নৈতিক অবক্ষয় থেকে সমাজকে রক্ষা করতে করণীয়
৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৭:৫১
॥ ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম ॥
নৈতিকতা মানবজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ এবং একটি সভ্য সমাজের মৌলিক ভিত্তি। নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটলে সমাজে অন্যায়, দুর্নীতি, সহিংসতা, নারী ও শিশু নির্যাতন, মাদকাসক্তি, প্রতারণা এবং সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। বর্তমান বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর যুগে নৈতিক সংকট আরও জটিল রূপ ধারণ করেছে। ফলে ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃত্ব, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্র— সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব নয়।
নৈতিক অবক্ষয় কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের মূল্যবোধ সংকটের ফল। পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার অবহেলা, ভোগবাদী সংস্কৃতির বিস্তার, দুর্নীতির সামাজিকীকরণ, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের অবক্ষয় মানুষকে ধীরে ধীরে নৈতিকতার পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তাই নৈতিক পুনর্জাগরণকে কেবল ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি হতে হবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত অঙ্গীকার।
সমাজকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করার জন্য এ বিষয়গুলোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন—
১. পরিবারকে নৈতিক শিক্ষা ও আদর্শের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলা
পরিবার মানুষের প্রথম ও প্রধান শিক্ষালয়। একজন শিশুর চরিত্র, আচরণ, মূল্যবোধ ও জীবনদর্শনের ভিত্তি পরিবারেই নির্মিত হয়। পিতা-মাতার জীবনাচরণ সন্তানের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তাই সন্তানকে শুধু উপদেশ দিলেই হবে না; নিজেদের জীবনেও সততা, শৃঙ্খলা, সত্যবাদিতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার চর্চা করতে হবে। এক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।’ —সূরা আত-তাহরীম : ৬।
রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ —সহীহ আল-বুখারী।
পরিবারের এই নৈতিক দায়িত্বের সঙ্গে অ্যারিস্টটলের চিন্তারও গভীর সামঞ্জস্য রয়েছে। অ্যারিস্টটল বলেছেন, মানুষের চরিত্র গঠনে ছোটবেলা থেকে গড়ে ওঠা অভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; শৈশব থেকেই কী ধরনের অভ্যাস তৈরি হচ্ছে, তার ওপর ভবিষ্যৎ চরিত্র অনেকাংশে নির্ভর করে। (Nicomachean Ethics, Book II.)।
২. শিশু-কিশোরদের ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধ শেখানো
শিশু-কিশোররাই আগামী দিনের সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেবে। তাই তাদের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, সহমর্মিতা, শিষ্টাচার, পরোপকার ও মানবিকতার চর্চা গড়ে তুলতে হবে। কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল নয়, একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠাই শিক্ষার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন এবং নিষেধ করেছেন অশ্লীলতা, অসৎ কাজ ও সীমালঙ্ঘন করতে। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন যে, শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে।’ —সূরা আন-নাহল : ৯০।
রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র উত্তম।’ —সহীহ আল-বুখারী।
এখানেও অ্যারিস্টটলের একটি কথা উল্লেখ করা যায়। তিনি বলেছেন, নৈতিক গুণ কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান থেকে আসে না; ভালো কাজের অভ্যাসের মাধ্যমেই মানুষ ন্যায়পরায়ণ, সংযমী ও সাহসী হয়ে ওঠে। তাই নৈতিক শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনের চর্চায় পরিণত করতে হবে। (Nicomachean Ethics, Book II.)।
৩. শিক্ষা ব্যবস্থায় চরিত্র গঠনমূলক শিক্ষার গুরুত্ব বৃদ্ধি
শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু ডিগ্রি অর্জন বা কর্মসংস্থানের যোগ্যতা তৈরি করা নয়; শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বিবেকবান, সৎ, দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিক তৈরি করা। জ্ঞান যদি নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে সেই জ্ঞান কখনো কখনো মানুষের কল্যাণের পরিবর্তে ধ্বংসের কারণও হতে পারে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান?’ —সূরা আয-যুমার : ৯।
রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘আমি উত্তম চরিত্রের পরিপূর্ণতা সাধনের জন্য প্রেরিত হয়েছি।’ —মুসনাদে আহমদ।
প্লেটো বলেছেন, শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য হলো মানুষের আত্মা ও চরিত্রকে সঠিক পথে পরিচালিত করা। তার দর্শনে শিক্ষা মানুষের নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
অতএব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক দায়িত্ব, সততা, মানবিকতা, সহনশীলতা ও দেশপ্রেমকে পাঠ্যক্রম ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন।
৪. মাদক, দুর্নীতি ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা
মাদকাসক্তি, দুর্নীতি, ঘুষ, প্রতারণা, সন্ত্রাস ও অন্যান্য অসামাজিক কর্মকাণ্ড সমাজের নৈতিক ভিতকে দুর্বল করে। এগুলো শুধু ব্যক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না; পরিবার, অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও বিপন্ন করে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।’ —সূরা আল-বাকারা : ১৮৮।
মাদক সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘প্রত্যেক নেশাজাতীয় বস্তু হারাম।’ —সহীহ মুসলিম।
সক্রেটিসের দর্শনে নৈতিক জ্ঞান ও সৎ জীবনযাপন পরস্পর অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার চিন্তার আলোকে বলা যায়, অন্যায়কে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য করে তোলা মানুষের ব্যক্তিগত চরিত্রের পাশাপাশি পুরো সমাজের নৈতিক চেতনাকেও দুর্বল করে।
তাই মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
৫. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিবাচক ও সচেতনতামূলক বিষয় প্রচার
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আধুনিক মানুষের চিন্তা, আচরণ ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছে। তাই এর অপব্যবহার রোধ করে জ্ঞান, নৈতিকতা, মানবিকতা, শিক্ষা ও সচেতনতামূলক বিষয় প্রচারে গুরুত্ব দিতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার কাছে তা লিপিবদ্ধ করার জন্য একজন প্রহরী প্রস্তুত রয়েছে।’ —সূরা কাফ : ১৮।
রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ —সহীহ আল-বুখারী ও সহীহ মুসলিম।
মার্শাল ম্যাকলুহান বলেছেন, ‘The medium is the message.’ তার বক্তব্যের তাৎপর্য হলো— যোগাযোগের মাধ্যম নিজেই মানুষের চিন্তা ও সামাজিক আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে নৈতিক ও ইতিবাচক পরিবর্তনের শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত করা দরকার।
৬. সৎ, যোগ্য ও মানবিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা
একটি সমাজের নৈতিক পরিবেশ অনেকাংশে তার নেতৃত্বের চরিত্রের ওপর নির্ভরশীল। নেতৃত্বে সততা, যোগ্যতা, ন্যায়পরায়ণতা ও জবাবদিহি থাকলে সমাজে এসব গুণের চর্চা বাড়ে। বিপরীতে নেতৃত্বে দুর্নীতি ও স্বার্থপরতা প্রতিষ্ঠিত হলে তা সমাজের সর্বস্তরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন আমানত তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচার করতে।’ —সূরা আন-নিসা : ৫৮।
রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ —সহীহ আল-বুখারী।
প্লেটো বলেছেন, ‘রাষ্ট্রের নেতৃত্ব এমন ব্যক্তিদের হাতে থাকা উচিত, যারা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায় ও সামষ্টিক কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেন।’ তাঁর Republic-এ ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের জন্য জ্ঞানী ও নৈতিক নেতৃত্বের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৭. আইনের সঠিক প্রয়োগ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা
আইনের শাসন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা একটি সভ্য সমাজের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। অপরাধী যদি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের কারণে আইনের ঊর্ধ্বে চলে যায়, তাহলে মানুষের মধ্যে অন্যায়ের প্রবণতা বৃদ্ধি পায় এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমে যায়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো, যদিও তা তোমাদের নিজেদের, পিতা-মাতা অথবা আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে যায়।’ —সূরা আন-নিসা : ১৩৫।
রাসূলুল্লাহ সা. ন্যায়পরায়ণ শাসক ও ন্যায়বিচারকারীদের বিশেষ মর্যাদার কথা বলেছেন। —সহীহ মুসলিম।
জন লক বলেছেন, ‘আইনের শাসন মানুষের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি।’ তার রাজনৈতিক দর্শনে ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং আইনের অধীন শাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অতএব আইন সবার জন্য সমান হতে হবে এবং বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত রেখে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
৮. সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি
একটি সমাজ কেবল আইন দিয়ে টিকে থাকে না; পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধও তার ভিত্তি। মানুষ যদি কেবল নিজের স্বার্থ নিয়ে চিন্তা করে, তাহলে সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো।’ —সূরা আল-বাকারা : ৮৩।
রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা ভালোবাসে, তার ভাইয়ের জন্যও তা ভালোবাসে।’ —সহীহ আল-বুখারী ও সহীহ মুসলিম।
ইমানুয়েল কান্ট বলেছেন, ‘মানুষকে কখনো কেবল নিজের স্বার্থসিদ্ধির উপায় হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়; প্রত্যেক মানুষকে তার নিজস্ব মর্যাদাসম্পন্ন সত্তা হিসেবে সম্মান করতে হবে।’ তার নৈতিক দর্শনের এই নীতি মানবিক মর্যাদা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তি শক্তিশালী করে।
৯. ভালো মানুষের সঙ্গ ও সুস্থ সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টি
মানুষের চরিত্র গঠনে তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ও সঙ্গের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের ক্ষেত্রে বন্ধু, সামাজিক পরিবেশ, সংস্কৃতি ও অনলাইন জগতের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই তরুণদের জন্য সুস্থ বিনোদন, খেলাধুলা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ —সূরা আত-তাওবা : ১১৯।
রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হলো আতর বিক্রেতা ও কামারের হাপরের মতো।’ —সহীহ আল-বুখারী ও সহীহ মুসলিম।
মানুষের নৈতিক চরিত্র তার অভ্যাস ও কার্যকলাপের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। তাই কোন পরিবেশে মানুষ বসবাস করছে এবং কী ধরনের আচরণের সঙ্গে সে নিয়মিত অভ্যস্ত হচ্ছে, তা তার চরিত্র নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১০. নিয়মিত আত্মসমালোচনা ও নৈতিক চর্চা
নৈতিক উন্নয়নের জন্য আত্মসমালোচনা অপরিহার্য। মানুষ যদি নিজের ভুল স্বীকার করতে না পারে, তাহলে তার আত্মশুদ্ধির পথও বন্ধ হয়ে যায়। তাই প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত নিয়মিত নিজের আচরণ, সিদ্ধান্ত ও নৈতিক অবস্থান পর্যালোচনা করা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ —সূরা আর-রা’দ: ১১।
রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের হিসাব গ্রহণ করে এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য কাজ করে।’ —সুনানে তিরমিযী।
সক্রেটিস বলেছেন, ‘The unexamined life is not worth living.’ অর্থাৎ যে জীবন আত্মপরীক্ষা বা আত্মসমালোচনা থেকে মুক্ত, সে জীবন প্রকৃত অর্থে অর্থবহ নয়। এই আত্মপরীক্ষাই মানুষকে নিজের ভুল শনাক্ত করে সংশোধনের সুযোগ দেয়।
উপসংহার
নৈতিকতা একটি জাতির সভ্যতা, সংস্কৃতি ও অগ্রগতির মৌলিক ভিত্তি। নৈতিক মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে গেলে আইন, প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন থাকলেও সমাজে প্রকৃত শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিপরীতে সততা, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি, মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ শক্তিশালী হলে একটি সমাজ স্থিতিশীল, নিরাপদ ও কল্যাণমুখী হয়ে ওঠে।
তাই নৈতিক পুনর্জাগরণকে শুধু ব্যক্তিগত সাধনা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি হতে হবে একটি সামাজিক আন্দোলন। পরিবারকে সন্তান গড়ার আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, শিক্ষাব্যবস্থায় চরিত্র গঠনের গুরুত্ব বাড়াতে হবে, তরুণদের মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ইতিবাচক কাজে ব্যবহার করতে হবে, সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং সর্বোপরি আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যক্তি যদি নিজেকে সংশোধন করে, পরিবার যদি সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা দেয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি চরিত্রবান নাগরিক তৈরি করে, সমাজ যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং রাষ্ট্র যদি ন্যায় ও আইনের শাসন নিশ্চিত করে— তাহলেই নৈতিক পুনর্জাগরণের মাধ্যমে একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
অন্যায়-অবিচার, দুর্নীতি, নারী নির্যাতন, মাদকাসক্তি, খুন-রাহাজানি ও সামাজিক সহিংসতার অবসান ঘটিয়ে ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও কল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠাই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার, ইনশাআল্লাহ।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা।