নতুন সন্ধিক্ষণে দেশের নিরাপত্তা ও রাজনীতি


২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:২৫

চ্যালেঞ্জে সরকার ॥ রাজনৈতিক বয়ানের বিকল্প মালিকানা তৈরি করছে বিরোধীদল

॥ ফারাহ মাসুম ॥
বাংলাদেশের বর্তমান ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তা ও রাজনীতির গতিপথকে একসাথে দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়— দেশটি এখন ক্ষমতা পরিবর্তনের পরের স্বাভাবিকীকরণ পর্যায়ে নয়; বরং এখন নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা, নতুন রাজনৈতিক ভারসাম্য এবং নতুন পররাষ্ট্র-নিরাপত্তা অবস্থান একই সময়ে গড়ে উঠছে। ফলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি একে অন্যকে ক্রমেই বেশি প্রভাবিত করবে।
২০২৪-এর রাজনৈতিক পালাবদলের পর ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি সরকারে এসেছে এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট শক্তিশালী সংসদীয় বিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এখন সংঘাতের কেন্দ্র আর শুধু ‘কে ক্ষমতায় যাবে’ নয়; বরং ‘রাষ্ট্র কীভাবে চলবে এবং জুলাই-পরবর্তী পরিবর্তনের কতটা বাস্তবায়িত হবে’— এটি।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও বিরোধীপক্ষের অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য ইতোমধ্যে প্রকাশ্য। সরকার বলছে, সনদ বাস্তবায়ন করবে এবং বিএনপির ৩১ দফার সংস্কারও এগিয়ে নেবে; প্রধানমন্ত্রী সংসদে সরকার ও বিরোধীদলের সাংবিধানিক সংশোধনে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
কিন্তু বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতির সাথে কার্যকর পদক্ষেপ না মেলায় বিরোধী জোটের ভাষা ক্রমেই কঠোর হচ্ছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর শনিবার ১১ দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান সতর্ক করেছেন, আট দফা দাবি পূরণ না হলে তা এক দফায় রূপ নিতে পারে। দাবিগুলোর মধ্যে নির্বাচন-পরবর্তী সাংবিধানিক সংস্কারের পাশাপাশি জ্বালানি, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনের রাজনীতিকরণ, চাঁদাবাজি-দুর্নীতি ও তিস্তা রয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট এখন আদর্শিক বিভাজনের চেয়ে ‘পরিবর্তনের মালিকানা ও বাস্তবায়ন’কে ঘিরে বেশি।
সরকারের বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা : নতুন সরকার একটি বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক প্রত্যাশা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। মানুষ শুধু সরকার পরিবর্তন চায়নি, রাষ্ট্রের আচরণেও পরিবর্তন প্রত্যাশা করেছে। এখানে তিনটি প্রত্যাশা পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে আসতে পারে— ক. দ্রুত পরিবর্তন; খ. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং গ. রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারাবাহিকতা।
সরকার যদি দ্রুত সংস্কার করতে যায়, প্রতিষ্ঠিত স্বার্থগোষ্ঠীর প্রতিরোধ তৈরি হতে পারে। আবার যদি প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার নামে সংস্কার ধীর হয়, জনগণ বলতে পারে— পুরোনো রাষ্ট্রকাঠামোই নতুন নামে টিকে যাচ্ছে। এই দ্বন্দ্বই আগামী পর্যায়ের রাজনীতির কেন্দ্র হতে পারে।
বিরোধী রাজনীতির চরিত্রও বদলেছে। বর্তমান সংসদে বিরোধী শক্তি শুধু সরকারবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছে না; তারা জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক বয়ানের একটি বিকল্প মালিকানা তৈরি
করতে চাইছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক কৃতিত্ব নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের সংসদীয় বিতর্কও তার একটি উদাহরণ। এখানে ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বৈধতার প্রধান উৎস কী হবে— নির্বাচনের ম্যান্ডেট, জুলাই আন্দোলনের উত্তরাধিকার, নাকি উভয়ের সমন্বয়?
যদি এর উত্তর নিয়ে বড় দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য না হয়, তাহলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সংসদ থেকে রাজপথে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
অর্থনীতি এখন জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় : এখানেই রাজনীতি ও ভূরাজনীতি এক বিন্দুতে এসে মিলেছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর রোববার জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ প্রায় ১৭.৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ডিজেল ১১৫ থেকে ১৩৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা হয়েছে। এর পেছনে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতজনিত আন্তর্জাতিক তেল ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।
তবে এটি নিছক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে তেলের দাম বৃদ্ধি পরিবহন ব্যয় বাড়ায়, এর ফলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি যার পরিণতিতে পণ্যের দাম বাড়ে এবং মূল্যস্ফীতি চাঙ্গা হয়। আর তাতে মানুষের প্রকৃত আয় কমে রাজনৈতিক অসন্তোষ সৃষ্টির চক্র তৈরি হতে পারে।
আর এখানেই ১১ দলীয় জোটের রাজনৈতিক দাবির সঙ্গে অর্থনৈতিক বাস্তবতা যুক্ত হচ্ছে। তাদের বর্তমান আন্দোলনের বড় অংশই জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয়কে কেন্দ্র করে। তাই বাংলাদেশের আগামী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে সরকার মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকট কতটা সামলাতে পারে তার ওপর।
ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হচ্ছে ‘বহুমুখীকরণ।’ এক্ষেত্রে তিনটি শক্তিকে আলাদা করে দেখতে হবে—
ভারত— ভূগোল : ভারতকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিকল্পনা কঠিন। চীন — অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা: চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র— বাজার, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো: যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রফতানি ও বৃহত্তর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ। ওআইসি দেশগুলো বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার।
তাই বাংলাদেশের সামনে আসলে ‘চীন না ভারত’ অথবা ‘চীন না যুক্তরাষ্ট্র’— এমন কোনো বাস্তবসম্মত দ্বৈত পছন্দ নেই। বরং বেশি প্রয়োজন: স্বার্থভিত্তিক বহুমুখীকরণ, কিন্তু কোনো শক্তির ওপর কৌশলগত অতিনির্ভরতা নয়। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলোও বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানকে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে।
চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় সুযোগ এবং ঝুঁকি— দুটিই রয়েছে। তারেক রহমানের জুনের চীন সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, যোগাযোগ, কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা নিয়ে ১৫টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি ও একটি যৌথ বিবৃতি হয়েছিল। এটি বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি করে— অবকাঠামো, শিল্প বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, আধুনিকায়ন, বন্দর ও যোগাযোগ এবং রফতানি বাজারে। কিন্তু সমস্যা হলো বৈচিত্র্যকরণ আর নির্ভরতা— দুটি একই জিনিস নয়। একটি দেশ যদি ভারতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীনের ওপর নির্ভরতা বাড়ায়, তাহলে সেটি কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন নয়; শুধু নির্ভরতার উৎস পরিবর্তন। এই কারণেই চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক যোগাযোগ একইসঙ্গে চালানোর বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রবণতাটি গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের সাথে এখন সম্পর্কের ‘পুনঃসমন্বয়’ চলছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামকে ভারতের নতুন হাইকমিশনার করার সিদ্ধান্ত এবং তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর— দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু কয়েকটি কঠিন ইস্যু এখনো অমীমাংসিত। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ও প্রত্যর্পণ প্রশ্ন; সীমান্ত হত্যা; পানি বণ্টন; বাণিজ্য ভারসাম্য; বিদ্যুৎ ও জ্বালানি; উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা; বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে জনমত ইত্যাদি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তাই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক সম্পূর্ণ উষ্ণতা বা সম্পূর্ণ বিরোধিতা— কোনোটির দিকেই যাচ্ছে না। বরং এটি হচ্ছে-অন্তর্বর্তী ‘রিসেট’— যেখানে প্রতিটি ইস্যুতে আলাদা দরকষাকষি হবে।
বঙ্গোপসাগর এখন বাংলাদেশের নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু
এখানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ঘটছে। আগে জাতীয় নিরাপত্তা মানে ছিল প্রধানত, সীমান্ত+অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা। এখন যুক্ত হচ্ছে সমুদ্র+বন্দর+জ্বালানি+সাবমেরিন কেবল+সাইবার+ড্রোন+সামুদ্রিক সম্পদ। চীন ও ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের সাম্প্রতিক আলোচনায় প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উঠে আসা এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। আর যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা যত বাড়বে, বঙ্গোপসাগরের গুরুত্বও তত বাড়বে।
মিয়ানমার এখন বাংলাদেশের ‘সবচেয়ে কাছের বহিরাগত নিরাপত্তা সংকট’। চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত চ্যালেঞ্জ; কিন্তু মিয়ানমার বাংলাদেশের জন্য সরাসরি নিরাপত্তা ঝুঁকি। কারণ এখানে একইসঙ্গে রয়েছে— ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা; সীমান্তের ওপারে সশস্ত্র গোষ্ঠী; মাদক; অস্ত্র; মানব পাচার; রাখাইন রাজ্যের অস্থিতিশীলতা; প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা। এর ফলে রোহিঙ্গা সমস্যাকে শুধু মানবিক ইস্যু হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি এখন শরণার্থী নিরাপত্তা+সীমান্ত নিরাপত্তা+সামুদ্রিক নিরাপত্তা+আঞ্চলিক কূটনীতি— এই চারটির সমন্বিত সমস্যা।
সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন : বাংলাদেশ আর শুধু ‘ভারতের প্রতিবেশী’ নয়, এটি সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাংলাদেশের অবস্থান এখন একইসঙ্গে ভারতের পূর্ব সীমান্তের রাষ্ট্র; বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় রাষ্ট্র; চীন-ভারত প্রতিযোগিতার মধ্যবর্তী ভূখণ্ড; ইন্দো-প্যাসিফিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অবস্থান; মিয়ানমার ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবেশদ্বার।
এই কারণে বাংলাদেশের কৌশলগত মূল্য বাড়ছে। কিন্তু কৌশলগত মূল্য বাড়া এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জন করা এক জিনিস নয়। স্বাধীন কৌশলগত অবস্থানের জন্য প্রয়োজন— শক্তিশালী অর্থনীতি+শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা+জ্বালানি নিরাপত্তা+দক্ষ কূটনীতি+রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা আসলে ‘ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা’। এখানে একটি গভীর বিষয় আছে। বাংলাদেশ যত বেশি ভূরাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, তত বেশি বিদেশি শক্তি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে চাইবে। কিন্তু যদি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা দুর্বল, জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত, প্রশাসন রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত, আইনশৃঙ্খলা দুর্বল, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম ঐকমত্য না থাকে,তাহলে বিদেশনীতি স্বাধীন রাখা কঠিন হবে।
অর্থাৎ কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন শুরু হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নয়, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা থেকে।
আগামী ১২ মাসে কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে?
আগামী ১২ মাসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক গতিপথ বোঝার জন্য পাঁচটি বিষয় বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণযোগ্য হবে। এগুলো কোনো রাজনৈতিক পক্ষের পক্ষে বা বিপক্ষে রায় নয়; বরং পরিস্থিতি মূল্যায়নের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
প্রথমত, জুলাই সনদ ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার। সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা এবং সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া কতটা এগোয়— তা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
দ্বিতীয়ত, জীবনযাত্রার ব্যয়। জ্বালানি, খাদ্য, পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা অর্থনীতির একটি বড় সূচক হবে।
তৃতীয়ত, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক। সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি, জ্বালানি ও নিরাপত্তা সহযোগিতায় সম্পর্ক পুনর্গঠন কতটা বাস্তব ফল দেয়, তা নজরে থাকবে।
চতুর্থত, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক। অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রকল্পগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং সেগুলোর আর্থিক ও কৌশলগত শর্ত কী হয়, তা গুরুত্বপূর্ণ।
পঞ্চমত, মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা সংকট। প্রত্যাবর্তনে অগ্রগতি এবং সীমান্তে নিরাপত্তা পরিস্থিতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও জাতীয় নিরাপত্তার বড় পরীক্ষা হয়ে থাকবে।
সবচেয়ে গভীর রাজনৈতিক সমীকরণ
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে কয়েকটি আন্তঃনির্ভরশীল উপাদানের সমীকরণে দেখা যায়। জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক বৈধতা রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের ভিত্তি তৈরি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নির্বাচনী ম্যান্ডেট— নির্বাচনের মাধ্যমে পাওয়া জনসমর্থন সরকারকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেয়।
তবে রাজনৈতিক বৈধতা ও নির্বাচনী ম্যান্ডেট একাই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে প্রয়োজন অর্থনৈতিক সক্ষমতা, যাতে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার চাপ সামাল দেওয়া যায়। একইসঙ্গে সংস্কার বাস্তবায়ন নির্ধারণ করবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো আইনশৃঙ্খলা। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ পরিবেশ ও নাগরিক আস্থার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সর্বশেষ রয়েছে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক— যেখানে অর্থনীতি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও কৌশলগত স্বার্থকে সমন্বয় করতে হবে।
অর্থাৎ সমীকরণটি দাঁড়ায়— রাজনৈতিক বৈধতা+নির্বাচনী ম্যান্ডেট+অর্থনৈতিক সক্ষমতা+সংস্কার+আইনশৃঙ্খলা+ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি=টেকসই রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা।
এই উপাদানগুলোর কোনো একটি দুর্বল হলে তার চাপ অন্য ক্ষেত্রগুলোয়ও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি সমীকরণে ধরলে জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক বৈধতা হলো— নির্বাচনী ম্যান্ডেট; অর্থনৈতিক সক্ষমতা; সংস্কার বাস্তবায়ন; আইনশৃঙ্খলা এবং ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য।
রাষ্ট্রের নতুন স্থিতিশীলতার যেকোনো একটি বড় অংশ দুর্বল হলে অন্য অংশগুলোর ওপর চাপ বাড়বে।
‘শাসন রূপান্তর’ থেকে ‘রাষ্ট্র পুনর্গঠন’
বাংলাদেশ এখন ‘শাসন রূপান্তর’ থেকে ‘রাষ্ট্র পুনর্গঠন’ এর পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। ২০২৪-২৬ ছিল মূলত ক্ষমতা ও রাজনৈতিক বৈধতার পুনর্বিন্যাসের সময়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে— এই পরিবর্তন কি প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্র সংস্কারে পরিণত হবে, নাকি পুরোনো রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাই নতুন দল ও নতুন ভাষায় ফিরে আসবে।
একই সময়ে বাইরের পৃথিবীও বদলাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা এখন বাণিজ্য, এআই, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা— সব ক্ষেত্রেই চলছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আবার জ্বালানি বাজারে ধাক্কা দিচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশে জ্বালানি মূল্যে পড়েছে। তাই বাংলাদেশের সামনে একটি নয়, তিনটি পরিবর্তন একসঙ্গে চলছে অভ্যন্তরে— রাষ্ট্র পুনর্গঠন; এই অঞ্চলে— ভারত-চীন প্রতিযোগিতার নতুন ভারসাম্য এবং বৈশ্বিকভাবে— বহু মেরুকরণ ও শক্তির প্রতিযোগিতা।
এই তিনটির মধ্যে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রশ্ন হবে— বহুমুখী সম্পর্ককে কি সত্যিকারের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনে পরিণত করা যাবে, নাকি এক নির্ভরতা থেকে আরেক নির্ভরতায় সরে যাবে?