সৌদি-হুথি সংঘাতের বিস্তার

ঝুঁকিতে জ্বালানি নিরাপত্তা ইউরোপ-এশিয়ার নৌ-বাণিজ্যে প্রভাবের শঙ্কা


৪ নভেম্বর ২০২৬ ২১:২৫

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া সামরিক উত্তেজনা অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে এসে সৌদি আরবের বিমানবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। গত ২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, হুথিদের ছোড়া তিনটি ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও চারটি ড্রোন সৌদি আরবের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের দিকে যাওয়ার সময় প্রতিহত করা হয়েছে। এ পরিস্থিতি ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় প্রতিষ্ঠিত যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা কার্যত শেষ করে দিয়েছে।
সংঘাতের শিকড় ইয়েমেনের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে। ২০১৪ সালে হুথি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করলে ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিতে সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতিতে বড় ধরনের লড়াই কমলেও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান হয়নি।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে ইরানের একটি উড়োজাহাজকে ইয়েমেনে অবতরণের অনুমতি দেওয়া নিয়ে বিরোধের পর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সানা বিমানবন্দরের রানওয়েতে হামলা চালায়। হুথিরা এটিকে অবরোধ ও নিজেদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখিয়ে পাল্টা হামলা জোরদার করে। পরে লোহিত সাগর উপকূলে কৌশলগত এলাকা দখল এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির দিকে অগ্রসর হওয়ার মধ্য দিয়ে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়।
অক্টোবরের শুরু থেকে সৌদি আরব হুথিদের অবস্থানে বিমান হামলা বাড়ায়। অন্যদিকে হুথিরা রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, অন্যান্য বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলার দাবি করে। গত ১০ অক্টোবর রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় ১৩ জন নিহত হওয়ার খবরের পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, হুথিদের হামলায় দেশটির বিভিন্ন স্থাপনায় হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গত ২৬ অক্টোবর হুথিরা সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পরিবহন পাইপলাইন, তেল পাম্পিং স্টেশন ও রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার দাবি করে। একই দিনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে ক্ষেপণাস্ত্রের উৎক্ষেপণব্যবস্থা, সংরক্ষণাগার ও সরবরাহপথে হামলার কথা জানায়।
বাব আল-মান্দেব ঘিরে লড়াই, জ্বালানি বাজারে ঝুঁকি
এই সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে কেন্দ্র করে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের লড়াই। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ। এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়লে শুধু সৌদি আরব বা ইয়েমেন নয়, ইউরোপ-এশিয়ার নৌ-বাণিজ্যেও প্রভাব পড়তে পারে। সৌদি আরবের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল, কারণ হরমুজ প্রণালিতে চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে লোহিত সাগর হয়ে তেল রপ্তানির পথটির গুরুত্ব বেড়েছে। সংঘাত এখন আর কেবল সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইরানের সঙ্গে হুথিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সৌদি আরবের নিরাপত্তা জোরদারে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার খবরের পাশাপাশি মিশরও রিয়াদকে প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। গত ২৭ অক্টোবর মিশরের পার্লামেন্ট সৌদি আরবকে সহায়তার জন্য প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিকে অনুমোদন দিয়েছে। তবে মিশরের পক্ষ থেকে ইয়েমেনে স্থলসেনা পাঠানোর পরিকল্পনা নেই বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা মনে করেন, সৌদি আরবের প্রধান লক্ষ্য হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকানো এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে তাদের প্রভাব কমানো। অন্যদিকে হুথিরা সামরিক চাপের পাশাপাশি সৌদি জ্বালানি অবকাঠামো ও বিমান চলাচলকে ঝুঁকিতে রেখে কৌশলগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান সৌদি আরবের জন্যও ব্যয়বহুল হতে পারে এবং ইয়েমেনের মানবিক সংকট আরও গভীর করতে পারে।
জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় নতুন যুদ্ধবিরতি এবং সৌদি-ইরান কূটনৈতিক যোগাযোগ সংঘাত প্রশমনে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু পারস্পরিক হামলা বন্ধ, বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত এবং ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সমঝোতা ছাড়া স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন। গত ২৭ অক্টোবর দুপুর পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, সংঘাত থামার স্পষ্ট লক্ষণ নেই; বরং সামরিক তৎপরতা ও আঞ্চলিক মেরুকরণ পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।