ঐশ্বর্যের লিবিয়া এখন গৃহযুদ্ধ ও ধ্বংসস্তূপের নগররাষ্ট্র
১৫ অক্টোবর ২০২৬ ১১:৪২
॥ মুহাম্মদ আল-হেলাল ॥
বিংশ শতকের প্রথমভাগে ইতালীয়রা লিবিয়াকে উপনিবেশ বানায়। পরে ১৯৫১ সালে দেশটি একটি রাজতন্ত্রে পরিণত হয়। এরপর এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানে ১৯৬৯ সালে রাজা ইদ্রিসকে উৎখাত করেন কিছু তরুণ সামরিক কর্মকর্তাসহ ক্যাপ্টেন মুয়াম্মার গাদ্দাফি। পরবর্তীতে গাদ্দাফি তার শাসনামলে জরাজীর্ণ লিবিয়াকে ঐশ্বর্যময় লিবিয়ায় পরিণত করেন। বিরোধীদের কাছেও গাদ্দাফি আমল ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কিন্তু ২০১১ সালে আরব বসন্তের ঝড়ে গাদ্দাফির ৪২ বছরের স্বর্ণযুগের পতন হয়। তবে দেশটিতে ২৫ বছরেও ফিরে আসেনি স্থিতিশীলতা। বরং বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ধনী লিবিয়া এক ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
গাদ্দাফি শাসনামল : গাদ্দাফিবিরোধী একজন জাবালা মাতার। তার পুত্র খ্যাতনামা লেখক হিশাম মাতার। হিশামের সাথে কথা বলেছেন বিবিসির লুইস হিদালগো। ‘লিবিয়ায় বিপ্লব হবার পর মানুষের প্রতিক্রিয়া ছিল ইতিবাচক’, বলছিলেন হিশাম। কারণ ‘লিবিয়ায় ঔপনিবেশিক শাসনামলে ছিল অশান্তি। সেসময় অসংখ্য লোককে হত্যা করা হয়েছে প্রকাশ্যে।’ ‘আমার বাবা সেনাবাহিনীর একজন কর্নেল ছিলেন।’ অভ্যুত্থানের সময় তিনি লন্ডনে লিবিয়ার দূতাবাসে কাজ করতেন। অভ্যুত্থানের পর দেশে আসলে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ‘তবে অভ্যুত্থানের পর এমনটা হওয়া স্বাভাবিক। কিছুদিন পর বাবাকে মুক্তি দিয়ে জাতিসংঘের চাকরিতে পাঠানো হলো।’ এরপরের বছর হিশামের জন্ম হয় নিউইয়র্কেই। ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত তারা সেখানেই ছিলেন। ‘আমার বাবা লিবিয়ার জীবন ভালোবাসতেন। সেখানে শান্তি ছিল। আরো কারণ আমাদের বাড়ি ছিল সমুদ্রের ধারে এবং আমাদের ছিল একটা বড় যৌথ পরিবার।’ তাই বাবা পদত্যাগ করেন এবং বাবা, মা ও আমরা দুই ভাইসহ লিবিয়ায় ফিরে আসি। তবে মা দেশ ছাড়ার জন্য আবার মনস্থির করলেন।’ ‘হ্যাঁ, কারণ ছিল। সে সময় চাদের সাথে লিবিয়ার যুদ্ধ চলছে। তাই স্কুলগুলোকে দেশের জন্য সামরিকায়ন করা হচ্ছিল। কারণ গাদ্দাফির কাছে সবার আগে ছিল দেশের নিরাপত্তা। মাত্র ১৩-১৪ বছর বয়েসে আমার ছোট ভাইয়ের সামরিক ট্রেনিং শুরু হলো।’ ফলে হিশামের পরিবার কায়রোয় চলে গেল। হিশাম তার অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘দি রিটার্ন’ নামে একটি বই লিখেছেন। সে বই পুলিৎজার পুরস্কারও পেয়েছে। তবে আরব বসন্তের পর তার অভিজ্ঞতা ভিন্ন।
আরব বসন্ত : পুলিশের দুর্নীতির প্রতিবাদে ২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর তিউনিশিয়ার সিদি বাওজিদ এলাকার ফুটপাতের সবজি বিক্রেতা ২৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ বাওয়াজিজি নিজের গায়ে আগুন জ্বেলে আত্মাহুতি দেন। ঐ খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। সেই ঘটনা থেকে জন্ম আরব বসন্তের বা আর রবিউল আরাবি। যদিও তিউনিশিয়ায় আরব বসন্ত জেসমিন বিপ্লব হিসেবে পরিচিত। তীব্র আন্দোলনের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হন দেশটির প্রেসিডেন্ট বেন আলী। তবে সাংবাদিক Neil Clark মন্তব্য করেছেন যে, Tunisia : Where the Arab Spring has not yet turned to winter. ইসলামী রেনেসাঁ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ ড. রাশিদ ঘানুসির ভাষায়ও ‘আরব বসন্তের পর তিউনিশিয়া এখনো বিপ্লবের আলোক শিখা জ্বালিয়ে রেখেছে।’ আর Daniel L Byman Zvi After the Hope of the Arab Spring, the Chill of an Arab Winter প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, আরব বসন্তের স্বপ্ন পূরণ হয়নি; বর্তমানে Arab Winter চলছে। তিউনিশিয়ার পর আন্দোলন গড়ে ওঠে মিশর, ইয়েমেন, সিরিয়া, লিবিয়াসহ বিভিন্ন আরব দেশে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ন্যাটোভুক্ত রাষ্ট্রগুলো অস্ত্র সরবরাহ করে এবং সরাসরি আক্রমণ করে দেশগুলোর ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রনায়কদের পতন ঘটায়। এর মধ্যে লিবিয়ার বৃহত্তম শহর বেনগাজিতে গাদ্দাফিবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়ে ২০১১ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। ‘দ্য ডে অব রিভোল্ট’ বলা হয় যে দিনটিকে। তবে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ পরিস্থিতি জটিল করে তোলে।
আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ : জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৭৩ সালের প্রস্তাব গ্রহণ করে মার্চ ২০১১ সালে বিদ্রোহীদের দিয়ে লিবিয়ার ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এনটিসি) গঠন করে। এনটিসি শাসনকে উৎখাত করার জন্য কর্মসূচি সমন্বয় করে। বিদ্রোহীরা ২০ ফেব্রুয়ারিতে বেনগাজি শহর দখল করে ফেলে। ১০ মার্চ গাদ্দাফি বাহিনী ব্রেগা, জায়িয়াহ ও বিন জাওয়াদ শহর পুনরায় দখলে নেয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সরকারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ একটি সামরিক অপারেশন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯ মার্চ ২০১১ সালে ন্যাটোর অপারেশন শুরু হয়, যার লক্ষ্য হলো বিদ্রোহীদের সমর্থন করা। আগস্ট ২০১১ সালে বিদ্রোহীরা রাজধানী শহর ত্রিপোলি দখল করে। এরপর গাদ্দাফি নিজ শহর সির্তে চলে যান। অবশেষে ২০ অক্টোবর গাদ্দাফিকে তার শহর সির্তে হত্যা করা হয়। যদিও লিবিয়ার ট্রানজিশনাল কাউন্সিল বা এনটিসির প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ জিবরিল বলেন, ‘ফোরেন্সিক‘ রিপোর্টমতে গাদ্দাফি গুলির আঘাতে মারা গেছেন। গাদ্দাফি পরবর্তীতে লিবিয়া টালমাটাল হয়ে যায়। এই সুযোগে লিবিয়ায় রাশিয়ান ওয়াগনারের বাহিনী উপস্থিত হয়।
লিবিয়ায় ওয়াগনার : ওয়াগনার গ্রুপ রাশিয়ার একটি প্রাইভেট সামরিক বাহিনী। ২০১৯ সালের এপ্রিলেও ওয়াগনার গ্রুপের যোদ্ধাদের লিবিয়ায় দেখা যায়। সেখানে তারা লিবিয়ার বিদ্রোহী জেনারেল খলিফা হাফতারের বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়। হাফতারের বাহিনী তখন রাজধানী ত্রিপোলিতে জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে হামলা চালাচ্ছিল। ২০২০ সালের অক্টোবরে এক যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে এই সংঘাতের অবসান হয়। বিবিসির কাছে একজন সাবেক যোদ্ধা স্বীকার করেছেন যে, এই গ্রুপটি বন্দীদের হত্যা করে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তার ভাষায়, ‘একটা বাড়তি মুখের খাবার কে জোগাতে চায়?’ এই অনুসন্ধানের ভিত্তিতে বিবিসির আরবী এবং রাশিয়ান ভাষা বিভাগ যৌথভাবে যে টিভি ডকুমেন্টারিটি তৈরি করেছে, সেটির নাম, ‘হাফতার’স রাশিয়ান মার্সেনারিজ: ইনসাইড ওয়াগনার গ্রুপ।’ তথ্যমতে, এই ভাড়াটে সেনারা মুসলিম ভূখণ্ড লিবিয়ায় ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ করছে। বেসামরিক এলাকায় মাইন বা বোমা পোঁতা মতো তৎপরতায়ও জড়িত তারা। কোনো চিহ্ন না রেখে স্থলমাইন পোঁতা আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত। এদিকে ২০২০ সালের ১৯ জানুয়ারির দশ পৃষ্ঠার একটি ডকুমেন্ট ও বিবিসির হাতে এসেছে। একজন বিশেষজ্ঞ, যিনি ওয়াগনার গ্রুপের কাজকর্ম সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন। এই ডকুমেন্ট দেখে তিনি বলছেন, এর সঙ্গে দিমিত্রি উতকিনের সম্পর্ক আছে। দিমিত্রি উতকিন একজন সাবেক রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা। তিনিই ওয়াগনার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা বলে মনে করা হয়। রুশ ইন্টেলিজেন্সে কাজ করার সময় তার যে ‘কল সাইন’ বা ছদ্মনাম ছিল, সেই নামেই ওয়াগনার গ্রুপের নামকরণ করা হয়েছে। ওয়াগনার গ্রুপকে প্রথম চিহ্নিত করা হয়েছিল ২০১৪ সালে ইউক্রেনে। তবে এর বাইরে সিরিয়া, মোজাম্বিক, সুদান এবং সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকেও তারা ছিল। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন লিবিয়ায়ও সিরিয়ার খেলাই চলছে।
লিবিয়ায়ও ‘সিরিয়ার খেলা’ : অনেক দিক থেকেই সিরিয়ার প্রক্সি যুদ্ধের ধারাবাহিকতায়ই যেন চলছে লিবিয়ার যুদ্ধ। তুরস্ক এবং রাশিয়া দু’পক্ষই লিবিয়ায় নিয়ে গেছে সিরিয়ান মিলিশিয়াদের। যারা নিজ দেশের এক দশকব্যাপী গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দক্ষ যোদ্ধা হয়ে উঠেছে। হয়তো তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সিরিয়ায় করা চুক্তিগুলোরই একটা সংস্করণ লিবিয়ার ওপর প্রয়োগ করছেন। এর বাইরে ফ্রান্স, রাশিয়াসহ অন্যান্য রাষ্ট্র মুসলিম ভূখণ্ড সিরিয়ার মতো আরেক মুসলিম ভূখণ্ড লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে যোগ দিয়েছে নিজ নিজ স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে। তবে আমেরিকা ২০১২ সালের পর থেকে লিবিয়া থেকে নিজেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে রেখেছিল। যদিও প্রকাশ্যে তাদের অবস্থান জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারের প্রতি। অন্যদিকে রুশ ও তুর্কি সমর্থনে দেশটিতে হাফতার চালায় অপারেশন ডিগনিটি নামে নৃশংসতা।
অপারেশন ডিগনিটি : ২০১৪ সালের মে মাসে খালিফা হাফতার বেনগাজি এবং লিবিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন। তার এই অভিযানের নাম দেয়া হয় অপারেশন ডিগনিটি। ২০১৫ সালের মার্চ মাসে লিবিয়ার নির্বাচিত পার্লামেন্ট হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ, যা কিনা জেনারেল ন্যাশনাল কাউন্সিলের জায়গা নিয়েছিল। তারা অপারেশনে বীরত্বের জন্য হাফতারকে লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির অধিনায়ক নিযুক্ত করে। এরপর হাফতার শুরু করে আরো শক্তিশালী অপারেশন সুইফট থান্ডার।
অপারেশন সুইফট থান্ডার : ২০১৬ সালে অপারেশন সুইফট থান্ডার শুরু করে লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি। উদ্দেশ্য ছিল লিবিয়ার গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনাগুলোর দখল নেয়া। তখন পর্যন্ত এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতো ‘পেট্রোলিয়াম ফ্যাসিলিটিজ গার্ড’ নামের একটি বাহিনী। এই সশস্ত্র বাহিনী ছিল জাতিসংঘের সালিশে গঠিত ‘গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল একর্ড’ বা জিএনএ’র অনুগত। লিবিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সব তেল টার্মিনাল এদের কাছ থেকে কেড়ে নেয় হাফতারের নেতৃত্বে লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি। এর স্বীকৃতি হিসেবে খলিফা হাফতারকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল থেকে পদোন্নতি দিয়ে ফিল্ড মার্শাল করা হয়। তবে এই সরকার প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ইব্রাহিম আল বারগাতি অফিসারকে দেওয়ায় খালিফা হাফতার জিএনএ’র কাজ-কর্মে অখুশি ছিলেন। দেশটিতে চলমান এই নিসংহ গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো ইঙ্গিত নেই। তবে লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতায় হাজির হয়েছে পাকিস্তান।
লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতায় পাকিস্তান : বেশ কিছুদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে লিবিয়া সংকটের কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা চলছিল। এর মধ্যেই পাকিস্তানের নাম সামনে এসেছে। এর আগে চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার ক্ষেত্রেও পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সে সময় ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানের এ ভূমিকার প্রশংসা করেছিল। রয়টার্সের বরাত দিয়ে পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে, লিবিয়া ইস্যুতে পাকিস্তানের উদ্যোগ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি অবগত এবং এতে সম্পৃক্ত রয়েছে। পাকিস্তানি সূত্রের দাবি, গত বছরের শেষ দিকে এই উদ্যোগ শুরু হয় এবং লিবিয়ার উভয় পক্ষই পাকিস্তানকে মধ্যস্থতার অনুরোধ জানায়। সম্প্রতি পাকিস্তানের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনির রাওয়ালপিন্ডিতে লিবিয়ার সামরিক নেতা হাফতারের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর কয়েকদিন পর হাফতার ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই বৈঠকের পর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, রুবিও লিবিয়ার নেতাদের বিভেদ দূর করার প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং দেশটির ঐক্যের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ইতোমধ্যে পাকিস্তান পূর্বাঞ্চলভিত্তিক লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (এলএনএ)-এর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্কও জোরদার করছে। এর মধ্যে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান ও সুপার মুশশাক প্রশিক্ষণ বিমান বিক্রির সম্ভাবনাও রয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলভিত্তিক জাতীয় ঐক্য সরকার (GNA)ও সম্প্রতি পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার আগ্রহ দেখিয়েছে। পাকিস্তানি সূত্রের ভাষ্য, (GNA)-এর প্রধান সমর্থক কাতার ও তুরস্কও পাকিস্তানকে এই মধ্যস্থতার উদ্যোগে এগিয়ে আসতে উৎসাহ দিয়েছে। তবে বিশ্ব ইতোমধ্যেই প্রত্যক্ষ করছে গাদ্দাফি পরবর্তী ধ্বংসস্তূপ ও গৃহযুদ্ধের নগর রাষ্ট্র লিবিয়া।
গাদ্দাফি পরবর্তীতে দ্বিতীয় পর্যায়ের গৃহযুদ্ধ (২০১৪-২০১৯) দেখা দেয় লিবিয়ায়। যদিও ইতোমধ্যে সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে অসংখ্য হতাহত সহ অন্তত ২৫ লাখ মানুষের শরণার্থী জীবন বেছে নিতে হয়েছে দাবি অ্যামনেস্টির। ২০১৪ সালে লিবিয়া পূর্ব ও পশ্চিমে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী সরকারের নিয়ন্ত্রণে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পূর্বাঞ্চলে খালিফা হাফতারের নেতৃত্বে লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (LNA) এবং পশ্চিমে জাতিসংঘ-সমর্থিত জিএনএ গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল অ্যাকর্ড (GNA) সরকার ক্ষমতার লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে। এরপর লিবিয়ার সংঘর্ষ আন্তর্জাতিক প্রক্সিযুদ্ধে পরিণত হয়। একদিকে পূর্বাঞ্চলীয় সরকারের সেনাপ্রধান, ফিল্ড মার্শাল খালিফা হাফতারকে সাহায্য করছে প্রধানত আরব আমিরাত। তার সাথে আরো আছে মিশর, সৌদি আরব, ফ্রান্স, সুদান, জর্ডান এবং রাশিয়া। ২০১৪ সালে খালিফা হাফতার টেলিভিশনে তার ভাষায়, জাতিকে রক্ষার এক পরিকল্পনা হাজির করে এবং নির্বাচিত পার্লামেন্টের বিরুদ্ধে জনগণকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানালে আবার সংঘাত শুরু হয়। তখনো জেনারেল ন্যাশনাল কংগ্রেস (জিএনসি) নামে পরিচিত লিবিয়ার পার্লামেন্ট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। খালিফা হাফতার এমন এক সময় এই নাটকীয় ঘোষণা দেন, যখন কিনা লিবিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বেনগাজি এবং পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য শহর কার্যত একটি সংগঠন ‘আনসার আল শরিয়া’ এবং অন্যান্য ইসলামী সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে। জেনারেল হাফতার অনেক বছর আমেরিকা ভার্জিনিয়ার ল্যাংলিতে কাটিয়েছেন। এই শহরেই মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএর প্রধান দফতর। এখানে বসেই গাদাফির পতনের ছক আঁটতেন জেনারেল হাফতার। এখন তিনি বেনগাজির নিয়ন্ত্রক এবং ত্রিপোলিতে অভিযান চালিয়ে তিনি চেয়েছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফায়েজ আল সেরাজের সরকারকে উৎখাত করতে। এই সংঘাতে দুই পক্ষই বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির কাছ থেকে সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন পায়। যদিও লিবিয়ার বিরুদ্ধে জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ছিল। ১৯৪৩ সালে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় শহর আজডাবিয়ায় জন্ম খলিফা হাফতারের। ১৯৬৯ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির নেতৃত্বে অভ্যুত্থানকারীদের তিনিও একজন। অন্যদিকে জাতিসংঘ সমর্থিত সরকার জিএনএর পক্ষে আছে প্রধানত তুরস্ক এবং সেই সাথে সীমিত আকারে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করছে কাতার। লিবিয়ায় বিদেশি শক্তিগুলোর বর্তমান ছায়াযুদ্ধটি মূলত ২০১৪ সালে শুরু হওয়া দেশটির দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধেরই বিলম্বিত ধারাবাহিকতা। কিন্তু এর মূল নিহিত আছে ২০১১ সালের গাদ্দাফিবিরোধী গৃহযুদ্ধে। সংক্ষেপে বলতে গেলে প্রক্সিযুদ্ধ হচ্ছে মিশরের জেনারেল সিসি স্টাইলের পুরাতন সামরিক কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী ফিল্ড মার্শাল হাফতারের সাথে তথাকথিত গণতান্ত্রিক শক্তির বা সংস্কারপন্থীদের লড়াই। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হানান সালেহ বলছেন, গৃহযুদ্ধরত সব পক্ষই বেসামরিক মানুষদের প্রতি একই রকম নির্মম আচরণ করেছে। ত্রিপোলিতে জাতিসংঘ সমর্থিত প্রধানমন্ত্রী ফায়েজ আল-সেরাজের সরকার ক্ষমতাসীন। কিন্তু তাদের মোকাবিলা করছে লিবিয়ার নানা অংশ নিয়ন্ত্রণকারী বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী। লিবিয়ার শহরগুলো এখন এক একটি নগররাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। লিবিয়ার জনগণ এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চায়।
তথ্যসূত্র : সিআইএ, দ্য ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক, ইন্টেসা সান পাওলো ও মেনা, রয়টার্স, আল-জাজিরা, বিবিসি।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : alhelaljudu@gmail.com