বস্তুবাদী দর্শনে কল্যাণরাষ্ট্র সম্ভব নয় : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ


৭ অক্টোবর ২০২৬ ২০:২৫

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
একসময় বিশ্বে বর্তমান আধুনিক রাষ্ট্রের মতো কোনো রাষ্ট্র ছিল না। জনগণ ও সমাজের স্বার্থেই আধুনিক রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। প্রথমে রাষ্ট্র তারপর বিভিন্ন বিবর্তনের মধ্য দিয়েই বিভিন্ন অঙ্গ তৈরি করা হয়েছে। যেমন সরকার তথা নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইন বিভাগ ইত্যাদি। একপর্যায়ে রাষ্ট্রের চতুর্থ অঙ্গ সংবাদমাধ্যম। আবার সরকারের নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনী। এমনিভাবে যুগে যুগে রাষ্ট্রের পরিধি যেমন বাড়ে, তেমনিভাবে তার ক্ষমতা ও অধিকারের পাশাপাশি দায়িত্ব ও সেবার পরিধি ও চাহিদা বাড়ে। অপরদিকে রাষ্ট্রের ধরন ও প্রকৃতি তথা আদর্শিক বৈশিষ্ট্য দিয়ে তার একটি পরিচিতিও লাভ করে। বর্তমান বিশ্বে যেমন আছে বস্তুবাদী রাষ্ট্র, তেমনি রয়েছে আদর্শিক রাষ্ট্র। বস্তুবাদী রাষ্ট্রগুলো পুঁজিবাদ, কমিউনিজম, সাম্যবাদ, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি মতবাদে বিশ্বাসী ও তাকে ধারণ করে অপরদিকে আদর্শিক রাষ্ট্রগুলো ইসলামসহ বিভিন্ন আদর্শকে ধারণ করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ও চলছে।
বস্তুবাদী রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন নামে রাষ্ট্র পরিচালনা করে থাকে, তবে তাদের রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার দর্শন ও নীতি পরিবর্তনশীল। যেমন— বাংলাদেশ জন্ম হওয়ার পর থেকে যে আদর্শ ও দর্শন দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু করেছিল, তা শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে। বাংলাদেশ শুরু করেছিল, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র নামক আদর্শ দিয়ে। কিন্তু যারা এ দর্শন দিয়ে শুরু করেছিল, তারা নিজেরাই তিন বছরের মধ্যেই গণতন্ত্রকে হত্যা করে একদলীয় শাসনের দিকে চলে যায়। পরবর্তী তিন বছর তথা ১৯৭৫ সালে ক্ষমতা গ্রহণকারী আরেক শাসকগোষ্ঠী এসে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দিয়ে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস এবং সমাজতন্ত্রের সাথে নতুন শব্দ যোগ করে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচার। পরবর্তীতে আবার সেক্যুলার গোষ্ঠী আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতাকে ফিরিয়ে আনে। এভাবে বিগত ৫৫ বছর ধরে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির আদর্শ ও দর্শন তথা মূলনীতি বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। তবে যতই পরিবর্তন করুক না কেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি পুরোপুরি পরিচালিত হচ্ছে বস্তুবাদী দর্শন ও আদর্শকে ভিত্তি করেই। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আদর্শ ও দর্শন হওয়া উচিত ছিল নৈতিক মূল্যবোধ বিকাশ ও লালনের চিরন্তন আদর্শ ইসলাম। তবে এ বাংলা ভূখণ্ডটি ১৯৪৭ সালে যখন ভারত থেকে আলাদা হয়, তখন কিন্তু ইসলামকেই এ রাষ্ট্রের আদর্শ ও দর্শন হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তথা ১৯৭২ সালে নাস্তিকতাবাদী কমিউনিস্ট ও ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদী গোষ্ঠী রাষ্ট্রটিকে তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক আদর্শের নামে বস্তুবাদী মতবাদকে গ্রহণ করে। যার পরিণতিতে বাংলাদেশ একটি অকার্যকর রাষ্ট্রের দিকে নিপতিত হচ্ছে।
বস্তুবাদী আদর্শ ও দর্শন স্বল্পসময়ে খুবই চমকপ্রদ মনে হতে পারে, কিন্তু নৈতিক মানুষ ও সমাজ তথা রাষ্ট্র তৈরিতে কোনো সময়ই সফল হতে পারেনি। বিগত দুই শতক ধরে বিশ্বব্যাপী প্রচার চালানো হচ্ছে কমিউনিজম ও সমাজতন্ত্র বাস্তবায়ন করতে পারলে শোষণমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানবতার মুক্তি আসতে পারে। কিন্তু বিগত শতকে রুশ ফেডারেশনে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার পর দেখা গেল মানবতার মুক্তি মেলেনি, বরং একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র ভেঙে পড়ে। এভাবে চীন, যুগোস্লাভিয়া, পোল্যান্ড ও আলবেনিয়াসহ অনেক দেশে কমিউনিজম আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করে শোষিত মানুষের মুক্তির অনেক কোশেশ করা হয়েছে। কিন্তু সেই দেশগুলোয়ও মানবতার মুক্তি মেলেনি, বরং চীনসহ প্রতিটি রাষ্ট্রই বস্তুবাদী আদর্শ সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমকে প্রত্যাখ্যান করেছে ।
একটি রাষ্ট্র শুধু তার রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, প্রশাসন, আইন ও বিচার বিভাগ দিয়েই চলে না। রাষ্ট্রের সাধারণ জনগণও গুরুত্বপূর্ণ। তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রাষ্ট্রটির আদর্শ ও তার দর্শন। সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে সরকার ও প্রশাসনের কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যবৃন্দ, আইনপ্রণেতা, বিচারপতি, মন্ত্রীবর্গ, প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট— সবাই রাষ্ট্রের আদর্শ ও দর্শন দ্বারাই প্রভাবিত ও পরিচালিত হয়ে থাকেন। একটি রাষ্ট্রের আদর্শ ও দর্শন যে প্রকৃতি ও ধরনের হবে তার কর্ণধার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপ্রধানও সেই প্রকৃতি ও ধরনের হবেন। সেই আদর্শ ও দর্শন দিয়েই রাষ্ট্র ও সরকারের আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে প্রতিটি বিধিবিধান প্রণীত হবে। তারা সেই আদর্শ ও দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হবেন এবং সকলের নীতি-নৈতিকতাও সেই মাত্রা ও মানের হবে।
রাষ্ট্রটি যদি বস্তুবাদী হয়, তাহলে তার আইন ও বিধিবিধানও হবে বস্তুবাদী আদর্শ ও দর্শন দ্বারা তেমনিভাবে রাষ্ট্রটি যদি আদর্শিক হয়, তাহলে তার আইন ও বিধিবিধানও হবে আদর্শিক। আর ঐ আদর্শ দ্বারাই রাষ্ট্রের কর্ণধার থেকে শুরু করে সকল কর্মকর্তা ও জনগণের নীতি-নৈতিকতা গঠন ও উন্নীত হবে।
ব্যক্তিস্বার্থ বনাম জনকল্যাণ
বস্তুবাদী আদর্শ মানুষকে মূলত ‘অর্থনৈতিক একক’ (Economic Agent) হিসেবে দেখে, যেখানে ব্যক্তিস্বার্থই প্রধান। অপরদিকে আদর্শিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় আত্মত্যাগ ও সহমর্মিতার ওপর। অবস্তুগত বা নৈতিক ভিত্তি না থাকায় বস্তুবাদী নীতিবোধ প্রায়ই সুবিধাভোগী শ্রেণিস্বার্থ দ্বারা সংজ্ঞায়িত হয়। বস্তুবাদী মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে গঠিত রাষ্ট্রযন্ত্র কেবল ধনতান্ত্রিক কাঠামোর জন্ম দেয়, যেখানে ব্যক্তিস্বার্থই প্রাধান্য পায়, কিন্তু কল্যাণরাষ্ট্রে গুরুত্ব পায় ত্যাগ, সহমর্মিতা ও অপরকে অগ্রাধিকার।
বস্তুবাদী দর্শনের মূলকথা হলো— জীবন ও জগতের মূলভিত্তি বস্তু এবং মানবসম্পর্ক ও সামাজিক কাঠামো মূলত অর্থনৈতিক স্বার্থ, পুঁজি ও বৈষয়িক চাহিদার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই বস্তুবাদী দর্শনের আলোকে বাংলাদেশকে কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব নয়, তাই এখানে কিছু পয়েন্ট অবতারণা করা হচ্ছে।
বস্তুবাদী দর্শনে নীতি-নৈতিকতাকে সর্বজনীন বা ঐশ্বরিক না মেনে বৈষয়িক ও আপেক্ষিক মনে করে। ফলে ব্যক্তি বা রাজনৈতিক শ্রেণির প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় নিজস্ব বৈষয়িক স্বার্থ ও ক্ষমতা অর্জন; এককথায় স্বার্থকেন্দ্রিক নীতি। এককথায় বস্তুবাদী দর্শনে নৈতিকতার আত্মিক ভিত্তি না থাকায় রাষ্ট্রে ও সরকারে রাজনৈতিক দুর্নীতির বিস্তার ঘটে। বাংলাদেশে কল্যাণরাষ্ট্র গঠনের অন্যতম প্রধান বাধা হলো দুর্নীতি ও সম্পদ পাচার। নীতিবোধের অভাব ও চরম বস্তুভোগবাদী মানসিকতার কারণে জনপ্রতিনিধি ও আমলাদের মধ্যে জনকল্যাণের চেয়ে ব্যক্তিগত পুঁজি তথা সম্পদ অর্জনেরই প্রবণতা প্রবল হয়।
বস্তুবাদী সমাজব্যবস্থা বাজার অর্থনীতি ও ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। বাংলাদেশে বিগত দশকগুলোয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও তা সমাজের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে সম্পদ পুঞ্জীভূত করেছে। এতে করে জাতীয় সম্পদের অতি কেন্দ্রীকরণ হয়েছে। এটা হয়েছে পুঁজিবাদী তথা বস্তুবাদী মানসিকতার পরিণতি।
জবাবদিহি ও মূল্যবোধের সংকট
বস্তুবাদী দর্শনে ক্ষমতা ও সম্পদই প্রধান নিয়ামক। বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে যখন অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়, তখন জবাবদিহি ও সুশাসন সুদূরপরাহত হয়ে পড়ে। কল্যাণরাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আদর্শিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রয়োজন। অপরদিকে বস্তুবাদী দর্শনে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার রাজনৈতিক স্বার্থে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল ও দলীয়করণ করা হয়। বাংলাদেশে বিগত ৫৫ বছরে তাই করা হয়েছে। বস্তুবাদী দর্শনে জবাবদিহি করতে হয় রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণ নামক জাগতিক শক্তির কাছে। তাই জাগতিক শক্তিকে ফাঁকি দিতে পারলে কোনো সমস্যা নেই। আর জাগতিক শক্তিকে ফাঁকি দেয়া সম্ভব। অপরদিকে আদর্শিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কৃতি হচ্ছে সবাইকে দুনিয়াবি শক্তির কাছে জবাবদিহির পাশাপাশি চূড়ান্ত জবাবদিহি করতে হয় সৃষ্টিকর্তার কাছে। তাই আদর্শিক বিশ্বাসে গড়া রাষ্ট্রে পুলিশি পাহাড়া ছাড়াও নৈতিক পাহারা থাকায় দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড কমে আসে। তখন রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে সব ধরনের কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং জনগণ বিশ্বাস করে, আমার সকল কর্মকাণ্ড জাগতিক কোনো শক্তি দেখুক আর না দেখুক, সৃষ্টিকর্তা দেখছেন। আমার অনৈতিক ও অপরাধ তিনি দেখছেন এবং পরকালে আমাকে এজন্য জবাবদিহি করতে হবে। তখন আদর্শিক ও প্রকৃত বিশ্বাসী মানুষ দ্বারা অনৈতিক ও দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ড করা সম্ভব হয় না। এভাবে আদর্শিক রাষ্ট্রে জাগতিক জবাবদিহির পাশাপাশি একটি নৈতিক জবাবদিহি গড়ে ওঠে।
বস্তুবাদী দর্শনে মানুষের আত্মিক ও মানবিক গুণাবলির কোনো মূল্যায়ন করা হয় না। আদর্শিক মূল্যবোধের কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণাটি এসেছে ‘পারস্পরিক সহমর্মিতা’, ‘ত্যাগের মানসিকতা’ ও ‘মানবিক দায়িত্ববোধ’ থেকে। বস্তুবাদী দর্শনে মানুষকে কেবল অর্থনৈতিক উপাদান হিসেবে মূল্যায়ন করায় নিঃস্বার্থ জনসেবা বা ত্যাগের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না।
বস্তুবাদী দর্শনের অনুসারীদের স্বার্থভিত্তিক সম্পর্কের কারণে সমাজে আত্মকেন্দ্রিকতা বাড়ে, যা রাষ্ট্রকে একটি ঐক্যবদ্ধ জনকল্যাণমূলক পরিবার হিসেবে গড়ে তুলতে বাধা দেয়। সর্বোপরি সামাজিক সংহতি গড়ে ওঠে না।
বস্তুবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক বস্তুবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে চলতে হচ্ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কঠিন শর্ত ও বস্তুবাদী বাজারব্যবস্থা রাষ্ট্রকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় পর্যাপ্ত ভর্তুকি দিতে উৎসাহিত করে না। তাই শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো জরুরি সেবা খাত আজকে বাণিজ্যিক খাতে রূপান্তরিত হয়েছে।
ভোগবাদী প্রজন্ম ও মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক
বস্তুবাদী দর্শনে বিশ্বাসী রাষ্ট্র কেবল ভৌত অবকাঠামো ও জিডিপি বৃদ্ধিকে উন্নয়ন মনে করে, কিন্তু মানসম্পন্ন শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা, ত্যাগী মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সুষম বণ্টনে নজর দেয় না। এতে করে একটি ভোগবাদী প্রজন্ম গড়ে উঠে, নৈতিক ও ত্যাগী প্রজন্ম গড়ে ওঠে না। অপরদিকে আদর্শিক ও কল্যাণমুখী আদর্শের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র নৈতিক ও ত্যাগী জনশক্তি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আদর্শিক ও ধর্মীয় অনুশাসন মানুষের ভেতর দায়বোধ তৈরি করে এবং নৈতিক গুণাবলির বিকাশ ঘটায়। রাষ্ট্রের আদর্শিক চিন্তা ও সংস্কৃতি মানুষের মূল্যবোধের বিকাশ ঘটায় ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। এতে করে সমাজ ও রাষ্ট্রে নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক সমাজ গড়ে ওঠে। যার প্রতিফলন ঘটে সমাজ ও রাষ্ট্রে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে।
সর্বোপরি বস্তুবাদী আদর্শ ও দর্শন মানুষকে বস্তু ও স্বার্থের দাস করে তোলে, যা কল্যাণরাষ্ট্রের মূল ভিত্তি ‘নিঃস্বার্থ জনসেবা’, ‘সমতা’ ও ‘সহমর্মিতা’-এর সাথে সাংঘর্ষিক। বাংলাদেশে বস্তুগত প্রবৃদ্ধি হলেও নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির অভাবে কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে।
বস্তুবাদী দর্শন (Materialist Philosophy)-এর মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বস্তুগত উৎপাদন, ব্যক্তিস্বার্থ, পুঁজিবাদ ও ভোগবাদ। অপরদিকে আদর্শিক ও কল্যাণরাষ্ট্রের মৌলিক শর্তাবলি পারস্পরিক সমতা, সামাজিক নিরাপত্তা, সুষম সম্পদ বণ্টন ও নিঃস্বার্থ জনসেবা।
কল্যাণ রাষ্ট্র (Welfare State) হলো এমন একটি শাসনব্যবস্থা, যেখানে নাগরিকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সার্বিক কল্যাণ সাধন করা সরকারের প্রধান দায়িত্ব। সর্বোপরি নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
আর্থিক সুবিধা বনাম নৈতিকতা : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত
শত শত বছরের বিখ্যাত মনীষীদের বিভিন্ন পর্যালোচনা থেকে এটাই বের হয়ে আসছে যে, নৈতিক ও আত্মিক ভিত্তির অভাব এবং কেবল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তির ওপর নির্ভরশীলতার কারণে বস্তুবাদী দর্শনে একটি প্রকৃত কল্যাণরাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়।
যেমন বিগত ৫৫ বছরে বাংলাদেশ বেশ কয়েকবার বিশ্বে দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র হিসেবে প্রথম হয়েছে। বলা হয়ে থাকে রাষ্ট্র ও সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা কম হওয়ার বা অভাবের কারণে তারা দুর্নীতি করে। তাই বিগত সময়ে এ যুক্তি দেয়া হয়েছে যে, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন ভাতা বাড়ানো হলে ঘুষ-দুর্নীতি হ্রাস পাবে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেছে যে, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর পরও সরকার ও প্রশাসনে ঘুষ-দুর্নীতি কমে নাই। এ বছরও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। কিন্তু সরকারি অফিসগুলোয় কি দুর্নীতি কমেছে বলে কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে। এটা দ্বারাই প্রমাণিত যে, শুধু বস্তুগত সুবিধা দিয়ে একদল মানুষকে নৈতিক মানে উন্নিত করা সম্ভব হয় না। তাই দরকার আদর্শিক ও মূল্যবোধের বিকাশ যেটা একটি আদর্শিক রাষ্ট্রই করতে পারে।
বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক আল্লামা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী র. বলেছেন, “আমরা মনে করি, জীবনের বর্তমান অধঃপতন দূর করার কোনো চেষ্টা তদবিরই সফল হতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত সংস্কারের অন্যান্য চেষ্টার সাথে শাসনব্যবস্থার সংস্কারের চেষ্টা করা না হবে। এজন্য যে শিক্ষা, আইন আদালত, আইনশৃঙ্খলা এবং জীবিকা বণ্টন প্রভৃতি শক্তির মাধ্যমে যে অনাচার-নৈরাজ্য জাতির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তার মোকাবিলায় শুধু ওয়াজ-নসিহত ও তাবলিগের মাধ্যমে কোনো গঠনমূলক কাজ সম্ভব নয়। অতএব প্রকৃতপক্ষেই যদি আমরা আমাদের দেশের জীবন ব্যবস্থাকে পাপাচার ও পথভ্রষ্টতার পথ থেকে সরিয়ে দীনে হকের, সিরাতুল মুস্তাকিমের ওপর চালাতে চাই, তাহলে ক্ষমতার মসনদকে পাপাচার মুক্ত করে তথায় সততা, গঠনমূলক উপাদান ও ভাবধারা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা আমাদের জন্যে অপরিহার্য হবে।” (আন্দোলন সংগঠন কর্মী : ১০৭-১০৮, ইসলামী জীবন ব্যবস্থার মৌলিক রূপরেখা, পৃ : ২৭৯-২৮০)।
বাংলাদেশ সরকারের ঘোষিত প্রধানতম নীতি হলো— ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদী দর্শন। ধর্মনিপেক্ষতার মূলকথা, রাজনীতি, প্রশাসন ও শিক্ষানীতিতে থাকবে না ইসলামের প্রতি সরকারের কোনোরূপ অঙ্গীকার। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা দেশের শিক্ষা সংস্কৃতি, রাজনীতি, আদালত, প্রশাসনে ইসলামী আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় না। বরং ইসলাম থেকে দূরে সরা এবং দূরে সরানোই তাদের নীতি। এভাবে রাষ্ট্র পরিণত হয় ভোগবাদী গোষ্ঠীর হাতিয়ারে। বাংলাদেশ জন্মের পর থেকে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনায় সবসময়ই ধর্মনিরপেক্ষবাদীরাই অগ্রাধিকার পেয়ে আসছে। শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাংলাদেশে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে সরকারপ্রধানদের অধিকাংশই ছিলেন বাম ও বস্তুবাদী চিন্তা ও বিশ্বাস তথা ধর্মনিরপেক্ষতার ধারক ও বাহক। তাই বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামী আদর্শের বিকাশের কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি সেক্যুলারিজম তথা ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদী দর্শনকে ভিত্তি করেই তার সমস্ত আইন ও বিধি প্রণয়ন করার পাশাপাশি তার সরকার, প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা ও শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। যার প্রতিফলনে রাষ্ট্রের উঁচু পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়েও একদল নীতিহীন বস্তুবাদী ও ভোগবাদী স্বার্থপর গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। যাদের মধ্যে নেই ত্যাগ-তিতিক্ষার কোনো বালাই, নেই কোনো নীতি ও আদর্শিক মূল্যবোধ এবং কল্যাণকর কোনো সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চিন্তা। তাদের আদর্শিক কোনো চিন্তা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও চেতনা না থাকায় তারা সর্বদা ব্যস্ত ছিল এবং থাকে জনগণ ও দেশের সম্পদ লুটপাট করে নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল ও সম্পদের পাহাড় গড়ায়। এভাবেই তারা দেশে-বিদেশে সম্পদ গড়ে ভোগবাদিতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। বিগত ৫৫ বছরে বাংলাদেশের জনগণ তা প্রত্যক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে এবং চরম পরিণতি ভোগ করছে। ধর্মনিরপেক্ষতার ধারক-বাহক গোষ্ঠীটির বস্তুবাদী চিন্তা ও দর্শনের কবলে পড়ে দেশ হয়ে পড়ে প্রায় দেউলিয়া আর বাংলাদেশ একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়। যার পরিণতি যেমন বস্তুবাদী আদর্শের পৃষ্ঠপোষক আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে ভোগ করতে হচ্ছে, তেমনিভাবে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণকে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে।
চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণে বলতে হচ্ছে, বাংলাদেশকে একটি প্রকৃত কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে কেবল বস্তুবাদী চিন্তা ও আদর্শকে ভিত্তি করে বস্তুগত বা অর্থনৈতিক সংস্কার যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নৈতিক, আদর্শিক ও মূল্যবোধগত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর রূপান্তর। আর এটা হতে হবে ইসলামী আদর্শের চিন্তা-বিশ্বাসকে ভিত্তি করে এগিয়ে চলা। সর্বোপরি আদর্শিক, নৈতিক ও মূল্যবোধগত সংস্কার করতে হলে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের চিন্তা, বিশ্বাস ও আদর্শ ইসলামকেই রাষ্ট্রের আদর্শ ও দর্শন হিসেবে নির্ধারণ করতে হবে।
লেখক : বার্তা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা।
ই-মেইল : ferdous.ab@gmail.com