মৃত্যুশয্যায় শায়িত মহাবীর খালিদের দুঃখ


২২ মে ২০২৬ ২১:৩৬

॥ আবদুল হালীম খাঁ ॥
মহাবীর খালিদ মৃত্যুশয্যায় শায়িত। তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছেন। কিন্তু তার মন নিস্তেজ নয় এখনো। আশিটি জিহাদের বিজয়ী সেনাপতি তিনি। মনে পড়ছে তার জিহাদী জীবনের গৌরবময় স্মৃতি। জিহাদের কথা শুনলেই তার শরীরে রক্ত নেচে উঠতো। জিহাদ ছিল তার আনন্দের ছেলেখেলা। মনে হচ্ছে এখনো যদি জিহাদের ডাক আসত তিনি ছুটে যেতেন। কিন্তু তিনি যে এখন বিছানায় একাত-ওকাত হতে পারছেন না।
তিনি ছোট স্ত্রীকে খুব ভালোবাসতেন। খুব আদর করতেন। তাকে তিনি একটা প্রাইভেট নাম দিয়েছিলেনÑ কুমকুম। খালিদ জিহাদের ময়দান থেকে ফিরে এলে কুমকুম দৌড়ে এসে তার সামনে দাঁড়াতেন। তার জিহাদের পোশাক খুলে দিতেন। পাশে বসে শরীরে হাত বুলিয়ে দিতেন। বেশি করে আঙুরের রস দিয়ে শরবত বানিয়ে গ্লাস তার মুখে ধরতেন। খালিদ বলতেন, তুমি আগে একটু খেয়ে দাও। কুমকুম বলতেন, না তুমি আগে খাও। খালিদ হেসে বলতেন, এটা আমার প্রিয় রাসূলের সা. সুন্নত। এসব কথা বলে দুজন খুব হাসাহাসি করতেন। খালিদ কুমকুমের কাছে এলে তিনি আর মহাবীর থাকতেন না। হয়ে যেতেন একদম ছেলে মানুষ।
খালিদ আদর মাখা কণ্ঠে ডাক দিলেন কুমকুম!
কুমকুম কাছেই ছিলেন। তিনি জবাব দিলেন, জি, এই যে আমি আপনার পাশেই আছি। কী কথা বলুন।
আমার তরবারিটা কোথায়?
ঐ যে দেয়ালে ঝোলানো রয়েছে।
আমার হাতে দাও।
এখন তরবারি দিয়ে কী করবেন?
হাতে দাও দেখি।
কুমকুম তরবারি এনে হাতে দিলেন। কোষবদ্ধ তরবারি। তিনি তরবারি কোষমুক্ত করলেন। কোষমুক্ত করতে তরবারি খানিকটা ঝনাত শব্দ হলো। খালিদের মুখে হাসি ফুটে উঠলো। যেন তার শরীরে শিরায় শিরায় রক্ত টগবগ করে উঠলো। স্বামীর হাসিমুখ দেখে তিনিও হাসলেন।
খালিদ বিছানায় শুয়ে থেকেই হাত ঊর্ধ্বে তুলে ধরে মনে মনে বললেন, এই সেই তরবারি। যে তরবারি দিয়ে তিনি পাঁচটি-দশটি নয়। আশিটি জিহাদ করেছেন। অসংখ্য শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধে তিনি অতি অল্প মুজাহিদ বাহিনী নিয়ে জিহাদে জয়লাভ করেছেন।
মনে পড়ছে প্রিয় রাসূল সা. তাঁকে উপাধি দিয়েছিলেন সাইফুল্লাহ। আল্লাহর তরবারি। এর চেয়ে বড় মর্যাদা আর সম্মানের উপাধি কী আছে! আমি সেই সাইফুল্লাহ। আজ বিছানায় পড়ে আছি। এ কথা ভাবতেই তাঁর হাতটি বিছানায় ধপ করে পড়ে গেল। তিনি তরবারিটি শক্ত করে বুকে চেপে ধরলেন। দুঃখ-বেদনায় তিনি উহ! আহ! করতে লাগলেন। তিনি মৃদু কণ্ঠে বলতে লাগলেন, সারা জীবন জিহাদ করলাম। অথচ শহীদ হতে পারলাম না। শহীদের কত বড় যে মর্যাদা। আমি সেই মর্যাদা লাভ করতে পারলাম না। আমার শরীরে শত্রু তরবারির সামান্য একটু আঘাতও লাগেনি। তিনি আবার তরবারি হাতে নিয়ে তরবারির অগ্রভাগ দিয়ে নিজ হাতের এপিঠ-ওপিঠ খুঁচিয়ে দেখতে লাগলেন। না, কোথাও সামান্য আঘাতের দাগ নেই।
তাঁর মনে পড়লো এই সেই তরবারি। যে তরবারি তিনি ইয়ারমুকের যুদ্ধের ময়দানে রোম সম্রাট হিরা ক্লিয়াসের কয়েক লাখ অস্ত্রে সজ্জিত সৈন্যের প্রধান সেনাপতি মাহানের বুকে চেপে ধরে তার গর্ব চূর্ণ করে কয়েক লাখ সৈন্যের মধ্য দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে ধুলা উড়িয়ে চলে এসেছিলেন। আমি সেই খালিদ! এই আমার সেই তরবারি। এই সেই তরবারি। যে তরবারি কোষমুক্ত করলে তার চমকে আকাশে বিদ্যুৎ চমকাতো। শত্রুর বুক ভয়ে ধড়ফড় করতো। এই সেই তরবারি। এই সেই খালিদ আমি!
তিনি কুমকুমকে ডেকে বললেন, দেখো আমার শরীরের কোথাও আঘাতের দাগ আছে কিনা! কুমকুম কতদিন তাঁর বীর স্বামীর শরীরে হাত বুলিয়েছেন। কোথাও সামান্য আঘাতের দাগ দেখেনি। আজ তিনি স্বামীর কথায় তাঁর শরীরে আস্তে আস্তে ভালোবাসার হাত বুলাতে লাগলেন। কোথাও কোনো আঘাতের দাগ খুঁজে পেলেন না। নিটোল মসৃণ তার সুঠাম সুন্দর শরীর। তারপর কুমকুম তাঁর স্বামীর মুখের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, আপনার শরীরের কোথাও আঘাতের সামান্য দাগও নেই। আপনি তো সাইফুল্লাহ। আপনি আল্লাহর তরবারি। পৃথিবীতে এমন কে আছে, যে আপনার পবিত্র শরীরে আঘাত করে? এ কথা বলেই তিনি স্বামীর মুখের কাছে মুখ নিয়ে হাসতে লাগলেন।
মহাবীর খালিদ প্রিয়তমা স্ত্রীর হাসি মুখের কথা শুনেও হাসতে পারলেন না। তিনি মুখ ভার করে বেদনায় মলিন কণ্ঠে বললেন, তুমি হাসছো! আমি আশিটি জিহাদ করেও শহীদ হতে পারিনিÑ এ আমার মনের দুঃখ। এমনকি শত্রুর অস্ত্রের সামান্য আঘাতও লাগেনিÑ এ আমার প্রাণের দুঃখ। আশিটি জিহাদ করেও আল্লাহর রাস্তায় শরীরের রক্ত ঝরাতে পারিনিÑ এ আমার জীবনের বড় দুঃখ।