জনগণ পক্ষে থাকলে দেশ ছেড়ে কেউ পালায় না: এটিএম আজহার
১৩ জুন ২০২৫ ০০:২৩
তারা আজ কোথায়? তারা পালিয়ে যায়নি? তাদের ঔদ্ধত্য ধ্বংস করে দিয়েছে আল্লাহ। জনগণ যদি তাদের পক্ষে থাকতো তাহলে দেশ ছেড়ে পালাতে হবে কেন? আমাদেরও সুযোগ ছিলো, আমরা পালাইনি।
গত বৃহস্পতিবার (১২ জুন) সকালে তারাগঞ্জ উপজেলা জামায়াতের আয়োজনে উপজেলা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে শুকরানা সমাবেশ ও ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
দীর্ঘদিন পর কারামুক্ত হয়ে প্রথমবারের মতো নিজ জেলা রংপুরে আগমন উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, আমাদের পালানোর জায়গা নেই, আমাদের জন্ম বাংলাদেশে, বাংলাদেশেই আমরা মৃত্যুবরণ করবো। যাদের জন্ম বাংলাদেশে কিন্তু ঠিকানা আরেক দেশে আছে তারা একটু শব্দ হলেই সেখানে পালিয়ে যায়। এদের কাছে দেশ নিরাপদ নয়। আপনারা সামনে খেয়াল রাখবেন, যারা আধিপত্যবাদী শক্তির হাতে বন্দি তারা যতই বলুক না কেন তাদের দ্বারা এ বাংলাদেশ নিরাপদ নয়। তাই বাংলাদেশের মধ্যে থেকেই যারা দেশের জনগণের জন্য কাজ করে তারাই আপনাকে নিরাপত্তা দিতে পারে, তারাই আপনাকে স্বাধীনতা দিতে পারে, সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারে, দেশের সীমানা রক্ষা করতে পারে। তারাই ঈমান, আকিদা, চিন্তা রক্ষা করতে পারে। তাই আগামী নির্বাচনে আপনারা সেটি খেয়াল রাখার চেষ্টা করবেন।
তিনি বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে অনেক গল্প সাজানো হয়েছিলো। আমার মুক্তির কারণে এটি প্রকাশ পেয়েছে। এর আগে যাদের ফাঁসি দেয়া হয়েছে, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ পেলে দেখা যাবে তাদের অন্যায়ভাবে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের সাথে যারা, যেখানে, যেভাবেই জড়িত আমি আপনাদের মাধ্যমে সরকারকে জানাতে চাই তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির বিধান করা হোক। তা না হলে আইনের শাসন থাকবে না।
তিনি আরো বলেন, এখন আদালতে মানুষ আস্থা পেতে শুরু করেছে। আগে আদালত চলত দলীয় রাজনীতিতে, দলীয়ভাবে, এখন সে আদালত স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীন দেশে স্বাধীন আদালত পেয়েছি আমরা। যার কারণে আমি ন্যায়বিচার পেয়েছি।
এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, আমি আপনাদের কাছে একটি কথা বলতে চাই, আপনারা হয়তো জানেন না, যখন এ মামলা চলে মীর কাশেম আলী সাহেব তখন আমেরিকায় ছিলেন। উনাকে অনেক বন্ধুবান্ধব পরামর্শ দিয়েছিলেন আপনি এ অবস্থায় বাংলাদেশে যাবেন না। বাংলাদেশে গেলে আপনাকে অন্যায়ভাবে ফাঁসির নাটক সাজাবে। তিনি বলেছিলেন হায়াত-মাওতের মালিক আল্লাহ, আমি কোনো অপরাধ করিনি। আমি কেন আমার দেশে যাব না? মৃত্যু হলে আমার দেশেই হবে। এরপর তিনি এসেছেন, তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে এবং ফাঁসি দেয়া হয়েছে। তিনি পালিয়ে যাননি।
তিনি বলেন, আমারতো রায় হয়ে গেছিলো ফাঁসি কার্যকর করা হবে, কিন্তু আল্লাহর রহমত আমি মুক্ত হলাম, আর আমাকে যারা ফাঁসি দেয়ার চেষ্টা করেছিলো তারা এখন কোথায় আছে? তাদের এখন কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। আল্লাহ সব কিছুই করতে পারেন ৫ আগস্ট তার সব থেকে বড় প্রমাণ।
জামায়াতের অন্যতম শীর্ষ এ নেতা বলেন, জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধীদল মিলে সাড়ে ১৫ বছর আন্দোলন করলাম সরকারের কিছুই করতে পারলাম না। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া সাধারণ ছাত্ররা যে আন্দোলন গড়ে তুলল তাতে আওয়ামী লীগের পতন হতে বাধ্য হলো। আমি তাই এ সব যুবক ভাই যারা এ বিপ্লব ঘটিয়েছেন তাদের অভিনন্দন জানাই, তাদেরকে স্যালুট জানাই, তারা আধিপত্যবাদী শক্তি-ফ্যাসিস্ট সরকারের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে পেরেছেন। যারা এ আন্দোলনে জীবন দিয়ে শহীদ হয়েছেন, অনেক ভাই পঙ্গু হয়েছেন, আমি পিজি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলাম সেখানে অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করে হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন তাদের চিকিৎসারও পরিপূর্ণ সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। আমি তাদের সুচিকিৎসার দাবি করছি এবং তাদের ত্যাগ যেন আল্লাহ কবুল করেন সেই দোয়াও করছি।
তিনি বলেন, আজকে আমি মুক্ত, আমি স্বাধীন। আমি আপনাদের বলতে চাই, যে অপরাধে আমাকে ফাঁসির রায় দেয়া হয়েছিলো আল্লাহর কসম সেই অপরাধে আমি সামান্যতম জড়িত ছিলাম না। আমাকে অন্যায়ভাবে এটা করা হয়েছে। একজন বলেছেন আমি শুধু আফসোস করি আমার বিরুদ্ধে যারা অভিযোগ গঠন করেছেন, তারা করতেই পারেন কিন্তু যারা বিচারপতি হবেন তাদের তো বিবেক থাকা দরকার। তিন কিলোমিটার দূর থেকে আমাকে নাকি দেখেছে, এর ভেতরে নাকি অনেক বাড়িঘরও ছিলো, এটাকি সম্ভব? তিন কিলোমিটার দূরে কি খালি চোখে দেখা সম্ভব? যারা সাক্ষী দিয়েছেন তারা মিথ্যা সাক্ষী দিতেই পারেন কিন্তু বিচারপতিদের বিবেক গিয়েছিলো কোথায়? তারা বিবেক বিক্রি করেছিলেন আরেক জায়গায়। এই বিবেকহীন বিচারপতিরা যতদিন বাংলাদেশে থাকবে ততদিন মানুষ সুবিচার পাবে না।
এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, আমরা চাই নির্বাচন তাড়াতাড়িই হোক। এপ্রিলের মধ্যে নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে, এর মধ্যে যদি সংস্কার সম্পন্ন হয়, আমরা এপ্রিলের মধ্যেই নির্বাচনের কাজ শুরু করবো। সেই নির্বাচন যেন অবাধ হয়, সুষ্ঠু হয়, নিরপেক্ষ হয়, আমরা সেই দাবি সরকারের কাছে করবো। আগের মতো যেন ভোট চুরি ভোট ডাকাতি না হয়। আশাকরি এবার সেটি করার সুযোগ পাবে না। আপনারা অনেকেই ১৫ বছর ভোট দিতে পারেন নাই। এজন্য ভোটের প্রতি আপনাদের অনেকের বিতৃষ্ণা আছে। আমি অনুরোধ করবো এবার আপনাদের ভোট বিপ্লব ঘটাতে হবে। আমাদের সবাইকে ভোট কেন্দ্রে যেতে হবে। আমাদের অধিকারকে প্রয়োগ করতে হবে। সৎ, যোগ্য লোককে নির্বাচিত করতে হবে। যদি নির্বাচিত করতে ভুল করি, আবার আপনাদের বিপদে পড়তে হবে।
তিনি বলেন, আমি অনেক বছর থেকে কাজ করছি, আপনারা আমাকে চেনেন, আমি ছিয়ানব্বইতে নির্বাচন করেছি, ২০০০ সালে নির্বাচন করেছি, ২০০৯ সালে নির্বাচন করেছি। আপনারা চান নাই আমি এমপি নির্বাচিত হতে পারি নাই, সামনে যদি আপনারা চান আমি এমপি নির্বাচিত হতে পারবো। জামায়াতে ইসলামী জোর করে, ভোটকেন্দ্র দখল করে, ভোটারদের কিনে নিয়ে জয় লাভ করতে চায় না। আমরা জনগণের স্বতস্ফুর্ত সমর্থনের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবর্তন ঘটাতে চাই। এ জন্য জামায়াতে ইসলামীর শ্লোগান- আল্লাহর আইন চাই, সৎ লোকের শাসন চাই।
তিনি আরো বলেন, আপনাদের কাছে আহ্বান করবো আপনারা আমাকে সহযোগিতা করবেন, আপনারা আমাকে সহযোগিতা করলেই আমি আপনাদের খেদমত করার সুযোগ পাবো। আমি ব্যক্তিগতভাবে জামায়াতে ইসলামী করলেও আমি আচরণে সব দলের লোককেই ভালোবাসি।
এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, আমাদের বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জের অনেক পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। যদি আগামী নির্বাচনে এমপি হিসেবে নির্বাচিত হতে পারি আমি ওয়াদা করছি, একটি হারাম পয়সাও আমার পেটে ঢুকবে না ইনশাআল্লাহ। আমি বলতে পারবো জামায়াতে ইসলমীতে যোগদানের পর থেকে একটি হারাম টাকা আমি খাইনি। আল্লাহ আমার অভাব দেয় নাই। আমার টাকা, সম্পদ নাই কিন্তু আমাকে চলার সুযোগ করে দিয়েছেন। এইজন্য এমপি হলে কিন্তু অনেক কাজ করার সুযোগ থাকে। আপনারা অনেকেই হয়তো জানেন না, অনেক অনুদান সরকার থেকে পাওয়া যায়। এই অনুদানগুলো যদি জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা হয় তাহলে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। আমি এমপি ছিলাম না কিন্তু অনেক মসজিদকে সরকার থেকে চাঁদা নিয়ে দিয়েছি। যারা এমপি ছিলেন, শুনেছি মসজিদের নামে টাকা নিয়ে নিজেরাই টাকা শেষ করে দিয়েছে। তাই আপনারা যদি আমাকে নির্বাচিত করেন, তাহলে আমি ওয়াদা করছি সরকারি কোষাগারের একটি পয়সাও আমার পেটে যাবে না। সরকার নির্ধারিত জায়গায় সব টাকা ব্যবহার হবে ইনশাআল্লাহ।
সমাবেশে তারাগঞ্জ উপজেলা শাখার আমীর এস এম আলমগীর হোসেনের সভাপতিত্বে প্রধান মেহমান হিসেবে বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদের সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল হালিম, কেন্দ্রীয় কর্ম-পরিষদের সদস্য অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও রংপুর দিনাজপুর অঞ্চলের টিম সদস্য মাহবুবর রহমান বেলাল, রংপুর মহানগর আমীর এটিএম আজম খান, তারাগঞ্জের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা দুলাল পাটোয়ারী, অনিল কুমার রায়, রংপুর জেলা আমীর অধ্যাপক গোলাম রব্বানী, নীলফামারী জেলা আমীর আব্দুস ছাত্তার, রংপুর জেলা শূরা সদস্য মাওলানা এনামুল হক, রংপুর মহানগর ছাত্রশিবির সভাপতি নুরল হুদা, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন রংপুর জেলা পরিচালক আবুল হোসেন বাদল, রংপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর শূরা সদস্য মোতালেব হোসেন, রংপুর জেলা মহানগর শ্রমিক কল্যাণ ফেডারশনের সভাপতি এডভোকেট কাওছার আলী, রংপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা মোস্তাক, বদরগঞ্জ উপজেলা আমীর কামরুজ্জামান কবির, সৈয়দপুর উপজেলার আমীর হাফিজ মাওলানা মো. মন্তাকিম, রংপুর সদর উপজেলার আমীর মাওলানা মাজহারুল ইসলাম, রংপুর জেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন সভাপতি জয়নাল আবেদীন, পীরগঞ্জ উপজেলা আমীর মাওলানা নুরল আমিন, রংপুর জেলা শাখার শিবির সভাপতি ফিরোজ মহম্মদ প্রমুখ।