ইতিহাসের দর্পণ বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়


২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:৪৩

মিনাজুল ইসলাম মিজান, বগুড়া : বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থানগড় বাংলাদেশের বুকে ধারণ করা প্রাচীনতম নগর সভ্যতা এবং প্রায় আড়াই হাজার বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। জেলা শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার উত্তরে করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে গড়ে ওঠা এই পুণ্ড্রনগরী আজ আমাদের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের প্রধান অহংকার। সুপ্রাচীন কাল থেকে শুরু করে মধ্যযুগ এবং আধুনিককাল পর্যন্ত এই জনপদের উৎপত্তি, রাজনৈতিক উত্থান-পতন, অসাধারণ স্থাপত্যশৈলী, মাজার ও মসজিদ, জ্ঞান অন্বেষণের জাদুঘর এবং সমকালীন কৃষি গবেষণার অনন্য কেন্দ্র মসলা গবেষণাগার— সবকিছু মিলিয়ে মহাস্থানগড় এক মহাকাব্যিক রূপ পরিগ্রহ করেছে।
মহাস্থানগড়ের জন্ম ও ইতিহাসের সূচনা খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ বা তৃতীয় শতকের কাছাকাছি সময়ে মৌর্য সাম্রাজ্যের হাত ধরে হয়েছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রাচীনকালে এই স্থানটির মূল নাম ছিল পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রনগর। ১৯৩১ সালে এখানে একটি প্রাচীন ব্রাহ্মী লিপিসমৃদ্ধ পাথরের টুকরো আবিষ্কৃত হওয়ার পর প্রত্নতাত্ত্বিকরা নিশ্চিত হন যে, এই নগরীটি মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন রাজবংশের শক্তিশালী প্রশাসনিক ও প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ব্যবহৃত হতো। প্রাচীন বাংলার এই বিশাল নগরীটি প্রাকৃতিক ও কৃত্রিমভাবে অত্যন্ত সুরক্ষিত ছিল, যার চারপাশ ঘিরে ছিল বিশাল মাটির ও ইটের দুর্গপ্রাচীর এবং একদিকে করতোয়া নদীর প্রমত্তা স্রোত ও বাকি তিন দিকে ছিল গভীর পরিখা। এই সুরক্ষিত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই যুগে যুগে রাজন্যবর্গ এটিকে তাদের নিরাপদ ক্ষমতা কেন্দ্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ সপ্তম শতকের প্রথমার্ধে এই পুণ্ড্রনগরে এসেছিলেন এবং তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে এখানকার সমৃদ্ধ জীবনযাত্রা, অসংখ্য বৌদ্ধ মঠ ও সুশৃঙ্খল নগর কাঠামোর ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। কালের আবর্তে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে এখানে যেমন হিন্দু ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল, তেমনি মধ্যযুগে সুফি সাধকদের আগমনের মধ্য দিয়ে এটি মুসলিম সংস্কৃতির এক মহিমান্বিত কেন্দ্রে পরিণত হয়। ২০১৬ সালে মহাস্থানগড়কে সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর প্রাচীন ঐতিহ্য নতুন করে স্বীকৃতি লাভ করে।
মহাস্থানগড়ের মাটির নিচে এবং ওপরে ছড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক নিদর্শন ও স্থাপনাগুলো আজ পর্যটক ও গবেষকদের বিস্ময়ের অন্যতম কারণ। মূল দুর্গ প্রাচীরের বাইরে ও ভেতরে অসংখ্য ঢিবি বা ভিটা আবিষ্কৃত হয়েছে যার মধ্যে গোবিন্দ ভিটা, বৈরাগীর ভিটা, খোদার পাথর ভিটা এবং পরশুরামের প্রাসাদ অন্যতম। করতোয়া নদীর ঠিক পাশেই অবস্থিত গোবিন্দ ভিটাক মূলত একটি প্রাচীন মন্দির কমপ্লেক্স হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যেখানে ষষ্ঠ ও একাদশ শতকের চমৎকার স্থাপত্যিক গাঁথুনি দেখতে পাওয়া যায়। খোদার পাথর ভিটায় গ্রানাইট পাথরের বিশাল খোদাইকৃত প্রাচীন স্তূপ পাওয়া গেছে, যা কোনো একসময়ে একটি বৌদ্ধ উপাসনালয় ছিল বলে ধারণা করা হয়। মূল দুর্গের ভেতরে রয়েছে প্রাচীন জিয়ত কুণ্ড বা জীবন কূপ এবং রাজা পরশুরামের প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ। লোকগাথা অনুযায়ী, জিয়ত কুণ্ডের অলৌকিক পানি পান করে রাজা পরশুরামের মৃত সৈন্যরা পুনরায় বেঁচে উঠত। এছাড়া মানকালীর ঢিবি, শিলাদেবীর ঘাট এবং বৈরাগীর ভিটা প্রাচীন বাংলার মানুষের শিল্পচেতনা, ধর্মীয় আচার এবং উন্নত জীবনযাত্রার পরিচয় বহন করে। এখানকার দুর্গপ্রাচীরগুলো পর্যায়ক্রমে কাদামাটি ও পোড়া ইট দিয়ে কয়েক স্তরে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল, যা প্রাচীন বাংলার প্রতিরক্ষামূলক সামরিক কৌশলের অনন্য নিদর্শন।
মহাস্থানগড়ের ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক পরম পবিত্র অংশ হলো হযরত শাহ সুলতান বলখী মাহীসওয়ারের ঐতিহাসিক মাজার ও সংলগ্ন মসজিদ। ইতিহাস ও জনশ্রুতি অনুসারে, ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে বলখ অঞ্চলের এই মহান সুফি সাধক ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে করতোয়া নদী পাড়ি দিয়ে এই অঞ্চলে আগমন করেছিলেন। তৎকালীন অত্যাচারী হিন্দু রাজা পরশুরামের সাথে তাঁর ঐতিহাসিক যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং যুদ্ধে রাজা পরশুরাম পরাজিত ও নিহত হন। এরপর থেকেই এই অঞ্চলে সুফিবাদের প্রসার ঘটে। মাজারের ঠিক পাশেই একটি উঁচু ঢিবির ওপর অবস্থিত মহাস্থানগড় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, যা মুঘল সম্রাট ফররুখ সিয়ারের রাজত্বকালে ১৭১৮ খ্রিস্টাব্দে খোদিদাদ নামক এক ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি নির্মাণ করেছিলেন। এই মুঘল আমলের মসজিদটি তার প্রাচীন নির্মাণশৈলী এবং তিন গম্বুজবিশিষ্ট কাঠামোর কারণে আজও স্থাপত্যপ্রেমীদের আকর্ষণ করে। প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত, পর্যটক ও সাধারণ মানুষ মাজার জিয়ারত করতে এবং মানসিক শান্তি খুঁজতে এখানে সমবেত হন, যা এই ঐতিহাসিক স্থানটিকে একটি অসাসম্প্রদায়িক ও আধ্যাত্মিক মিলনমেলায় পরিণত করেছে।
প্রতি বছর মহাস্থানগড়কে কেন্দ্র করে এক বিশাল বার্ষিক মেলার আয়োজন করা হয়, যা স্থানীয়ভাবে বৈশাখী মেলা বা মাজারের বার্ষিক ওরস মোবারক নামে পরিচিত। প্রতি বছরের বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার এই মেলা শুরু হয় এবং কয়েক দিন ধরে চলে। তবে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্যও এই স্থানটি অত্যন্ত পবিত্র, কারণ চৈত্র মাসে পুণ্যার্থীরা করতোয়া নদীর শিলাদেবীর ঘাটে স্নান উৎসবের আয়োজন করেন। বৈশাখী মেলার সময় পুরো মহাস্থান এলাকা এক উৎসবমুখর রূপ ধারণ করে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত বাউল, সাধু, সুফি এবং ব্যবসায়ীরা এখানে অস্থায়ী দোকানপাট ও আস্তানা গড়ে তোলেন। মেলায় গ্রামীণ লোকশিল্পের নানাবিধ সামগ্রী যেমন মাটির তৈরি খেলনা, তৈজসপত্র, বাঁশ ও বেতের তৈরি আসবাবপত্র এবং বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি ও দইয়ের পসরা বসে। দূরদূরান্ত থেকে আসা পুণ্যার্থী ও সাধারণ দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত এই মেলাটি উত্তরবঙ্গের এক অন্যতম প্রধান লোকজ উৎসব হিসেবে প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত নিজের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
মহাস্থান গড়ের কটকটি ব্যবসায়ী মজিবর বলেন, এই ঐতিহাসিক স্থানকে কেন্দ্র করে হাজারো ব্যবসায়ীদের একটি আয়ের উৎস হয়েছে। এই ঐতিহাসিক স্থানে প্রশাসনিক নজরদারি আরও বৃদ্ধি করতে হবে। যাতে দর্শনার্থীরা নিরাপদে তাদের ভ্রমণ নিশ্চিত করতে পারে।
মহাস্থানে ঘুরতে আশা কুড়িগ্রামের দর্শনার্থী সুজন মাহমুদ, রকেট এবং বাবু মিয়া বলেন, মহাস্থানের ঐতিহ্যে মিশে আছে আমাদের আবেগ আর গৌরব। এই ঐতিহাসিক স্থানের নিদর্শনগুলো রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। তাই দর্শনার্থীদের নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল ভ্রমণ নিশ্চিত করতে এবং প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ রক্ষায় প্রশাসনের কঠিন নজরদারি একান্ত প্রয়োজন। বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থান গড় সম্পর্কে জানতে বগুড়া আঞ্চলিক প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকতার সাথে ফোনে যোগাযোগ করলে সংযোগ পাওয়া যায়নি।