রাজনৈতিক রূপান্তরের জটিল সংকটে দেশ


৭ অক্টোবর ২০২৬ ২২:১৮

উত্তরণে প্রয়োজন জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সমন্বয় ও সমঝোতা
॥ ফারাহ মাসুম ॥
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কেবল একটি সাধারণ সরকার বদল বা চিরাচরিত শাসক ও বিরোধীদলের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে এর পেছনের গভীর চিত্রটি অধরা থেকে যাবে। ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান, ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচন, নতুন সরকারের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধানের মৌলিক সংস্কার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আমূল পুনর্গঠনের প্রশ্ন— সব মিলিয়ে বাংলাদেশ আজ এক জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় রাজনৈতিক রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলেও রূপান্তরের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াটি এখানেই শেষ হয়ে যায়নি; বরং নতুন সরকারের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে এই রূপান্তর কোন ইতিবাচক বা নেতিবাচক গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছাবে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতি, সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চ্যালেঞ্জ এবং বিরোধীদলগুলোর কৌশলগত অবস্থানের সার্বিক মূল্যায়নে একটি সুদূরপ্রসারী চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো।
নির্বাচনোত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট : বৈধতা বনাম সাংবিধানিক আকাঙ্ক্ষা : চলতি বছর ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতার দিক থেকে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ়। তবে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় কেবল সংসদের আসন সংখ্যাই ক্ষমতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষ যে নতুন রাষ্ট্রকাঠামো, জবাবদিহি এবং সুশাসনের প্রত্যাশা করেছিল, তার সঙ্গে প্রচলিত সংসদীয় রাজনীতির চিরাচরিত পদ্ধতির এক ধরনের মৌলিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও এই দ্বান্দ্বিক দিকটি উঠে এসেছে। তাদের মতে, ২০২৬ সালের নির্বাচন বিগত প্রায় দুই দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত হলেও, বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার পর পুরনো রাজনৈতিক অর্থনীতি, দলীয় আধিপত্যের সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার গতানুগতিক কাঠামোর সঙ্গে নতুন সংস্কারপন্থীদের তীব্র টানাপড়েন শুরু হয়েছে। অর্থাৎ নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ কিছুটা নামলেও কাঠামোগত বৈরিতা এবং আদর্শিক দ্বন্দ্ব ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে।
সংবিধান সংস্কার বনাম সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা : মূল আদর্শিক সংঘাত : বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও তাৎক্ষণিক সংকটটি আবর্তিত হচ্ছে সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নটিকে কেন্দ্র করে। সরকার সংসদের বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের প্রচলিত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় এগোতে চাইছে। পক্ষান্তরে, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধীদলগুলোর একটি বৃহৎ অংশ জোরালো দাবি তুলেছে যে, জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য প্রচলিত সংসদীয় পদ্ধতির বাইরে একটি বিশেষ সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল গঠন করতে হবে।
এই দুই অবস্থানের মধ্যে মৌলিক, তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ফারাক রয়েছে— সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি : বিদ্যমান সংবিধানের কাঠামোর ভেতরে থেকেই সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে যেকোনো প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা সম্ভব এবং তা সাংবিধানিকভাবে বৈধ।
বিরোধীদের দৃষ্টিভঙ্গি : জুলাই সনদ বাস্তবায়ন কোনো সাধারণ আইনি সংশোধন নয়; এটি মূলত ঔপনিবেশিক ও স্বৈরাচারী ধাঁচের রাষ্ট্রকাঠামোর একটি মৌলিক পুনর্বিন্যাস। ফলে নির্বাচিত সংসদের প্রচলিত পদ্ধতিতে এটি সম্পন্ন করলে গণভোটের মূল ম্যান্ডেট খর্ব ও ক্ষুণ্ন হবে।
এই সাংবিধানিক মতপার্থক্যের কারণে ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে ওয়াকআউট এবং ১১টি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে বিশেষ কমিটির বৈঠক বর্জনের মতো ঘটনা ঘটেছে। সরকারের সামনে এখানে এক ধরনের দ্বিমুখী রাজনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে— সংস্কার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিলে সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণার জন্ম নেবে যে সরকার পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ফিরে যাচ্ছে; আবার বিরোধীদের সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে এককভাবে দ্রুত সংস্কার বাস্তবায়ন করতে গেলে তা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার অপবাদ ডেকে আনতে পারে।
সরকারের সামনে ১০টি প্রধান ও বহুমুখী ঝুঁকি
নতুন সরকারের জন্য সামনের দিনগুলোয় অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক পরিসরে অন্তত দশটি প্রধান ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে—
বিরোধী জোটের রাজপথ ও সংসদের দ্বিমুখী কৌশল : সংসদে সংখ্যায় দুর্বল হলেও রাজপথে বিরোধীদলগুলোর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। জামায়াত ও এনসিপি জুলাই সনদকে মূল হাতিয়ার করে আন্দোলন বেগবান করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ রাষ্ট্র সংস্কারে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সুশাসন নিশ্চিত না হলে প্রয়োজনে এক দফা আন্দোলনে যাবার কথা বলছেন। এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম আইনশৃঙ্খলা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের কঠোর সমালোচনা করে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে পরিবর্তনের দাবি তুলেছেন। অর্থনীতি ও সুশাসনের ঘাটতিকে পুঁজি করে বিরোধীদলগুলো যদি একটি শক্তিশালী সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে, তবে তা সরকারের জন্য মারাত্মক রাজনৈতিক চাপ তৈরি করবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও দলীয় আধিপত্য : সরকারের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো আইনশৃঙ্খলা ও স্থানীয় পর্যায়ের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্থানীয় স্তরে দলীয় প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কতিপয় নেতাকর্মীর জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ সরকারকে বিব্রত করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় রাজনৈতিক সমাবেশে বাধা এবং আটকের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যা সরকারের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
‘আওয়ামী লীগ প্রশ্ন’ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিচার প্রশ্ন : বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ একটি বড় অমীমাংসিত প্রশ্ন। দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের ফলে একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির বাইরে অবস্থান করছে। সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো— অপরাধের বিচার এবং রাজনৈতিক সংগঠনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রশ্নটিকে আলাদা করা। গণহত্যার জন্য দায়ীদের বিচার ও রাজনৈতিক প্রতিশোধপরায়ণতার মধ্যে পার্থক্য করার নীতি দৃশ্যমান হলে তা দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্র ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির পথকে সংকুচিত করবে বলে পশ্চিমা বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও শুদ্ধি অভিযান : দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের জন্য ক্ষমতায় ফেরার পর দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন। স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের লোভ সামলানো এবং দুর্নীতি রোধে দলের ভেতর কঠোর শুদ্ধি অভিযান চালানো জরুরি। যদি বিচ্ছিন্ন অনিয়মগুলোকে সরকার কঠোর হাতে দমন করতে না পারে, তবে জনগণের মাঝে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে; যা সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাকেও ম্লান করে দিতে পারে।
অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতির চাপ; জনজীবনের সংকট : রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি মূলত মানুষের পকেটের অর্থনীতির ওপর নির্ভর করে। গ্যাস সংকট, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংকিং খাতের বিশাল খেলাপি ঋণ অর্থনীতিকে এখনো কুঁকড়ে রেখেছে। সংস্কারের সুফল পেতে দীর্ঘসময় লাগলেও দ্রব্যমূল্যের কষাঘাত মানুষ প্রতিদিন অনুভব করে। সরকার যদি স্বল্পসময়ের মধ্যে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে না পারে, তবে অর্থনৈতিক অসন্তোষ দ্রুত রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নিতে পারে।
প্রশাসন, পুলিশ ও বিচার বিভাগের কাঠামোগত সংস্কার : রাষ্ট্রযন্ত্রের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা দেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকটের মূল চাবিকাঠি। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী রীয়াজের মতে, কেবল নির্বাচন দিয়ে গণতান্ত্রিক সংকটের অবসান ঘটে না; বরং নির্বাচন কমিশন, দুদক, বিচার বিভাগ এবং বেসামরিক প্রশাসনকে পুরোপুরি দলীয় প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা দিতে হবে। প্রশাসন যদি পুনরায় কোনো বিশেষ দলের সেবায় নিয়োজিত হয়, তবে গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
জুলাইয়ের তরুণ প্রজন্মের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও নতুন মেরুকরণ : জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতিতে যে নতুন তরুণ শক্তির উত্থান ঘটেছে, তারা প্রথাগত দ্বিদলীয় রাজনীতির বাইরে একটি নতুন রাষ্ট্রচিন্তার জন্ম দিয়েছে। এনসিপি সেই আকাঙ্ক্ষারই রাজনৈতিক রূপ। এই প্রজন্মকে যদি বর্তমান সরকার কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে, তবে তা একটি ঐতিহাসিক সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটাবে এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেবে। পুরোনো ফ্যাসিবাদের ফিরে আসার পথ তৈরি করবে এটি।
জামায়াতে ইসলামী ও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ : জামায়াত এখন আর গতানুগতিক ধারার দল নয়; সংসদে প্রধান বিরোধী শক্তির ভূমিকা এবং সুসংগঠিত রাজপথের অবস্থানের মাধ্যমে তারা নিজেদের একটি শক্তিশালী বিকল্প শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এর ফলে দেশের রাজনীতিতে চিরাচরিত দ্বিমেরু ব্যবস্থার অবসান ঘটে ত্রিভুজ বা বহুমুখী প্রতিযোগিতার এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্ক : ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভূরাজনৈতিক সমীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানবাধিকার রক্ষা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মহলের সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যর্থ হলে তা বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং কূটনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আস্থার সংকট; রাষ্ট্রের মৌলিক আচরণের পরিবর্তন : সর্বোপরি সমস্ত ঝুঁকির কেন্দ্রবিন্দু হলো জনগণের আস্থার সংকট। মানুষ কেবল মুখের বুলি বা ক্ষমতার পালাবদল চায় না, তারা রাষ্ট্রের আচরণে মৌলিক পরিবর্তন দেখতে চায়। সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাকেই যদি সংস্কারের একমাত্র একক ম্যান্ডেট মনে করা হয়, তবে তা হবে একটি আত্মঘাতী রাজনৈতিক ভুল।
সামনের সম্ভাব্য তিনটি রাজনৈতিক পথ
আগামী দিনগুলোয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি মূলত তিনটি সম্ভাব্য পথের যেকোনো একটি ধরে এগোতে পারে—
প্রথম পথ (সমঝোতা ও সমন্বয়) : সরকার ও বিরোধীদলগুলো সমঝোতার মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল এবং সংসদীয় কাঠামোর মধ্যে একটি কার্যকর সাংবিধানিক সমন্বয় তৈরি করবে। এটি দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতির জন্য সবচেয়ে স্থিতিশীল পথ।
দ্বিতীয় পথ (সংখ্যাগরিষ্ঠতার কঠোর প্রয়োগ) : সরকার সংসদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার জোরে নিজস্ব এজেন্ডায় সংস্কার সম্পন্ন করবে। এতে তাৎক্ষণিক আইন পাস সহজ হলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও অসন্তোষ বাড়বে।
তৃতীয় পথ (রাজপথের সংঘাত) : সংস্কার প্রশ্নে মতপার্থক্য চরমে পৌঁছে রাজপথে আন্দোলন ও প্রশাসনিক দমন-পীড়নের চক্র তৈরি হবে। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সংকট যুক্ত হলে তা দেশকে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতার মুখে ঠেলে দিতে পারে।
সংকট উত্তরণে সুনির্দিষ্ট পথরেখা
বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রূপান্তরের সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি—
১. রাজনৈতিক সমঝোতা : জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে সকল প্রধান রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের নিয়ে একটি লিখিত ও অংশীদারিত্বমূলক রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো।
২. প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা : পুলিশ, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের দলীয়করণ চিরতরে বন্ধ করে দৃশ্যমান ও স্বাধীন প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর নিশ্চিত করা।
৩. জিরো টলারেন্স নীতি : দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নির্বিশেষে অপরাধী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ।
৪. অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার : দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা।
৫. সমন্বিত বিচার প্রক্রিয়া : আওয়ামী লীগ আমলের অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দলীয় বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ ও আইনি পথ অনুসরণ করা। কিন্তু গণহত্যার অপরাধে কোনো ছাড় না দেয়া।
রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ঝুঁকিমুক্ত নয় সরকার
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করলে স্পষ্ট দেখা যায় যে, সরকার একেবারে দুর্বল অবস্থানে না থাকলেও নানামুখী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকিমুক্তও নয়। সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারের অন্যতম প্রধান শক্তি; কিন্তু রাজপথে বিরোধীদলগুলোর ক্রমবর্ধমান চাপ, সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে মতভেদ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং জনজীবনের অর্থনৈতিক চাপ সরকারের দুর্বল দিকগুলোকে ক্রমাগত স্পষ্ট করে তুলছে।
তবে সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। সরকার যদি তার সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহংকার ত্যাগ করে এটিকে একটি জাতীয় ঐকমত্যের ও সমঝোতার শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে, কেবল তবেই ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আদর্শ এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনের জনরায় একে অপরের পরিপূরক হতে পারবে। অন্যথায় নির্বাচন ও সরকার বদল হলেও বাংলাদেশের মৌলিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কোনো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না— আর এখানেই নিহিত রয়েছে বর্তমান রাজনৈতিক রূপান্তরের সবচেয়ে বড় ও চূড়ান্ত পরীক্ষা।