সংরক্ষিত নারী আসন : তোমার পতাকা বহিবারে দাও শকতি


৭ মে ২০২৬ ০৯:৫৪
॥ এডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নী ॥
সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে সংরক্ষিত আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। মনোনয়নপত্র জমা এবং মনোনয়নপত্র চূড়ান্ত বাছাই শেষে গেজেট প্রকাশ করা হয়।
সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদের (৩) দফার অধীন জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনসমূহ আনুপাতিক হারে বণ্টন এবং বণ্টনকৃত আসনের জন্য নির্বাচন পদ্ধতি অনুসরণে নির্বাচিত হয় সরকারি ও বিরোধীদলীয় ৪৯ জন নারী এমপি।
গত ৩ মে রোববার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এদিন রাতে সংসদ ভবনের পূর্ব ব্লকের লেভেল-১-এ অবস্থিত শপথকক্ষে নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের ৪৯ জন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে এটিএম আজহারুল ইসলাম, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, নূরুল ইসলাম বুলবুল ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপি জোট থেকে ৩৬ জন, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য থেকে ১২ জন এবং স্বতন্ত্র জোট থেকে ১ জন শপথ নেন। শপথগ্রহণ শেষে নববির্বাচিত সংসদ সদস্যরা রীতি অনুযায়ী সংসদ সচিবের রুমে শপথ বইয়ে স্বাক্ষর করেন।
এর আগে নারী আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ৪৯ জনের নাম-ঠিকানাসহ গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। গত ৩০ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ইসি সচিবের রুটিন দায়িত্বে থাকা কে এম আলী নেওয়াজের স্বাক্ষরে এ গেজেট জারি করা হয়।
বিএনপি জোট থেকে নির্বাচিতরা হলেন- সেলিমা রহমান, শিরিন সুলতানা, রাশেদা বেগম হীরা, রেহানা আক্তার রানু, নেওয়াজ হালিমা আরলী, ফরিদা ইয়াসমিন, বিলকিস ইসলাম, সাকিলা ফারজানা, হেলেন জেরিন খান, নিলোফার চৌধুরী মনি, নিপুণ রায় চৌধুরী, জিবা আমিনা খান, মাহমুদা হাবিবা, সাবিরা সুলতানা, সানসিলা জেবরিন, সানজিদা ইসলাম তুলি, সুলতানা আহমেদ, ফাহমিদা হক, আন্না মিনজ, সুবর্ণা সিকদার, শামীম আরা বেগম স্বপ্না, শাম্মী আক্তার, ফেরদৌসী আহমেদ, বীথিকা বিনতে হোসাইন, সুরাইয়া জেরিন, মানসুরা আক্তার, জহরত আদিব চৌধুরী, মমতাজ আলো, ফাহিমা নাসরিন, আরিফা সুলতানা, সানজিদা ইয়াসমিন, নাদিয়া পাঠান পাপন, শওকত আর আক্তার, মাধবী মারমা, সেলিনা সুলতানা ও রেবেকা সুলতানা।
১১ দলীয়  জোটের নির্বাচিত যারা- নির্বাচিতদের মধ্যে রয়েছেন জামায়াতের ৯ জন, এনসিপির ১ জন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ১ জন এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) ১ জন।
নির্বাচিতরা হলেন- জামায়াতের নূরুন্নিসা সিদ্দীকা, মারজিয়া বেগম, সাবিকুন্নাহার মুন্নী, নাজমুন নাহার নীলু, মাহফুজা হান্নান, সাজেদা সামাদ, শামছুন্নাহার বেগম, মারদিয়া মমতাজ, জুলাই শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম, এনসিপির মাহমুদা আলম মিতু, জাগপার তাসমিয়া প্রধান ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাহবুবা হাকিম।
এছাড়া স্বতন্ত্র জোটের প্রার্থী হিসেবে সাবেক ছাত্রদল নেত্রী সুলতানা জেসমিন জুঁই সংরক্ষিত আসনের এমপি নির্বাচিত হয়েছেন।
সংরক্ষিত নারী আসন মোট ৫০টি। এর মধ্যে জামায়াত জোট ১৩টি নারী আসন পেয়েছে। জোটে থাকা এনসিপির একজন এখনো নির্বাচিত হননি। এনসিপির প্রার্থী মনিরা শারমিনের মনোনয়ন বাছাইয়ে বাতিল হয়। আর নির্ধারিত সময়ের পরে যাওয়ায় প্রথমে এনসিপির আরেক প্রার্থী নুসরাত তাবাসসুমের মনোনয়ন গ্রহণ করেননি রিটার্নিং কর্মকর্তা। পরে আদালতের নির্দেশে তাঁর মনোনযনপত্র  গ্রহণ করা হয় এবং বাছাইয়ে বৈধ হয়। তবে তাঁকে এখনো নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়নি কিংবা গেজেট প্রকাশ করা হয়নি। অন্যদিকে মনিরা শারমিন ইসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিট করেছেন। সেটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এছাড়া নুসরাত তাবাসসুমকে এমপি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ না করতে ইসিতে চিঠি দিয়েছেন মনিরা শারমিন।
নবনির্বাচিত সকল সংসদ সদস্যকে অভিনন্দন। মহান আল্লাহ যেন তাদের দায়িত্বভার সহজ করে দেন। যারা সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত হলেন, তাদের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। বিশেষ করে দেশের ৫১% নারী সমাজের কণ্ঠস্বর হিসেবে সংসদে তারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন, দল মতের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে সরকারি ও বিরোধীদলীয় নারী সংসদ সদস্যগণ ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখবেন। নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ নারী সমাজের  সুযোগ সুবিধা এবং স্বার্থ রক্ষায় যথাযথ আইন প্রণয়ন করবেন, আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন ও প্রয়োগের নিশ্চয়তা বিধানে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সরকারের গঠনমূলক সমালেচনা করবেন।
সরকার সংস্কার নিয়ে জনগণের সঙ্গে টালবাহানা করছে। নির্বাচনের আগে জনগণের সঙ্গে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে। যে জুলাই শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে মহান সংসদে যাবার সুযোগ হলো, গণমানুষের এক দাবি জুলাই সনদের বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করা। সংসদে প্রয়োজনে রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া। রাষ্ট্র  কাঠামোর সংস্কার, স্বৈরাচারের বিচারের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। এ মহান দায়িত্ব পালনের শক্তি কামনা করছি। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নৈবেদ্য’ কাব্যগ্রন্থের কয়েকটি  পঙক্তি উদ্ধৃত করছি-
‘তোমার পতাকা যারে দাও
তারে বহিবারে দাও শকতি
তোমার সেবার মহান দুঃখ
সহিবারে দাও ভকতি।’
আমরা মহান রবের কাছে দোয়া করছি- মহান আল্লাহ সকলকে যথাযথ হক আদায় করে ও পূর্ণ আমানতদারিতার সাথে দায়িত্বপালন করা সহজ করে দেন, সাহায্য করেন এবং দীনের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব করার তাওফিক দেন। জাতীয় এ দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত করেন। পরিশেষে পবিত্র কুরআনের সূরা বাকার শেষ আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের শিখানো মোনাজাত উদ্ধৃত করে তার সাহায্য প্রার্থনা করছি, হে আমাদের প্রতিপালক! যদি আমরা ভুলে যাই বা ভুল করি তবে তুমি আমাদেরকে অপরাধী কোরো না। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পূর্ববর্তীদের যে ভারী দায়িত্ব দিয়েছিলে আমাদের ওপর তেমন দায়িত্ব দিয়ো না। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এমন ভার আমাদের ওপর দিয়ো না, যা বইবার শক্তি আমাদের নেই। আর আমাদের পাপ মোচন করো, আর আমাদের ক্ষমা করো, আর আমাদের ওপর দয়া করো, তুমি আমাদের অভিভাবক। অতএব অবিশ্বাসী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তুমি আমাদের জয়যুক্ত করো।’
লেখিকা : জাতীয় সংসদ সদস্য।