পত্রিকা ‘বাংলাদেশে ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে চলেছে ভারত! নতুন প্লান দিল্লির’ এ শিরোনামে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। কলকাতার সাংবাদিক বিক্রম ব্যানার্জির প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান নিয়ে এমন সব শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা দৃষ্টিকটু ও যথাযথ নয়। ঐ প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, “হাসিনা জামানা শেষ হতেই বাংলাদেশের সাথে ভারতীয় সম্পর্কে (ওহফরধ-ইধহমষধফবংয জবষধঃরড়হ) ক্রমশ ফাটল ধরেছে। ক্ষমতা শান্তিতে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে যেতেই ওপারে শুরু হয়েছে নানান ভারতবিরোধী কার্যকলাপ। ফলত স্বাভাবিকভাবেই এক বেহায়া পড়শির মতোই বাংলাদেশকে প্রত্যেক অগ্রহণযোগ্য আচরণের প্রত্যুত্তর দিচ্ছে ভারত।
যার প্রমাণ সম্প্রতি বাংলাদেশি পণ্য আমদানি নিষিদ্ধকরণ। তবে শোনা যাচ্ছে, এবার ওপার বাংলার সাথে সম্পর্ক নিয়ে ভিন্ন পথে হাঁটতে পারে দিল্লি! বেশ কয়েকটি সূত্রের দাবি, বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে এবার ভারতের কাছে অনুরোধ রাখলেন ঢাকা সম্পর্কিত কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
পাকিস্তানের মতো শত্রুতার দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা যাবে না বাংলাদেশকে!
বেশ কয়েকটি সংবাদ প্রতিবেদন মারফত খবর, বাংলাদেশের সাথে সাম্প্রতিক সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিদেশ মন্ত্রক বিষয়ক সংসদীয় কমিটিকে ওপার বাংলার স্বার্থ রক্ষাকারী কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মতো শত্রুতার দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে চলবে না! বদলাতে হবে এদেশের সাথে সম্পর্কের দৃষ্টি।
জানা যাচ্ছে, বর্তমান বাংলাদেশের সাথে আগামী দিনে ভারতের সম্পর্ক কোন পথে যাবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই বহু কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞের মতামত চেয়েছে শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন বিদেশ মন্ত্রক বিষয়ক সংসদীয় কমিটি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ভারতের পাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন, অবসরপ্রাপ্ত আর্মি জেনারেল সৈয়দ আতা হাসনাইন, জওহরলাল নেহেরু ইউনিভার্সিটি স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ডিনসহ বাংলাদেশে নিযুক্ত প্রাক্তন ভারতীয় হাইকমিশনার রেবা গাঙ্গুলী দাসের মতো বহু কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে বাংলাদেশের সাথে আগামী দিনের সম্পর্কের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মতামত চেয়েছে বিদেশ মন্ত্রক বিষয়ক সংসদীয় কমিটি।
ইউনূসের শাসনকালে পাকিস্তানের সাথে ক্রমশ সখ্য বেড়েছে বাংলাদেশের। কাছাকাছি এসেছে ঢাকা ও ইসলামাবাদ। শুধু তাই নয়, ভারতবিরোধী অন্যতম পরাশক্তি চিনের সাথেও সুসম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে ওপার বাংলার। বিগত মাসগুলোয় বাংলাদেশের বাজারে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে ড্রাগন। বলা চলে, চীনা পণ্যে ঠাসা বাংলাদেশের বাজার।
এদিকে পাকিস্তানের কুমতলবে পড়ে ভারতের বিরুদ্ধে একের পর এক অনৈতিক কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে ইউনূসের বাংলাদেশ। এমতাবস্থায় বহু বিশেষজ্ঞের দাবি, সবচেয়ে কাছের পড়শি বেহাত হওয়ার আগে বাংলাদেশের সাথে অংশীদারিত্ব বাড়াতে হবে ভারতকে। আর তাহলেই ওদেশে কিছুটা হলেও ক্ষমতা পাবে দিল্লি! আদতে বাংলাদেশের অন্তর্র্বর্তী সরকারও মুখে মুখে তেমনটাই চায়! তবে মনে যে পাকিস্তানের ঢালা বিষ, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।”
বিক্রম ব্যনার্জি যেভাবে অসত্য তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে তার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছেন, তাতেই বোঝা যায় ভারত প্রতিনিয়ত বাংলাদেশবিরোধী প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে তিনি তার প্রতিবেদনে এটা স্বীকার করেছেন যে, হাসিনার সরকারের পতনের পরপরই বাংলাদেশ ভারত সম্পর্কে ফাটল ধরেছে। প্রতিবেদনটিতে তিনি কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মতো শত্রুর দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা যাবে না। বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের দৃষ্টি বদলাতে হবে।
কয়েক মাস আগে ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক প্রথম আলো বাংলাদেশ-ভারতের বর্তমান সম্পর্কের সংকট নিয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে। ‘বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের সংকট কোথায়, সমাধান কী’ সালেহ উদ্দিন আহমদের রচিত নিবন্ধে তিনি দুই দেশের মধ্যে ঠাণ্ডা লড়াই চলছে বলে রাজনীতিবিদদের অভিযুক্ত করেছেন। লেখক নিবন্ধটিতে ভারতকে এক বড় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে ইনিয়ে-বিনিয়ে সম্পর্ক সুদৃঢ় করার কথা বলেছেন। লেখক তার নিবন্ধে জানিয়েছেন, ভারতের দ্য প্রিন্ট সংবাদমাধ্যমের প্রধান সম্পাদক শেখর গুপ্তা বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উদ্দেশে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন। চিঠিতে তিনি বলেছেন, ‘ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বড় কোনো সমস্যা নেই। শুধু ভাগ করা স্বার্থ ও পারস্পরিক সুবিধার ক্ষেত্র রয়েছে। যদি ভারতের ওপর আপনার একমাত্র বিরক্তির কারণ এই হয় যে, হাসিনা এখানে আছেন, আপনি সত্যিই আশা করবেন না যে ভারত তাকে আপনার হাতে তুলে দেবে।’
সালেহ উদ্দিন আহমদ তার নিবন্ধে লিখেছেন, ‘যদি আমরা বাস্তব মেনে নিই, ভারত থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, বাংলাদেশের এমন কোনো লেভারেজ বা উপরিশক্তি নেই যে আমরা ভারতকে বাধ্য করতে পারি হাসিনাকে ফেরত দিতে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যেসব মামলা আছে, এগুলো সম্ভবত তাঁর অনুপস্থিতেই এগিয়ে নিতে হবে।’ প্রথম আলোতে প্রকাশিত নিবন্ধ ও শেখর গুপ্তার চিঠির মাধ্যমে এটা স্পষ্ট যে, ভারত শেখ হাসিনাকে কখনো বাংলাদেশের কাছে ফেরত পাঠাবে না।
বাংলাদেশ থেকে শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়ার পর বিগত এক বছর ভারত বাংলাদেশের সাথে একের পর এক শত্রু দেশের মতো আচরণ করছে। অবশ্য বাংলাদেশের বর্তমান স্বাধীন সরকার তার পাল্টা ব্যবস্থা নিচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। সাম্প্রতিককালে ভারত যখন বাংলাদেশের ব্যাপারে কোনো কঠোর নীতি গ্রহণ করে, ঢাকাও তখন পাল্টা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। ভারত যখন স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তখন ঢাকাও পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ভারত তার দেশে বাংলাদেশিদের চিকিৎসাসহ বিভিন্ন কাজে ভিসা বন্ধ করার পর বাংলাদেশও তার নাগরিকদের চিকিৎসার বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে চীনের সাথে নতুন ব্যবস্থা চালুর চুক্তি করছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের মিথ্যা প্রোপাগান্ডা আর শত্রুতামূলক নীতি ও কর্মকাণ্ডের কারণেই ঢাকার সাথে দিল্লির বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন সম্ভব হচ্ছে না। ভারতই আর্ন্তজাতিক রীতিনীতিকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। বিগত কয়েক দশক ধরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে যারা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণের সমূহ ক্ষতি করেছে ভারত তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে। শেখ হাসিনার মতো একজন ফ্যাসিস্ট যে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে। যার বিচার চলছে বাংলাদেশের একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে, তাকে দিল্লি নিরাপদে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে। শুধু আশ্রয়ই নয়, তাকে দিয়ে বাংলাদেশ বিরোধী বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ও বাংলাদেশিদের প্রতি দিল্লির নিবর্তনমূলক নীতিমালা ও আচরণে বাংলাদেশের জনগণ ভারতের প্রতি বিরূপ হয়ে পড়েছে। এককথায় বাংলাদেশের জনগণ ভারত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের সাথে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিমালা ও অবস্থান এককথায় বাংলাদেশ নিয়ে চিন্তিত ব্রাহ্মণ্যবাদি দিল্লি। আগামী দিনে বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক কোন পথে যাবে এবং কি করবে, তা নিয়ে কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতামত চেয়েছে দিল্লির সরকার। তবে কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হলে দিল্লির সাউথ ব্লককে পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবেই তার সাথে আচরণ করতে হবে। সর্বোপরি বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক স্বাভাবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ করতে হলে দিল্লিকে অতীত ভুলে উইন উইন সিচুয়েশন পলিসিতেই ফিরে আসতে হবে।