গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা ছাড়া সরকারের সামনে কোনো বিকল্প নেই
৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৭:৪৬
৩৬ জুলাই বিপ্লবের চেতনায় দীপ্ত ১১ দলীয় ঐক্য গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে লংমার্চ কর্মসূচি শুরু করেছে গত ৫ সেপ্টেম্বর শনিবার। ঐদিন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণে সারা দেশে সাড়া পড়েছে।
১১ দলীয় ঐক্যের ডাকা এ লংমার্চে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাটুরিয়া— সমগ্র দেশের রাজপথ যেভাবে প্রকম্পিত হয়েছে। আমরা মনে করি, এটি শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না। বরং তা ছিল স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক স্বতঃস্ফূর্ত গণবিস্ফোরণ। দেশের আপামর জনসাধারণের এই অভূতপূর্ব ও ব্যাপক অংশগ্রহণ একটি বিষয়কে দিবালোকের মতো স্পষ্ট করে দিয়েছে— জনগণ আর কোনো কালক্ষেপণ চায় না, তারা অনতিবিলম্বে বিরোধীদলের ঘোষিত ঐতিহাসিক ‘৬ দফা’র পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখতে চায়। রাজপথের এই উত্তাল তরঙ্গে কান পাতলে যে প্রতিধ্বনি শোনা গেছে, তা হলো স্বাধিকার, সাম্য এবং মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার তীব্র আকুতি। দূরদূরান্ত থেকে আসা লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, স্লোগান ও ঐক্যবদ্ধ অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে— ছাত্র-জনতার এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ‘জুলাই সনদ’ এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের ৬ দফা দাবি আজ আর কেবল নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক জোটের দলীয় এজেন্ডা নয়, বরং তা দেশের আপামর গণমানুষের এক অবিসংবাদিত আকুতিতে পরিণত হয়েছে।
ঐতিহাসিক লংমার্চ কর্মসূচিতে সংহতি ও নেতৃত্ব দিয়েছেন ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষনেতারা। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ও সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ বীরবিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমীর মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম সুবহানী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমীর হাফেজ মাওলানা আতাউল্লাহ ইবনে হাফেজ্জী হুজুর, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) সভাপতি এডভোকেট আনোয়ার হোসেন চান, ইসলামী ঐক্য আন্দোলনের আমীর ড. ঈসা শাহেদী। লংমার্চ-পরবর্তী উদ্বোধনী ও সমাপনী সমাবেশে জোটের শীর্ষনেতাদের নীতিগত অবস্থান ছিল অত্যন্ত সুদৃঢ় ও দূরদর্শী। জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সরকারের নীতিগত শিথিলতার প্রশ্ন উল্লেখ করে স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দেন যে, বিরোধী শক্তিকে নিষ্ক্রিয় রেখে কিংবা জনগণের গণতান্ত্রিক ইচ্ছাকে পাশ কাটিয়ে দেশ পরিচালনা করার চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। জনগণের এই ন্যায্য দাবির বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত আন্দোলন শেষ হবে না। জনগণকে সাথে নিয়ে তারা এ বিপ্লব চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছে ন্যায় ও ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণের তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
আমরাও মনে করি, ১১ দলীয় ঐক্যের ৬ দফা— ১. গণভোটের রায় বাস্তবায়ন : নির্বাচনে সংসদ সংস্কার বা জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়ে হওয়া গণভোটের গণরায় দ্রুত কার্যকর করা, ২. জুলাই গণহত্যার বিচার : ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যা ও নির্যাতনের দৃশ্যমান এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। ৩. সংকট নিরসন : জনজীবনে দুর্ভোগ সৃষ্টিকারী বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের সরবরাহ স্বাভাবিক করা। ৪. মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও দুর্নীতি বন্ধ : নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, চাঁদাবাজি এবং সব ধরনের দুর্নীতি কঠোরভাবে দমন করা। ৫. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি : দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা অবস্থার দ্রুত উন্নতি ঘটিয়ে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ৬. দলীয়করণ বন্ধ : প্রশাসন ও রাষ্ট্র বিভিন্ন অঙ্গনে সংকীর্ণ দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয়করণের অবসান ঘটানো— এগুলো শুধু ১১ দলীয় ঐক্যের দাবি নয়, এটি দেশের ১৮ কোটি মানুষের প্রাণের দাবি। রোদ-বৃষ্টি, রাতের আঁধার উপেক্ষা করে লংমার্চ, পথসভা এবং চট্টগ্রামের বিশাল জনসমাবেশের সফল বাস্তবায়ন সরকারকে এ বার্তাই দিচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে যে ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, তা সংকট সমাধানের পক্ষে অনুকূল নয়। সরকারের রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, সভা-সমাবেশে বাধা এবং জনগণের যৌক্তিক দাবিকে উড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা কেবল সংঘাত ও অস্থিরতাকেই উসকে দেবে। একটি কল্যাণকামী ও দায়িত্বশীল সরকারের প্রধান কর্তব্য জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। জোরপূর্বক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা ক্ষণস্থায়ী স্বস্তি দিলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনে। তাই সময় থাকতেই সরকারকে জেদ ও অহংকার পরিহার করে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। আমরা মনে করি, সরকার রাজপথের এই গণজোয়ারের ভাষা ও মনস্তাত্ত্বিক সত্যকে অনুধাবন করতে পারবে। রাজনৈতিক জেদ বা সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে আলোচনার পথ উন্মুক্ত করাই এখন সরকারের নীতিনির্ধারকদের জন্য ইতিবাচক হবে।
আমরা চাই, অবিলম্বে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ ও গণভোটের রায়কে পূর্ণ আইনি ও সাংবিধানিক রূপ দিয়ে দেশে প্রকৃত জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করা হোক। কারণ গণদাবি অবজ্ঞার পরিণতি কখনো শুভ হতে পারে না। ইতিহাসের অমিল স্রোতে ভেসে যাওয়া পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী ব্যবস্থার মতো এই সরকারের পরিণতি হোক, তা আমরা চাই না। তাই আমরা আশা করি, সরকার ১১ দলীয় ঐক্যের ৬ দফা দাবি দ্রুত মেনে নেবে। বিএনপি গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সরকারের মেয়াদ ও দেশের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। তাছাড়া ছাড়া সরকারের সামনে কোনো বিকল্প নেই।