সম্পাদকীয়

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানুন : মানুষ বাঁচান


৭ অক্টোবর ২০২৬ ১৯:৩০

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বাড়ছে লাগামছাড়া পাগলা ঘোড়ার গতিতে। কারো কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। জ্বালানি তেলের বাড়তি মূল্যের প্রভাব কাটতে না কাটতে গত ৪ অক্টোবর রোববার একলাফে এলপি গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে ২৫২ টাকা। কিন্তু কেন বোঝার ওপর শাকের আঁটি চাপানো হলো, তার কোনো উত্তর নেই। সরকার ভুলে গেছে রাষ্ট্র কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়। জনগণের জীবনমানের ভোাগন্তি কমানোর জন্যই এর জন্ম। দুষ্টের দমন করে শিষ্টের জন্য জীবনযাপন নিরাপদ করার অঙ্গীকার থেকেই রাষ্ট্রের জন্ম। কিন্তু ‘ক্লায়েন্টেলিজম’ আক্রান্ত রাজনৈতিক সরকারগুলো যখন, দলের ক্লায়েন্টের স্বার্থ রক্ষায় সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলতে ভুলে যায়, তখন রাজনীতির ছাতার ছায়ায় দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, চাঁদাবাজ, দখলবাজ, ছিনতাইকারী, চোর ডাকাত, মাদক ব্যবসায়ী, বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণকারীরা নিরাপদে জনগণকে শোষণ করার সুযোগ পায়। সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্রকে অপশাসনের কালো ছায়া গ্রাস করে। দেশের অর্থনীতিতে সেই ছায়া দিন দিন বড় হচ্ছে।
দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আজ চরম সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির পরিবারের দৈনিক জীবনযাত্রার নিরাপত্তা ও পুষ্টির নিশ্চয়তা দেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আর নেই। চাল ও ডালের মতো অতি সাধারণ খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করতেই যেখানে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে মাছ, মাংস, ডিম ও দুধের মতো পুষ্টিকর খাবার সাধারণ মানুষের থালায় রীতিমতো বিরল বস্তুতে পরিণত হয়েছে। এই সার্বিক পরিস্থিতির পেছনে মূল কারণ সরকারের কার্যকর উদ্যোগের অভাব, অব্যাহত চাঁদাবাজি, বাজার সিন্ডিকেট এবং জ্বালানি তেলের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি। একটি স্বাধীন দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো তার শ্রমজীবী জনগণ। কিন্তু বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ভাঙতে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে গেছে। মহাসড়ক থেকে শুরু করে পাইকারি বাজার পর্যন্ত চাঁদাবাজির যে অপ্রতিরোধ্য চেইন গড়ে উঠেছে, তার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাকে। তার ওপর বারবার জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিসহ সামগ্রিক উৎপাদন খরচ একলাফে বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা নিত্যপণ্যের বাজারকে করেছে আরও বেশি অস্থির।
অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও জুলাই চেতনাকে ধারণ করে দুর্নীতি ও ঘুষের লাগাম টানার যে অঙ্গীকার বা প্রত্যাশা ছিল, তা আজ উপেক্ষিত। ঘুষ ও দুর্নীতির মূলোৎপাটন করার পরিবর্তে সরকারি কর্মকর্তাদের পে-স্কেলে বেতন বৃদ্ধি করে প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। অথচ সাধারণ শ্রমজীবী ও খেটে খাওয়া মানুষ তাদের জীবনধারণের ন্যূনতম আয়ের নিশ্চয়তা পাচ্ছে না। ধ্বংসমুখে পতিত অর্থনীতির প্রভাবে শিল্পকারখানা বন্ধ ও নতুন বিনিয়োগ থমকে যাওয়ায় দেশজুড়ে আশঙ্কাজনকভাবে বেকারত্ব বেড়েছে।
খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে চরম পুষ্টিহীনতার শিকার হচ্ছে দেশের কোমলমতি শিশুরা। মাছ, দুধ ও ডিমের মতো প্রোটিন ও ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবারের অভাবের কারণে এক বিশাল জনগোষ্ঠী ও নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে পুষ্টিহীনতার শিকার হচ্ছে। যার ফলে জাতি ক্রমান্বয়ে মেধাশূন্য হওয়ার গুরুতর ঝুঁকিতে পড়ছে। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় শিশুরা হাম, ডেঙ্গু ও কলেরার মতো প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক ব্যাধিতে সহজেই আক্রান্ত হচ্ছে এবং অকালে প্রাণ হারাচ্ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সরকারকে কালবিলম্ব না করে বাজারের সিন্ডিকেট ও চাঁদা তোলার সিন্ডিকেট গুঁড়িয়ে দিতে হবে। টিসিবি-র মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরাসরি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সুলভমূল্যে পৌঁছে দেওয়ার পরিধি বৃদ্ধি করতে হবে। একইসঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম পুনর্নির্ধারণ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে অর্থনৈতিক সামঞ্জস্য ফিরিয়ে আনা আবশ্যক। অন্যথায় সাধারণ মানুষের এই তীব্র হাহাকার ও অসন্তোষ দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিতকে আরও গভীরভাবে বিপন্ন করে তুলবে, যা আমাদের কারো কাম্য নয়।