একান্ত সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক গোলাম আযম

নিজেদের এবং দেশের স্বাধীন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাইলে অবশ্যই ইসলামকে জীবনযাপনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে

হারুন ইবনে শাহাদাত
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৫:৫৬

জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর ও ভাষাসৈনিক অধ্যাপক গোলাম আযমের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন হারুন ইবনে শাহাদাত -ফাইল ছবি

সাপ্তাহিক সোনার বাংলার সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর ও ভাষাসৈনিক অধ্যাপক গোলাম আযম বলেছেন, নিজেদের এবং দেশের স্বাধীন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাইলে অবশ্যই ইসলামকে জীবনযাপনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ভাষাসৈনিক অধ্যাপক গোলাম আযম উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অনেক স্মরণীয় ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন। এ প্রবীণ জননেতা ও বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে মানবজীবনের যাবতীয় সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রামে ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। এ সংগ্রামী নেতা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র আর অপপ্রচারের শিকার হয়ে হাসিনা সরকারের কারাগারে পিজি হাসপাতালের প্রিজন সেলে ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর ইন্তেকাল করেছেন। ষড়যন্ত্রকারীরা মিথ্যার কালো পর্দার আড়ালে তার স্বর্ণোজ্জ্বল অনেক অবদানকে ঢেকে রাখার অপপ্রয়াস চালিয়েছে নিরন্তরভাবে, তার ইন্তেকালের পরও তা বন্ধ হয়নি। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৭ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার যে সংগ্রাম শুরু হয়, তার সাথে তিনি প্রথম থেকেই প্রত্যক্ষভাবে ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে তাকে হাজতবাসসহ নানা নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। গত ২০১১ সালের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে এ প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মুখোমুখি হয়েছিল সাপ্তাহিক সোনার বাংলা। তার এ সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন হারুন ইবনে শাহাদাত। ছবি তুলেছেন আসফাকুর রহমান তালুকদার।
সোনার বাংলা: কোন প্রেক্ষাপটে ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল?
অধ্যাপক গোলাম আযম: ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ডাকটিকিট, খাম, মানি অর্ডার ফরম প্রভৃতি সরকারি ফরম ছাপা হয়ে বের হয়। দেখা গেল, এগুলো লেখা হয়েছে উর্দু ও ইংরেজি ভাষায়। এতে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা নেই। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে তমদ্দুন মজলিস উর্দুর সাথে বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবিসংবলিত একটি পুস্তিকা ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করে। এ পুস্তিকায় তিনজনের লেখা স্থান পায়। এরা হলেন- তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাসেম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহার হোসেন এবং তৎকালীন ইত্তেহাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদ। এখানে আর একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, তা হলো ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিস গঠন করা হয়।
১৯৪৭ সালের আরেকটি ঘটনা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা তীব্রতর করে, তা হলো পাকিস্তানের তৎকালীন কেন্দ্রীয় পাবলিক সার্ভিস কমিশনের শ্বেতাঙ্গ সচিব মি. গুড ইন ১৫ নভেম্বর তারিখে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে উচ্চতম সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার বিষয় উল্লেখ করে একটি সার্কুলার পাঠান। এতে ৩১টি বিষয় দেয়া হয়। এর মধ্যে ৯টি ছিল ভাষা। এসব ভাষার মধ্যে উর্দু, হিন্দি, ইংরেজি, জার্মান, ফ্রেঞ্চ; এমনকি মৃতভাষা লাতিন ও সংস্কৃতও ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা ছিল না। এ সার্কুলার প্রকাশের কঠোর সমালোচনা করে অধ্যাপক আবুল কাসেম আহমদ ইত্তেহাদ পত্রিকায় বিবৃতি দেন। এ সম্পর্কে কড়া সম্পাদকীয় লেখেন পত্রিকার সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদ।
এদেশের ছাত্র-জনতা বুঝতে পারে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করে, বাংলা ভাষাকে এভাবে নির্বাসনে পাঠানোর যে আয়োজন করেছে, তা বাস্তবায়িত হলে বাংলা ভাষাভাষী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কার্যত অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীতে পরিণত হবে। কারণ তারা উর্দু জানত না। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করলে পাঠ্যপুস্তক হবে উর্দু, অফিস-আদালতের ভাষা হবে উর্দু। উর্দু না জানলে তারা কোনো চাকরিও পাবে না। রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা না পেলে বাংলা ভাষা এভাবে হয়তো একদিন লেখ্য ভাষা থেকে শুধু মুখের ভাষায় পরিণত হবে। এমন এক প্রেক্ষাপটে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ; বিশেষ করে ছাত্ররা উর্দুর সাথে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃত দেয়ার জন্য আন্দোলন শুরু করে।
সোনার বাংলা: ভাষা আন্দোলনের কোন কোন পর্যায়ে আপনি ভূমিকা পালন করেন?
অধ্যাপক গোলাম আযম: আমি ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ থেকে প্রত্যক্ষভাবে ভাষা আন্দোলনে শরিক হই। এই দিন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে হরতাল পালিত হয়। ১১ মার্চের পূর্বে ভাষার প্রশ্নে কোনো গণবিক্ষোভ বা ধর্মঘট হয়েছে বলে মনে পড়ে না। ১৯৪৮ সালে কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আগমনের পূর্বে এ দাবির যথার্থতা তুলে ধরার জন্যই প্রথম গণদাবি হিসেবে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। হরতাল সফল করতে আমি ডাকসুর জিএস হিসেবে ছাত্রদের সংগঠিত করি। বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত করে পিকেটিংয়ের জন্য রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোয় পাঠাই। আমি নিজেও একটি গ্রুপ নিয়ে টিএন্ডটি অফিস বর্তমান টেলিফোন একচেঞ্জ ভবনের কাছে যাই। এ বিক্ষোভের মূলে ছিল প্রধানত ছাত্ররা। ভাষার দাবিতে প্রথম গণবিক্ষোভ, ধর্মঘট বা হরতাল যাই বলি না কেন, ১১ মার্চ ঐতিহাসিক মর্যাদা পাওয়ার দাবি রাখে। ১৯৫২ সালে আমি রংপুর কারমাইকেল কলেজে ছিলাম। ছাত্রজীবন শেষ করে সেখানে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছি। ভাষা আন্দোলনের উত্তাল ঐ সময়ে সেখানে আমি, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক জমির উদ্দীন ও দর্শন বিভাগের অধ্যাপক কলিমুদ্দীন আহমদ এবং সেখানকার স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মী ও ছাত্রদের নিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করি। কয়েকজন ছাত্রসহ আমি এবং জমির উদ্দীন ও কলিমুদ্দীন আহমদ গ্রেফতার হই।
সোনার বাংলা: আপনি তো ১৯৪৮ সালেও গ্রেফতার হয়েছিলেন?
গোলাম গোলাম আযম : হ্যাঁ। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে হরতালে পিকেটিংয়ের সময় আমাকেসহ ১০-১২ জনকে তেজগাঁও থানা-পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। সারা দিন থানাহাজতে আটকে রাখে। হাজতখানার ছাদ ছিল ভাঙা। আমরা সবাই বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম। মনে পড়ে আশপাশের জনগণ আমাদের জন্য গুড়মুড়ি নিয়ে আসে, আমরা তাই খেয়ে সারা দিন কাটাই। সারা দিন হাজতবাসের পর সন্ধ্যার সময় আমাদের ছেড়ে দেয়।
সোনার বাংলা: ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চেও বিক্ষোভ স্তিমিত হয় কীভাবে?
অধ্যাপক গোলাম আযম: পরিস্থিতি শান্ত করতে খাজা নাজিমুদ্দিন সরকারের পক্ষ থেকে ছাত্রদের সাথে ৭ দফা চুক্তি সম্পাদন করেন। ১৫ মার্চ এ চুক্তি সম্পাদন হয়। তিনি কথা দেন বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে পার্লামেন্টে প্রস্তাব আনবেন এবং পাসের ব্যবস্থা করবেন।
সোনার বাংলা : কায়েদে আযমের সফরের সময় কি রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছিল?
গোলাম আযম : ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ তিনি ঢাকা আসেন। ২১ মার্চ বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তিনি ভাষণ দেন। আমি মঞ্চের পেছনে দাঁড়িয়ে তার ভাষণ শুনছিলাম। তিনি ইংরেজিতে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। একমাত্র উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষাÑ তিনি তার বক্তৃতায় এ কথা উল্লেখ করার পর আমি চলে আসি। বাকি বক্তৃতা রেডিওতে শুনি। সেখানে কেউ কোনো প্রতিবাদ করেনি। তবে কার্জন হলে বক্তৃতার সময় তিনি একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু বলার সাথে সাথে নো, নো, নো বলে প্রতিবাদ ওঠে। এছাড়া আর তেমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
সোনার বাংলা : ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের আপনি আর কী ভূমিকা পালন করেছেন?
অধ্যাপক গোলাম আযম: ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ঢাকায় আসেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়াম মাঠে ছাত্রদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। তাকে ২৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিসংবলিত একটি ঐতিহাসিক স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। এ স্মারকলিপি প্রণয়নের দায়িত্ব ছিল তৎকালীন ছাত্রনেতা সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভিপি (পরবর্তীতে বিচারপতি) আব্দুর রহমান চৌধুরীর ওপর। স্মারকলিপিটি ডাকসুর কাউকে দিয়ে পেশ করার ব্যাপারে চারটি হলের ছাত্র সংসদের নেতৃবৃন্দ ঐকমত্যে পৌঁছেন। ডাকসুর ভিপি ছিলেন অরবিন্দু বোস। তিনি যেহেতু হিন্দু, তাই তাকে দিয়ে পাঠ করালে সরকার বিষয়টিকে ভিন্নভাবে চিত্রিত করতে পারে। এদিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত হয় ডাকসুর জিএস অর্থাৎ আমার ওপর দায়িত্ব অর্পিত হয়। রাষ্ট্রভাষা বাংলার কথাটি ছিল শেষের দিকে। এর আগে প্রাদেশিকতায় আমরা বিশ্বাস করি না, এমনভাবে আঞ্চলিকতার নিন্দার কথা বলা ছিল, এ প্যারাটি পড়ার সময় ছাত্রছাত্রীরা তুমুল করতালি দেয়। করতালি শেষে আমার কানে এলো লিয়াকত আলীর স্ত্রী রানা লিয়াকত তার স্বামীকে বলছেন, ‘ল্যাঙ্গুয়েজকে বারে মে সাফ বাতা দেনা।’ তার কথা শোনার পর আমি লেট মি রিপিট দিস বলে আবার ভাষার দাবিসংবলিত প্যারাটি পড়লাম। আবার মুহুমুহু করতালি শুরু হলো। আমি এবার করতালির জন্য একটু বেশি সময় দিলাম।
সোনার বাংলা: ঐ সময় আপনার অনুভূতি কী ছিল?
অধ্যাপক গোলাম আযম: আমি লিয়াকত আলী খান এবং রানা লিয়াকত আলী খানের খুব কাছে বসেছিলাম। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, বিষয়টিকে খুব ভালোভাবে নেননি তিনি। আমি মনে মনে স্থির করলাম, বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে কোনো মন্তব্য তিনি তার বক্তব্যে করলে আমি সাথে সাথে প্রতিবাদ করে স্লোগান দেব। কিন্তু তিনি খুব ঝানু রাজনীতিবিদ হিসেবে উপস্থিতির মনোভাব উপলব্ধি করে বিষয়টি চেপে গেলেন। তার মনে ক্ষোভ থাকলেও এমনকি তার স্ত্রী অনুরোধ করার পরও ভাষার প্রসঙ্গে কোনো কথা বলেননি। শুধু বক্তব্যের একপর্যায়ে ক্ষোভের সাথে বলেন, ইফ ইট ইস নট প্রোভিনসিয়ালিজম, দেন হোয়াট ইস প্রোভেনসিয়ালিজম? তার এ কথাগুলো শুনে আমরা মনে করেছিলাম, তিনি হয়তো ভাষার ব্যাপারে আর কিছু বলবেন? কিন্তু না, তিনি এ প্রসঙ্গটি এড়িয়ে গেলেন। আমার আর স্লোগান দেয়া হলো না।
সোনার বাংলা: আমরা জানি ইসলামপন্থী ব্যক্তি ও সংগঠনের মাধ্যমেই ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। বিষয়টি কতটুকু সত্য?
অধ্যাপক গোলাম আযম: তমদ্দুন মজলিস ভাষা আন্দোলনের সূচনা করেছিল। আর তমদ্দুন মজলিসের গঠনতন্ত্রের ২নং ধারায় বলা হয়েছে, তমদ্দুন মজলিস বিশ্বাস করে- একমাত্র খাঁটি ইসলামী আদর্শের বাস্তবায়নের মারফত বর্তমান সমস্যাজর্জরিত আর অসাম্য, অত্যাচার ও হিংসা নিপীড়িত দুনিয়ার মানবসমাজের মুক্তি সম্ভব।
সোনার বাংলা : আপনিও তো তমদ্দুন মজলিসের সাথে জড়িত ছিলেন?
অধ্যাপক গোলাম আযম: ছাত্রজীবনে আমি প্রত্যক্ষভাবে তমদ্দুম মজলিসের সাথে জড়িত ছিলাম না। রংপুরে আমি যখন কারমাইকেল কলেজে অধ্যাপনা করি, তখন ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সাথে জড়িত থাকায় গ্রেফতার হই। জেল থেকে বের হওয়ার কিছুদিন পর সুলাইমান ভাইয়ের মাধ্যমে প্রথম দাওয়াত পাই এবং মজলিসে যোগদান করি। ১৯৫৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মজলিসের রংপুর জেলা প্রধান ছিলাম। তখন নিয়মিত মজলিসের সম্মেলন ও শিক্ষাশিবিরে অংশ নিতাম।
সোনার বাংলা : ১৯৪৮ সালের পর ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন এত ব্যাপকতা লাভ করে কেন?
অধ্যাপক গোলাম আযম : মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সফরের পর প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান সফর করেন। তিনি কৌশলে রাষ্ট্রভাষার দাবিটি এড়িয়ে যান। এ বিষয়ে তিনি কোনো বক্তব্য না দেয়ায় আন্দোলনের নতুন কোনো কর্মসূচি আসে না। লিয়াকত আলী খানের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন খাজা নাজিমুদ্দিন। পারিবারিকভাবেই তিনি ছিলেন উর্দুভাষী। পাকিস্তানের কিছু নেতা তাকে বোঝালেন আপনি ঢাকার পূর্ব পাকিস্তানের লোক আপনার পক্ষ থেকে রাষ্ট্রভাষা উর্দুর ঘোষণা এলে তেমন কোনো প্রতিবাদ হবে না। তাদের এ মন্ত্রণা বোকার মতো গ্রহণ করে ১৯৫২ সালে পল্টন ময়দানের এক জনসভায় খাজা নাজিমুদ্দিন ছাত্রদের সাথে করা সাত দফা চুক্তির তোয়াক্কা না করে ঘোষণা করলেন বাংলা নয়, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা। তিনি রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে কায়েদে আযমের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করার পরই শুরু হয় প্রতিবাদ বিক্ষোভ। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি গণদাবিতে পরিণত হয়।
সোনার বাংলা : আপনারা যে স্বপ্ন নিয়ে ভাষা আন্দোলন করেছিলেন, তা কি বাস্তবায়িত হয়েছে?
অধ্যাপক গোলাম আযম : বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেয়েছে। ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য হিসেবে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম আইনসভায় বাংলা ভাষাকে অবিলম্বে শিক্ষার মাধ্যম ও সরকারি ভাষারূপে চালু করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এ প্রস্তাবটি সর্বসম্মতক্রমে গৃহীত হয়। বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেয়েছে। কিন্তু অফিস-আদালতে এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। আদালতের রায় এখনো ইংরেজিতে লেখা হয়। অর্থবিত্তের অধিকারীদের সন্তানরা ইংরেজি মাধ্যম, নয়তো ইংরেজি ভার্সনে লেখাপড়া করছে। বাংলার চেয়ে তারা ইংরেজি ভালো বুঝে। পৃথিবীর সব দেশেই মাতৃভাষার সাথে সাথে একটি আন্তর্জাতিক ভাষাকে গুরুত্ব দেয়া হয়। এটা অপরাধ নয়। কিন্তু বিদেশি ভাষা শিখতে গিয়ে মাতৃভাষার প্রতি অবহেলা দুঃখজনক। এ অবস্থার পরিবর্তন হলেই আমাদের স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে।
সোনার বাংলা: হিন্দি ভাষা ও সংস্কৃতির আগ্রাসন মোকাবিলার উপায় কী?
অধ্যাপক গোলাম আযম: আমাদের আগে বুঝতে হবে সংস্কৃতি কী? অনেকের ধারণা, নাচ, গান-বাজনা হলো সংস্কৃতি। এ ধারণা ঠিক নয়, সংস্কৃতি হলো জীবনযাপন প্রণালী। আমার সম্ভাষণ, চালচলন, বিয়ে, পোশাক, স্রষ্টার আরাধনা আমি করবো আমার সংস্কৃতির আলোকে, একজন হিন্দু করবে তার সংস্কৃতির আলোকে, খ্রিস্টান ও শিখরা করবে তাদের বিশ্বাসের আলোকে। সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হলো সভ্যতা। সভ্যতা গড়ে ওঠে বিশ্বাস বা আর্দশের ভিত্তিতে। ভূগোলের ভিত্তিতে সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না। যেমন ইংল্যান্ডে বসবাসকারী একজন খ্রিস্টান, একজন মুসলমান কিংবা হিন্দুর জীবনযাপন প্রণালী একই ভৌগোলিক সীমানায় বসবাস করার কারণে কখনো এক হবে না। যার যার বিশ্বাস বা আদর্শের আলোকে হবে। ভারত তো ভাগ হয়েছিল এ বিশ্বাসের ভিত্তিতেই যে মুসলমানরা আলাদা জাতি। তাদের সংস্কৃতি আলাদা। এ চেতনা জাগ্রত না করলে হিন্দির আগ্রাসন মোকাবিলা করা যাবে না। এখন তো হিন্দি সিনেমা দেখতে হলে যেতে হয় না, ঘরে বসেই দেখা যায়। তাদের ভাষা পৌত্তলিক সংস্কৃতি আমাদের ঘরে চলে আসছে সরাসরি। আমাদের সন্তানরা নিজস্ব সংস্কৃতিক চেতনায় উজ্জীবিত না হওয়ায় আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে।
সোনার বাংলা : বাঙালি সংস্কৃতি কী? আমরা বাঙালি নাকি বাংলাদেশি?
অধ্যাপক গোলাম আযম: আমি আগেই উল্লেখ করেছি, ভূগোল কিংবা ভাষা নয়, সংস্কৃতির মূল ভিত্তি বিশ্বাস। আমাদের দেশে হিন্দু সংস্কৃতিকে বাঙালি সংস্কৃতি বলে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে। বাংলা আমার মাতৃভাষা এদিক থেকে আমি বাঙালি। আমাদের দেশে মুসলমান, হিন্দুু, খ্রিস্টানসহ নানা ধর্ম-বর্ণ ও ভাষার মানুষ বসবাস করে, তারাসহ আমরা সবাই বাংলাদেশি।
সোনার বাংলা: জাতির উদ্দেশে আপনার বক্তব্য কী?
অধ্যাপক গোলাম আযম: আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব আজ সংকটের মুখে। যে চেতনা নিয়ে ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক আবাস ভূমি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। আমাদের জীবনযাপন প্রণালী বা সংস্কৃতিতে তার প্রভাব ধরে রাখার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই আমাদের স্বাধীন অস্তিত্ব আজ বিপন্ন হতে বসেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে সিকিমের মতো হয়তো অফিসিয়ালি একটি দেশ হিসেবে টিকে থাকবে বাংলাদেশ। কিন্তু সত্যিকারে স্বাধীনতা হারাবে। ১৯৭১ সালে ভারতের সাহায্যে স্বাধীনতা লাভ করায় তাদের চাপে ১৯৭২-এর সংবিধানে সেদেশের অনুকরণে আমাদের সংধিানেও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ স্থান পায়। ১৯৭৭ সালে এ ভুলের সংশোধন হলেও আবার ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকেই ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। অবশ্য এখন যারা ক্ষমতায় আছেন তারা ১৯৫৬ সালেই ভারতের রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শকে গ্রহণ করেছে। প্রধান বিরোধীদল ইসলামী মূল্যবোধের কথা বললেও ইসলামকে জীবনযাপন প্রণালী বা সংস্কৃতি হিসেবে পুরোপুরি গ্রহণ করেনি। তারা যদি নিজেদের এবং দেশের স্বাধীন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চান, তাহলে অবশ্যই ইসলামকে জীবনযাপনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আমাদের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতিসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করলেই আমরা আমাদের অস্তিত্ব বিপন্নকারী আগ্রাসন মোকাবিলা করতে সক্ষম হবো।