রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অধরা
৭ অক্টোবর ২০২৬ ২১:০২
॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
ইরাকে ইসলামিক স্টেট (আইএস/আইএসআইএল) দমনে পরিচালিত ‘অপারেশন ইনহেরেন্ট রিজলভ’ (ওআইআর) শেষ করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল। তিনি বলেন, এখন থেকে ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী এবং কুর্দি পেশমার্গা যোদ্ধারা দেশটির নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং আইএসকে ‘দমন’ রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। ইতোমধ্যে পশ্চিম ইরাকের আইন আল-আসাদ ঘাঁটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ইরাকি সেনাবাহিনীর হাতে সমর্পণ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইরাকের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে মার্কিন সেনা ইরাক ছাড়ার কথা থাকলেও একদিন আগেই সব সেনা প্রত্যাহার করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরাকের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক আব্দুল আমির আল-শাম্মারিও নিশ্চিত করেছেন, ইরাকের ভিক্টোরিয়া ঘাঁটিটি ইতোমধ্যে মার্কিন বাহিনীমুক্ত হয়েছে এবং এটিকে কূটনৈতিক মিশনগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার একটি কেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে। এর আগে কাতাইব হিজবুল্লাহ নামে এক আরব নেতা হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ৩০ সেপ্টেম্বরের পর ইরাকের আকাশে কোনো ‘শত্রুভাবাপন্ন’ (মার্কিন) উড়োজাহাজ দেখা গেলে তা ভূপাতিত করা হবে। এই ডেটলাইন অতিক্রমের আগেই ‘অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম’সহ প্রায় দুই যুগ ধরে ইরাককে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার পর দেশটি ছাড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যদিও ইরাকের নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা রয়টার্সকে বলছেন, ২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সমঝোতার মাধ্যমে নেওয়া প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বাস্তবায়ন করছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে নিজ স্বার্থ নিশ্চিত করতে ইরানে আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ : ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকাকে সংযুক্ত করা মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত অবস্থান মার্কিন বাণিজ্য ও সামরিক অভিযানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটন ডিসির থিঙ্কট্যাঙ্ক দ্য উইলসন সেন্টারের মিডল ইস্ট প্রোগ্রামের ডিরেক্টর মেরিসা খুরমা বলেন, ঐতিহাসিকভাবে তেলের চাহিদা আর কমিউনিজমের প্রভাব রুখে দেয়া মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মূল আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল। তবে বর্তমান কোনো একক শক্তি যেন অঞ্চলটিতে আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে নিজেদের শক্তিশালী উপস্থিতি বজায় রেখেছে দেশটি। যদিও যুক্তরাষ্ট্র যখন মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনছে, তখন চীন মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল বলে জানাচ্ছেন লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের (এসওএএস) আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক গিলবার্ট আসকার। এদিকে ওয়াশিংটন ডিসির থিঙ্কট্যাঙ্ক স্টিমসন সেন্টারের কেলি এ গ্রিয়েকো বলেন, অঞ্চলটি ‘চীন এবং রাশিয়ার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা-প্রতিযোগিতার মূল নাট্যমঞ্চ মধ্যপ্রাচ্য’। যদিও ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ নাতাশা হল বলেন, ‘দুঃশাসন, আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাব আর মধ্যপ্রাচ্যে অত্যাচার ও সাম্রাজ্যবাদের ধারণার কারণেই সন্ত্রাসবাদ বিদ্যমান।’ আর ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার নামে জ্বালানিসম্পদ লুট, বাণিজ্য রুট, ইসলামোফোবিয়া, ইসরাইলের সঙ্গে মিত্রতার জন্য অঞ্চলটিতে প্রভাব ধরে রাখতে চাইছে দেশটি। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য আমেরিকান পণ্য ও পরিষেবা বিশেষ করে সামরিক হার্ডওয়্যারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বাজার। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এই অঞ্চলটিতেই সবচেয়ে বেশি মার্কিন অস্ত্র রপ্তানি করা হয়েছে। মোট মার্কিন অস্ত্র রপ্তানির ৩৮ শতাংশই গেছে মধ্যপ্রাচ্যে। এছাড়া সমুদ্র পথে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্য যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান অঞ্চলটির ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের (ইসিএফআর) বিশ্লেষক হিউ লোভাট। এদিকে মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের (এমইআই) খালেদ এলগিন্ডি বলেন, ‘গত ৬০ বছরের বেশিরভাগ সময়ই অঞ্চলটিতে ইসরাইলের নিরাপত্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে শীর্ষস্তরের অগ্রাধিকার পাচ্ছে’। তথাপিও মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করা উচিত। এতে করে ‘ইন্দো-প্যাসিফিকের মতো যে জায়গাগুলোয়’ প্রয়োজনে, তাদের স্থানান্তর করা যাবে। যদিও পারমাণবিক সহায়তা, ‘অ্যাটমস ফর পিস’ ও সেনাঘাঁটিসহ বিভিন্ন অছিলায় অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্র তার উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে।
‘অ্যাটমস ফর পিস’ ও পারমাণবিক সহায়তা : ইরানে ১৯৫৭ সালে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে শাহকে সমর্থন জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলটিতে তার ঘাঁটি শক্ত করে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেনআওয়ারের ‘অ্যাটমস ফর পিস’ কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়। এক দশক পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে একটি পারমাণবিক চুল্লি ইউরেনিয়াম সরবরাহ করে। এই চুক্তিই পরবর্তীতে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বর্তমান ইজরাইল-মার্কিন-ইরান যুদ্ধের ভিত্তি। তবে ইরানে মার্কিন সেনাঘাঁটি না থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে সেটি উল্লেখযোগ্যভাবে রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাঘাঁটির যাত্রা : ইসলামোফোবিয়া ও ভূরাজনৈতিক কারণে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫৮ সালে প্রথম মার্কিন সেনা মোতায়েন করে মধ্যপ্রাচ্যে। সে সময় লেবানন সংকটে বৈরুতে প্রায় ১৫ হাজার মেরিনসেনা পাঠানো হয়েছিল। ১৯৯০ সালের গাল্ফ যুদ্ধ একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়। ইরাকের কুয়েত আক্রমণের পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের হাজার হাজার সেনা অঞ্চলটির মিত্র দেশগুলোতে পাঠায়। যুদ্ধ শেষ হলেও কিছু কিছু সেনা থাকে তেল আহরণ ও আগ্রাসন চালাতে। এরপর ক্রমেই অঞ্চলটিতে নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে বৃহৎ, স্থায়ী এবং ছোট সব ধরনের সামরিক ঘাঁটি গাড়তে থাকে মার্কিন সেনারা। আর ইরাক নিয়ন্ত্রণের জন্য ইঙ্গ-মার্কিন জোটও গঠন করা হয়।
ইরাককে ঘিরে ইঙ্গ-মার্কিন জোট : ব্রিটিশ ও ফরাসি কূটনীতিক সাইক ও পিকোর মধ্যকার সাক্ষরিত সাইকস-পিকো চুক্তির ফল বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য। বর্তমান ইরাক পূর্বে অটোমান সাম্রাজ্যের তিনটি বড় প্রদেশের (বাগদাদ, মসুল ও বসরা) সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রয়োজনে এই তিনটি প্রদেশের সমন্বয়েই ইরাক তৈরি হয় এবং বাদশা ফয়সালকে ইরাকের শাসন ক্ষমতায় বসানো হয়। তিনি ব্রিটিশদের ইরাকের আবিষ্কৃত তেলের খনিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রদান করেন। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের Royal Air Force (RAF) ইরাকে ফয়সালের বিরুদ্ধে বিপ্লবের মাধ্যমে ইরাক দখল নেয়। ইরাককে রাজতন্ত্রের বদলে প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা সত্ত্বেও সরকার তেলের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের পালে যুক্তরাষ্ট্রও যুক্ত হয়। কিন্তু প্রজাতন্ত্র হওয়ায় তারা ব্রিটিশ সরকারের ওপর ফয়সালের মতো অনুগত ছিলো না। যদিও ইঙ্গ-মার্কিন জোটকে আরব দেশগুলো থেকে তেল আমদানি করতে হলেও, আরব দেশগুলোর রাজস্বের অধিকাংশই চলে যেত এই জোটের থেকে অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানিতে। ‘অস্ত্র-পেট্রোডলার চক্র’ আরব দেশ ও ইঙ্গ-মার্কিন জোটের মধ্যে চলতে থাকে। এছাড়া গালফভুক্ত দেশগুলো বিশাল অংকের রাজস্ব পশ্চিমা আর্থিক ও প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করতো। আর ইরাক রাজস্ব জনগণের জীবন-মান; অবকাঠামো নির্মাণ; শিল্পায়ন ও শিক্ষা উন্নয়নে ব্যবহার করে। এ সময় ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের জনপ্রিয়তা, উন্নয়ন ও তেলের খনিগুলোর ওপর একনিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায়। ফলে ইঙ্গ-মার্কিন জোট সাদ্দাম হোসেনকে অপসারণ জরুরি মনে করে। এরপর WMD-র মিথ্যা অভিযোগ তুলে ইরাকে ইঙ্গ-মার্কিন জোট চালায় ‘অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম’ নামে হামলা।
ইরাকে ঈঙ্গ-মার্কিন হামলা : ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ওয়াশিংটন সাদ্দাম হোসেনকে অস্ত্র সরবরাহ করেছিল। তারপর ১৯৯০ এবং ২০০০-এর দশকে মার্কিন নীতি (ওয়াশিংটন) তার বিরুদ্ধে চলে যায়। পরে ২০০৩ সালের ২০ শে মার্চ ঈঙ্গ-মার্কিন জোট WMD (Weapon of Mass Destruction) রাখার অভিযোগে ইরাকে অন্যায়ভাবে হামলা করে। তিন সপ্তাহের মধ্যে সাদ্দাম হোসেন এর সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে জোট। এয়ারক্রাফট কেরিয়্যার ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের ডেকে দাঁড়িয়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ঘোষণা করেন, মিশন সফল। সেই সময় পর্যন্ত আমেরিকা ও তার জোটসঙ্গীরা ২৯ হাজার ১৬৬টি বোমা ও রকেট ফেলেছিল ইরাকে। দেশটির পরিকাঠামোর বড় অংশ মাটিতে মিশে গেছিল। তারপর ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইরাকি প্রেসিডেন্ট এবং মুসলিম উম্মাহর নেতা সাদ্দাম হোসেনকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন ভোরে এক মিথ্যা, অন্যায় ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়। যদিও সেখানে কোনো WMD (Weapon of Mass Destruction) পাওয়া যায়নি। তবে মুসলিমরা দুর্বল ঈমান নিয়ে করতে পারেনি তেমন প্রতিবাদ। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেন প্রশাসনের ওপর হামলার পর ২০০৭ সালে ইরাকে মার্কিন সেনার সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এই সেনাদের একটি অংশ ২০১১ সালে ইরাক ছাড়ে। পরে ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেট (আইএস) বিরোধী ‘অপারেশন ইনহেরেন্ট রিজলভ’ অভিযানের জন্য ইরাকে আরও সেনা পাঠানো হয়। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কস্টস অব ওয়ার’ প্রকল্পের হিসাবে ইরাকে প্রায় দুই যুগের সংঘাতে ২ লাখ ১০ হাজার ইরাকি নিহত হয়েছেন। যদিও সব মৃত্যু নথিভুক্ত হয়নি। এসব যুদ্ধে ৩ কোটি ৮০ লাখ ইরাকির মধ্যে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার তথ্যমতে বাস্তুচ্যুত ৯২ লাখ। তবে ব্রিটিশ এনজিও বেবিকাউন্টের হিসাব, সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা দুই লাখ থেকে ১০ লাখের মধ্যে। তবে সাবেক ন্যাটো সেক্রেটারি জেনারেল জাবিয়ার সোলানা বলেছিলেন, যদি এই অভিযানের লক্ষ্য থাকে ইরাককে সন্ত্রাসমুক্ত করা, তার পুনর্গঠন ও সর্বস্তরে সুরক্ষা বাড়ানো, তাহলে এই লক্ষ্যপূরণ হয়নি। যদিও ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতা এমন ছিল যে তৎকালীন ইরাকি প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-আবাদি জানিয়েছিলেন, ইরাক পুনর্গঠনে কমপক্ষে ১০০ বিলিয়ন ডলার লাগতে পারে। তবে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইনকে দেখিয়েছে বৃদ্ধাঙ্গুলি।
আন্তর্জাতিক আইনভঙ্গ : আইন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক কাই অ্যামবোস উড কে জানিয়েছেন, ‘যেভাবে ইরাক আক্রমণ করা হয়েছে, তা জাতিসংঘের চার্টার ও আন্তর্জাতিক আইনের বিরোধী। তাহলে একমাত্র আত্মরক্ষার জন্যই এই ধরনের আগ্রাসন করা যেতে পারে। তবে এখানে আত্মরক্ষার কোনো বিষয় ছিল না।’ সেই সময়ে জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল কফি আনানও, ঐ আগ্রাসনকে ‘বেআইনি’ বলেছেন। হার্ভার্ডের অধ্যাপক স্টিফেন ওয়াল্ট বলেছেন, ‘আসলে আমেরিকা আগে ঠিক করে নিয়েছিল তারা কী করবে। এমন নয়, গোয়েন্দারা এইসব তথ্য দিয়েছিলেন। তারপর তারা WMD-এর মতো ঐসব যুক্তি সাজিয়েছিল। আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করে ইরাকে ইঙ্গ-মার্কিন জোটের হামলার অন্যতম অগ্রাধিকার ছিল ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ নিয়ন্ত্রণ।
ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে : ইরাকে দুই যুগে ৪৫০০ মার্কিন সেনার প্রাণহানি আফগানিস্তানে একই সময়ে চলা যুদ্ধে নিহতের প্রায় দ্বিগুণ। তবে ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ নিয়ন্ত্রণের সুযোগে ওয়াশিংটন কেবল বাগদাদের রাজনীতি ও অর্থনীতিতেই প্রভাব খাটাচ্ছে না, পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় ভূমিকা রাখছে। ২০০৩ সালে ইরাক দখলের পর মার্কিন নেতৃত্বাধীন ‘কোয়ালিশন প্রোভিশনাল অথরিটি’ (সিপিএ) দেশ পুনর্গঠনের জন্য ‘ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ফর ইরাক’ (ডিএফআই) নামের একটি বিশেষ তহবিল গঠন করে। ইরাকের তেল আয়কে সুরক্ষা দেওয়ার নামে এর অ্যাকাউন্টটি নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে খোলা হয়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে চালু হওয়া এই ব্যবস্থা পরবর্তীতে প্রতিটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নবায়ন করে আসছেন। এই ডিএফআই ফান্ডটি পরে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে পরিচালিত ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে রূপান্তরিত হয়ে আজও পরিচালিত হচ্ছে। ইরাকের জাতীয় বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশ আয়ই আসে তেল রপ্তানি থেকে। ফলে দেশটির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই ওয়াশিংটনের হাতে। রয়টার্স জানিয়েছে, ২০২০ সালে ইরাক সরকার যখন আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন সেনাদের দেশ ছাড়তে বলে, তখন নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ফান্ডে ইরাকের প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয় ওয়াশিংটন। শেষ পর্যন্ত মার্কিন চাপের মুখে পিছু হঠতে বাধ্য হয় বাগদাদ। ইরাকের তেল বিক্রির যাবতীয় অর্থ এখনো নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের হেফাজতেই জমা হচ্ছে। ফলে ভূমি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার হলেও এই নির্ভরতা দেশটির পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব অর্জনের পথে বড় বাধা। এদিকে দ্বিতীয় মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে আগ্রাসন চালানোর কারণে দুই শক্তির লড়াইয়ের মাঝে পড়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বিপাকে পড়েছে ইরাক।
অর্থনৈতিক সংকটে বাগদাদ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ইরানে মার্কিন-ইসরাইল আগ্রাসনের পর থেকে ইরাকের তেল রাজস্ব ৭০ শতাংশের বেশি কমেছে। প্রধানমন্ত্রী আল-জাইদি বলেছেন, যুদ্ধের কারণে ইরাক প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের তেল রাজস্ব হারিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সরকারি কর্মচারীদের বেতনে। অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, বেতনের জন্য প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন দিনার দরকার হলেও সরকারের হাতে ছিল মাত্র ৩ ট্রিলিয়ন। গত নভেম্বরের নির্বাচনের পর নুরি আল-মালিকির প্রধানমন্ত্রিত্বের সম্ভাবনা মার্কিন ভেটোয় ভেস্তে গিয়েছিল। পরে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা পেরিয়ে প্রায় ছয় মাসের অচলাবস্থার পর ১৪ মে আল-জাইদির সরকার শপথ নেয়। তিনি পেশায় ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিতে নবাগত। বসরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের ভাষ্যে, ইরাকের আধুনিক ইতিহাসে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাহীন কোনো ব্যবসায়ী এই প্রথম প্রধানমন্ত্রী হলেন। যিনি দেশ চালাতে অর্থনৈতিক সংকটে হিমশিম খেলেও ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে জনগণের রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছেন।
ইরাকি সরকারের প্রতিক্রিয়া : ইরাকি সরকার মার্কিন সেনাদের প্রস্থানকে বিজয় হিসেবে উদযাপনের জন্য চার দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে। এটিকে ইরাকের ‘সার্বভৌমত্ব দিবস’ আখ্যায়িত করেছে দেশটি। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি বলেছেন, এর মধ্য দিয়ে ইরাকের জন্য নতুন একটি দিনের সূচনা হলো। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টকমের কমান্ডার জেনারেল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আলী আল জাইদির বৈঠকের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা হয়েছে মার্কিন সেনাদের প্রস্থানের এই ডেটলাইন বা সময়সীমা। দেশটি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা এবং প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষকে ‘ইরাকি সার্বভৌমত্ব দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচির বিষয়ে সরকারি মিডিয়া সেলের সঙ্গে সমন্বয় করার নির্দেশ দিয়েছে। গণমাধ্যমের তথ্যমতে, গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরাকের শহীদ ও ভুক্তভোগীদের স্মরণে সরকারি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন। তবে এটি ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ জন্যও একটি বিশাল বিজয়।
‘প্রতিরোধ অক্ষের’ বিজয় : ইরাক থেকে মার্কিন বাহিনীর প্রত্যাহারকে একটি ‘মহান ও ঐতিহাসিক ঘটনা’ এবং ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বর্ণনা করেছে ইরানের আইআরজিসি। একইসঙ্গে তারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, এই ঐতিহাসিক বিজয়ের জন্য আমরা গর্বিত। ইরাকি জাতি, ঐক্যবদ্ধ ইসলামী প্রতিরোধ ফ্রন্ট এবং ইসলামী বিশ্বের বিপ্লবীদের অভিনন্দন জানাই। বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, আমেরিকাকে অঞ্চল ছেড়ে যেতে হবে। গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি দেখিয়েছে, এই উপস্থিতি পশ্চিম এশিয়া তথা মুসলিম উম্মাহর জন্য ‘নিরাপত্তাহীনতা, সন্ত্রাসবাদ ও অস্থিতিশীলতার’ একটি কারণ হয়ে উঠেছে। গত ৫ অক্টোবর সোমবার ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের উপপ্রধান আমির হায়াত মোঘাদ্দাম বলেন, আমেরিকান সেনারা ইরাক ও অঞ্চলটি ছেড়ে গেলে সেখানে স্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, ‘ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ইরান স্বাগত জানায়। এদিকে ইরাকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী সুদানীর উপদেষ্টা হোসেন আল্লাভী বলেছেন, এই পদক্ষেপ কেবল বিদেশি সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর ভেতরে আছে এক নতুন শক্তিসমিকরনের বার্তা।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন সেনা চলে যাওয়ায় দেশটিতে শূন্যতা তৈরি হতে পারে। যেখানে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো আরও শক্তিশালী হতে পারে এবং পুনরুত্থানশীল ইসলামিক স্টেট (আইএস) আবারও সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। ইরানবিষয়ক ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি বলেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের বিদায়ে কৌশলগতভাবে লাভবান হবে ইরান। কারণ বহু বছর ধরে ইরাকের রাজনীতি ও নিরাপত্তায় তেহরানের প্রভাবের বিরুদ্ধে ভারসাম্য হিসেবে কাজ করেছে মার্কিন উপস্থিতি। তবে এই সেনা প্রত্যাহার নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন ফালুজাহর নেতা আবদুর রহমান আল-জোবাই। এদিকে কুর্দি কমান্ডার সিরওয়ান বারজানি জানান, আন্তর্জাতিক জোটের আনুষ্ঠানিক প্রত্যাহারের ঘোষণা আসার পর থেকেই আইএস স্লিপার সেলগুলোর তৎপরতা লক্ষ করা গেছে। আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে একটি ব্রিগেডের নেতৃত্ব দেওয়া অবসরপ্রাপ্ত ইরাকি জেনারেল মোহাম্মদ আল-জুবুরি বলেছেন, ‘জোটবাহিনী চলে যাওয়ার পর ইরাকের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো ‘প্ল্যান বি’ প্রস্তুত করেছে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।’ তবে ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জোট ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’-এর কমান্ডার আবু মুজতবা আল-ইয়াসিরি মার্কিন প্রত্যাহারকে ‘ইরাকি ইসলামিক প্রতিরোধ গোষ্ঠী ও সম্মানিত ইরাকিদের ঐতিহাসিক বিজয়’ এবং ‘আমেরিকান প্রকল্পের চরম পরাজয়’ বলে বর্ণনা করেছেন।
তথ্যসূত্র : রয়টার্স, বিবিসি, আল-জাজিরা ও মিডলইস্ট মনিটর।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : alhelaljudu@gmail.com