সংক্ষিপ্ত বিশ্ব সংবাদ
১ নভেম্বর ২০২৪ ১৭:৫৬
ইউরোপজুড়ে চ্যালেঞ্জের মুখে মুসলিমরা
ইউরোপজুড়ে মুসলিমদের জীবন ক্রমশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রভাবশালী মানবাধিকার সংস্থা এজেন্সি ফর ফান্ডামেন্টাল রাইটসের (এফআরএ) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোয় বসবাসরত প্রায় অর্ধেক মুসলমান তাদের দৈনন্দিন জীবনে বৈষম্য ও ঘৃণামূলক বক্তব্যের সম্মুখীন হচ্ছেন। বিং মুসলিম ইন ইউরোপ: এক্সপেরিয়েন্সেস অব মুসলিমস শিরোনামে একটি জরিপ করে এফআরএ। এতে ইইউ’র ১৩টি দেশের নয় হাজার ৬০০ মুসলিম অংশ নেয়। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদ ও বৈষম্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। জরিপটি ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২২ সালের অক্টোবরের মধ্যে করা হয়েছে। জরিপে অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রীস, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, সুইডেনে বসবাসকারী মুসলমানরা অংশ নেন। মুসলিমরা জানিয়েছেন, তাদের সন্তানেরা স্কুলে বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। সেইসঙ্গে তারা চাকরির সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে অসমতা, এমনকি বাড়ি ভাড়া বা কেনার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের আগে ইউরোপের দেশগুলোয় মুসলিমরা বর্ণবাদের শিকার হয়েছেন ৩৯ শতাংশ। এরপর ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ শতাংশে। যেসব দেশে মুসলিমরা বেশি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তার মধ্যে অন্যতম অস্ট্রিয়া (৭১ শতাংশ), জার্মানি (৬৮ শতাংশ) এবং ফিনল্যান্ডে (৬৩ শতাংশ)। তবে মুসলিমরা যেখানে কম বৈষম্যের শিকার তার মধ্যে প্রথমে রয়েছে সুইডেন (২২ শতাংশ), স্পেন (৩০ শতাংশ) এবং ইতালি (৩৪ শতাংশ)। গার্ডিয়ান বলছে, জরিপটি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগেই সম্পন্ন হয়েছে। ওইদিন গাজা থেকে ইসরাইলে ব্যাপক হামলা চালায় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস। ওইদিনের পর থেকে ইউরোপের দেশগুলোয় মুসলিমবিরোধী ঘটনা আরও বেড়েছে। এ জরিপের সহকারী লেখক ভিদা বেরেসনেভিসিউটি বলেছেন, আমরা দেখছি মুসলমানদের অবস্থা খারাপ হচ্ছে। ইইউতে মুসলিম হিসেবে বাস করা আরও জটিল হয়ে উঠছে। আনাদোলু এজেন্সি, দ্য গার্ডিয়ান।
মধ্যপ্রাচ্যে এখনো ‘ভয়াবহ পরিণতি’ এড়ানো সম্ভব : রাশিয়া
সম্প্রতি ইরানে দখলদার ইসরাইলের হামলার পরও মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘ভয়াবহ পরিণতি’ এড়ানো সম্ভব বলে বিশ্বাস করেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। গত ২৮ অক্টোবর সোমবার কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ আলী আল-ইয়াহিয়ার সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। ল্যাভরভ বলেন, এ মুহূর্তে ‘ভয়াবহ পরিণতি’ এড়ানো সম্ভব হয়েছে। কারণ এখনো এর সম্ভাবনা রয়েছে। রাশিয়া আশা করে যে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ মধ্যপ্রাচ্যের (পশ্চিম এশিয়া) উত্তেজনা কমাতে সহায়তা করবে। এমনটা উল্লেখ করে ল্যাভরভ বলেন, ‘আমি খুব আশাবাদী যে, সাম্প্রতিক আলোচনাগুলো পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাওয়া থেকে রোধ করবে। আমরা উত্তেজনা কমাতে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি’। গত শনিবার ইরান দাবি করে যে, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইসরাইলি আগ্রাসন মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে ইরান এও জানিয়েছে যে, তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘনের জন্য ইসরাইলকে অবশ্যই কঠোরভাবে শাস্তি দেওয়া হবে। মেহের নিউজ এজেন্সি।
গাজায় ইসরাইলি হামলা এবং গণহত্যার ‘উদ্দেশ্য স্পষ্ট’ : দক্ষিণ আফ্রিকা
অবরুদ্ধ গাজায় চলমান হামলা এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। এ বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতে (ওঈঔ) তুলতে দেশটি পদক্ষেপ নিয়েছে এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজীবীরা বিভিন্ন তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করে আদালতে উপস্থাপন করেছেন, যা গাজায় ইসরাইলের বর্বর সামরিক হামলাকে ‘গণহত্যার ইচ্ছা’ হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে। এ উদ্যোগটির ফলে আন্তর্জাতিক মহলে একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ও আইনি প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত সোমবার (২৮ অক্টোবর) তারিখে দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক আদালতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনতে তথ্য-প্রমাণ জমা দিয়েছে। তারা দাবি করছে যে, ইসরাইলি বাহিনী গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালানোর পরিকল্পনা করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজীবী এবং কূটনীতিকদের মতে, ইসরাইলি কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং গাজায় সংঘটিত হামলার ঘটনার ধারাবাহিকতায় ইসরাইলের গণহত্যার প্রমাণ দেয়। এর আগে ইসরাইলি মন্ত্রীদের বিভিন্ন বক্তব্যে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ এবং সেখানে ইসরাইলি পুনর্বাসনের কথা বলা হয়েছে, যা দক্ষিণ আফ্রিকা বিচার বিভাগীয় পর্যায়ে প্রশ্ন তুলেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজীবীরা গাজায় ইসরাইলের সামরিক পদক্ষেপকে গণহত্যা হিসেবে প্রমাণ হিসেবে সংগৃহীত তথ্যাদির মধ্যে শত শত পৃষ্ঠা বিশদ বিবরণ, গাজার ছবি, ভিডিও ফুটেজ এবং ইসরাইলি কর্মকর্তাদের বক্তব্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার কূটনীতিকরা উল্লেখ করেছেন, গাজায় ইসরাইলের সামরিক কার্যক্রম এবং উচ্ছেদের কথা বলা স্পষ্টতই ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের গণহত্যার পরিকল্পনার অংশ বলে মনে করা হয়। গত বছর অক্টোবর থেকে চলমান এ বর্বর হামলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৩,০০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যা দক্ষিণ আফ্রিকার মতে ‘গণহত্যার ধারা’র পরিচয় বহন করে।
প্রমাণগুলোয় ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োয়াভ গালান্টের মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বক্তব্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ গালান্ট নভেম্বর ২০২৩-এ বলেছিলেন যে, তিনি গাজার ফিলিস্তিনিদের সাদা পতাকা নিয়ে চলে যেতে দেখেছেন, যা তার উচ্ছেদের ইচ্ছাকে নির্দেশ করে। দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজীবীরা এ বক্তব্যগুলোকে গাজায় সংঘটিত ধ্বংসযজ্ঞের পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
এ মামলা ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ কারণ, এটি বর্তমানকালে সংঘটিত গণহত্যার অভিযোগের বিষয়ে একটি বিচারিক নজির স্থাপন করতে পারে। সাধারণত এ ধরনের মামলাগুলো অতীতে সংঘটিত গণহত্যার পর দায়ের করা হয়েছিল, যেমন স্রেব্রেনিকা ও রুয়ান্ডা গণহত্যার ক্ষেত্রে দেখা গেছে। এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা তার দেশের পদক্ষেপকে আত্মবিশ্বাস হিসেবে প্রকাশ করেছেন এবং আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার পাবার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
ইসরাইলকে দোষী সাব্যস্ত করা হলে এর বাস্তবিক প্রভাব ইসরাইলের সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ করবে না, তবে এটি অন্যান্য দেশগুলোকে তাদের সাথে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে। এ রায় একটি অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে এবং অন্য দেশগুলোকে সামরিক সহায়তা পুনর্বিবেচনা করতে উৎসাহিত করতে পারে। প্রেসিডেন্ট রামাফোসা এ প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা আশা করি বিশ্ব নীরবে দাঁড়িয়ে থাকবে না এবং নিরীহ মানুষদের হত্যার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবে।”
দক্ষিণ আফ্রিকার এ পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা এবং শান্তির আশা করা যায়। গণহত্যা একটি মারাত্মক অপরাধ এবং এটি বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এগিয়ে আসা উচিত বলে তারা মনে করে। এ মামলার ফলাফল শুধু গাজা ও ইসরাইলের জন্য নয়, বরং সারা বিশ্বে সামরিক হামলার এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনি বিচার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে দক্ষিণ আফ্রিকা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। আল-জাজিরা।
গ্রন্থনা ও সম্পাদনা : আবদুল কাইউম খান