দেশে নতুন দারিদ্র্য বেড়েছে প্রায় ২১ লাখ কমছে প্রবৃদ্ধি, ঊর্ধ্বমুখী থাকছে মূল্যস্ফীতি
৭ অক্টোবর ২০২৬ ২২:০৬
সোনার বাংলা রিপোর্ট : দেশে টানা পাঁচ বছর ধরে বাড়ছে দারিদ্র্যের হার। এর মধ্যে গত এক বছরেই নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে প্রায় ২১ লাখ মানুষ। অর্থনৈতিক মন্দা, শিল্পায়নের গতি কমে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়াকেই দারিদ্র্য বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক।
‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট : মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’ শীর্ষক বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গত ৬ অক্টোবর মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ১ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একইসঙ্গে বেড়েছে দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্য। কর্মসংস্থান হারানোর দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নারীরা।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গতি কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়ছে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি। শিল্প খাতে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট উৎপাদন ব্যাহত করছে। অন্যদিকে ব্যাংক খাতে বাড়ছে খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতাও কমছে। এসব সংকটের সম্মিলিত প্রভাব পড়ছে নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যাওয়ায় বিশেষ করে নারীরা শ্রমবাজারে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ ও আয় কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। একই সময়ে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং সারসহ বিভিন্ন খাতে সরকার বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে। তবে এসব ভর্তুকি ও সহায়তার উল্লেখযোগ্য অংশ দরিদ্র মানুষের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছাচ্ছে না বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির মতে, অনেক তুলনামূলক সচ্ছল পরিবার সরকারি সুবিধা পাচ্ছে অথচ সবচেয়ে দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা বহু পরিবার সামাজিক সুরক্ষার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংস্কারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সুশাসন জোরদার এবং কর-রাজস্ব বাড়ানো। পাশাপাশি সাধারণ ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে তার পরিবর্তে দারিদ্র্য ও ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ বলছে, শুধু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়িয়ে দারিদ্র্য পরিস্থিতির টেকসই উন্নতি সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি এবং শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি। একই সঙ্গে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর সংকট কাটিয়ে প্রবৃদ্ধির গতি ফিরিয়ে আনাও জরুরি।
দারিদ্র্য বৃদ্ধির সাম্প্রতিক প্রবণতা তাই বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে মূল্যস্ফীতিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে; অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে শিল্প খাতের জ্বালানি সংকট, দুর্বল বিনিয়োগ এবং আর্থিক খাতের চাপ। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল মানুষের কাছে পৌঁছানোর বদলে উল্টো একটি বড় জনগোষ্ঠী নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়ছে।
সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের তুলনায় চলতি বছর দেশে দারিদ্র্যের হার ১ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গত বছর এ হার ছিল ২১ দশমিক ৪ শতাংশ। এর আগে ২০২৪ সালে ২০ দশমিক ৫, ২০২৩ সালে ১৯ দশমিক ২ এবং ২০২২ সালে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল। অর্থাৎ কোভিড-১৯-পরবর্তী সময় থেকে টানা পাঁচ বছর ধরে দেশে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে।
দারিদ্র্যের হার নিয়ে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত খানা আয়-ব্যয় জরিপে দারিদ্র্যের হার ১৯ দশমিক ২ শতাংশ দেখানো হয়েছিল। অন্যদিকে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) হিসাবে গত বছর এ হার ছিল ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। পদ্ধতি ও সময়কালভেদে পরিসংখ্যানে এ পার্থক্য থাকলেও সবক’টি হিসাবেই একটি অভিন্ন প্রবণতা স্পষ্ট— দেশে দারিদ্র্য কমার বদলে বাড়ছে।
দারিদ্র্য বৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কর্মসংস্থানের। অথচ দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রধান ক্ষেত্র শিল্প খাতই কয়েক বছর ধরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মোট কর্মসংস্থানে শিল্পের অংশ ২০ দশমিক ৪২ থেকে কমে ১৭ দশমিক ৩৬ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে সেবা খাতেও কর্মসংস্থানের অংশ কমেছে। বিপরীতে কর্মসংস্থান বেড়েছে কৃষিতে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২ শতাংশ। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে অনেক কারখানা সক্ষমতার নিচে উৎপাদন করেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মঘণ্টা কমিয়েছে, উৎপাদন বন্ধ রেখেছে কিংবা কর্মী ছাঁটাই করেছে।
দারিদ্র্য বৃদ্ধির পেছনে অর্থনীতির সামগ্রিক দুর্বলতাও বড় ভূমিকা রাখছে। বিশ্বব্যাংক চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস দিয়েছে। এর অন্যতম কারণ বিনিয়োগের সংকোচন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে পণ্য ও সেবার প্রকৃত রফতানি কমেছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের মতে, দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে জ্বালানি খাতের গভীর সংকট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা। এর সঙ্গে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তাও বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর চাপ তৈরি করছে।
অন্যদিকে চলতি বছর শেষে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭ শতাংশ থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য, সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যা এবং মুদ্রা সরবরাহের প্রবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি কমার পথে বাধা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক কান্ট্রি ডিরেক্টর জ্যাঁ পেম বলেন, ‘অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে এবং বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে ব্যাংক খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ এবং জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন। দরিদ্র মানুষকে সুরক্ষা দেয়া এবং আরো বেশি ও ভালো কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। এখনই সে পদক্ষেপ নেয়ার সময়।’
বিশ্বব্যাংক অবশ্য বলছে, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রম ত্বরান্বিত হলে ২০২৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। শক্তিশালী রেমিট্যান্সপ্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উন্নতিও অর্থনীতিকে কিছুটা সহায়তা করছে।