বিএনপি কি আওয়ামী লীগকে ফেরাতে চায়?
১১ জুন ২০২৬ ১০:০৩
॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেড় বছর সরকার পরিচালনা করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই সময় দেশ পরিচালনায় তিনি বিএনপিসহ বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করেই দেশ পরিচালনা করেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার পরিচালিত হচ্ছে। এ সময়ে বিএনপির লোকেরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধীদলের সমালোচনায় বেশি ব্যস্ত। প্রশাসন একচেটিয়ে দলীয়করণ করা হয়েছে। সব সিটিতে দলীয় প্রশাসক বসানো হয়েছে। বিভিন্ন টেন্ডার, লোভনীয় পদে বসানো হচ্ছে ফ্যাসিস্টদের দোসর হিসেবে চিহ্নিতদের। জামিনে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের। আওয়ামী লীগের লোকেরা প্রকাশ্যে মিছিল করলেও সরকার তাদের চোখে দেখে না। টেলিভিশন টকশো, অনলাইন এবং সামাজিকমাধ্যমগুলোয় বিএনপির অ্যাক্টিভিস্টরা আ’লীগের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলছেন না, বলছেন ১৭ বছর জুলুমের শিকার জামায়াতের বিরুদ্ধে। প্রকাশ্যে বিএনপি মহাসচিব বলছেন, ‘আমরা সমস্ত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলকে তাদের কর্মকাণ্ড করতে দিতে চাই।’ অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান অনেকটা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন, আওয়ামী লীগ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। দলীয় পোস্টে থাকলেও তিনি ভোটে অংশ নিতে বাধা নেই। সরকারের কর্মকাণ্ড, সরকারি দলের লোকদের তৎপরতা, বিএনপি মহাসচিব ও তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্যের পর মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে, তাহলে কী বিএনপি আওয়ামী লীগকে রাজপথে ফেরানোর সুযোগ করে দিচ্ছে?
আইভী-একাধিক সাবেক এমপিসহ অনেক আ.লীগ নেতার জামিন : নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী গত ৩ জুন বুধবার রাত সোয়া ১০টায় গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান। রাত সাড়ে ১২টায় তিনি নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকায় নিজ বাসভবনে পৌঁছান। বাসায় পৌঁছানোর পর দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান সেলিনা হায়াৎ আইভী, সঙ্গে বর্তমান সরকারের প্রতিও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। এর আগে গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে জয় পেয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। ওইদিনই বরিশাল-৫ (সদর) আসনে আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজ জামিন পান। একইসঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন এবং মহানগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হক খান মামুনও জামিন লাভ করেন। বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক তাদের জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের দুদিন পর জামিনে মুক্ত হন ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা দবিরুল ইসলাম। ১৯ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে তিনি দিনাজপুর জেলা কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন। অবশ্য ২৮ মে ২০২৬ তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। বিএনপি সরকার গঠনের প্রথম সপ্তাহেই জামিন পান আওয়ামী লীগের আরেক সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের বরিশাল জেলার সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনুস। ২৩ ফেব্রুয়ারি অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস. এম শরীয়তউল্লাহ তার জামিন মঞ্জুর করেন। আইনজীবী সূত্র জানায়, গত ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তালুকদার মো. ইউনুস আত্মগোপনে চলে যান। ওইসময় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করা হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি আদালতে হাজির হয়ে আত্মসমর্পণ করলে শুনানি শেষে আদালত জামিনের আদেশ দেন। অর্থাৎ বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরপরই আওয়ামী লীগের সাবেক একাধিক এমপি ও গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতার জানিনে মুক্ত হয়েছেন।
প্রকাশ্যে মিছিল করছে আ.লীগ, গ্রেফতার নেই
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠনের সব সাংগঠনিক তৎপরতা দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু দেশে প্রতিদিনই কোনো না কোনো স্থানে আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে মিছিল করছে। বিক্ষোভ থেকে জুলাই অভ্যুত্থানে সম্পৃক্তদের হুমকি দিচ্ছে।
সীতাকুণ্ডে নিষিদ্ধ দলের তৎপরতা
গত ৫ জুন শুক্রবার চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল করেছে। এ ঘটনায় নাশকতার অভিযোগে ৩৭ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় আরও ৩৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। ঘটনার দিন সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের ডিসি পার্কসংলগ্ন বন্দরগামী সড়কে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা আকস্মিক মিছিল বের করেন। এ সময় তারা বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন এবং নাশকতার উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধভাবে তৎপরতা চালায়। এর একদিন পর গত ৬ জুন শরীয়তপুরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ঝটিকা মিছিল করেছে। ওইদিন বিকেলে শরীয়তপুর পৌরসভার প্রেমতলা এলাকায় ঢাকা-শরীয়তপুর সড়কে তাঁরা মিছিল নিয়ে বের হয়। মিছিলের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, শরীয়তপুর পৌরসভার প্রেমতলা এলাকায় ঢাকা-শরীয়তপুর সড়কে দলীয় ব্যানার ও জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে হাঁটছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। ব্যানারের সামনে আওয়ামী লীগের এক কর্মী জাতীয় পতাকা নিয়ে হাঁটছে আর বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছে। মিছিলে নেতৃত্ব দিতে দেখা যায় শরীয়তপুর সদরের পালং ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সেলিম শেখকে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা যখন মিছিল করছিল, তখন ওই ইউপি সদস্য তাঁর ফেসবুক পেজ থেকে মিছিলের লাইভ করে। মিছিল থেকে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা ও আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। এছাড়া শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা ও শরীয়তপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেনের নামে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়।
নারায়ণগঞ্জে নাসিম ওসমানের ছেলে সক্রিয়
গত ৫ জুন শুক্রবার কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে সিদ্ধিরগঞ্জে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরী ওসমানের সহযোগী যুবলীগের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল করে। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুবলীগের ব্যানারে চিটাগাং রোড টু ডেমরা সড়কের গলাকাটা এলাকায় এ মিছিল হয়। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দেখা যায় ঝটিকা মিছিলটিতে অন্তত ১৮-২০ জনের এক গ্রুপকে আওয়ামী লীগ, শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনাকে নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছে। এতে নেতৃত্ব দেয় সিদ্ধিরগঞ্জ থানা তাঁতি লীগের সভাপতি লিটন ওরফে গুজা লিটন ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের জহিরুল ইসলাম। অর্থাৎ প্রতিদিনই মিছিল করছে আওয়ামী লীগ। এদিকে গত ৮ জুন সোমবার আনন্দাবাজার ডটকম, ‘আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলে ঢল নামল সমর্থকদের! ২০৮ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা কুমিল্লায়, ধৃত ৪৮’ শিরোনামে একটি সংবাদ পরিবেশন করে। ওই সংবাদে বলা হয়, বাংলাদেশে ‘নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল’ আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের মিছিলে কর্মী-সমর্থকদের ঢল নামল কুমিল্লায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ‘নিষিদ্ধ’ ছাত্রলীগের ব্যানারে ঝটিকা মিছিল হয়, সেই মিছিল থেকে সরকার বিরোধী স্লোগানের অভিযোগে ২০৮ জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে। এদের মধ্যে ৪৮ ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীকে আটক করে গত ৮ জুন সোমবার বিকেলে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাদের জেলে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এদের মধ্যে ৪৫ জনকে গত ৭ জুন রোববার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এবং আশপাশের এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। গত ৮ জুন সোমবার গ্রেফতার করা হয় তিন জনকে।
জুলাই হত্যা মামলার অনেক আসামি প্রকাশ্যে
নারায়াণগঞ্জ মিটি করপোরেশনে আওয়ামী লীগের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী, সাবেক রেলমন্ত্রী নজরুল ইসলাম সুজন, কক্সবাজারে সাবেক এমপি ও ইয়াবা ব্যবসায়ী আবদুর রহমান বদিসহ অনেক জুলাইযোদ্ধা হত্যা মামলার আসামি জামিন রয়েছেন। আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের অনেক লোক এখন জামিনে রয়েছে। বিশেষ করে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই জামিনের পরিমাণ বেড়ে যায়। এছাড়া সাবেক চিফ হুইপ ও এমপি এ এস এম ফিরোজ, আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ও এমপি এবং সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, সাবেক এমপি সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন এবং শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচার হওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি করা সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক জামিন পাওয়ার বিষয়টিট আলোচনায় রয়েছে। তাছাড়া মাঠপর্যায়ের শত শত নেতাকর্মী জামিন পেয়ে প্রকাশ্যে তৎপরতা চালাচ্ছেন।
বিএনপির অ্যাক্টিভিস্টরা আ.লীগ বিরুদ্ধে কোনো কথা বলছে না
বিএনপির অনেক নেতা জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে যতটা সরব, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ততটা নন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয়ও বিএনপির অ্যাক্টিভিস্টরা শুধু জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে অথচ গত ১৭ বছর জামায়াতে ইসলামী ছিল এমটি মজলুমের দল, এই দলটির নেতাকর্মীরা রাজপথে রক্ত দিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন, জেল-জুলুম সয়েছেন। আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে সাড়ে ১৫ বছর স্বৈরশাসন চালিয়েছে, ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠেছে। খুন ও গুমের রাজত্ব কায়েম করেছে। বিএনপির অ্যাক্টিভিস্ট আওয়ামী লীগের সেই অপকর্মগুলো তুলে না ধরে শুধু জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে সমালোচনায় ব্যস্ত রয়েছেন।
আ’লীগের অনিয়ম-দুর্নীতির আড়াল করার চেষ্টা
আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, অবৈধভাবে অর্থ পাচার, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে সরকারি টাকা লুটপাট করেছেন। গায়েবি প্রতিষ্ঠানের নামে শত শত হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ব্যাংকগুলোকে খালি করে দিয়েছে। সেই সব লুটেরাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে তাদের কাউকে না কাউকে পুনর্বাসনও করছে। যেমন ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান করা হয়েছে এমন এক ব্যক্তিকে, যিনি কিনা ২০২৪ সালের ৫ আাগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর আত্মগোপনে চলে যান এবং পরবর্তীতে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। এই ব্যক্তি লুটেরা এস আলমের অন্যতম সহযোগী এবং তার স্ত্রীর নামে ১ হাজার কোটি টাকার ঋণ সুবিধা তিনি নিয়েছেন, যা এখনো ঋণখেলাপি হিসেবে রয়েছে। এমন অসংখ্যা উদাহরণ রয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে দেশে অর্থনীতিকে যারা পাতালে নিয়ে গেছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বিএনপি ব্যস্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নানা দোষ-ত্রুটি ধরতে। সময়মতো টিকা কেন আনা হলো না, সেজন্য মামলা করা হয় সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে। বিশ্লেষকরা বলছেন, কেউ যদি দায়িত্ব অবহেলা করেন বা অনিয়ম-দুর্নীতি করেন তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনি মামলা হবে, আদালত তার শাস্তি নির্ধারণ করবেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে সরকার কেন চুপ আছেন, তা অনেকেরই অজানা।
আ’লীগের নেতাকর্মীরা স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন, জানালেন তথ্য উপদেষ্টা
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, শর্ত মানলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে। গত ৯ জুন মঙ্গলবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলনকক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা এসব কথা জানান। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশ নিতে ‘কোনোরকম কোনো সমস্যা নেই। মানে একজন ব্যক্তি যদি নির্বাচনে পার্টিসিপেট (অংশগ্রহণ) করতে চান, তিনি যদি আওয়ামী লীগের… করেন, কারণ এটা নির্দলীয়, এখানে কেউই দলের কথা বলবেন না। একজন নির্দলীয় ব্যক্তি আসলেন কিন্তু তিনি তার ক্যাম্পেইনে আওয়ামী লীগ বা তাদের যা যা বলার সেগুলো বলেন, সেটা প্রবলেম হবে। এর বাইরে নির্দলীয় ব্যক্তি তার যে ক্রাইটেরিয়া (শর্ত) আছে নির্বাচনটা করার জন্য সেটা যদি তিনি ফুলফিল করতে পারেন, তিনি নির্বাচন করতে পারেন। নিশ্চয়ই পারেন।’ যদি নির্বাচনে আসা কারও আওয়ামী লীগের দলীয় পদ-পদবি থাকে, তাহলে কী হবে? এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের পোস্ট পজিশন… আসলে যেটা হয় আরকি, সংগঠনের কর্মসূচি যেহেতু নিষিদ্ধ আছে এই পোস্ট পজিশন তিনি তো আসলে ব্যবহার করছেন না, তিনি করতে পারেন না। ব্যক্তি হিসেবে যেকোনো কেউ যদি ক্রাইটেরিয়া যা আছে, সেটা ফুলফিল করতে পারেন, তিনি যদি মনে করেন নির্বাচন করবেন তিনি নির্বাচন করতে পারেন। সরকারের দিক থেকে বাধা দেওয়ার কোনো কারণ নেই এ ব্যাপারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্যে অনেকটাই স্পষ্ট যে বছরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হচ্ছে, আর এ নির্বাচনকে কাজে লাগিয়েই মাঠে ফেরার সুযোগ পাচ্ছে আওয়ামী লীগ।
সব দলকে সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা বিএনপি মহাসচিবের
গত ৩ জুন বিকালে ঠাকুরগাঁওয়ের ভুল্লী উপজেলা পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয়ের উদ্বোধন শেষে কুমারপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সংবর্ধিত প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমরা সমস্ত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলকে তাদের কর্মকাণ্ড করতে দিতে চাই। জনগণের সামনে তাদের যেতে দিতে চাই, নির্বাধে তারা তাদের বক্তব্য দিক, সেটা চাই। এর মধ্যে জনগণ ঠিক করবেন, তারা কাকে চান।’ তিনি বলেন, পতিত সরকার (আওয়ামী লীগ) জোর করে ক্ষমতায় থাকতে গিয়ে তাদের দলবল নিয়ে এমনভাবে পালিয়ে যেতে হয়েছে যে ইচ্ছে করলেও আর তারা এখনই ফিরতে পারছে না। বিএনপি সেটা চায় না, বিএনপি চায়, সুন্দর সুস্থ সহনশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, উদার গণতন্ত্র আমরা প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’
মির্জা ফখরুল যা বলছেন
বিএনপি মহাসচিবের ‘সব দলকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে দিতে চাই’ বক্তব্যে ‘সব দল’ বলতে আওয়ামী লীগ অন্তর্ভুক্ত কিনা, তা নিয়ে রাজনীতিতে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন তিনি আওয়ামী লীগকে ইঙ্গিত করেছেন। কারণ আওয়ামী লীগ এখন নিষিদ্ধ হয়তো তিনি সেই দলকেই ইঙ্গিত করে বোঝাতে চেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, “বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, ‘সব দলকে কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দিতে চাই।’ আমরা স্পষ্ট জানতে চাই তাদের সব দলের মধ্যে আওয়ামী লীগ আছে কিনা?”
আওয়ামী লীগকে সুযোগ দেওয়া প্রসঙ্গে ইতোপূর্বে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার দলীয় অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি ‘জুলাই গণহত্যায় গ্রেফতারকৃত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাদের জামিন প্রদান ও দলটির অফিস খুলে দেওয়ার’ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একইসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে প্রকাশ্যে সক্রিয় ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী, তাকে জামিন দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আবদুর রহমান বদিকে জামিন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় পতিত ফ্যাসিবাদের দোসরদের ব্যাপক হারে জামিন প্রদান করা হচ্ছে। এর নেপথ্যে কারা সক্রিয়, তা জাতির কাছে স্পষ্ট। অবিলম্বে গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় সহিংসতায় জড়িয়ে পড়তে পারে, যার দায়ভার সরকারকেই বহন করতে হবে।’
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু অবশ্য মনে করেন, ‘মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শুধু বৈধ ও নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমের বিষয়ে কথা বলেছেন। সেখানে আওয়ামী লীগের নাম আসার সুযোগ নেই। কারণ তারা আইনে নিষিদ্ধ। তাদের নেতাকর্মীরাও পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। সব দলের মধ্যে তারা নেই। আর জাতীয় পার্টি তো কাজ করছেই। বিএনপি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। তাই বহুদলের মতামতকে শ্রদ্ধা জানায়। সবাইকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে চায়।’
প্রসঙ্গত, জুলাই-আগস্ট আন্দোলন দমনে হত্যা, গুম, খুন এবং সারা দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করার অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১২ মে আওয়ামী লীগ এবং এর সকল সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে একটি গেজেট প্রকাশ করেছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির নেতাদের বিচারকাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল’ পাসের মাধ্যমে এ নিষেধাজ্ঞাকে আইনি ভিত্তি দেওয়া হয়। জাতীয় সংসদে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল’ পাস করার ফলে কোনো সত্তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা সরকারের হাতে স্থায়ীভাবে অর্পিত হয়েছে। ফলে আইন বাতিলের আগে কার্যত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর কোনো সুযোগ নেই।