জাকসু : মেয়াদ শেষ, নেই পরবর্তী নির্বাচনের রোডম্যাপ


৭ অক্টোবর ২০২৬ ২০:৪৯

দ্রুত তফসিল ঘোষণার দাবি ছাত্র সংগঠনগুলোর

জাবের আব্দুল্লাহ, জাবি : দীর্ঘ ৩৩ বছরের অচলায়তন কেটে গত বছর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা ও প্রতিনিধিত্বের নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়। তবে এক বছর না যেতেই সেই ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মেয়াদ শেষ হলেও পরবর্তী নির্বাচনের তফসিল বা রোডম্যাপ ঘোষণা করেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন। তবে নির্বাচন কবে হবে, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জাকসু নির্বাচনে ২৫টি পদের মধ্যে ২০টিতে জয়ী হয় ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’। সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুর রশিদ জিতু এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে মাজহারুল ইসলাম নির্বাচিত হন। যদিও পরবর্তীতে ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু বিএনপিতে যোগ দেন। ১১ হাজার ৮০৫ জন নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে ভোট দেন ৮ হাজার ৩ জন। ১৯ সেপ্টেম্বর শপথ গ্রহণের পর দায়িত্ব নেন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা।
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, বর্তমান কমিটির এক বছরের মেয়াদ গত ১৯ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী নির্বাচন আয়োজনের জন্য ভোটার তালিকা প্রণয়ন, তফসিল ঘোষণা কিংবা নির্বাচন কমিশন গঠনের মতো কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। ফলে জাকসুর নিয়মিত নির্বাচন আয়োজনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা বলছেন, জাকসু নির্বাচনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য জরুরি। তাদের মতে, নির্বাচনের নির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকলে আবারও দীর্ঘ বিরতির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তবে আগের নির্বাচনে ওঠা অনিয়ম ও পক্ষপাতের অভিযোগের সুরাহা এবং সব সংগঠনের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
দ্রুত নির্বাচনের দাবি ছাত্র সংগঠনগুলোর
জাকসুর পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে দ্রুত রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছে ছাত্রশিবির। সংগঠনটির জাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান জাকসুর জিএস মাজহারুল ইসলাম বলেন, তারা দায়িত্বে থাকাকালীন সময় থেকেই একাদশ জাকসু নির্বাচনের রোডম্যাপ দাবি করে আসছেন। এ বিষয়ে পূর্ববর্তী ও বর্তমান উভয় ভিসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দাবি জানানো হয়েছে। নতুন ভিসি দায়িত্ব গ্রহণের দিনও সৌজন্য সাক্ষাতে বিষয়টি তুলে ধরেছেন তারা।
মাজহারুল ইসলাম বলেন, সর্বশেষ হল সংসদ ও জাকসু সমন্বয় বৈঠকেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দ্রুত তফসিল ঘোষণার কথা জানানো হয়েছে। তবে ভিসি জাকসু নির্বাচনের সিদ্ধান্ত সরকারের ওপর নির্ভরশীল বলে জানিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। এতে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি।
ছাত্রশিবিরের এই নেতা আরও বলেন, একাদশ জাকসু নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রশাসনের অনীহা রয়েছে বলে তাদের মনে হচ্ছে। এ বিষয়ে অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা চলছে। দ্রুত নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণায় প্রশাসনকে বাধ্য করতে তারা উদ্যোগ নেবেন।
তবে শুধু ছাত্রশিবির নয়, দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছে জাতীয় ছাত্রশক্তিও। জাবি শাখার সভাপতি জিয়া উদ্দিন আয়ান বলেন, আগের জাকসুর প্রতিনিধিদের অন্যতম দায়িত্ব ছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে পরবর্তী নির্বাচনের তফসিল আদায় করা। কিন্তু তারা সেক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন।
জিয়া উদ্দিন আয়ান বলেন, নির্বাচনের আগে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত জাকসু নির্বাচনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই ধারাবাহিকতা রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি। তারা চান, প্রতি বছর ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্যালেন্ডারে জাকসু নির্বাচনের রোডম্যাপ অন্তর্ভুক্ত করে দ্রুত তফসিল ঘোষণা করতে হবে।
অন্যদিকে নির্বাচনের আগে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রহণযোগ্য পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ছাত্রদল। জাবি শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন বাবর বলেন, জাকসু নির্বাচন নিয়ে যেসব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর সুরাহা করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিলে ছাত্রদলের কোনো আপত্তি নেই। তবে নির্বাচনে সব ছাত্র সংগঠনের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।
জাবি শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি অদ্রি অংকুর বলেন, আগের জাকসু নির্বাচনে ওঠা অনিয়ম, অসংগতি ও পক্ষপাতের অভিযোগগুলোর সুরাহা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে পরবর্তী নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করা প্রয়োজন। তার মতে, নিয়মিত নির্বাচন না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হবে।
প্রশাসনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
পরবর্তী জাকসু নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি। এ বিষয়ে জানতে জাকসুর সভাপতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. নুরুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক ভিসি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান জানিয়েছিলেন, পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে প্রশাসনিকভাবে বসে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে সেই আলোচনার ভিত্তিতে পরবর্তী নির্বাচনের কোনো সময়সূচি এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাকসু নির্বাচন নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়নি। ১৯৭২ সালে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৭৪, ১৯৭৯, ১৯৮০, ১৯৮১, ১৯৮৯, ১৯৯০, ১৯৯১ ও ১৯৯২ সালে নির্বাচন হয়। এরপর দীর্ঘ ৩৩ বছর কোনো নির্বাচন হয়নি। ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনটি ছিল জাকসুর দশম নির্বাচন।
দীর্ঘ বিরতির পর গত বছরের নির্বাচনে তফসিল ঘোষণা, ভোটার তালিকা প্রণয়ন, আচরণবিধি নির্ধারণ ও প্রার্থী-সংক্রান্ত কার্যক্রম ধাপে ধাপে সম্পন্ন করেছিল প্রশাসন। ভোটের তারিখ ঠিক রেখে ওই বছরের আগস্টে পুনঃতফসিলও ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু এবার বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও পরবর্তী নির্বাচনের দৃশ্যমান কোনো প্রস্তুতি না থাকায় জাকসুর ধারাবাহিকতা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, নিয়মিত নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে জাকসু শিক্ষার্থীদের সমস্যা তুলে ধরা ও সমাধানের কার্যকর মঞ্চ হিসেবে ভূমিকা রাখবে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা না আসায় সেই প্রত্যাশা আপাতত অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েছে।
নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রুবাইয়া জাবিন তাহমিনা বলেন, ‘জাকসু নির্বাচনের পর শিক্ষার্থীরা তাদের বিভিন্ন সমস্যা হল সংসদ বা কেন্দ্রীয় সংসদের মাধ্যমে সহজেই জানাতে পারছে। ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের এসব সুবিধা আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে অবশ্যই জাকসু নির্বাচন দরকার।’
তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, পরবর্তী জাকসু নির্বাচন আয়োজনে তাদের এখন পর্যন্ত কোনো প্রস্তুতি নেই। সংশ্লিষ্টদের সদিচ্ছার অভাব দেখা যাচ্ছে। সরকারের উচ্চমহল থেকে সবকিছু পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সরকারের গ্রিন সিগন্যাল ছাড়া কিছু করার সুযোগ নেই।
এদিকে দ্রুত জাকসু নির্বাচন আয়োজনে প্রশাসনকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন জাকসু সদ্য সাবেক সদস্যরা।
জাকসুর সদ্য সাবেক এজিএস ফেরদৌস আল হাসান বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে বহুল কাঙ্ক্ষিত জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ এফোর্ট দিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করার চেষ্টা করেছি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে মাত্র কয়েক লাখ টাকা পেলেও প্রায় তিন কোটি টাকার কাজ করেছি। আমরা জব ফেয়ার করেছি, বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের আধুনিকায়নে কাজ করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা জাকসুর সুফল ভোগ করেছে। তাই তারা পরবর্তী জাকসু নির্বাচন পেতে বদ্ধপরিকর। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনও জাকসু নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানাচ্ছে। অনতিবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জাকসুর রোডম্যাপ ঘোষণাসহ সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।’
তবে এ বিষয়ে জানতে জাকসুর সদ্য সাবেক ভিপি আব্দুর রশিদ জিতুর সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে জাকসু নির্বাচনের বিকল্প নাই, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে ছাত্র সংগঠনগুলোর দ্রুত নির্বাচনের দাবি, রাজপথে জোরালো আন্দোলন এবং প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ওপরই ঝুলে আছে পরবর্তী জাকসুর নির্বাচনী সময়সূচি।