সফল সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছাড়া আলোকিত দেশ গড়া সম্ভব নয়
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৭:৫২
একটি সফল বিপ্লবের শিকড় লুকিয়ে থাকে সাহিত্য ও সংস্কৃতির শক্তির শক্ত আবরণে। তাই সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছাড়া কোনো রাজনৈতিক বিপ্লব সফল হয় না। সম্প্রতি এ সত্য তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। বিশেষ করে বিগত মাহে রবিউল আউয়ালে বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় তিনি সাহিত্য-সংস্কৃতি আন্দোলনের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে ছাত্র ও তরুণদের নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানমালায় তার এ আহ্বান দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের গাইড বলে আমরা মনে করি।
আমরা বিশ্বাস করি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা শাসনব্যবস্থা কিংবা শাসকের বদল বিপ্লবের একটি প্রাথমিক ধাপ মাত্র। তবে শুধুমাত্র ক্ষমতার রদবদল বা আইনি কাঠামোর সংস্কার দিয়ে সামাজিক মুক্তি ও স্থায়িত্ব অর্জন সম্ভব নয়। ইতিহাস সাক্ষী, যে রাজনৈতিক আন্দোলন তার শিকড় বা সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটাতে পারে না, তা অল্প দিনেই আবার পুরোনো স্বৈরাচার, দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলার দিকে ফিরে যায়। তাই একটি অর্থবহ ও দীর্ঘস্থায়ী সমাজ গঠনের জন্য রাজনৈতিক বিপ্লবের পাশাপাশি ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তর বা সাংস্কৃতিক বিপ্লব অপরিহার্য।
রাজনৈতিক বিপ্লব আমাদের বাহ্যিক আইন বা শাসক পরিবর্তন করে, কিন্তু সাংস্কৃতিক বিপ্লব পরিবর্তন করে মানুষের চিন্তাধারা, বিশ্বাস ও নৈতিক আচরণ। কোনো দেশে রাজনৈতিকভাবে নতুন সরকার এলেও যদি জনগণের মানসিকতায় সততা, ইনসাফ ও দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠা না পায়; তবে নতুন মোড়কে পুরোনো অন্যায়ই প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলামী দর্শনেও আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক জাগরণকে যেকোনো সমাজ পরিবর্তনের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, একটি জাতির ভেতরে যতক্ষণ না সংস্কার আসে, ততক্ষণ তাদের অবস্থার পরিবর্তন হয় না। এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই আমাদের সমাজব্যবস্থায়— অপসংস্কৃতি, নৈতিক অবক্ষয় এবং বৈষম্যমূলক মূল্যবোধ যখন জেঁকে বসে। এমন অবস্থায় কেবল নতুন রাজনৈতিক নীতি দিয়ে সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করা অসম্ভব।
আমরা জানি, ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মূল উদ্দেশ্য হলো সাম্য, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সততার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। এটি কেবল কোনো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এমন এক সমাজ-ভাবনা, যা একজন নাগরিককে ভিতর থেকে আইন মান্যকারী, পরোপকারী ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।
সংস্কৃতি যখন অনৈতিকতা ও উগ্রপন্থা থেকে মুক্ত হয়ে ঈমানি দৃঢ়তা ও নৈতিক শৃঙ্খলায় রূপ নেয়, তখন তা রাজনৈতিক বিপ্লবকে একটি মজবুত ভিত্তি দেয়। ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে দরকার এমন এক সংস্কৃতি, যেখানে ঘুষ, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারকে সামাজিকভাবেই ধিক্কার জানানো হয়। রাজনৈতিক বিপ্লবের মাধ্যমে পাওয়া স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখতে হলে এই নৈতিক পাটাতনের শক্ত ভিত্তি নিশ্চিত করতেই হবে।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, কোনো বিপ্লবই সফলতার মুখ দেখতে পারবে না, যদি না জাতির আত্মায় মৌলিক পরিবর্তন আসে। রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত সাফল্যকে টেকসই ও কল্যাণমুখী করতে হলে আমাদের শিক্ষা, চিন্তা ও সংস্কৃতিকে ইসলামী আদর্শের আলোকে পুনর্গঠন করতে হবে। মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক মুক্তির মাধ্যমেই কেবল রাজনৈতিক বিপ্লব তার পূর্ণতা পেতে পারে। তাই আসুন, আমরা আমাদের জাতির মুক্তির পাটাতনকে মজবুত করতে সাহিত্য-সংস্কৃতি আন্দোলনকে আরো জোরদার করি। বিশেষ করে আগামী দিনের কাণ্ডারি শিশু-কিশোর-তরুণদের মাঝে ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক সাহিত্য-সংস্কৃতির ব্যাপক চর্চার প্রসারে সরকার-বিরোধীদল মিলে একসাথে কাজ করি। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজের সর্বস্তরে; বিশেষ করে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনে এনে আলোকিত দেশ গড়ার উপযোগী জাতি গঠনকে অগ্রাধিকার দিতেই হবে। তবেই আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারব।