সাহসী সৈনিক আম্মার (রা.)


১ জুলাই ২০২৬ ১৯:৪৯

॥ ইকবাল কবীর মোহন ॥
জাহিলিয়াতের ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত গোটা আরব দুনিয়া। মানুষ এক আল্লাহকে ভুলে গেল। আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে লোকেরা অসংখ্য মূর্তির পূজা করতো। তাছাড়া লোকেরা নানারকম পাপাচারে লিপ্ত হয়ে পড়লো। মারামারি ও হানাহানি আরব সমাজে লেগেই থাকতো। মারামারি একবার শুরু হলো তো তা বছরের পর বছর ধরে চলতো। ফলে সমাজে শান্তি ও সৌহার্দ্য বলতে কিছুই ছিলো না। মানুষ যেনো বন্য হায়েনার মতো পাষাণ হয়ে পড়েছিলো। সত্য ও ন্যায়নীতি বলতে কিছুই আর বাকি ছিলো না আরব সমাজে।
এমন এক দুঃসময়ে আঁধারের চাদর ছিড়ে দুনিয়ায় এলেন আল্লাহর মহানবী (সা.)। তাঁর আগমনে আরব মরুতে ফুটলো সত্যের স্বপ্নীল গোলাপ। এই গোলাপের সুবাস ও সৌরভ ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে। মক্কার আনাচে-কানাচে শোনা গেল মুক্তির অমোঘ বাণী। নবীজি (সা.) এলেন ইসলামের আলো নিয়ে। এই আলোয় উদ্ভাসিত হলো আরব সমাজ। সত্য-সন্ধানী মানুষের বুকে নাড়া দিলো নবীজি (সা.)-এর কথা। তিনি বললেন, ‘বন্ধুরা, তোমরা যা করছো, তা ঠিক নয়। তোমরা মূর্তি পূজা ছাড়ো। এসব মূর্তি মিথ্যা ও অলীক। আল্লাহ আমাদের সৃষ্টিকর্তা। তাই এক আল্লাহকে মানো।’
আরবের লোকেরা ছিলো ভীষণ অহঙ্কারী। তাদের মন ছিলো কলুষিত। অধিকাংশ আরব নবীজি (সা.)-এর কথা শুনলো না। বরং তারা নবীজি (সা.)-এর কথায় ক্ষিপ্ত হলো। আরবের হিংস্র ও বর্বর লোকেরা নবীজি (সা.)-কে বিদ্রƒপ ও কটাক্ষ করলো। তারা নবীজি (সা.)-কে নানাভাবে কষ্ট দিতো। মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর নবী। কাফেরদের কোনো বাধাই তাঁকে দাবিয়ে রাখতে পারলো না। তিনি ইসলামের কথা বলতে পিছপা হলেন না। এ সময় অনেকে আবার নবীজি (সা.)-এর কথায় আস্থা রাখলো। তাঁরা নবীজি (সা.)-এর কথা মেনে নিলো।
ফলে এসব নও-মুসলিমরা কাফের-মুশরিকদের কোপানলে পড়লেন। তাঁরাও চরম নিপীড়ন ও অত্যাচারের শিকার হলেন। এদের মধ্যে অন্যতম ইয়াসির (রা.)-এর গর্বিত পরিবার। ইয়াসির (রা.) নবীজি (সা.)-এর আহ্বানে সাড়া দিলেন। সাড়া দিলেন তাঁর স্ত্রী সুমাইয়া (রা.)। তাঁদের দুই পুত্র ছিলেন আবদুল্লাহ ও আম্মার (রা.)। তাঁরাও ইসলাম গ্রহণ করলেন। ফলে এরা সবাই কাফেরদের সীমাহীন নির্যাতনের শিকার হলেন। চরম ইসলামবিরোধী ও পাপিষ্ঠ আবু জাহেলের বর্শার আঘাতে ঝাঁঝরা হলো সুমাইয়ার পবিত্র দেহ। তিনি শহীদ হলেন। ইসলামের প্রথম মহিলা শহীদ তিনি। তাঁর স্বামী ইয়াসির (রা.)। কাফেররা তাঁকেও নির্মমভাবে শহীদ করলো। শহীদ হলেন তাঁদের আদরের সন্তান আবদুল্লাহও।
এই শহীদ পরিবারের আরেক সন্তান আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.)। তিনিও ইসলামের অমিয় বাণী গ্রহণ করে ধন্য হলেন। বড় বিচিত্র ছিলো তাঁর বর্ণিল জীবন। অনেক অনাচার ও অত্যাচারে তিনিও কম জর্জরিত হননি। ইসলামের দুশমনরা আম্মার (রা.)-কে অনেক কষ্ট দিয়েছে। তবে আম্মার (রা.) সাহসী পিতা ইয়াসির (রা.)-এর মতোই ছিলেন অটল-অবিচল। অত্যাচারের স্টিমরোলার আম্মার (রা.) সহ্য করলেন। তারপরও তিনি ইসলামের পথ থেকে বিচ্যুত হলেন না।
একবার কাফেররা আগুন জ্বেলে আম্মার (রা.)-কে আগুনের মধ্যে শুইয়ে দিলো। এ সময় কাফেররা আম্মার (রা.)-এর কষ্ট দেখে হাসাহাসি ও আনন্দ-উল্লাস করলো। তবে আল্লাহর অসীম রহমতে আম্মার (রা.) বেঁচে গেলেন। আরেকবার পাপিষ্ঠ কাফেররা আম্মার (রা.)-কে পানিতে ডুবিয়ে মারার চেষ্টা করলো। এ সময় তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তবে এবারও তিনি আল্লাহর সীমাহীন কুদরতে বেঁচে গেলেন।
আম্মার (রা.) ইসলামের কাজে ছিলেন অগ্রগামী। যেখানেই দীনের ডাক এসেছে তিনি উৎসাহে-আনন্দে সেখানে ছুটে গেছেন। ইসলামের প্রচার ও প্রসারে বাজি রেখেছেন নিজের জীবন। কাফেরদের সাথে লড়াইয়ে প্রতিটি রণাঙ্গনে আম্মার (রা.) সাহসের সাথে লড়াই করেছেন। দায়িত্ব নিয়ে অগ্রসর হয়ে ইসলামকে আগলে রাখার চেষ্টা করেছেন।
ইয়ামামার যুদ্ধের কথা। সেই ছিলো এক ভয়ানক যুদ্ধ। প্রাণপণে লড়াই করছেন আম্মার (রা.)। একসময় তলোয়ারের তীব্র আঘাতে তাঁর একটি কান কেটে মাটিতে পড়ে গেল। তাতে কী! কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই আম্মার (রা.)-এর মধ্যে। এই অবস্থায়ই খাপ খোলা তলোয়ার নিয়ে ছুটছেন আম্মার (রা। কাফেরদের ব্যূহ তছনছ করে তিনি এগিয়ে গেলেন। তবে কাফেরদের আক্রমণে মুসলিম বাহিনী পড়লো মহা সঙ্কটে। তাঁরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লো। কিন্তু আম্মার (রা.) সাহসের সাথে দাঁড়িয়ে গেলেন। তিনি সাথীদের ময়দানে ফিরে আসার উদাত্ত আহ্বান জানালেন। আম্মার (রা.)-এর ডাক জাদুর মতো কাজ করলো। আল্লাহর দীনের সৈনিকরা সম্বিত ফিরে পেলেন। মুসলিম সেনারা এবার প্রাণপণে লড়াই করলেন। অবশেষে তাঁরা বিজয়ীও হলেন। এই যুদ্ধে আম্মার (রা.)-এর সাহসী ভূমিকায় সবাই খুশি হলেন।
আম্মার (রা.)-কে মহানবী (সা.) খুব ভালোবাসতেন। কারণ তিনি ছিলেন এক গর্বিত শহীদ পরিবারের সাহসী সন্তান। হিজরতের পর মদিনা মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করা হচ্ছে। নবীজি (সা.) নিজেও এর জন্য কাজ করছেন। এ সময় আম্মার (রা.) মাথায় ইট বহন করে আনলেন। একবার তিনি রাসূল (সা.)-এর পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। এ সময় মহানবী (সা.) অত্যন্ত আদরের সাথে আম্মার (রা.)-এর মাথার ধুলোবালি ঝেড়ে দিলেন। এরপর নবীজি (সা.) অত্যন্ত কষ্টের সাথে আম্মার (রা.)-কে বললেন, ‘আফসোস আম্মার! একটি বিদ্রোহী দল তোমাকে হত্যা করবে। তুমি তাদের আল্লাহর আদর্শের দিকে ডাকবে। আর তারা তোমাকে ডাকবে জাহান্নামের দিকে।’
৬৫৬ সাল। আলি (রা.) ও মুয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্যে সংঘটিত হলো দুঃখজনক এক লড়াই। সেটি ছিলো সিফফিনের যুদ্ধ। আম্মার (রা.) তখন বেশ বৃদ্ধ মানুষ। তাঁর বয়স তখন একানব্বই বছর। এই দুঃসময়ে আম্মার (রা.) স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি আলি (রা.)-এর পক্ষে যুদ্ধ করার জন্য রওনা হলেন। অবশেষে তিনি যুদ্ধের ময়দানে গিয়ে পৌঁছালেন। তুমুল লড়াই চলছে। মুসলমানরা নিজেদের মধ্যেই লড়াই করলেন। ফলে উভয়পক্ষের চার হাজার মুসলমান শাহাদাতবরণ করলেন। আম্মার (রা.)। তিনিও সিফফিনের যুদ্ধে শহীদ হলেন।
ইসলামের সাহসী সৈনিক আম্মার (রা.)। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সহজ ও সরল মানুষ। তিনি অতি সাধারণ জীবনযাপন করতেন। খোদাভীরু আম্মার (রা.) ছিলেন সৎ, ন্যায়নিষ্ঠ ও অসীম সাহসী এক বিশ্বস্ত মুজাহিদ। আল্লাহকে ভালোবেসে তিনি জীবনকে ধন্য করেছিলেন। আর হাসতে হাসতে মহান আল্লাহর রাস্তায় তিনি জীবনকে উৎসর্গ করেন। তাঁর মহৎ জীবন আমাদের উজ্জীবিত করে। আজও অগণিত ইসলামী সৈনিক আম্মার (রা.)-এর সাহসের শিহরণ বুকে ধারণ করে। আর এই আবেগ নিয়ে আল্লাহর পথে জীবন বিলিয়ে দিতে তাঁরা কুণ্ঠাবোধ করে না।