বিদেশি শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বৃদ্ধির ডিক্রি জারি, ফ্রান্সজুড়ে বাড়ছে ক্ষোভ

সোনার বাংলা অনলাইন
২৩ মে ২০২৬ ১৯:৫৭

লিয়ন ইউনিভার্সিটি ক‍্যাম্পাস

প্যারিস (ফ্রান্স) থেকে মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম
২৩ মে ২০২৬

ফ্রান্স সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরের দেশগুলো থেকে উচ্চশিক্ষা নিতে আসা বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি ব্যাপকভাবে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ফরাসি সংবাদমাধ্যম লা ক্রোয়া, লে ত্যুদিয়ঁ,রেডিও ফ্রান্স ইন্টারন্যাশনাল ও ইনফো-মাইগ্রেন্টস এর সূত্রমতে, সম্প্রতি প্রকাশিত সরকারি ডিক্রির মাধ্যমে জানানো হয়েছে, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে এই নতুন নীতি কার্যকর হবে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শিক্ষাবাজারে ফ্রান্সকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে এবং উচ্চমানের বিদেশি শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, এটি বৈষম্যমূলক এবং আর্থিকভাবে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার পথ আরও কঠিন করে তুলবে।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশ থেকে ফ্রান্সে আসা অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে লাইসেন্স বা ব্যাচেলর পর্যায়ে বছরে ২ হাজার ৮৯৫ ইউরো টিউশন ফি দিতে হবে। বর্তমানে এই ফি মাত্র ১৭৮ ইউরো। একইভাবে মাস্টার্স পর্যায়ে টিউশন ফি ২৫৪ ইউরো থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার ৯৪১ ইউরো নির্ধারণ করা হয়েছে। ফরাসি উচ্চশিক্ষামন্ত্রী ফিলিপ বাতিস্ত সরকারের “উচ্চশিক্ষার জন্য ফ্রান্সকে বেছে নিন” পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করছেন। সরকারের দাবি, বিশ্বের অন্যান্য অ্যাংলো-স্যাক্সন দেশের মতো ফ্রান্সও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য একটি টেকসই অর্থনৈতিক মডেল গড়ে তুলতে চায়, যেখানে বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেশি ফি নেওয়ার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে।

বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক ফি কাঠামো প্রথম চালু হয়েছিল ২০১৯ সালে। তবে এতদিন অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় বাড়তি ফি কার্যকর করেনি। বিভিন্ন ছাড় ও অব্যাহতির মাধ্যমে তারা পুরোনো কম ফি বহাল রেখেছিল। ফলে বাস্তবে অনেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আগের মতোই স্বল্প খরচে পড়াশোনার সুযোগ পেতেন। এবার সরকার সেই সুযোগ সীমিত করার পথে হাঁটছে। প্রথম খসড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বিদেশি শিক্ষার্থীকে অতিরিক্ত ফি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় মহল ও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে সরকার কিছুটা নমনীয় অবস্থান নেয়। সংশোধিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে এই অতিরিক্ত ফি থেকে অব্যাহতি দিতে পারবে। ২০২৭ সালে সেই হার কমে ২৫ শতাংশ হবে এবং ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তা সর্বোচ্চ ২০ শতাংশে নেমে আসবে। অর্থাৎ ধীরে ধীরে ফি মওকুফের সুযোগ আরও সীমিত হয়ে যাবে।

সরকারের যুক্তি হলো, বর্তমানে ফরাসি করদাতাদের অর্থে বিদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। নতুন নীতির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ উন্নত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সরকার বলছে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে “উচ্চ সম্ভাবনাময়” আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা যাবে। এর বিনিময়ে বিদেশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা শেষে ওয়ার্ক ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।

তবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সংগঠনগুলো এই সিদ্ধান্তকে “অন্যায্য” এবং “অসঙ্গতিপূর্ণ” বলে আখ্যা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, এই নীতির ফলে আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বহু শিক্ষার্থী ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। বিশেষ করে ফরাসিভাষী আফ্রিকান দেশগুলোর শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। শিক্ষক সংগঠন “উনসা সুপ-রিসার্চ”-এর মহাসচিব আলি শেরিফ বলেছেন, ফ্রান্স সবসময় বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত ছিল, কিন্তু এখন সেখানে সীমাবদ্ধতা ও কার্যত কোটা ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।

নতুন নীতির বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হয়েছে। গত ১২ মে প‍্যারিস সহ
ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে প্রথম দফার বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরা বিক্ষোভে অংশ নেন এবং সরকারবিরোধী স্লোগান দেন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সরকার একদিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার কথা বলছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত ফি চাপিয়ে বাস্তবে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করছে। বিভিন্ন শ্রমিক ও শিক্ষার্থী সংগঠনের জোট আগামী ২৬ মে আবারও দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। তাদের দাবি, সরকারকে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে হবে এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয় বাড়লেও অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বহু মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্য ফ্রান্সে পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে উঠবে। ফলে ফ্রান্সের ঐতিহ্যগত উন্মুক্ত ও বৈচিত্র্যময় শিক্ষাব্যবস্থা ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারে।

প্যারিস (ফ্রান্স) থেকে মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম

সম্পর্কিত খবর