পবিত্র মহররম ও আশুরার গুরুত্ব, ইতিহাস ও শিক্ষা
২৫ জুন ২০২৬ ১০:৩৩
॥ এস এম মাহমুদ হাসান ॥
ইসলামী বর্ষপঞ্জি বা হিজরি সনের প্রথম মাসের নাম মহররম। আরবি ‘মহররম’ শব্দের অর্থ হচ্ছে সম্মানিত, নিষিদ্ধ, মর্যাদাপূর্ণ বা পবিত্র। প্রাক-ইসলামী যুগ থেকেই এ মাসটি সমগ্র আরব উপদ্বীপে অত্যন্ত পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হতো। সুদূর অতীতেও আরবের গোত্রগুলো জাহেলি যুগের সমস্ত হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে এই মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ, রক্তপাত ও লুটতরাজ থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকত এবং একে বিশেষ সুরক্ষার চোখে দেখত। ইসলামের চিরন্তন আলো আগমনের পরও এই মাসের মর্যাদা বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ন হয়নি, বরং এর মহিমা ও আধ্যাতিক গুরুত্ব আরও বেশি সমৃদ্ধ, অর্থবহ ও কল্যাণময় হয়ে উঠেছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে এই মাসকে ‘আশহুরুল হুরুম’ বা চারটি বিশেষ সম্মানিত মাসের একটি হিসেবে ঘোষণা করেছেন। মহররমের প্রতিটি দিনই ফজিলতপূর্ণ, তবে এর মধ্যে দশম দিনটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর। এই দিনটিকে ‘আশুরা’ বলা হয়, যা ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আধ্যাতিকতার এক অনন্য মিলনস্থল। এই দিনটি ঘিরে আবর্তিত হয়েছে মানবজাতির ইতিহাসের যুগান্তকারী সব ঘটনা, যা প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে ঈমানি চেতনা জাগ্রত করে এবং গভীর জীবনমুখী শিক্ষার উৎস হিসেবে কাজ করে।
হিজরি বর্ষচক্রের সূচনা হয় মহররমের পবিত্রতা দিয়ে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের সূরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধানে আকাশের পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই মাসের সংখ্যা বারোটি। তার মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত দীন। সুতরাং এই মাসগুলোয় তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।’ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বিখ্যাত তাফসিরবিদ ইমাম ইবনে কাছির (রহ.) তাঁর তাফসির গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আল্লাহ বারো মাসের মধ্য থেকে চারটি মাসকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেছেন। এই মাসগুলোয় সংঘটিত পাপের গুরুত্ব যেমন মারাত্মক, তেমনি এতে কৃত নেক আমলের সওয়াব ও পুরস্কারও অন্য মাসের তুলনায় বহুগুণ বেশি। সুতরাং তোমরা এই সম্মানিত মাসগুলোয় পাপাচারে লিপ্ত হয়ে নিজেদের আত্মার ওপর জুলুম করো না।’ শুধু তাই নয়, আল্লাহর রাসূল (সা.) মহররম মাসকে ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতা দিয়েছেন। তিনি এই মাসকে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ বলে অভিহিত করেছেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, বছরের সব মাসই আল্লাহর সৃষ্টি, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট মাসকে যখন সরাসরি আল্লাহর নামের সাথে স¤পর্কিত করা হয়, তখন তা সেই মাসের সর্বোচ্চ মর্যাদা, পবিত্রতা ও শ্রেষ্ঠত্বের অকাট্য প্রমাণ বহন করে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি বিখ্যাত হাদিসে নবী করীম (সা.) বলেছেন, ‘রমজানের ফরজ রোজার পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।’ (সহিহ মুসলিম : ১১৬৩)।
আশুরার ঐতিহাসিক পটভূমি : মূসা (আ.) ও বনি ইসরাইলের মুক্তি মহররম মাসের দশম দিন তথা ‘আশুরা’ বিশ্বের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় ও যুগান্তকারী দিন। ইসলামী বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা ও রেওয়ায়েত অনুযায়ী, এই পবিত্র দিনে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির শুরু থেকে অনেক নবী-রাসূলকে বিভিন্ন বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং তাঁদের শত্রুদের ওপর বিজয় দান করেছিলেন। কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, এই দিনে আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর দীর্ঘদিনের তাওবা কবুল হয়েছিল, মহাপ্লাবনের পর হজরত নূহ (আ.)-এর নৌকা জুদি পাহাড়ের চূড়ায় এসে নোঙর ফেলেছিল এবং হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে নমরুদের প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ড থেকে অলৌকিকভাবে নাজাত দেওয়া হয়েছিল। তবে আশুরার দিনে ঘটে যাওয়া সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য, বিশুদ্ধ এবং হাদিসে সবিশেষ গুরুত্বের সাথে উল্লিখিত ঘটনা হলো হজরত মূসা (আ.) এবং তাঁর কওম ‘বনি ইসরাইল’ জাতির ফেরাউনের কবল থেকে অলৌকিক ও ঐতিহাসিক মুক্তির ঘটনা। মিশরের প্রতাপশালী শাসক ফেরাউনের অমানুষিক ও পাশবিক অত্যাচারে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নি®েপষিত হচ্ছিল বনি ইসরাইল সম্প্রদায়। অবশেষে আল্লাহর নির্দেশে হজরত মূসা (আ.) যখন তাঁর অনুসারীদের নিয়ে রাতের আঁধারে মিশর ত্যাগ করে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে যাচ্ছিলেন, বনি ইসরাইলের সামনে ছিল উত্তাল ও বিশাল লোহিত সাগর, আর ঠিক পেছনে ধেয়ে আসছিল লৌহবর্ম পরিহিত ফেরাউনের বিশাল ও আধুনিক সামরিক বাহিনী। সামনে উত্তাল তরঙ্গ, পেছনে মৃত্যুর হাতছানিÑ এমন এক নিশ্চিত ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বনি ইসরাইলের দুর্বলচিত্তের মানুষেরা ভয়ে ও হতাশায় কাতর হয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম!’ কিন্তু আল্লাহর ওপর যাঁর বিশ্বাস পাহাড়ের চেয়েও অটল, সেই নবী হজরত মূসা (আ.) অকম্পিত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, ‘তিনি বললেন, কখনোই নয়! আমার সাথে আমার রব আছেন, নিশ্চয়ই তিনি আমাকে পথ দেখাবেন।’ (সূরা আশ-শুয়ারা : ৬২)। অতঃপর আল্লাহর ওহী বা আদেশ এলো। মূসা (আ.) তাঁর হাতের লাঠি দিয়ে সাগরের পানিতে আঘাত করলে সাথে সাথে বিশাল লোহিত সাগরের মাঝখান দিয়ে বনি ইসরাইলের বারোটি গোত্রের জন্য বারোটি শুকনো ও নিরাপদ রাস্তা তৈরি হয়ে গেলে মূসা (আ.) তাঁর দলবলসহ নিরাপদে সেই সাগর পার হয়ে গেলেন। কিন্তু অহংকারী ফেরাউন যখন তার বিশাল বাহিনী ও রথসহ সেই একই অলৌকিক পথে সাগরে প্রবেশ করল, তখন রবের আদেশে সাগরের পানি আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে এলে চোখের পলকে ফেরাউন তার সমস্ত অহংকার ও বিশাল বাহিনীসহ সাগরের অতল গভীরে ডুবে ধ্বংস হয়ে গেল। এই মহামুক্তির ও অসত্যের পরাজয়ের ঐতিহাসিক দিনটি ছিল ১০ মহররম। ইসলামের প্রাথমিক যুগে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজা রাখা মুসলমানদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। পরবর্তীতে রমজানের রোজা ফরয হলে আশুরার রোজার বাধ্যবাধকতা শিথিল করে এটিকে ‘সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ’ বা অত্যন্ত সওয়াবের নফল ইবাদত হিসেবে বহাল রাখা হয়। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ইসলাম কোনো নতুন ধর্ম নয়, বরং এটি পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসূলের মূল আদর্শের ধারাবাহিকতা এবং বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর সাথে পূর্ববর্তী আম্বিয়ায়ে কেরামের আত্মিক ও আদর্শিক বন্ধন কতটা গভীর। ওলামায়ে কেরামের মতে, আশুরার রোজার সর্বোত্তম নিয়ম হলো মহররমের ৯ ও ১০ তারিখে রোজা রাখা। যদি কোনো কারণে ৯ তারিখে রোজা রাখা সম্ভব না হয়, তবে ১০ ও ১১ মহররম মিলিয়ে দুটি রোজা রাখা উচিত।
মহররম ও আশুরার আলোচনা করতে গেলে ইসলামের ইতিহাসের অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও রক্তঝরা একটি অধ্যায় স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আমাদের সামনে চলে আসে। হিজরি ৬১ সনের ১০ মহররম বর্তমান ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে এক চরম অমানবিক ও নির্মম ঘটনা ঘটেছিল। মহানবী (সা.)-এর অত্যন্ত আদরের ও প্রিয় দৌহিত্র, হজরত আলী (রা.) ও হজরত ফাতেমা (রা.)-এর কনিষ্ঠ পুত্র হজরত হুসাইন (রা.) স্বৈরাচারী শাসক ইয়াজিদের বাহিনীর হাতে সপরিবারে ও সঙ্গী-সাথীসহ অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে শাহাদাতবরণ করেন। নবী করীম (সা.) ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইনকে কতটা ভালোবাসতেন, তা প্রখ্যাত সাহাবী হজরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) প্রায়ই বলতেন, ‘তারা দুজন হলো দুনিয়ায় আমার দুটি সুগন্ধি ফুল।’ (সহিহ বুখারি : ৩৭৩০)। তৎকালীন সময়ে ইয়াজিদ যখন ইসলামী খেলাফতের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অন্যায়ভাবে ক্ষমতা দখল করে এবং সমাজে জুলুম, স্বৈরতন্ত্র ও অনৈসলামিক সংস্কৃতির বিস্তার ঘটাতে চায়, তখন হজরত হুসাইন (রা.) একজন প্রকৃত মুমিন হিসেবে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি দীনের বিশুদ্ধতা ও উম্মাহর কল্যাণের জন্য মদিনা থেকে কুফার উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু কারবালার ময়দানে ইয়াজিদের বিশাল বাহিনী তাঁর পানি ও খাবারের পথ বন্ধ করে দিয়ে অবরুদ্ধ করে ফেলে। ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কাতর থাকা সত্ত্বেও ইমাম হুসাইন (রা.) সত্য ও ন্যায়ের প্রশ্নে কোনো আপস না করে ১০ মহররম জুমার নামাজের পর জালিমদের হাতে তিনি নির্মমভাবে শহীদ হন। তাঁর এই শাহাদাত ইসলামের ইতিহাসে এক অসীম বেদনার মহাসমুদ্র, কিন্তু একই সাথে তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক টান করে দাঁড়ানোর এক চিরন্তন ও জ্বলন্ত অনুপ্রেরণা। কারবালার এই হৃদয়বিদারক ঘটনা মুসলিম উম্মাহকে গভীরভাবে ব্যথিত ও আলোড়িত করে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, আশুরার মূল গুরুত্ব ও পবিত্রতা কারবালার ঘটনার বহু আগে থেকেই, স্বয়ং সৃষ্টির শুরুত্ব এবং মূসা (আ.)-এর যুগ থেকেই নির্ধারিত ছিল।
কারবালার ঘটনা আশুরার দিন ঘটে যাওয়া একটি কাকতালীয় ও ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি। আজকাল আশুরা এলে আমাদের সমাজে কারবালার শোককে কেন্দ্র করে নানা ধরনের কুসংস্কার, অনৈসলামিক আচার-অনুষ্ঠান ও বিদ’আতের অনুপ্রবেশ লক্ষ করা যায়। অনেককে দেখা যায় শোক প্রকাশ করতে গিয়ে উচ্চৈঃস্বরে বিলাপ করতে, নিজের বুকে-মুখে আঘাত করতে, কাপড় ছিঁড়তে কিংবা লোহার শৃঙ্খল বা ছুরি দিয়ে নিজের শরীরকে আঘাত করে রক্তাক্ত করা যাকে ‘মাতম’ বলা হয়। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড স¤পূর্ণ হারাম ও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসুদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ¯পষ্ট বলেছেন, ‘যারা (কোনো বিপদে বা মৃত্যুতে) নিজের গালে চড় মারে, জামার কলার বা কাপড় ছিঁড়ে ফেলে এবং জাহেলি যুগের মতো চিৎকার ও বিলাপ করে, তারা আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ বুখারি: ১২৯৪)।
পবিত্র মহররম মাস এবং আশুরার দীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা আমাদের ব্যক্তি, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের জন্য বেশকিছু কালজয়ী ও অমূল্য শিক্ষা লাভ করতে পারি।
১. তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর অবিচল ভরসা : হজরত মূসা (আ.)-এর ঘটনা আমাদের শেখায় যে, বাহ্যিক সমস্ত উপায়-উপকরণ যখন বন্ধ হয়ে যায়, চারপাশ থেকে যখন মানুষ নিরাশার অন্ধকারে ডুবে যায়, তখনো আল্লাহর রহমতের দরজা বন্ধ হয় না। সামনে উত্তাল সাগর আর পেছনে শত্রু থাকা সত্ত্বেও মূসা (আ.) আল্লাহর ওপর ভরসা হারাননি। একজন মুমিন জীবনের যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে, রোগ-বালাই, অভাব-অনটন কিংবা শত্রুর ষড়যন্ত্রের মুখেও বিচলিত না হয়ে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও তাওয়াক্কুল রাখবে এটাই আশুরার প্রধান শিক্ষা।
২. অহংকার ও জুলুমের অবধারিত পতন : মিশরের ফেরাউন ছিল তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী, ধনী ও প্রতাপশালী শাসক যে নিজেকে খোদা বলে দাবি করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছিল এবং দুর্বল বনি ইসরাইলের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাকে লোহিত সাগরের সামান্য পানিতে ডুবিয়ে অত্যন্ত তুচ্ছভাবে ধ্বংস করে দিলেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ক্ষমতার মদমত্ততায় যারা পৃথিবীতে সীমালঙ্ঘন করে এবং মানুষের ওপর জুলুম করে, আল্লাহ তাদের দুনিয়ায়ও ছাড় দেন না। জুলুমের পরিণতি সর্বদা অত্যন্ত ভয়াবহ ও লজ্জাজনক হয়ে থাকে।
৩. সত্য ও ন্যায়ের পথে আপসহীনতা : কারবালা প্রান্তরে ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর পরিবারের আত্মত্যাগ আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, জীবনের চেয়েও ঈমান ও নীতির মূল্য অনেক বেশি। জালিম শাসকের কোটি টাকার প্রলোভন কিংবা সপরিবারে নিশ্চিত মৃত্যুর ভয় কোনো কিছুই তাঁকে অসত্যের সাথে হাত মেলাতে বাধ্য করতে পারেনি। সমাজ ও রাষ্ট্রে যখনই অন্যায়, অবিচার ও ইসলামের অবক্ষয় দেখা দেবে, তখন নিজের স্বার্থ ও জীবনের মায়া ত্যাগ করে সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া প্রতিটি মুমিনের নৈতিক দায়িত্ব।
৪. ইবাদতের মাধ্যমে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ : আশুরার রোজা মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে বনি ইসরাইলকে দেওয়া এক বিশাল নেয়ামত ও বিজয়ের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ পালন করা হয়। ইসলাম আমাদের শেখায় যে, জীবনে কোনো বড় সাফল্য, আনন্দ বা মুক্তি লাভ করলে তা নাচ-গান বা অনর্থক উৎসবের মাধ্যমে উদযাপন না করে, রোজা, নামাজ ও ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে রবের দরবারে শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হয়।
৫. ধৈর্য ও শরীয়তের বিধান মেনে চলা : কারবালার মতো মহাবিপদ ও শোকের মুহূর্তেও ইসলাম আমাদের ধৈর্যের চরম পরাকাষ্ঠা দেখাতে বলেছে। প্রিয়জনের বিয়োগে মানুষ ব্যথিত হবে, চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হবে এটা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি এবং এতে কোনো গুনাহ নেই। কিন্তু শরীয়তের সীমালঙ্ঘন করা যাবে না। যেকোনো মুসিবতে মুমিনের একমাত্র করণীয় হলো সবর করা।
৬. আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক জীবনের নবায়ন : মহররম মাস যেহেতু নতুন বছরের সূচনা করে, তাই এটি আমাদের জন্য বিগত বছরের হিসাব মেলানোর এবং আগামী বছরের জন্য আধ্যাতিক পরিকল্পনা করার একটি মোক্ষম সময়। এই মাসে বেশি বেশি নফল ইবাদত, দান-সদকা, ক্ষমাপ্রার্থনা ও গুনাহ বর্জনের মাধ্যমে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, মহররম শুধু একটি সাধারণ আরবি মাসের নাম নয় এবং আশুরা শুধু কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের আনুষ্ঠানিকতার দিন নয়। এটি হলো আত্মোপলব্ধি, ঈমানি চেতনা এবং আত্মশুদ্ধির এক অনন্য সুবর্ণ সুযোগ। ফেরাউনের পতন ও মূসা (আ.)-এর মুক্তি আমাদের আল্লাহর অসীম ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, আর কারবালার প্রান্তরে ইমাম হুসাইনের (রা.) শাহাদাত আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের প্রেরণা জোগায়। আসুন, আমরা মহররমের এই পবিত্র দিনগুলোয় অনর্থক বিতর্ক ও কুসংস্কার পরিহার করি। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী ৯ ও ১০ মহররম রোজা পালন করি, বেশি বেশি নেক আমল করি এবং ইসলামের সত্য ও সুন্দরের পতাকাকে সমুন্নত রাখার দীক্ষা নিই।