ওয়ালীমাহ্ বনাম কনেপক্ষের ভোজ
৪ জুন ২০২৬ ১০:৪০
॥ আতাউর রাহমান নাদভী ॥
ইসলামী শারীয়াতে বিবাহ কেবল একটি সামাজিক চুক্তি নয়, বরং এটি একটি পবিত্র ইবাদত। আর এই ইবাদাতের আনন্দ সবার সাথে ভাগ করে নেওয়ার একমাত্র অনুমোদিত মাধ্যম হলো ‘ওয়ালীমাহ্’। শারীয়াতে বিবাহ উপলক্ষে বরের পক্ষ থেকে দেওয়া এই ওয়ালীমাহ্ ছাড়া অন্য কোনো নামে দাওয়াত বা আনুষ্ঠানিকতার অস্তিত্ব নেই; এমনকি সর্বোত্তম যুগ হিসেবে খ্যাত নবীজী (সা.) ও সাহাবীদের যুগেও এর বাইরে কোনো প্রথা ছিলো না। তখন বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর বর তার সামর্থ্যানুযায়ী একটি ভোজের আয়োজন করতেন, যা মূলত বিয়ের আনন্দের ঘোষণা এবং সমাজকে তা জানানোর একটি সর্বোত্তম উপায়।
ভাষাগত দিক থেকে ইংরেজিতে ব্যবহৃত ‘উইলিয়াম’ শব্দটি মূলত আরবি ‘ওয়াও, লাম, মীম’ মূলধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ এমন একটি সমাবেশ যেখানে বন্ধুবান্ধব ও পরিবার-পরিজন খাওয়ার উদ্দেশ্যে একত্রিত হয়। মুসলিম সমাজে এই শব্দের বহুল ব্যবহারের কারণে বিবাহ উপলক্ষে স্বামীর পক্ষ থেকে আয়োজিত সমাবেশ বা ভোজকে ‘ওয়ালীমাহ্’ বলা হয়ে থাকে।
বিয়ে জায়েয হওয়ার জন্য শর্ত কী?
বিয়ে বৈধ হওয়ার জন্য শারীয়াতের তিনটি মূল শর্ত হলো; দুইজন সাক্ষীর উপস্থিতি, মোহর নির্ধারণ এবং উভয়ের ইজাব ও কবুল। এছাড়া বিয়ে মাসজিদে করা এবং খেজুর বিতরণ করা সুন্নাহ, যা বিবাহের ঘোষণার কাজও করে। বিয়ের খুতবা দেওয়া মুস্তাহাব, জরুরি কিছু নয়।
হযরত আবদুর রাহমান বিন আউফ (রা.) যখন মাদীনায় বিয়ে করেন, তখন খোদ রাসূলুল্লাহ্ (সা.) তা জানতেন না। পরে তাঁর চেহারায় বিয়ের চিহ্ন দেখে রাসূল (সা.) জানতে পারেন। তিনি (সা.) দাওয়াত না পেয়ে কোনো রাগ বা বিরক্তি করেননি, বরং বর-কনের জন্য দোয়া করেন এবং সামর্থ্যানুযায়ী একটি ছাগল দিয়ে ওয়ালীমাহ্ করার নির্দেশ দেন।
শারীয়াতের দৃষ্টিতে ওয়ালীমার মর্যাদা!!
বিবাহের পর বরের পক্ষ থেকে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের যে ভোজের আয়োজন করা হয়, তাকে ওয়ালীমাহ্ বলে। অধিকাংশ আলেমের মতে, এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ, আবার কেউ কেউ একে ওয়াজিব বলেছেন। তবে এটি কোনো ফরজ বিষয় নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) আবদুর রহমান ইবনু আওফ (রা.)-কে একটি ছাগল দিয়ে হলেও ওয়ালীমাহ্ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এছাড়া উম্মুল মুমিনীন হযরত সাফিয়্যাহ্ (রা.)-এর বিয়েতেও তিনি ওয়ালীমাহর আয়োজন করেছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর প্রিয় কন্যা হযরত ফাতিমাহ্ (রা.)-এর বিয়েতে জামাতা হযরত আলীকে বলেছিলেন, ‘বিয়ে উপলক্ষে বরের জন্য ওয়ালীমাহ্ করা আবশ্যক।’ তখন হযরত সাদ (রা.) একটি ছাগল এবং আনসারী সাহাবিরা ময়দার ব্যবস্থা করেন। লক্ষণীয় যে, কনের বাবা হিসেবে রাসূল (সা.) নিজে কোনো ভোজের আয়োজন করেননি, বরং বরকে ওয়ালীমাহ্ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এটিই ইসলামী বিয়ের প্রকৃত আদর্শ।
অথচ বর্তমান সমাজে ওয়ালীমাহকে আবশ্যক মনে করে লাখ লাখ টাকা অপচয় করা হচ্ছে। অন্যদিকে মেয়ের পক্ষের ওপর খাবারের অন্যায় বোঝা চাপানো হচ্ছে, যা ইসলামে নেই। এসব বানোয়াট কুপ্রথার কারণে বিয়ে এখন অনেকের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং দ্রুত বিবাহবিচ্ছেদ বাড়ছে। তাই দাম্পত্য জীবনে সুখ ও বরকত পেতে লোকদেখানো আড়ম্বর পরিহার করে ইসলামী রীতিনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
ওয়ালীমাহ্ কখন করতে হয়?
ওয়ালীমাহর সময় নির্ধারণে শারীয়াতে যথেষ্ট নমনীয়তা ও সুযোগ রয়েছে। বিবাহ অনুষ্ঠান, কনের বিদায়, কিংবা বাসর রাতের পর, সুবিধাজনক যেকোনো সময় এটি করা যায়। আল্লামাহ্ ইবনে হাজার আসকালানীর মতে, সালফে সালেহীনের বক্তব্য অনুযায়ী আকদ থেকে শুরু করে বাসর রাত পর্যন্ত যেকোনো সময়ই ওয়ালীমাহ্ করা বৈধ। ইমাম নববী ও কাজী আয়ায বাসর রাতের পর একে মুস্তাহাব বললেও আকদের পরপরই তা করার পক্ষে মত দিয়েছেন। ইমাম শাওকানী ও সৈয়দ সাবিকের মতে, স্থানীয় রীতিনীতি ও সুবিধার ওপর ভিত্তি করে এর সময় নির্ধারণের বড় অবকাশ রয়েছে।
মুফতি তাকী উসমানী উল্লেখ করেছেন, স্বামী-স্ত্রীর নির্জনতা বা বাসর রাতের পর ওয়ালীমাহ্ করা সবচেয়ে পছন্দনীয়, কারণ এতে সুন্নাহর পূর্ণতা আসে। তবে বিয়ের পরে কিংবা রুখসতীর আগে-পরে যেকোনো সময় আয়োজন করলেই ওয়ালীমাহর মূল সুন্নাতটি সুন্দরভাবে আদায় হয়ে যাবে। এর জন্য কোনো কঠোর শর্ত প্রযোজ্য নয়।
মালেকী ও শাফেঈ আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো : ফাতহুল বারীর মতে, বিয়ের পরপরই কনেকে বাড়ি এনে বাসর রাতের পূর্বেই ওয়ালীমাহ্ করা উত্তম, কারণ এটিই বিবাহ ঘোষণার শ্রেষ্ঠ সময়। তবে আল্লামাহ্ দামেরী ও শায়খ সালেহ আল-ফাওযানের মতে, ওয়ালীমার সময় নির্ধারণে শারীয়াতে যথেষ্ট সুযোগ ও প্রশস্ততা রয়েছে; যা বিবাহ অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে এর সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়া পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
রাসূলুল্লাহ্ (সা.) কখন ওয়ালীমাহ্ করেছেন?
রাসূলুল্লাহ্ (সা.) খালওয়াতে স্বাহীহাহ্ বা বাসর রাত শেষে ওয়লীমাহ্ করেছেন। অতএব এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইমাম বুখারী বর্ণনায় এই সম্পর্কে একটি দীর্ঘ হাদীসের মধ্যে আমরা এভাবে দেখতে পাই যে, উম্মুল মুমিনীন সাইয়্যিদাহ্ যায়নাব বিনতে জাহশ বলেছেন: ‘নাবী কারীম (সা.) দুলহা ছিলেন এবং লোকদের ওয়ালীমার দাওয়াত করলেন। সুতরাং তাঁরা এসে খানা খেলেন।’ (বুখারী)।
ঘটনাটি প্রমাণ করে, বাসর রাতের পরই ওয়ালীমাহর মূল সময় শুরু হয়। তৎকালীন যুগে ওয়ালীমাহর মাধ্যমেই বিয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হতো; বরযাত্রী নিয়ে মেয়ের বাড়িতে গিয়ে খাওয়ার কোনো প্রথা ইসলামে ছিলো না। এগুলো আমাদের তৈরি অপসংস্কৃতি। বিয়ের পর কনেকে বাড়িতে এনে বরের পক্ষ থেকে দ্রুত ওয়ালীমাহ্ করলে মেয়ের পরিবার বাড়তি খরচের বোঝা থেকে রক্ষা পায় এবং অতিথিদেরও দুবার যাতায়াত করতে হয় না। এছাড়া আকদ অনুষ্ঠানে সাধারণ মানুষদের বিদায় দিয়ে কেবল বিশেষ অতিথিদের জন্য আলাদা খাবারের ব্যবস্থা করা অনুচিত; এতে সমাজে বৈষম্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তাই জাঁকজমকহীন সুন্নাহসম্মত আয়োজনই শ্রেয়।
সামর্থ্যানুযায়ী ওয়ালীমাহ ও সুন্নাহর শিক্ষা
ইসলামে ওয়ালীমাহ্ হলো বিয়ের একটি পবিত্র সুন্নাহ, যা বরের সামর্থ্যানুযায়ী সাধারণ খাবার খাওয়ালেই আদায় হয়ে যায়। এখানে পোলাও, বিরিয়ানি বা দামি খাবারের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী খেজুর, ছাতু, এমনকি সামর্থ্য না থাকলে কেবল চা-বিস্কুট খাওয়ালেও ওয়ালীমাহ্ সম্পন্ন হয়। এই খরচের দায়িত্ব সম্পূর্ণ বরের। অথচ আজ আমরা সুন্নাহ ছেড়ে বিধর্মীদের কুপ্রথা গ্রহণ করেছি। কনে দেখার পর্ব থেকে শুরু করে বিয়ের পর পর্যন্ত দফায় দফায় বরপক্ষ মেয়ের বাড়িতে গিয়ে জোরপূর্বক ভূরিভোজ করছে। খাবারের মেন্যুতে সামান্য কমতি হলে কনের পরিবারকে ‘কৃপণ’ বা ‘ছোটলোক’ বলে অপবাদ দেওয়া হচ্ছে, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক।
সাহাবীদের যুগে পরিস্থিতি অনুযায়ী অত্যন্ত সাদামাটাভাবে ওয়ালীমাহ্ হতো। হযরত আলী (রা.) ও হযরত ফাতিমাহ (রা.)-এর বিয়েতে ওয়ালীমাহর খাবার ছিলো কেবল মাংস ও যবের রুটি। হযরত আসমা বিনতে উমাইস (রা.) একে সে যুগের সর্বোত্তম দাওয়াত বলেছিলেন। আবার ধনী সাহাবী হযরত আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.) যখন নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে বিয়ে করেন, তখন মহানবী (সা.) তাঁর সচ্ছলতা দেখে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘একটি ছাগল দিয়ে হলেও ওয়ালীমাহ্ করো।’
রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর বিভিন্ন বিয়েতে ওয়ালীমাহর ভিন্নতার কারণ ছিলো তৎকালীন পরিস্থিতি। তখন যা সহজলভ্য ছিলো, তা দিয়েই ভোজের ব্যবস্থা হতো। তবে উম্মুল মুমিনীন হযরত যায়নাব বিনতে জাহশ (রা.)-এর বিয়েতে রাসূল (সা.) বড় আয়োজন করেছিলেন। কারণ এই বিয়েটি সরাসরি আল্লাহর নির্দেশে আরশে আযীমে সম্পন্ন হয়েছিলো। এর মাধ্যমে ‘পালক পুত্রের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে করা যাবে না’ জাহেলি যুগের এই কুপ্রথার অবসান ঘটানো হয়। এই সাহসী পদক্ষেপের কারণেই বিশেষ ওয়ালীমাহর ব্যবস্থা করা হয়েছিলো, যেখানে আল্লাহর তরফ থেকে অলৌকিক বরকত নেমে এসেছিলো।
অতএব ওয়ালীমাহ্ কেবল লোকদেখানো ভোজসভা নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম। আড়ম্বরহীন ও সুন্নাহসম্মত ওয়ালীমাহর মাধ্যমেই দাম্পত্য জীবনে প্রকৃত বরকত লাভ সম্ভব।
ওয়ালীমায় নৈতিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে
ইসলামে ওয়ালীমাহর দাওয়াত দেওয়া ও গ্রহণের জোর তাগিদ রয়েছে, তবে এতে সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্রদের অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক। হাদীসে এসেছে, যে ওয়ালীমায় কেবল ধনীদের ডাকা হয় এবং গরিবদের উপেক্ষা করা হয়, তার খাবার সবচেয়ে নিকৃষ্ট। রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, নিকৃষ্ট খাবার সেটিই, যেখানে আগ্রহীদের (দরিদ্রদের) আসতে বাধা দেওয়া হয় এবং অনিচ্ছুকদের (ধনীদের) জোর করে আনা হয়। তাই বিয়ের এই শুভ উপলক্ষে অভাবী মানুষের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা শারীয়াতে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। লোকদেখানো সামাজিক মর্যাদার লোভে নিজের সামর্থ্যের বাইরে ধার-কর্জ করে এমন জমকালো ও বৈষম্যমূলক ভোজের আয়োজন করা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
শারীয়াতের দৃষ্টিতে কনেপক্ষের খাবারের বাস্তবতা
বর্তমান সমাজে বিবাহকে দিন দিন কঠিন করে তোলা হচ্ছে। বিয়ের আগেই এনগেজমেন্ট বা আংটি বদলের নামে শত শত মানুষকে মোরগ-পোলাও বা বিরিয়ানি খাওয়ানো এখন নিয়মিত প্রথা। এমনকি লাখ টাকা খরচ করে ছেলেপক্ষকে খাওয়ানোর পরও সামান্য কারণে বিয়ে ভেঙে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। যেমন; এক মেয়ের বিয়েতে বরপক্ষের মুরুব্বিদের পা ছুঁয়ে সালাম করতে বলায় মেয়েটি রাজি হয়নি। সে তার পরিবারকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ইসলামের শিক্ষা বিসর্জন দিয়ে সে বিয়ে করবে না; কারণ আজ পা ছুঁয়ে সালাম করলে সারা জীবন তা করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে মেয়ের বাবার ডাইনিংয়ে বসে ভূরিভোজের এই আয়োজন মানুষের তৈরি কুপ্রথা ছাড়া আর কিছুই নয়। শারীয়াতে মেয়ের পক্ষ থেকে নিয়মিত দাওয়াত বা বিশাল বরযাত্রী নিয়ে মেয়ের বাড়িতে গিয়ে খাওয়ার কোনো স্থান নেই।
দুর্ভাগ্যবশত, আজ সমাজের সবস্তরে শারীয়াতের বাস্তবতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজেদের বানানো নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর যখন বিশাল বরযাত্রী নিয়ে কনের বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন কাকে দাওয়াত দেবে আর কাকে বাদ দেবে, তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ও সংশয় তৈরি হয়। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় কনের বাবার। লোকলজ্জা, সামাজিক চাপ ও জোরজবরদস্তির কারণে অনেক গরিব বাবা-মা ধার-কর্জ বা ঋণ করে বরপক্ষের জন্য জমকালো ভোজের ব্যবস্থা করতে বাধ্য হন। তা না হলে বিয়েতে বাধা আসে বা বিয়ে ভেঙে যায়। অবশ্য শারীয়াত বিশেষজ্ঞদের মতে, বিয়ের অনুষ্ঠানে সীমিতসংখ্যক অতিথির জন্য কনেপক্ষ সাধ্য অনুযায়ী খাবারের ব্যবস্থা করলে তা শারীয়াত বিরোধী হবে না। কিন্তু এটিকে বাধ্যতামূলক নিয়মে পরিণত করলে গরিব পরিবারগুলো ঋণের বোঝায় পিষ্ট হবে, যা কখনো কাম্য নয়।
গভীরভাবে দেখলে, মেয়ের বাড়ির এই ভোজের দাবি এক ধরনের সুপ্ত যৌতুক। কেউ এটি সরাসরি দাবি করে, আবার কেউ নীরবে গ্রহণ করে। এই কারণে উপমহাদেশের অনেক ইসলামিক স্কলার মেয়ের বাবার পক্ষের এই খাবার পরিবেশনের বিরুদ্ধে জোর প্রচারণা চালাচ্ছেন এবং একে অবৈধ মনে করছেন। সমাজের খেটে খাওয়া মানুষের দুরবস্থার কথা চিন্তা করলে তাঁদের এই চিন্তাধারা সম্পূর্ণ যৌক্তিক। কোন যুক্তিতে বরপক্ষ বারবার মেয়ের বাড়িতে গিয়ে খাচ্ছে, তা ভাবা দরকার। শারীয়াত অনুযায়ী মেয়ের বাবার ওপর এই খাওয়ানোর কোনো দায়-দায়িত্ব নেই। তাই যারা নিজেদের আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মনে করেন, তাদের এই আয়োজন পরিহার করা উচিত। এটি মূলত বিধর্মীদের থেকে আসা এক অপসংস্কৃতি, যাকে আমরা আজ মুসলিম ঐতিহ্য ভাবছি।
পরকালীন মুক্তি ও সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য বাপ-দাদার বানানো এই কুপ্রথা ও বিধর্মীদের অনুকরণ ত্যাগ করে আল্লাহ ও রাসূলের পথ আঁকড়ে ধরতে হবে। অন্যথায় পারিবারিক শান্তি নষ্ট হবে এবং অবাধ্য সন্তানের জন্ম হবে। অনেকে প্রশ্ন করেন, মেয়ের বাবা খুশি হয়ে খাওয়ালে অসুবিধা কোথায় বা না-জায়েয হওয়ার দলিল কী? এর পেছনে দুটি স্পষ্ট উত্তর রয়েছে-
(এক) ছেলেপক্ষের দাবির কারণে মেয়ের বাড়ির এ ভোজ শারী‘য়াতের দৃষ্টিতে ‘আকলে বাতিল’ বা অন্যায়ভাবে অন্যের ধন-সম্পদ ভোগ করা, যা সম্পূর্ণ হারাম। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ পারস্পরিক সম্মতি ছাড়া অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রাস করতে নিষেধ করেছেন। (সূরা নিসা : ২৯)।
ইসলামী শারীয়াতে বিয়ের যাবতীয় খরচের দায়িত্ব এককভাবে পুরুষের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে, নারীর ওপর নয়। ইসলামের ইতিহাস ও সুন্নাহর কোথাও মেয়ের বাবার পক্ষ থেকে বরপক্ষকে খাওয়ানোর কোনো দৃষ্টান্ত নেই। যেহেতু বিবাহের মাধ্যমে বরই উপকৃত হয় এবং কনে তার ঘরে আসে, তাই বিয়ের একমাত্র স্বীকৃত ভোজ ‘ওয়ালীমাহ্’ বরের পক্ষ থেকেই হতে হবে।
(দুই) মেয়ের বাবা দাবি ছাড়া খুশি হয়ে খাওয়ালেও সমাজে তিনটি মারাত্মক অপরাধের জন্ম হয়-
(ক) শারীয়াত পরিপন্থী কাজ ও আত্মহনন : শারীয়াত যেখানে মেয়ের বাবার ওপর এই দায়িত্ব চাপায়নি, সেখানে খুশি হয়ে খাওয়ানোও শারীয়াতবিরোধী কাজ। আপাতদৃষ্টিতে একে ‘খুশি’ মনে হলেও কনের বাবাকে অর্থ জোগাড়, শারীরিক ও মানসিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আল্লাহ্ তায়ালা স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘এবং নিজের হাতে নিজেকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না’। (সূরা বাকারা : ১৯৫)।
(খ) কুপ্রথার প্রচলন ও সামাজিক জুলুম : বিত্তশালীদের দেখা দেখি সমাজে এটি একটি বাধ্যতামূলক রেওয়াজ বা কুপ্রথায় পরিণত হয়। ফলে গরিব মানুষ লোকলজ্জার ভয়ে ধার-কর্জ করে এই আয়োজন করতে বাধ্য হয়। যে গরিব বাবা খাওয়াতে পারেন না, সমাজ তার মেয়ের বিয়েকে ‘অসম্পূর্ণ’ বা ‘অলক্ষ্মী’ বলে গণ্য করে, যা তাদের জন্য আযাবস্বরূপ।
(গ) সামাজিক বিভেদ ও গীবত : সমাজ তখন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যারা ধুমধাম করে খাওয়ায় লোক তাদের প্রশংসা করে, আর অভাবের কারণে যারা খাওয়াতে পারে না সমাজ তাদের বদনাম করে। এমনকি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মানুষ খাওয়ার টেবিলে বসেই খাবারের নিন্দা শুরু করে। সুতরাং সমাজ ও আখেরাত রক্ষায় এই বানোয়াট প্রথা পরিহার করা আবশ্যক।
বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে খাওয়াতে না পারলে সামর্থ্যহীন বাবা-মায়েরা সারা জীবন নিজেদের অপরাধী মনে করেন। এ ধরনের কুপ্রথা সমাজে বহু অনাকাক্সিক্ষত সমস্যার জন্ম দিচ্ছে। তাই শারীয়াতবিরোধী অনুষ্ঠান পরিহার করে কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গঠন করা প্রত্যেক ঈমানদারের দায়িত্ব। আজ মুসলিম উম্মাহ্ পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অমুসলিমদের সংস্কৃতি অনুকরণ করতে গিয়ে নিজেদের আসল পরিচয় হারিয়ে ফেলছে। কিয়ামাতের দিন আল্লাহর একক ট্রাইব্যুনালে এ অধঃপতনের জন্য আমাদের সবাইকে জবাবদিহি করতে হবে। বিজাতীয় অপসংস্কৃতির ছোবল থেকে সমাজকে রক্ষা করে শারীয়াত সম্মত উপায়ে বিয়ের ব্যবস্থা করলে আগামী প্রজন্ম দীনদার হবে এবং লাখো অসহায় মানুষ এই কুপ্রথার জাল থেকে মুক্তি পাবে। বর্তমান সমাজের বাস্তব চিত্র হলো, বহু অসহায় বাবা মেয়ের বিয়ের চিন্তায় প্রতিনিয়ত মৃত্যু কামনা করছেন। বিলাসবহুল ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে চড়ে যারা এই কান্না শুনতে পাচ্ছেন না, তাদের মনে রাখা উচিত, কোনো বিষয় নিজের জানা না থাকার অর্থ এই নয় যে সমাজে তার অস্তিত্ব নেই।
কুরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘আসল ব্যাপার হচ্ছে, যে জিনিসটি এদের জ্ঞানের আওতায় আসেনি এবং যার পরিণামও এদের সামনে নেই তাকে এরা মিথ্যা বলে।’ (সূরা ইউনুস : ৩৯)। অতএব জালিমদের এই করুণ পরিণাম থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের আজই সচেতন হওয়া উচিত।
শেষ কথা : ওয়ালীমাহ্ হলো মহানবী (সা.)-এর একটি প্রিয় সুন্নাহ, যার মূল উদ্দেশ্য জীবনসঙ্গী পাওয়ার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। এটি বিয়ের আনন্দ প্রকাশের এবং আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভোজের মাধ্যমে এই খুশিতে শামিল করার একটি নিষ্কলুষ মাধ্যম। তবে বর্তমান যুগে সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শন এবং অতিরিক্ত অর্থ খরচের প্রতিযোগিতা করে এই পবিত্র সুন্নাহর মূল চেতনাকে নষ্ট করা হচ্ছে। গরিবদের বাদ দিয়ে ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দাওয়াত দেওয়ার এক নতুন প্রথা তৈরি হয়েছে। আমাদের মনে রাখা উচিত, ওয়ালীমাহ্ কেবল ভোজসভা নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম। আড়ম্বরহীন ও সুন্নাহসম্মত ওয়ালীমাহ্ পালনের মাধ্যমেই দাম্পত্য জীবনে প্রকৃত বরকত ও কল্যাণ লাভ সম্ভব।
লেখক : শিক্ষক, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ।