পবিত্র ঈদুল আজহা ও কুরবানির তাৎপর্য


২২ মে ২০২৬ ২১:৪১

॥ মাওলানা হাফেজ কাজী মারফ বিল্লাহ ॥
জিলহজ মাসের ১০ তারিখ পবিত্র ঈদুল আজহা এবং সেদিনই আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নির্দেশনার আলোকে পশু কুরবানি করে থাকি। ঈদুল আজহার সাথে কুরবানির সম্পর্ক ত্যাগ, সাধনা ও আত্মার উৎসর্গ। কারণ এদিনই হযরত ইবরাহিম (আ.) পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর নির্দেশে কুরবানি করেছিলেন। তাই আল্লাহর নির্দেশের পুরোপুরি আনুগত্য করায়, আল্লাহ তার পরিবর্তে জান্নাতী দুম্বা কুরবানি করার মাধ্যমে হযরত ইবরাহিম (আ.) মহাপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। তাই ঈদুল আজহা ও কুরবানিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। প্রথমে ঈদুল আজহার গুরুত্ব ও তাৎপর্য আলোচনা করার পরপরই কুরবানির তাৎপর্য সম্পর্কে আলোচনা করবো, ইনশাআল্লাহ।
পবিত্র ঈদুল আজহার গুরুত্ব ও তাৎপর্য
মুসলমানদের সবচেয়ে বড় দুটি আনন্দের উৎসব হচ্ছে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। ঈদুল আজহা হচ্ছে পশু কুরবানি দিয়ে তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে ত্যাগের আনন্দ প্রকাশ করা হয়। মুসলমানদের নিকট ঈদুল আজহা বয়ে নিয়ে আসে অনুপম ত্যাগের অসাধারণ আনন্দ। ত্যাগের মাধ্যমে নির্মল আনন্দের এ মহান দিনটি কুরবানির ঈদ নামে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআন মাজীদে সূরা হজে ৩৭নং আয়াতে বলেছেন, আল্লাহ তায়ালার নিকট পৌঁছে না তার তথা কুরবানির পশুর গোশত ও রক্ত, বরং তার কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া’।
হযরত রাসূলে কারীম (সা.) ঈদুল আজহার তাৎপর্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, কুরবানির ঈদের দিনে আদম সন্তানদের পশু কুরবানি দেয়া অপেক্ষা আল্লাহ তায়ালার নিকট অধিকতর প্রিয় আর কোনো কাজ নাই। আর কুরবানির পশুকে কিয়ামতের দিন তাঁর শিং, পশম এবং ক্ষুরসহ উপস্থিত করা হবে। আর কুরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পতিত হওয়ার পূর্বেই আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়। বছর পরিক্রমায় কুরবানির ঈদ তথা ঈদুল আজহা এসে উপস্থিত হয় মুসলমান জাতিকে হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর ত্যাগের চেতনায় নতুনভাবে উজ্জীবিত করতে। ঈদুল আজহার দিনে কুরবানির সাথে জড়িত রয়েছে হযরত ইবরাহিম (আ.) এর তাওহীদবাদী জীবন ও একটি জাতি গঠনের সুদীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস।
ঈদুল আজহার দিনের করণীয় সম্পর্কে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত রাসূলে কারীম (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সামর্থ্য লাভ করেছে অথচ কুরবানি করে নাই, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকট না আসে। (ইবনে মাজাহ শরীফ)। সকলেরই উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টিকল্পে পশু কুরবানি করা। কুরবানি কোনো লৌকিকতার বিষয় নয়, বরং আল্লাহর রাহে তার নির্দেশ পালন করা। এখানে গোশত খাওয়া মুখ্য নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশ পালন করাই মূল লক্ষ্য। কুরবানি সার্থক করার জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন গোটা মুসলিম বিশ্বকে সম্মিলিত হওয়া এবং সংঘবদ্ধ হওয়া। ঈদুল আজহার তাৎপর্য : মুসলিম বিশ্বের কাছে আহ্বান জানায় শক্তিশালী ঈমান, নির্ভেজাল নবীজি (সা.)-এর প্রতি মুহব্বতের প্রেম এবং নজিরবিহীন ত্যাগ ও কুরবানির দিনের হযরত ইব্রহিম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.)-এর আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে বদ্ধমূল সংস্কার, অসত্য কুফরী ও তাগুতী শক্তিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করার শপথ গ্রহণ করা।
কুরবানির তাৎপর্য
প্রতি বছর কুরবানির ঈদ আসে মুসলমানদের আত্মত্যাগের মহিমায় অনুপ্রাণিত করে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনে উপযোগী করে তোলে। কুরবানি শুধু মুসলিম জাতির জন্যই একটি পবিত্র ইবাদত নয়, বরং অতীতের প্রত্যেক উম্মতের জন্য বিধান ছিলো। মহান আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারীমে সূরা হজের ৩৪নং আয়াতে বলেছেন, ‘প্রত্যেক উম্মতের জন্যই আমি কুরবানির বিধান দিয়েছিলাম’। কুরবানির ইতিহাস অনেক পুরাতন ও ব্যাপক। হযরত আদম (আ.)-এর জমানা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত পরিব্যপ্ত। হযরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল এবং কাবিলের মধ্যে সংঘটিত কুরবানির মাধ্যমে। কুরবানি হচ্ছে তাকওয়াবান লোকদের আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে অনন্য নিদর্শন। কুরবানি কবুল হওয়া না হওয়া ব্যক্তির ভাবাবেগ ও মানসিকতার ওপর নির্ভর করে। হাবিল ও কাবিল দুই ভাই একই সাথে কুরবানি দিল। একজন আল্লাহর নির্দেশে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ করায় কুরবানি কবুল হলো, অন্যজন যথাযথভাবে আত্মসমর্পণ না করায় কুরবানি কবুল হলো না।
হযরত ইবরাহিম (আ.) ৮৬ বছর বয়সে ভূমিষ্ঠ পুত্র সন্তান হযরত ইসমাইল (আ.)-কে মরু প্রান্তরে কুরবানি করে আল্লাহর নির্দেশিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। হযরত ইসমাইল (আ.) চলাফেরার বয়সে উপনীত হলে হযরত ইবরাহিম (আ.) তাঁর প্রাণপ্রিয় শিশুপুত্রকে আল্লাহর রাস্তার কুরবানি দেওয়া স্বপ্নে আদিষ্ট হওয়ার কথা পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-কে স্বপ্নের সকল ঘটনা স্ববিস্তার বলে পুত্রের অভিমত জানতে চাইলেন, যা সূরা আস সাফফাতে মহান আল্লাহ তায়ালা এভাবে বর্ণনা করেছেন, ‘অতঃপর সে যখন তার পিতার সাথে কাজ করার মতো বয়সে উপনীত হলো, তখন ইবরাহিম বললো, হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে আমি জবেহ করছি। এখন তোমার অভিমত কী বলো? সে বললো, হে আমার পিতা! ’আপনি যা আদিষ্ট হচ্ছেন তাই করুন। আল্লাহ তায়ালা ইচ্ছা করলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন’।
যখন তারা উভয়েই আনুগত্য (আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ) প্রকাশ করলো এবং ইবরাহিম তার পুত্রকে কাত করে শায়িত করলো ‘তখন আমি (আল্লাহ) তাকে আহ্বান করে বললাম, হে ইবরাহিম! তুমি তো স্বপ্নের আদেশ সত্যিই পালন করলে। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই এটা ছিলো এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাকে মুক্ত করলাম এক মহান কুরবানির বিনিময়ে। আমি এটা পরবর্তীদের স্মরণে রেখেছি। (সূরা সাফফাত : ১০৩-১০৭)।
হযরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর দেখানো স্বপ্নের আলোকে মরুর নির্জন প্রান্তরে পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কাত করে শুইয়ে নিজের চোখ বেঁধে নিয়ে আল্লাহু আকবার বলে ছুরি চালিয়ে নিজ পুত্রকে কুরবানি করেন। চোখ খুলে দেখতে পান পুত্র পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আল্লাহ তায়ালার অশেষ কুদরতে ইসমাইল (আ.)-কে সরিয়ে তদস্থলে একটি দুম্বা কুরবানি সমাপ্ত করে হযরত ইবরাহিম (আ.)-কে অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ করলেন।
মহাগ্রন্থ আল কুরআনের এ নির্দেশনার আলোকে অনাদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর সামর্থ্যবান ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় ওয়াজিব হিসেবে পশু কুরবানি করে গরিব-দুঃখী ও আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে বিলি-বণ্টন এবং নিজেরা আহারের মাধ্যমে সুখ ও আনন্দ ভাগাভাগি করে থাকে। হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর পরিবার নজিরবিহীন ত্যাগ ও কুরবানির যে শিক্ষা দিয়েছিলেন, তাতে উদ্বুদ্ধ হয়ে একজন মুমিন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে সদা প্রস্তুত থাকে। হযরত ইসমাইল (আ.)-এর মা হযরত হাজেরা (রা.) আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশগুলো আজ পবিত্র হজের অংশ হিসেবে গণ্য রয়েছে। এ ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে ঈদুল আজহার নামাজ আদায়ের পর পশু কুরবানি করা হয়। জিলহজ মাসের ১০ তারিখে ঈদুল আজহার নামাজের পরপরই পশু জবেহ করা উত্তম। যদি কোনো কারণে এ দিন কুরবানি দিতে না পারা যায়, তাহলে সাধারণত ১১ ও ১২ জিলহজ তারিখে কুরবানি দেয়া যাবে।
পরিশেষে বলতে চাই, আসুন আমরা আমাদের মাঝে লুকায়িত সকল প্রকার গর্ব-অহংকার ও আমিত্য পরিহার করে আল্লাহর নির্দেশনা ও হযরত রাসূলে কারীম (সা.)-এর সুন্নাহর আলোকে পশু কুরবানি করে আল্লাহ তায়ালার সান্নিধ্য অর্জনের মাধ্যমে গঠন করি সুখী-সমৃদ্ধশালী জীবন ও সূচিত করি সোনালি সুন্দর সমাজ এবং দেশ। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সকলকে ইখলাসের সাথে কুরবানি দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার তাওফিক দান করুন। আল্লাহুম্মা আমিন।
লেখক: ইসলামী চিন্তাবিদ, গবেষক, ধর্মীয় আলোচক ও উপস্থাপক বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশন এবং স্যাটেলাইট চ্যানেলস।