পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের ওপর বিজেপির হামলা


১৪ মে ২০২৬ ০৯:৫৬

॥ আবু জায়েদ আনসারী ॥
ভারতের হিন্দুত্ববাদের উত্থানের সর্বশেষ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ এখন আগ্নেয়গিরির জ¦ালামুখ। বিশেষ করে মুসলমান ও নিম্নবর্ণের সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী প্রতিদিন উগ্রবর্ণবাদী হিন্দুদের হাতে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এর আগে কয়েকটি এবং ৩টি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে উগ্রবর্ণহিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিতর্কিত নির্বাচনে বিজয়ে ‘ওরা বদল নয় বদলা’ স্লোগান দিয়ে মিথ্যা মিথ সামনে এনে মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর চালানো হচ্ছে হত্যা ও নির্যাতনের স্টিমরোলার। বিজেপির উগ্রবাদী নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা মুসলমানদের বাড়িঘর, মসজিদ, মাদরাসাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনায় হামলা করছে ও অগ্নিসংযোগ করছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। এতে দুজনের প্রাণহানি ও ৫০ জনের অধিক মানুষকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে এবং ৫৪টি স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা নতুন করে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে। এসব খবর ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটস (এপিসিআর) নামক একটি মানবাধিকার সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৪ থেকে ৭ মে পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অন্তত ৮টি জেলায় ৩৪টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সহিংসতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কোচবিহার এবং উত্তর ২৪ পরগনা (প্রতিটি জেলায় ৭টি করে ঘটনা)। এছাড়া কলকাতা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৫টি করে এবং হাওড়া ও মুর্শিদাবাদেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সহিংসতায় অন্তত ৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে কোচবিহারের গোসাইনিমারিতে একটি মসজিদ রক্ষা করতে গিয়ে এক মুসলিম ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। মুসলিম মালিকানাধীন সম্পত্তি, মসজিদ, গবাদি পশুর হাট এবং মাংসের দোকানগুলো পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। অন্তত ৫৪টি সম্পত্তি ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে এবং ৫০ জনেরও বেশি মানুষ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বারাসাতে মুসলিমদের হোটেল গুঁড়িয়ে দেয়া এবং নন্দিনা ও আবুত্রা গ্রামে ঘরবাড়ি ভাঙচুরের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
নির্বাচনের পর উগ্রবাদী গোষ্ঠীটি খুবই ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে চলেছে। মুসলিমদের নিধনে কিংবা নির্যাতনের পুরোনো সংস্কৃতিকে আবারো সামনে আনছেন তারা। দেশটির বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিমদের নির্যাতন ও ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে মুছে ফেলার ধারাবাহিক কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গেও। মানবাধিকার সংস্থাটি দাবি করেছে, সহিংসতার ধরন হিসেবে কেবল মারধর নয়, বরং ‘অর্থনৈতিক অবরোধ’ এবং ‘বুলডোজার সংস্কৃতি’ ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাতে ‘এন পাড়া মসজিদ বাড়ি রোড’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘নেতাজি পল্লী রোড’ এবং ‘সিরাজউদ্দৌলা উদ্যান’-এর নাম বদলে ‘শিবাজী উদ্যান’ করার চেষ্টা চালানো হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, দক্ষিণ ২৪ পরগনার কিছু জায়গায় বিজেপির বিজয় মিছিলে উসকানিমূলক স্লোগান দেওয়া হয়েছে। এমনকি আজাদ হিন্দ কলেজে মুসলিম ছাত্রীদের হিজাব পরতে বাধা দেওয়ার মতো অভিযোগও এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আশঙ্কার বিষয়ে হলো, এসব ঘটনা দেশটির মূলধারার গণমাধ্যমে সেভাবে উঠে আসছে নাÑ এমনটিই উল্লেখ করেছে এপিসিআর।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটের পর শুধু রাজনৈতিক কর্মীরাই নন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষও সহিংসতার শিকার হয়েছেনÑ এমন অনেক ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এরপরই এসব বিষষে সরব হয় তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ইতোমধ্যে ভোট-পরবর্তী সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। সম্প্রতি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি ভিডিও প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এটাই কি বাংলায় ভয়ের রাজনীতি শেষ করার নমুনা?’
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, পূর্ব মেদিনীপুর জেলার খেজুরি এলাকায় বিজেপি-আশ্রিত দুষ্কৃতকারীরা গুণ্ডারাজ কায়েম করে ৬০টিরও বেশি দোকান জ্বালিয়ে দিয়েছে। এতে সাধারণ ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সংসদ সদস্য ডেরেক তার পোস্টে দাবি করেছেন, পুলিশের অনুমতি নিয়েই এই বিজয় মিছিল বের করা হয়েছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় বাহিনীর (সিআরপিএফ) উপস্থিতিতেই প্রকাশ্য দিবালোকে বুলডোজার এনে মাংসের দোকানটি ভাঙা হয়। তিনি একে বিজেপির ‘জয়ের উদযাপন’ হিসেবে কটাক্ষ করে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বুলডোজার বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোয়; বিশেষত উত্তরপ্রদেশে, মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের সম্পত্তি গুঁড়িয়ে দেওয়ার একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে। বুলডোজার দিয়ে মুসলমানদের বাড়ি ভেঙে দেওয়া উত্তর প্রদেশে প্রায়ই ঘটে থাকে, যদিও সেরাজ্যের সরকার যুক্তি দিয়ে থাকে যে, ওই বাড়িগুলো হয় বেআইনিভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল অথবা সেগুলোয় কোনো দুষ্কৃতকারী বাস করতেন।
উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও ‘বুলডোজার’ প্রতীকটি বারবার উঠে এসেছে। তিনি যখন পশ্চিমবঙ্গের ভোট প্রচারে এসেছিলেন, তখনো দেখা গিয়েছিল বুলডোজার।
হিন্দুত্ববাদী ভারতে মুসলিমদের ওপর নানা সময়ে জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদ জানিয়ে তাদের নিরাপত্তা প্রদানের আহ্বান জানিয়ে আসছে বাাংলাদেশ। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাদের ‘পূর্ণ নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করতে আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু ভারত সরকার বাংলাদেশের আহ্বানকে ‘অযৌক্তিক’ ও ‘গোপন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ না বললেও তা এড়িয়ে যায়।
ভারতে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে পাতানো নির্বাচন-পরবর্তী ভারতে সংঘটিত সংখ্যালঘু মুসলমানদের লক্ষ করে পরিচালিত সহিংস কর্মকাণ্ডকে মানবাধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতার লঙ্ঘন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থি বলে আখ্যায়িত করেছেন ‘হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’ এর আমীর আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। গত ১১ মে সোমবার এক প্রতিবাদ সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিজেপি কর্মীদের বুলডোজার দিয়ে মুসলিমদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। গত ৯ মে শনিবার এক যৌথ বিবৃতিতে কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ এ প্রতিবাদ জানান।
বিবৃতিতে নেতারা বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরে মুসলমানদের ওপর এই পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। নির্বাচনের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে মুসলিমদের ওপর সুপরিকল্পিত আক্রমণ চালানো হচ্ছে। বুলডোজার দিয়ে বেছে বেছে মুসলিমদের বাড়িঘর ও দোকানপাট ভেঙে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে দার্জিলিং ও উলুবেড়িয়ায় মসজিদে হামলা এবং সম্পদ লুটপাটের ঘটনা উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের চরম মুসলিমবিদ্বেষী রূপেরই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। আমরা এসব ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
ভারতের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৫ শতাংশ মুসলিম, পশ্চিমবঙ্গে এ সংখ্যা ২৮ শতাংশ, যা দেশটির বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ মুসলমানরা। কিন্তু সংখ্যালঘু হিসেবে মুসলিমদের ওপর জুলুম অব্যাহত রয়েছে হিন্দুপ্রধান দেশটিতে। ভারতে মুসলিমরা দীর্ঘসময় থেকে নাগরিক মৌলিক অধিকার বঞ্চিত হয়ে আসছেন। রাষ্ট্রীয় মদদে কিংবা নীরব সমর্থনে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় তাদের ঘরবাড়ি, মসজিদ, মাদরাসা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো হয়। এমনকি সমাজে পিছিয়ে রাখতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সদস্যদের সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সুযোগকে সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। ফলে তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছেন।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি জয় পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন চরম মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্যের জন্য বিতর্কিত শুভেন্দু অধিকারী। সাবেক এই তৃণমূল নেতা বিজেপিতে যোগ দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হলেন। তার অতীত বক্তব্য এবং নির্বাচনী প্রচারণায় দেয়া বক্তব্যেও মুসলিমবিদ্বেষ ফুটে উঠেছে। নির্বাচনে জয় পাওয়ার পর নতুন করে মুসিলমদের ওপর সহিংসতার ঘটনাও বেড়েছে রাজ্যটিতে। এমতাবস্থায় বিতকির্ত নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয়ে মুসলিমদের ওপর জুলুম-নির্যাতন ব্যাপকহারে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছেন পর্যবেক্ষকমহল।