আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের ব্যর্থতা : পিছনে হাঁটছে দেশ?


৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০:৫০

॥ মতিউর রহমান আকন্দ ॥
দেশের চলমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যা, অপহরণ, সন্ত্রাস, দখলদারি, চাঁদাবাজি, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের একের পর এক ঘটনা জননিরাপত্তার প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা এমন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে নাগরিকের জানমাল, সম্পদ, কর্মস্থল এবং এমনকি চিকিৎসাসেবার প্রতিষ্ঠানও অপরাধীদের হামলা থেকে পুরোপুরি নিরাপদ নয়।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দাবি করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গত ৩ সেপ্টেম্বর বলেছেন, সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে এবং বিভিন্ন গুরুতর অপরাধের হার কমেছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদেও তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং পুলিশ হত্যা, ছিনতাই, অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে তৎপর রয়েছে।
কিন্তু সরকারের এই মূল্যায়নের সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে যে ব্যবধান দেখা যাচ্ছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রকৃত মূল্যায়ন কেবল সরকারি বক্তব্য দিয়ে নয়, বরং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ, অপরাধের ধরন, অপরাধীদের দুঃসাহস এবং রাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক প্রতিরোধক্ষমতার আলোকে করতে হয়।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো যে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে
গত সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় পরপর কয়েকটি ঘটনা বিশেষভাবে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রাতের হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের পর ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই শতাধিক মুখোশধারী ব্যক্তি সেখানে প্রবেশ করে নিরাপত্তাকর্মীদের অবরুদ্ধ করে এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকা ও অন্যান্য সামগ্রী লুটের অভিযোগ রয়েছে। পরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবন, আসবাবপত্র ও অন্যান্য স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার বিষয়টিও স্বীকার করেছে। কেন হামলা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ করা যায়নি, সে বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকার কথা সামনে এনে সন্ত্রাস ও লুটপাটের মতো ফৌজদারি অপরাধ আড়াল করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকার প্রশ্নও জড়িয়ে গেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র ঘটনাটির স্বাধীন তদন্ত এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছে।
এরপর একদিন পর ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ব্যাপক আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটিকে প্রায় ৩৫ কাঠা জমির বিরোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে এবং এ ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে আক্রান্তরা বলছেন চাঁদবাজির কথা।
কিন্তু প্রশ্নটি এখানেই— জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে তার নিষ্পত্তির পথ আদালত ও আইন। কোনো পক্ষ যদি সংঘবদ্ধ লোকজন নিয়ে রাতের অন্ধকারে কোনো স্থাপনা দখল বা ভাঙচুর করে, তবে সেটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলার ভঙ্গের অত্যন্ত গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো বিরোধের পক্ষপাতী হওয়া নয়; বরং আইনবহির্ভূত শক্তি প্রয়োগ প্রতিরোধ করা।
চকরিয়ার ঘটনা এবং অপহরণের আতঙ্ক
গত ২৭ সেপ্টেম্বর রোববার রাতে কক্সবাজারের চকরিয়ায় ছাত্রদল নেতা ইসফাতুল ইসলাম জিসানকে সাদা মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ এবং কয়েক ঘণ্টা পর তার লাশ উদ্ধারের ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, তাকে অপহরণের অভিযোগের পর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত— তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন।
এ ধরনের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই অতীতের সেই ভয়াবহ সময়ের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়, যখন মানুষকে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া, নিখোঁজ হওয়া কিংবা পরে লাশ উদ্ধারের অভিযোগ দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল।
আজকের বাংলাদেশে কোনো নাগরিকের মনে যদি আবার সেই ধরনের আশঙ্কা জন্ম নেয়, তবে সেটি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। অতীতের পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
আমিনবাজারে পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যু : রাষ্ট্রের জন্যও সতর্ক সংকেত
গত ৫ সেপ্টেম্বর সাভারের আমিনবাজারে স্পেশাল ব্রাঞ্চের উপপরিদর্শক আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি গাড়ি পার্কিং নিয়ে বিরোধের মধ্যে তিনি হস্তক্ষেপ করলে একদল লোক তার ওপর হামলা চালায়। পরে তাকে ও তার ছেলেকে মারধর করা হয় এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর আলতাফ হোসেনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে এ ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
মামলা হওয়া এবং গ্রেপ্তার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— একটি সাধারণ বিরোধ কীভাবে এত দ্রুত সংঘবদ্ধ সহিংসতায় পরিণত হলো? কেন এত মানুষ প্রকাশ্যে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে আক্রমণ করার মতো দুঃসাহস পেল? রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর প্রতি অপরাধীদের ভয় ও আইনের প্রতি মানুষের আস্থা— এই দুই বিষয়ের উত্তর খুঁজতে হবে।
কিশোর গ্যাং ও মাদক : ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অশনিসংকেত
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরেকটি গুরুতর দিক হলো কিশোর গ্যাং, মাদক ও সংঘবদ্ধ তরুণ অপরাধী চক্রের বিস্তার। ঢাকায় সেপ্টেম্বর মাসে পুলিশের একাধিক ২৪ ঘণ্টার অভিযানে শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বরের অভিযানে ৫৪৬ জন গ্রেপ্তার এবং ৬১টি মামলা হয়েছে বলে ডিএমপি জানিয়েছে। ওই অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন ও ফেনসিডিল উদ্ধারের কথাও জানানো হয়।
এর কয়েকদিন আগেও ৫১৭ জন এবং ৫৭৭ জনকে পৃথক অভিযানে গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশ করেছে পুলিশ। এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক ও কিছু অস্ত্র উদ্ধারের তথ্যও এসেছে।
এগুলো একদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান পরিচালনার সক্ষমতার প্রমাণ; অন্যদিকে একইসঙ্গে অপরাধ ও মাদকবাজারের ব্যাপ্তি সম্পর্কেও প্রশ্ন তৈরি করে। শুধু অভিযান, গ্রেপ্তার ও মামলা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাদকের উৎস, সরবরাহব্যবস্থা, অর্থের প্রবাহ, রাজনৈতিক ও সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং কিশোরদের অপরাধ চক্রে যুক্ত হওয়ার কারণগুলো চিহ্নিত করতে হবে।
সরকারি বক্তব্য বনাম মাঠের বাস্তবতা
সরকার বলছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। অন্যদিকে একের পর এক সহিংস ও দখলদারির ঘটনা জনমনে উদ্বেগ তৈরি করছে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় করা সরকারেরই দায়িত্ব।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে অপরাধের কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য এসেছে। যেমন সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওর ঘটনাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জমি-সংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
কিন্তু কোনো ঘটনার পেছনে জমি বিরোধ, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত শত্রুতা কিংবা অন্য কোনো কারণ থাকলেও সেটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রশ্নকে অপ্রাসঙ্গিক করে না। বরং রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও স্পষ্ট হয়— অপরাধের কারণ যাই হোক, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ কাউকে দেওয়া যাবে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গত ২৮ সেপ্টেম্বরও বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির যেকোনো প্রচেষ্টা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে এবং অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় তাকে রক্ষা করবে না। এই বক্তব্য বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি অধিকার সুরক্ষার প্রশ্ন
জনগণেল জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অধিকার ও স্বাধীনতাও রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। সম্প্রতি মানবাধিকার কমিশন ও নিরাপত্তা খাত-সংক্রান্ত কয়েকটি আইন নিয়ে Human Rights Watch গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, সেপ্টেম্বরে পাস হওয়া কয়েকটি আইন পূর্ববর্তী সংস্কারের কিছু সুরক্ষা দুর্বল করেছে এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা ও তদন্তক্ষমতা কমিয়েছে।
এখানে সরকারের জন্য একটি মৌলিক ভারসাম্যের প্রশ্ন রয়েছে। একদিকে অপরাধ দমন করতে হবে; অন্যদিকে আইন প্রয়োগের নামে যেন নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়, তারও নিশ্চয়তা দিতে হবে। শক্তিশালী রাষ্ট্র মানে কেবল শক্ত হাতে দমন নয়; শক্তিশালী রাষ্ট্র মানে আইনের শাসন, জবাবদিহি, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
জনগণ কোনোভাবেই অতীতের পুনরাবৃত্তি চায় না
বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘসময় ধরে রাজনৈতিক সহিংসতা, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, দখলদারি, দলীয় প্রভাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অপব্যবহারের নানা অভিযোগের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। অতীতের সেই অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি কোনো রাজনৈতিক দলের জন্যই কাম্য হতে পারে না।
তাই বর্তমান সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা খুব স্পষ্ট— অপরাধী যে দলেরই হোক, তার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করতে হবে। সে সরকারি দলের সঙ্গে যুক্ত হোক, বিরোধীদলের সঙ্গে যুক্ত হোক কিংবা কোনো রাজনৈতিক পরিচয় না থাকুক— অপরাধের বিচার হতে হবে একই আইনে।
বিরোধীদলকে দোষারোপ করে কোনো সরকারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দায় এড়ানো সম্ভব নয়। আইনের শাসনের মূল কথাই হলো— ব্যক্তি নয়, অপরাধ বিচার্য হবে।
সরকারের সামনে এখন যে কয়েকটি কাজ জরুরি
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের উচিত রাজনৈতিক বক্তব্যের পাল্টাপাল্টির পরিবর্তে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
প্রথমত, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড, অপহরণ, দখল, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, যেসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি বা ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সেসব বিষয়েও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া দরকার।
তৃতীয়ত, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, কিশোর গ্যাং ও মাদকের বিরুদ্ধে শুধু গ্রেপ্তারনির্ভর অভিযান নয়— মাদক সরবরাহের মূল নেটওয়ার্ক, অর্থের উৎস এবং পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
পঞ্চমত, দখলদারি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি জমি ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির আইনি ব্যবস্থা দ্রুততর করতে হবে।
ষষ্ঠত, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্ব, মনোবল ও জবাবদিহি— এই তিনটি বিষয়কে একই সঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে।
সপ্তমত, নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার সুরক্ষার প্রশ্নে সরকারকে রাজনৈতিক বিরোধিতাকে শত্রুতা হিসেবে না দেখে সমালোচনাকে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিপক্ষ নয়, জনগণই হওয়া উচিত কেন্দ্রবিন্দু
একটি সরকার কতটা সফল, তার অন্যতম প্রধান মানদণ্ড হলো সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদবোধ করছে। একজন ব্যবসায়ী যদি চাঁদাবাজির ভয়ে থাকেন, একজন ভূমিমালিক যদি দখলের আশঙ্কায় থাকেন, একজন পরিবার যদি স্বজনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে, একজন সাংবাদিক যদি নিজের স্বাধীনতা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন কিংবা একজন সাধারণ নাগরিক যদি মনে করেন যে, শক্তিশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন কার্যকর হবে না— তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা দুর্বল হতে বাধ্য।
তাই সরকারের উচিত বিরোধীদলকে দোষারোপের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তব সমস্যার দিকে মনোযোগ দেওয়া। জনগণ রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে বাস্তব ফলাফল দেখতে চায়। তারা দেখতে চায়— রাস্তায় নিরাপত্তা আছে কি না, ঘর থেকে বের হলে নিরাপদে ফিরতে পারবে কি না, জমি দখল হলে আইন তার পাশে দাঁড়াবে কি না, অপরাধী রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে রেহাই পাবে কি না এবং রাষ্ট্র তার নাগরিকের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা দিতে সক্ষম কি না।
বাংলাদেশের মানুষ আর কোনোভাবেই এমন একটি পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে চায় না, যেখানে আইনের চেয়ে দলীয় পরিচয়, রাষ্ট্রের চেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি এবং ন্যায়বিচারের চেয়ে প্রভাবশালী মহলের শক্তি বড় হয়ে ওঠে।
অতএব সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দোষারোপ করে সাময়িকভাবে কোনো বিতর্ককে অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও আইনশৃঙ্খলার অবনতির বাস্তবতা আড়াল করা যায় না।
রাষ্ট্রের হাতে আইন আছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আছে, প্রশাসন আছে, বিচারব্যবস্থা আছে। এখন প্রয়োজন এসব প্রতিষ্ঠানকে দলীয় বা রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে রেখে কার্যকর করা।
কারণ রাষ্ট্রের শক্তি বন্দুকের নল কিংবা ক্ষমতার চেয়ারে নয়— রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং জনগণের আস্থায়।
বাংলাদেশের মানুষ একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র চায়। সেই প্রত্যাশা পূরণ করা সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার চেয়ে অনেক বড় দায়িত্ব। সরকার যদি এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারে, তবে রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা সুদৃঢ় হবে; আর যদি বাস্তব সমস্যার পরিবর্তে কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য ও দোষারোপের রাজনীতিতে ব্যস্ত থাকে, তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রশ্নটি আরও গভীর সংকটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
লেখক : আইনজীবী ও কলামিস্ট