আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদন

আসামে মানবতাবিরোধী অপরাধ করছে ভারত সরকার


৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২১:০০

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
দক্ষিণ এশিয়ার বহু ভাষা ও ধর্মের দেশ ভারত। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন বর্ণ ও গোত্র ও ভাষাভাষীদের দেশ ভারতে মুসলিমরা চরম অবহেলা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কাশ্মীর থেকে আসাম, পশ্চিমবঙ্গ থেকে গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ থেকে মহারাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রদেশ থেকে খোদ রাজধানী দিল্লি সবর্ত্রই হিন্দু ও হিন্দুত্ববাদী সরকার বিভিন্ন কায়দায় মুসলিমদের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠিগুলো বলছে, ভারত সরকার বিভিন্ন কালাকানুনের আওতায় ও অপকৌশল করে আসামসহ বিভিন্ন রাজ্যের মুসলিমদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধ করে যাচ্ছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, জোরপূর্বক সীমান্ত দিয়ে বহিষ্কার, এনকাউন্টারের নামে নির্বিচারে হত্যা, ভোটাধিকার হরণ এবং নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রীহীন করা।
আসাম ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের অন্যতম রাজ্য। আসামের আয়তন ৭৮ হাজার বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা তিন কোটি ২৯ লাখ। বাংলাদেশের পূর্বদিকের ভূবেষ্টিত রাজ্য আসামের মুসলিম জনসংখ্যা এক কোটি সাত লাখ (১০.৬৮ মিলিয়ন), যা সর্বশেষ ২০১১ সালের ভারতীয় সরকারি আদমশুমারি অনুযায়ী রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ৩৪.২২ শতাংশ। তবে সাম্প্রতিক বছরে আসামের জনসংখ্যা ও জনমিতিতে বেশ পরিবর্তন এসেছে। আসাম সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আসামে মুসলিম সংখ্যা বাড়ছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বাস শর্মার সাম্প্রতিক বিভিন্ন বক্তব্য ও প্রাক্কলন অনুযায়ী, বর্তমানে আসামে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৮% থেকে ৪০%-এ পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অবিভক্ত আসামে ১৯৪১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, মুসলিম জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২৫.১৩ শতাংশ। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর স্বাধীন ভারতের প্রথম ১৯৫১ সালের শুমারি অনুযায়ী, আসামে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২২.৬০ শতাংশ, সংখ্যায় প্রায় ১৯ লাখ ৯৫ হাজার জন। আসামের মোট ৩৫টি জেলার মধ্যে প্রায় ১১টি জেলায় মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।
বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে মাদরাসা
প্রায় ৪০ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যা অধ্যুষিত আসামের মোট মসজিদ ও মাদরাসার সুনির্দিষ্ট একক কোনো সরকারি সংখ্যা পাওয়া না গেলেও বিভিন্ন সরকারি সিদ্ধান্ত, ডাটাবেজ এবং রাজনৈতিক দাবি অনুযায়ী এর একটি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়।
আসামে মোট এক হাজার ২৮১টি সরকারি ও সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত মাদরাসা ছিল। আসাম সরকারের নতুন আইন অনুযায়ী, এই এক হাজার ২৮১টি মাদরাসাকে সম্পূর্ণভাবে সাধারণ স্কুলে (মিডল ইংলিশ বা ME স্কুল) রূপান্তর করা হয়েছে। মাদরাসাগুলোকে স্কুলে রূপান্তর করা মানেই মাদরাসা বন্ধ করে ইসলামী শিক্ষাকে বন্ধ করে দেয়া। আসামে বেসরকারিভাবে নিবন্ধিত এবং নতুন নিয়মের আওতাভুক্ত স্বতন্ত্র কওমি বা বেসরকারি মাদরাসার সংখ্যা প্রায় ৩৪০টি। তবে অনিবন্ধিত বা ছোট-খাটো মাদরাসার সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হতে পারে।
মসজিদের সঠিক পরিসংখ্যান নেই
আসামের মসজিদেরও কোনো চূড়ান্ত সরকারি তালিকা নেই। তবে সামাজিক এবং স্থানীয় ডিরেক্টরি ডাটাবেজ অনুযায়ী, আসামের প্রধান শহর ও জেলাগুলোয় নিবন্ধিত মসজিদের সংখ্যা কয়েক হাজার। আসামের স্থানীয় বিজেপি রাজনৈতিক নেতাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক দাবিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে আসামে প্রায় ত্রিশ হাজার মসজিদ রয়েছে। তবে এই সংখ্যাটি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা সরকারি পরিসংখ্যান দ্বারা নিশ্চিত করা নয়।
আসামের মুসলিমের সমস্যা ও সংকট
কেমন আছে আসামের মুসলিমরা— এমন প্রশ্নের জবাবে গৌহাটিতে অবস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মানবাধিকার কর্মী জানান, আসামের মুসলিমদের প্রধান সমস্যাগুলো হলো— এক. নাগরিকত্ব ও পরিচয়ের সংকট : NRC, D-Voter (Doubtful Voter), Foreigners Tribunal— এগুলো নিয়ে অনিশ্চয়তা। অনেক মানুষের ক্ষেত্রে কাগজপত্রের অভাবে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করাটা বড় চ্যালেঞ্জ। দুই. জমি ও বাসস্থান : চর-চাপরি অঞ্চলে থাকা লোকদের অনেকেরই জমির পাট্টা নেই। বন্যা, ভাঙন এবং সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযান এই সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তিন. শিক্ষা ও সাক্ষরতা : আসামের ভেতরে মুসলিম অধ্যুষিত জেলা যেমন ধুবড়ি, বরপেটা, দরং ইত্যাদিতে শিক্ষার হার; বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার হার রাজ্যের গড় হারের চেয়ে কম। চার. অর্থনৈতিক পিছিয়ে পড়া অবস্থা দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অভাব, কৃষির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা। পাচ. রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণ : নির্বাচনের সময় মুসলিম ভোট নিয়ে যে রাজনীতি হয়, তা দুই পক্ষেই অবিশ্বাসের সৃষ্টি করে। খিলঞ্জীয়া মুসলিমরা নিজেদের পৃথক পরিচয় ও অধিকারের দাবি করে আসছে। আসামের মুসলিমদের কি অবস্থা জানতে আসামের এক প্রবীণ সাংবাদিককে ঢাকা থেকে ফোন করে জানতে চাইলে তিনি কোনোকিছুই বলতে রাজি হননি নিরাপত্তা সংকটে।
এনআরসির কবলে মুসলিমরা
বর্তমানে আসামে মুসলিমদের সবচেয়ে বড় সংকটটি হচ্ছে নাগরিকত্ব ও পরিচয় ইস্যু। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর থেকেই আসামে বাংলাভাষী মুসলিমদের ওপর বিভিন্নভাবে অত্যাচার নির্যাতন চলে আসছে। আর বিগত কয়েক বছর ধরে চলছে নুতন আর সংকট আর তা হচ্ছে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের নামে মুসলিমদের নাগরিকত্ব বাতিল করা। ১৯৫০-র দশকে প্রণীত এক আইনের মাধ্যমে বিগত কয়েক বছর ধরে আসার সরকার নাগরিকত্ব যাচাই শুরু করেছে। ২০১৯ সালে ভারত সরকার এ সংক্রান্ত একটি তালিকা প্রকাশ করে। সরকারের ঘোষিত এ তালিকায় আসামে চূড়ান্ত জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা এনআরসি-তে বাদ পড়েছে প্রায় ১৯ লাখ মানুষের নাম। ভারতের অন্য কোনো প্রদেশে এনআরসি না করে শুধু আসামে করার টার্গেটটি ছিল মুসলিমরা। তবে এতে করে হিন্দু বাঙালিরাও এর শিকার হয়েছেন। সারা অসম বাঙালি যুব ছাত্র ফেডারেশনের দাবি, এর মধ্যে বাঙালি হিন্দুর সংখ্যা ১০ থেকে ১২ লাখ। বাঙালি মুসলিম বাদ পড়েছেন দেড় থেকে দুই লাখ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অভিমত হচ্ছে, ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস (এনআরসি)-র নামে চলছে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের নামে নতুন এক খেলা। আর এসবের মুল টার্গেট হচ্ছে আসামের মুসলিম সম্প্রদায়। এভাবে আবারও কয়েক লাখ মুসলিমকে নাগরিকত্বহীন করা হয়েছে। তারা নাগরিকত্বহীন হয়ে আবার এক অনিশ্চিত ও অনিরাপদ জীবনের হুমকিতে।
মুসলিম নির্যাতন নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল
আসামসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিম নির্যাতন ইস্যুটি এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি জ্বলন্ত ও সমালোচিত বিষয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ভারতে মুসলিম নির্যাতন নিয়ে প্রচুর খবর, ফিচার ও মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে ভারতে মুসলিমদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করতে আন্তর্জাতিক একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল তৈরি করা হয়। তিন সদস্যের এ বিশেষজ্ঞ প্যানেল ভারতের শুধুমাত্র আসাম ও উত্তরপ্রদেশে মুসলিমদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ওপর দীর্ঘমেয়াদে একটি তদন্ত করে ২৯২৬ সালেই একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করার জন্য গঠিত একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেল (Panel of Independent International Experts (PIIE)-র সদস্যরা হচ্ছেন, সার্বিয়ার হেলসিঙ্কি কমিটি ফর হিউম্যান রাইটসের প্রেসিডেন্ট সোনজা বিসারকো (Sonja Biserko), ইন্দোনেশিয়ার সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের সাবেক চেয়ারপারসন মারজুকি দারুসম্যান (Marzuki Darusman), যুদ্ধাপরাধ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচার ব্যবস্থার সাথে যুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বিশেষ দূত ও আইনজীবী স্টিফেন র‌্যাপ (Stephen Rapp)। দীর্ঘসময় ধরে তদন্ত করে এ বিশেষজ্ঞ প্যানের ৩৭২ পৃষ্ঠার একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পেয়েছে বিশেষজ্ঞ প্যানেল
ভারতের আসাম ও উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনের তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করতে এই প্যানেল গঠিত হয়। তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে (২০২২-২৫) আসাম ও উত্তরপ্রদেশে মুসলমানদের ওপর পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
আসাম ও উত্তরপ্রদেশে সংঘটিত ঘটনা ও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ও ঘটনাপ্রবাহ বিবেচনা করে তারা বলেছেন, আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার মুসলিমরা যাতে প্রতিকার পাওয়ার কার্যকর সুযোগ পান, তা নিশ্চিত করতে আসামের কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে। নথিবদ্ধ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড— যার মধ্যে রয়েছে নিয়মিতভাবে অভিযোগ দায়েরের পথে বাধা সৃষ্টি, ভুক্তভোগীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, দায়সারা তদন্ত, বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তা থেকে স্পষ্ট হয় যে, মুসলিমরা বিশেষ করে যাদেরকে বাঙালি বংশোদ্ভূত বলে মনে করা হয় প্রতিকার পাওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে গভীর ও সুদৃঢ় ‘পরিচয়ভিত্তিক’ বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতিকার ব্যবস্থা হতে হবে সহজলভ্য, নিরপেক্ষ, সময়োপযোগী এবং তা যেন সুনির্দিষ্ট ফলাফল বয়ে আনতে সক্ষম হয়। এছাড়া এসব মানদণ্ডে আরও বলা হয়েছে যে, যখন কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা ন্যায়বিচার প্রদানে অনিচ্ছুক বা অক্ষম হয়, তখন রাষ্ট্র তার আইনি বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘনের দায়ে দায়ী থাকে। আসামের ক্ষেত্রে দেখা গেছে এবং তাদের পর্যবেক্ষণে সামগ্রিক পরিস্থিতি থেকে এটি স্পষ্ট যে, উল্লেখিত শর্তাবলি বা মানদণ্ডগুলো পূরণ করা হচ্ছে না।
বাস্তব পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে প্যানেল এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, আসামের মুসলিমদের জন্য বিদ্যমান প্রতিকার ব্যবস্থা বাস্তবে অকার্যকর এবং এই প্রতিবেদনে নথিবদ্ধ মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ব্যক্তিদের বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ন্যায়বিচার পাওয়ার কোনো বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা নেই।
মুসলিমদের বহিষ্কার মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ
বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিজেপি নেতা আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বাস শর্মা কর্তৃক বাংলাভাষী মুসলিমদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ ও অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে চিত্রিত করা এবং সহিংস-সংঘাত উসকে দেওয়ার মতো একাধিক বক্তব্য এমন পরিস্থিতিতে দেওয়া হয়েছে, যা জাতিগত নির্মূল অভিযানের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে বলে মনে হয়। গণহত্যা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যে সর্বজনীন বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তার আলোকে মুখ্যমন্ত্রীকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে সহিংসতা উসকে দেয় এমন বক্তব্য বন্ধ করার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
আসাম থেকে বাংলাভাষী মুসলিমদের ব্যাপক হারে বহিষ্কারের ঘটনাটি ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে, যা জোরপূর্বক স্থানান্তর বা নির্বাসনের শামিল। আন্তর্জাতিক আইনে অনুমোদিত কোনো বৈধ কারণ ছাড়াই বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত ব্যাপক বা সুপরিকল্পিত আক্রমণের অংশ হিসেবে এই বাস্তুচ্যুতির ঘটনাগুলো ঘটেছে।
আসামে বাংলাভাষী মুসলিমদের লক্ষ করে ঘৃণা-বিদ্বেষমূলক বক্তব্য (Hate speech) প্রচারের যে ক্রমপুঞ্জিত ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারা লক্ষ করা গেছে, তা ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে ‘নিপীড়ন’ (Persecution)-এর পর্যায়ে পড়তে পারে। কারণ এটি একটি ব্যাপক বা সুপরিকল্পিত আক্রমণের অংশ হিসেবে কেবল গোষ্ঠীগত পরিচয়ের কারণে মৌলিক অধিকার থেকে ইচ্ছাকৃত ও গুরুতরভাবে বঞ্চিত করার বিষয়টিকেই প্রতিফলিত করে। একইভাবে আসামে বাংলাভাষী মুসলিমদের লক্ষ করে জোরপূর্বক উচ্ছেদ ও বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপক ঘটনাগুলোও ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে ‘নিপীড়ন’-এর শামিল হতে পারে।
আসামে বাংলাভাষী মুসলিমদের নাগরিকত্ব, আইনি বৈধতা ও বসবাসের অধিকার থেকে সুপরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত করার বিষয়টি ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে ‘বর্ণবৈষম্য’ বা ‘অ্যাপার্থাইড’ (Apartheid)-এর পর্যায়ে পড়তে পারে; কারণ এর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট জাতিগত বা বর্ণগত গোষ্ঠীর ওপর সুপরিকল্পিত দমন-পীড়ন ও আধিপত্য বিস্তারের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় অমানবিক কর্মকাণ্ড চালানো হয়েছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের পর্যবেক্ষণ
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের তদন্ত প্রতিবেনের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, আসামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে— পুলিশের ‘এনকাউন্টার’ বা বন্দুকযুদ্ধের নামে নির্বিচারে প্রাণহানি, উচ্ছেদ অভিযানের সময় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু এবং সম্ভাব্য গণসহিংসতা প্রতিরোধে ব্যর্থতা; নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও আটক; যার মধ্যে নাগরিকত্ব নির্ধারণের বৈষম্যমূলক প্রক্রিয়ার জেরে দীর্ঘমেয়াদি বা অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক রাখার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত; নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ; নির্বিচারে নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া, যার ফলে ব্যক্তি রাষ্ট্রহীনতা ও বহিষ্কারের ঝুঁকির মুখে পড়েন; যথাযথ আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে সীমান্ত দিয়ে বহিষ্কার, যা ‘রিফাউলমেন্ট’ বা জোরপূর্বক প্রত্যাবর্তনের যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করে। মতপ্রকাশ, সংগঠন ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতার ওপর অযৌক্তিক ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিধিনিষেধ, যার মধ্যে ভিন্নমত পোষণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করাও শামিল; ধর্মীয় স্বাধীনতায় বেআইনি হস্তক্ষেপ; দীর্ঘস্থায়ী ও বৈষম্যমূলকভাবে ভোটাধিকার বা নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা; ব্যাপক হারে জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার ও সংখ্যালঘু অধিকারের মারাত্মক লঙ্ঘন— যার মধ্যে আবাসন, জীবিকা, জনকল্যাণমূলক সুবিধা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষার ওপর বিধিনিষেধ অন্তর্ভুক্ত।
মানবতাবিরোধী অপরাধ করছে ভারত সরকার
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের পর্যবেক্ষণ ও অভিমত হচ্ছে, আসামে মুসলিমদের বাস্তবে কোনো নিরাপত্তা নেই, তারা কোনো ন্যায়বিচার পাচ্ছে না, মুসলিম জাতিগত নির্মূল অভিযান চলছে, গণহত্যা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সর্বজনীন বাধ্যবাধকতা প্রয়োগ নেই, ভবিষ্যতে সহিংসতা প্রতিরোধে জরুরি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন, আসামের মুখ্যমন্ত্রীকে জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞ প্যানেল আসামের মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা-বিদ্ধেষ ছড়ানো, তাদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেয়া এবং বাংলাভাষী মুসলিমদের ব্যাপকহারে উচ্ছেদ ও বহিষ্কারকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবেই অভিহিত করেছেন। ভারতসহ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদেরও অভিমত যে, সর্বোপরি ভারত সরকার আসামে মানবতাবিরোধী অপরাধ করছে।
লেখক : বার্তা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা।
ই-মেইল : ferdous.ab@gmail.com